অমিয়ভূষণ তাঁতী বউ: রূপান্তরিত স্বাধীন সত্তা – সোহানা মাহবুব

Abstract
In his short story ‘Tantibou’, Amiyabhushon Majumdar has depicted the tale of a flourishing liberated soul of an enslaved woman. Love induced sexual desire incites ecstasy, and a deep thirst for life. On the other hand, loveless sex generates perversion and deformity. The author has attempted to impose this theme on the lives of a weaver and an enslaved woman. The subservient-exhausted-dying woman has been woken up with the love of the weaver, his desire for offspring and his affectionate touches; a sense of soul-searching has risen in her. Finally, she has found herself and redemption by walking through the path of darkness. The newfound self-consciousness has given her redemption and transformed her as a liberated soul. This story apprehends how an enslaved woman becomes a weaver’s wife, and finally transforms into an independent entity. This essay attempts to critically understand the construction of different phases of this metamorphosis.

অমিয়ভূষণের কথাসাহিত্যে নারী অমিত শক্তির আধার। তাঁর কাছে ”নারীই জীবন, পুরুষ তার means to an end…’|(১) – তাঁতীবউ গল্পেও অমিয়ভূষণ এমন এক নারীকে এঁকেছেন, যার প্রবল আত্মশক্তি এক পরাধীন অকিঞ্চনসত্তা থেকে তাকে স্বাধীন-শুদ্ধ সত্তায় রূপান্তরিত করেছে। আলোচ্য প্রবন্ধে এই নারী, গল্পে যার নাম ”তাঁতীবউ, তার রূপান্তরিত সত্তার স্বরূপ উন্মোচনই অন্বিষ্ট হয়ে উঠেছে।

নরনারীর সম্পর্ক রূপায়ণে অমিয়ভূষণ মজুমদার যৌনতাকে অপরিহার্য মনে করেন। তবে সেই যৌনতাকে হতে হবে প্লবলভাবে জীবনীশক্তির আধার। আদিম  প্রাণশক্তিই (লাইফ ফোর্স) তাঁর কাছে যৌনতার মূল উপাদান। তিনি মনে করেন, যৌনতা তখনই শক্তি হয়ে উঠবে, যখন তার ভেতর থাকবে পরিশুদ্ধ প্রেম। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন:

…আমাদের দেশের লেখকরা যা বলে, ইউরোপেও অনেকে বলে যে love is conjunction of body.

 

আসলে love হচ্ছে light, that is extracted from the body. দুটো শরীরের ঘর্ষণে যে আলো দেখা যায়, সেটাই মানুষের আবিষ্কার,that is love তাই সে আলোর সন্ধান যখন করব তখন আমার চিত্ত যদি প্রেমে  উদ্ভাসিত না হয়, তবে কি হবে! …এটা যদি দুটো মানুষ যখন পাশাপাশি আসে …যারা মহাপুরুষ নয়, …তাদের মধ্যে, দুটো বিন্দুর মধ্যে যেমন আর্কল্যাম্পের আলো, আলো জন্মায়। তাতে কাম থাকবেই তা কিন্তু হীরকদ্যুতি স্বর্ণালঙ্কারে পান।

অমিয়ভূষণের তাঁতীবউ গল্পেও লেখক এমনই এক যৌনজীবনেরযে কথা বলতে চেয়েছেন। যৌনতা যেখানে প্রেম ও জীবনীশক্তি হিসেবে কাজ করেছে, এ গল্পে সেখানে ফুল ফুটেছে; আবার যেখানে যৌনতা ধর্ষণের নামান্তর সেখানে ফুলের বদলে জেগে উঠেছে বিকলাঙ্গতা আর কদর্যতার অন্ধকার।‘তাহলে ধরে নেওয়া যেতে পারে-পুরুষটি যতবেলা ইভের অ্যাডাম, ততবেলা সম্পর্কের সুতো ছাড়তে তিনি যাকে বলে অমায়িক নাম্বার ওয়ান অর্থাৎ এই ফাঁকে তোমরা যা কিছু করো না বাপু, বাধা দিতে আমার বয়েই গেছে।…তবে পুরুষসঙ্গীটি যদি ইভের অ্যাডাম হওয়ার পরিবর্তে ইভটিজার হয়ে ওঠে, তাহলেই তিনি কৃপাণহস্ত। তখন তুমি যে-ই হও না কেন…তোমাকে ধর্ষক নামেই ডাকহবে।৩ অমিয়ভূষণের এই যৌনতাবোধ তাঁর কথাসাহিত্যের মূল সুর। আলোচ্য প্রবন্ধে আমরা অমিয়ভূষণের তাঁতীবউ গল্পে গোকূল আর তাঁতীবউয়ের মধ্যকার সম্পর্ক-সূত্র ব্যাখ্যায় এবং তাঁতী বউয়ের হয়ে ওঠার ক্ষেত্র নির্মাণে এই জীবনেচ্ছাজাগানিয়া যৌনতার প্রভাব অনুধাবন করতে সচেষ্ট হব।

অমিয়ভূষণের তাঁতীবউ গল্পটি ১৩৫৪ বঙ্গাব্দে ”পূর্বাশ্রার আষাঢ় সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। তাঁতী এবং তার ক্রীতদাসীর মধ্যে ক্রমে গড়ে ওঠা সম্পর্কের অন্তর্বুননকেদ্ধশল- আলো অন্ধকারের রঙে বিশ্লেষিত হয়েছে এ গল্পে। এখানে অমিয়ভূষণ এমন এক যুগের কথা বলছেন, যা অন্ধকার আর আলোর আকাক্সক্ষাহীন মিলনের যুগ, যে যুগ মানবসত্তাকে দাসে পরিণত হওয়া কতগুলো হাত-পা-চেতনা বাঁধা কাঠামো বিকিকিনির যুগ। এরকমই এক বন্ধ্যা সময়ের গল্প বলতে চেয়েছেন অমিয়ভূষণ, যার কেন্দ্রাতিগ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে এক ক্রীতদাসী আর তার সত্ত¡াধিকারী তাঁতীর মধ্যকার সম্পর্কের টানাপড়েন।

অভিমন্যু বসাকের পুত্র গোকুল তšদবয়নের কেদ্ধশল নিরয়েইক্ত জন্মেছিল। পিতাকে বচকানা কাপড় আর ঠেঁটির পরিবর্তে মসলিন-বয়নে অতিক্রম করতে পারাটাই ছিলো তার কৃতিত্ব আর সৃজনশীলতার প্রকাশ। কিšদ তখনও পর্যন্ত সেটি পরিণত শিল্পবোধের অভাবে সেরা হয়ে উঠতে পারেনি। অর্থাৎ সৃজনে যে শৈল্পিকতা প্রয়োজন, যে জীবনীশক্তি প্রয়োজন, সেটি গোকুলের ভেতর জন্মেনি তখনও। তার তৈরি মসলিন আর মাকড়শার জাল তখনও অভিন্নই প্রায়। লেখকের ভাষায়:

গঞ্ছে পাঠাবার মতো সরেস জিনিস তার তাঁতে উৎরাত না, বিশেষ করে ফুলের কাজগুলোতে সোনার আঁশ খাটাতে সে পারতো না, কাজেই রাত্রিতে ঘুমিয়ে পড়ার আগে কয়েকটি মুহূর্ত ছাড়া বড়ো বেশি কারো চোখেপড়ত না তার কারিগরি; বড়োজোর সকালে কোনো স্বামী দেখতে পেতো রাত্রির শুকনো মালাগাছির সঙ্গে বিছানায় পড়ে আছে মাকড়সার শাদা জালির মতো কী
একটা।

গোকুল এভাবেই মসলিনের খেয়ালে জড়িয়ে গেলো। ইদিলশাহী পরগণার হাটে মসলিন বিক্রির পর হাটের বিশেষ এক ভিড়াক্রান্ত দিক তার কেদ্ধতূহলবাড়িয়ে তোলে। জমিদার-উজির-লাঠিয়াল-পাইক-পেয়াদা-সিপাইদের প্রবল ভিড় জানান দেয় ”এদিকে বাঁদী-বান্দার দোকান। টাকা দিয়ে বান্দা পাওয়া যেতো জোয়ান, বুদ্ধিমান, কেদ্ধশলী, পাঠান, মোবলা, খোজা, হিন্দু যার যে রকম চাই। বাঁদীও পাওয়া যেতো মুলতানি, গুজরাটি, আফগানি, শাদা, গোলাপি, শ্যামলা, কখনও বসরা থেকেও আসত।…আনারকলি, নুরজাহাঁ এসব দোকানের বেসাত্রি।৫ অন্ধকার এক কাল তার ক্ষতচিহ্নসমেত এভাবেই গল্পে উঠে আসে। মসলিন আর ক্রীতদাস চিহ্নিত করে দেয় একইসঙ্গে একটি বিশেষ কালের ইতিবাচকতা ও নেতিবাচকতাকে।

প্রাচীন ও মধ্যযুগে ভারতে যে দাসপ্রথা প্রচলিতাে, ছিতার বিবরণ মেলে শিলালিপি, পুরাণ, রামায়ণ-মহাভারত-বিদেশি পর্যটকদের বিবরণ এবং অন্য সাহিত্যের উল্লেখ থেকে। প্রথম দিকে, দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের মতে, ”দাস শব্দের অর্থে লাছিদাতা। আর্য ভাষাভাষীর হরপ্পা সভ্যতার মানুষদের সাধারণভাবে ঐ নামে অভিহিত করতো। পরবর্তীকালে বিজিত হরপ্পা অধিবাসীদের তারা দাস (অধীন) হিসাবে ব্যবহার করতো। তখন থেকেই দাস শব্দটির অর্থ পাল্টে গিয়ে সম্পূর্ণ অধীনতা বোঝান হয়েছে। বিজিত মহিলাদের অধীনভাবে ব্যবহার করলেও আর্য ভাষাভাষীদের সন্তানধারণ করা তাদের অন্যতম কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মধ্যযুগে সুলতান, আমীর ওমরাহ, রাজা বা অভিজাতদেরওীতদাসক্র থাকত’।৬ এরকমই এক ক্রীতদাসী এ গল্পের তাঁতীবউ। পঞ্চদশ শতকের শেষ বা ষোড়শ শতকের ঘটনাই এ গল্পের কালপট বলে অনুমান করে নেয়া যেতে পারে। ১৮৩৩ খ্রি. পর্যন্ত ভারতবর্ষে দাসপ্রথার প্রচলন এবংমধু সাধু ্ররখাঁনেদ্ধবাণিজ্যের সঙ্গে সঙ্গে দাসব্যবসাও ছিল ষোড়শ শতকেÑএক সাক্ষাৎকারে অমিয়ভূষণের এমন মন্তব্যের বরাতে এ গল্পের সময়কাল ষোড়শ শতকের আগে-পরে বলে বিবেচনা করা যেতে পারে। সেই কালের রূপাবয়ব নির্মাণে লেখক এখানে মসলিন-দাসব্যবসা আর সামন্ত শোষকের মতো কালচিহ্নায়ক উপাদান ব্যবহার করেছেন।

মেলার শেষদিন কেদ্ধতূহলবশত পায়ে পায়ে গোকুল বাঁদী বিকিকিনির দোকানে গেলে বিক্রেতার ওঁচা-ভাঙা মাল-উচ্ছি¡ষ্ট এক বাঁদী তার কপালে জোটে। যে খেয়ালের বশে গোকুল মসলিন বয়নে জড়িয়েছিল, ঠিক সেই একই ধরনের খেয়ালেই মসলিন-বিক্রির টাকায় সে সাতপাঁচ না ভেবে একটি ”মেয়ে নয়, মেয়ের কাঠামো যেন্র৭ কিনে নিলো। মূল গল্পের শুরু এখান থেকেই। বাঁদী ক্রয়ের পর নিজের ওপরেই ক্ষিপ্ত গোকুল একবারই সেই মাংসহীন হাড়সর্বস্ব কাঠামোর দিকে তাকিয়ে ঘৃণাবোধ করেছিল। অমিয়ভূষণ নির্মোহ দৃষ্টিতে গোকুলের বিরক্তি আর বিরক্তি উৎপাদনকারী বাঁদীর কাঠামো বর্ণনা করেন:

পথে দুর্বল রোগা মেয়েটার দিকে চেয়ে-চেয়ে কষ্ট যত না হলো তার চাইতে বেশি হলো রাগ। সে যে ঠকেছে, গ‘ামের লোকেরা আর একবার তাকে বোকা তাঁতী বলবে এ বিষয়ে সে নিঃসন্দেহ হয়েছে। সমস্ত শরীরের হাড়গুলো নড়বড় করছে। আধময়লা ডুরে ঠেঁটি পরবার ধরনটাই-বা কী! চোয়ালের হাড়গুলোর নিচে চোখ ডুবে গেছে, কাঁধের হাড়ের জোড়া পর্যন্ত বোঝা যাচ্ছে। কঙ্কালই হোক, কঙ্কালের গড়নের মধ্যেও একটা ছন্দ থাকা উচিত। যেন কোমর নেই এত সরু জায়গাটা, গোকুল ভাবছিলো, মচ্ করে একটা শব্দ হবে, তারপর- দু টুকরো হয়ে যাবে মেয়েটি। সে বললেÑ”আস্তে চলো, বাপ্রু। তার মনে হতে লাগলো, মুচিরা মাঝে মাঝে যেমন বুড়ো গোরু হাঁটিয়ে নিয়ে যায় রাস্তা দিয়ে এও যেন তেমনি। হাতে করে তুলে ফেলে দেবার মতো হলে সে ছুঁড়ে ফেলে দিতো তার বোকামির নিশানা করো চোখে না-পড়ে এমন জায়গায়।৮

বাঁদী কেবল শারীরিক কাঠামোতেই নয়, মানসিকভাবেও ছিলো নির্বোধ, নির্বাক। যেন শরীর ও মন কিংবা চেতনাসহ সে তাঁতীর সম্পত্তি। নিজের অস্তিত্ব বলতে কেবল বেঁচে থাকা মাত্র। চেতনাগত সাড় ছিলো না কোনও। অন্যদিকে, তাঁতীর ক্ষোভ-রাগ আর বিরক্তি কিংবা ঘৃণার প্রাখর্য বাঁদীকে সঙ্কুচিত করে তোলায় সে নিজেকে ক্রমে গুটিয়ে নিয়েছিল। ফলে তার প্রাথমিক রূপান্তর প্রক্রিয়াটুকু তাঁতীর চোখ এড়িয়ে যায়। অবহেলা সত্তে¡ও বাঁদীর কঙ্কালসদৃশ কাঠামোতে রক্ত-মাংস আর লাবণ্যের লালিমা গাঢ় হয়ে উঠছিল ক্রমশ। ভাদ্রের এক গভীর বর্ষণসিক্ত রাতে তাঁতী নতুন করে বাঁদীকে আবিষ্কারলো করতার সেই নবজাগ‘ত সুডেদ্ধল কাঠামোর গাঢ়বদ্ধ লাবণ্যে। গড় শ্রীখÐেরসুরতুনও এভাবেই মাধাইকর্তৃক আকস্মিকভাবে আবিষ্কৃত হয়েছিল। ”কী বিশ‘ী কি বিশ‘ী করে চোখ ফিরিয়ে নেওয়্রা৯তাঁতীর এতকালের মন বাঁদীর ”বক্ষের বৃত্তাভাস, নিতম্বের বিস্তৃতি, ঊরুর মসৃণতা, আর সব ছাপিয়ে তার১০ চোখ্র দেখে তাকে নিয়ে ভাবতে বাধ্য হয়েছিল। তার মনে হয়েছিল, ”এত করুণ, এত কিশোর!…এত ¯েœহ দিতে পারে একে, তবু না হয় ¯েœহের শেষ, না হয় তা জানান্রো।১১যে আশ‘য় আর ¯েœহের খোঁজ কোনদি এই ক্রীতদাসী মেয়েটি পায়নি, সেটি গোকুলের চোখে দেখতে পেয়ে সে তার সকল কারুণ্য নিয়ে তাঁতীকে আঁকড়ে ধরেছিল। এভাবেই গোকুল আর বাঁদীর সম্পর্ক ঘৃণা থেকে মাধুর্যে উপনীতলো। যদিওহ তখন পর্যন্ত বাঁদী তাঁতীবউ হয়ে ওঠেনি।

বাঁদীর সঙ্গে তৃ-সহবাসপ্ত গোকুলের ভেতর তীব্র এক জীবনীশক্তি এনে দেয়।যার ফলে সেই প্রাণশক্তি তার ভেতর আনন্দজাত এক শিল্পবোধের জন্ম দেয়। সে কারণেই হয়তো ”সকালে তাঁতঘরে গিয়ে গোকুল প্রথমে কিছুক্ষণ এত সূক্ষèকাজ করলো যা জীবনে করেনি। মানুষের শরীর যে এতো তৃপ্ত হতে পারে কে জানতো? শিরা-উপশিরাগুলোর শূন্যতাপূর্ণ হয়ে সেগুলো এত ¯িœগ্ধ হয়ে উঠছিলো। তার একবার অনুভব হলো সেটা শুভ্র ঊরুদেশের ছায়্রা। ১২ ফ্রয়েড যাকে লিবিডো আখ্যা দেন, অমিয়ভূষণ যাকে মনে করেন জর্জ বার্নার্ড শ্রএর লাইফ ফোর্স, বা যাকে তিনি দেবী মনসার বিষময় সত্তার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে চান, সবকিছু মিলেই এই প্রবল জীবনীশক্তিকে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। অমিয়ভূষণ বিশ্বাস তেন,কর ”লিবিদো…বিষের আধার, অথচ সে না থাকলে কিছুই কি ঘটে?্র১৩ এক প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন:

…ফ্রয়েডীয় আনকনশাস তো শোপেনহরের সেই উইল টু লিভই, সেই শক্তির উৎস…সেই গূঢ় স্বার্থপর জীবনেচ্ছা, যা সর্বব্যাপী, এমনকি গাছে, পশুতে, প্রাণীতে, পতঙ্গে…যা আবেগসর্বস্ব…মানুষ কী, আমিী,অন্যক অনেক আমি কি বলতে গেলে যেদ্ধনাবেগভূমিষ্ঠ সেই জীবনেচ্ছার কথাই বলতে পারা উচিত?

গোকুলের ভেতর উÐিত নবসৃজনীশক্তির পেছনেও সেই ”উইল টু লিভ্র। গোকুল যেন এই প্রথম সত্যিকারের শিল্পীহয়ে উঠলো। তাঁতঘর থেকে দিনরাত ভেসে আসা গান তার প্রাণশক্তি আর জীবনেচ্ছারই প্রগাঢ় প্রকাশ।ঁদীরবা সঙ্গে তার যাপিত জীবনে ক্রমশ গাঢ় হয়ে উঠছিল প্রেম। এভাবেই ধীরে ধীরে উদ্বেলিত জীবনেচ্ছা তার ভেতর শিল্পবোধের সঙ্গে সঙ্গে সন্তানাকাক্সক্ষাও জাগিয়ে দেয়। অন্যদিকে বাঁদীর নির্জীব-মৃতপ্রায় জীবনে এই যৌনতা জাগায় জীবনেচ্ছা।

অমিয়ভূষণ গল্পের এই জায়গায় জন্ম দেন এক আয়রনির। যে গোকুলের হাতে তিনি সরেস মসলিন উৎপাদনের ক্ষমতা দিলেন, সেই একই গোকুলকে দিলেন সন্তান উৎপাদনের ক্ষেত্রে অক্ষমতা। ক্রমশ তার এই অক্ষমতার কথা বাঁদীর কাছে উন্মোচিত হয়ে গেছে।

কাজেই যে জীবনেচ্ছা বাঁদীকে বাঁচার রসদ যুগিয়েছিল, সেই সদ্যজায়মান জীবনে গোকুলের সন্তানাকাক্সক্ষা তার ভেতর এক আশ‘য়হীনতার ভীতিবোধ তৈরি কেরলা। গোকুলের সন্তানাকাক্সক্ষায় তাই প্রথম আঁতকে উঠেছে সে। যদিও বাঁদী নিজেও ক্রমে নিজের ভেতর সন্তানাকাক্সক্ষা অনুভব করেছে। কারণ, সন্তান শেকড়সম। আর সংসারে শেকড়ায়নের আশায় গোকুলের সন্তানাকাক্সক্ষা দীরবাঁসঙ্গে একাকার হয়ে ওঠে। এভাবেই গল্পে দ্বিতীয় ধাপের সূত্রপাত ঘটে।

গোকুল অক্ষম জেনেও বাঁদীর সন্তানাকাক্সক্ষার জন্ম হয়েছিল শুধুমাত্র গোকুলের প্রতি তার অসীম ভালবাসা আর নিজের শেকড়ায়নের স্পৃহা থেকে। এ পর্যায়ে পাঠক উপলব্ধি করবেন, ধীরে ধীরে জীবনেচ্ছার পাশাপাশি তাঁতীবউয়ের ভেতর স্পৃহাব আকাক্সক্ষার স্ফূরণ ঘটছে। বাঁদী নিজের ভেতর ক্রমস্ফূরিত এই সোপানগুলোর নির্মাণ টের পাচ্ছিল সন্তর্পণে। কিšদ তার পরিপূর্ণ হয়ে ওঠার অনেকটা পথ তখনও বাকি।

ফকিরের কাছে সন্তান প্রার্থনার জন্য গিয়ে নিগৃহীতলো বাঁদী।হ ভোররাতে ফিরে এলে তার পরিক্লান্ত সর্বহারা দৃষ্টি, তার-অভিমানাহতক্ষোভ হৃদয় তাঁতীকে ব্যাকুল করলেও বাঁদীর ধর্ষিত সত্তার আর্তি উপলব্ধি করতে ব্য র্লো হসে। এ অংশটি উদ্ধার করা যেতে পারে:

গোকুল বাঁদীর হাত ধরে ঘরে নিয়ে এলো ; নতুন গামছা দিয়ে হাত মুখ মুছিয়ে শাড়ি পালটিয়ে বিছানায় বসালো তাকে।
Ñ”আমি জানি। অভিমান হওয়া তোর অন্যায় নয়। আমাকে সুখী করার জন্যে তুই যে সাহস দেখালি, যে কষ্ট করলি তারপর তোকে প্রবোধ দেওয়া যায় না। তুই বলেই পেরেছিস। আর কেউ তাঁতীর জন্য এতটা করত না।…

বাঁদী -দুতিন মাস কথা বললো না, ভালো করে রাঁধলো না, খেলো না, চুল বাঁধলো না। শুধু আকাশের দিকে চেয়ে-চেয়ে দিন কাটলো। গোকুল ূরেদ-দূওে থেকে ভাবলো অভিমান করবেই তো বাঁদী, সে কি সোজা কথা! রাত করে ওই ভয়ের মধ্যে যাওয়া।্র১৫

বাঁদীর নিগৃহীত হবার বেদনা গোকুলের কাছে এরকম একটা ”অভিমার্নের ব্যাখ্যাতেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। গোকুলের প্রতি কৃতজ্ঞতা আর প্রেম তাকে এই নিগ‘হও নীরবে গ‘হণ করবার শক্তি দেয়। শুধু াঘেরব কামড়ে সেই ফকিরের মৃত্যুর খবরে পাঠক বাঁদীর বক্তব্যে এক হিং¯্র চাপা প্রতিহিংসার প্রকাশ অনুভব করেন। যে যৌনতা প্রেমহীন, সেটি অমিয়ভূষণের কাছে ধর্ষণের নামান্তর। সেই মিলন কোনও পূর্ণ প্রাণ তৈরি করতে পারে না। বরং জন্ম দেয় বিকলাঙ্গ-বিকৃতের। ফকিরের সঙ্গে বাঁদীর মিলনেও সেরকমইকএনিষ্ফল জীবনের জন্ম হলো। তাঁতী সন্তান পেলো। কিšদ প্রেমহীনতায় জন্ম নেয়া এই সন্তানের ভেতর প্রাণময়তার পরিবর্তে থেকে গেলো জড়ত্বের বীজ।

ফকিরের ঔরসজাত সন্তান তাঁতীর সন্তান বলে পরিচিতি পাবার সঙ্গে সঙ্গে গল্পের বাঁদী হয়ে ওঠে তাঁতীবউ। অনুগৃহীতার আত্মদানে ঠেঁটি পরে গল্পে পরিচয়েনতুন উন্মোচিত হলো সে। তবে শুধু সামাজিক স্বীকৃতিটুকুর জন্যই ফকিরের কাছে তার আত্মদান ঘটেনি; বাঁদীর অকিঞ্চনসত্তা থেকে তাঁতীবউ সত্তায় উত্তরণে গোকুলের প্রতি তার ভালবাসা মূল নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে।

গল্পে এ পর্যায়ে লেখক ঘটালেন আরেকটি বাঁকবদল।ফকিরের ঔরসজাত সন্তান ক্রমশ বেড়ে উঠবার বদলে অপরিবর্তিতই রয়ে গেলো। সে ”বসবার কোনো লক্ষণই দেখলো না। পাঁচ মাস গেলো, সাত মাস গেলো, বছর ঘুরে এলো, ছেলে বাড়ল না পর্যন্ত। দেখলে মনে হয় যেন কত কালের বুড়ো, হাসে না পর্যন্ত।…রাতে ছেলে ঘুমায় না। কী একটা কষ্টে সারা রাত কাঁদে, সারা রাত কাতরায়্র।১৬ অমিয়ভূষণ মনে করেন, যে সৃষ্টির পেছনে কোনওআনন্দ নেই, সেই সৃষ্টি বিকৃত বিকলাঙ্গতাকেই ধারণ করে। ফকিরের কাছে বাঁদীর আত্মদানের বেদনাই যেন তার সৃষ্টির ওপর ছায়াপাত ঘটিয়েছিল। একইসঙ্গে ধর্ষিত হবার বেদনা ক্রমে তার ভেতর জীবনেচ্ছাহীনতার জন্ম দিচ্ছিলো। ফলে, তাঁতীবউ ক্রমে বিকলাঙ্গ শিশুটির মতোই নিভৃতে বোকা-বাকহীন বাঁদীর জীবনে ফিরে যায়। তাঁতী বলে, ”কেমন যেন আগের মতো, তোর নিজের ইচ্ছা বলে যেন কিছু নেই, শুতে বললাম আর টুপ করে শুয়ে পড়ল্রি।১৭ তাঁতী বউয়ের এই ক্রমরূপান্তর প্রক্রিয়ার পুরোটাই মনস্তাত্তি¡ক। তার এই মনস্তাত্তি¡ক রূপান্তরকরণ প্রক্রিয়া এবং ”চরিত্রের মানসিকন্তর্লীনতাঅ আমাদের আবিষ্ট করে রাখে Ñ বিশ্বাস অবিশ্বাসের সীমারেখা কখন অতিক্রান্ত হয়, সচেতন পাঠকও তা খেয়াল করেন ন্রা।১৮এক সাক্ষাৎকােের অমিয়ভূষণ মজুমদার বলেছিলেন, তাঁর ”তাঁতীবউ্র গল্পে ম্যাজিক রিয়েলিজমের বীজ আছে। ম্যাজিক রিয়েলিজমের মধ্য দিয়ে তিনি বর্তমান পৃথিবীর গভীর জটিল মনের ছবির সঙ্গে তাঁতীবউয়ের মনের রূপান্তর প্রক্রিয়াকে একাকার করে তোলেন। এই রূপান্তরকরণের ভেতর একধরনের অলেদ্ধকিকতার গন্ধ থাকলেও এর একটা বাস্তব ভিত্তি আছে, এবং সেই বাস্তব ভিত্তির মধ্য দিয়েই সমকালীন সমাজ ও রাজনীতির কদর্য রূপ মূর্ত হয়ে ওঠে। মধ্যযুগের ক্রীতদাস ব্যবসায় নারীর আত্মনিগ‘হেরএই রূপ সমকালীন পৃথিবীর জটিল অন্ধকার জীবনেরই ছবি এঁকেছে গল্পে।

সন্তানের ভেতর নিজের অস্তিত্ব-সন্ধানে ব্যর্থ গোকুল আকণ্ঠ হতাশায় নিমজ্জিত। একদিকে বিকলাঙ্গ সন্তান, অন্যদিকে তাঁতীবউয়ের ক্রমনেতিবাচক রূপান্তর তার ভেতর ফেনিয়ে তোলে প্রগাঢ় বিষণœতা।কাজেই একদিন সব বাঁধ ভেঙে গিয়ে সত্য কথাটবলেই বসলো সে, ”হারামজাদা পাজি, ভাগাড়ের শকুন, বাঁদরের বাচ্চা কোথাকার। যেমন দেবতা তার বরও তেমনি। অমন মরকুটে ফকির না-হলে এমন ফল হয় তার মন্তর্রে।১৯ একধরনের আক্ষেপের প্রকাশ ঘটেছে তার এই বক্তব্যে। যদিও নিজের সন্তান উৎপাদনের অক্ষমতা বিষয়ে তখন পর্যন্ত তার অনবহিত থাকাটাই সমীচীন মনে হয়।

তাঁতীবউয়ের রিষ্টি যোগ আছেÑঅর্থাৎ সংসারের জন্য অকল্যাণকর এই নারীÑঅতীতে সিদ্ধার এমন বক্তব্য তাঁতী উড়িয়ে দিলেও পরবর্তীকালে তাঁতীবউয়ের কণ্ঠে আশা নষ্ট হওয়া সুরে সেই একই কথার অনুরণন তাঁতীর মন ভেঙে দেয়। অথর্ব বিকলাঙ্গ সন্তানের পরিবর্তে একটা সুস্থ সন্তান কামনায় তাঁতীবউয়ের এই রিষ্টিযোগ বিশাল প্রতিবন্ধকতা বলেই একদিন নিরুদ্দেশের পথ বেছে নেয় গোকুল।

তাঁতীর অনুপস্থিতি তাঁতীবউকে বিধ্বস্ত করলেও একেবারে ভেঙে ফেলতে পারেনি। এ পর্যায়েই তাঁতীবউ নিজের ভেতরে টিকে থাকবার এক বিস্ময়কর শক্তি ও ক্ষমতা অনুভব করে। হাটফেরত লোকেদের মুখে তাঁতীর নতুন করে বিয়েকরবার গল্প শুনতে পেলেও আকস্মিক এইসব আঘাত তাকে দুর্বল করার বদলে দৃঢ় করে তোলে। বাঁদীর পরাধীন সত্তাকে ছাপিয়ে উচ্চকিত হয়ে ওঠে তার স্বাধীন চিন্তাশক্তি। আবারো একদিন তাই হতাশার বদলে পরিপূর্ণ একটি শিশুর রূপকল্প তার চেতনায় বর্ণিল হয়ে ওঠে:

কোনো-কোনো দিন সে ভাবে শুয়ে-শুয়ে, যদি কোনো দেবতা বর দিতো তাকে। এমন কি হয় না, কোনো গুণিন এসে দু-হাতে তুলে একটা সন্তান তাকে দিয়ে যায়, একরাশ ফুলের মধ্যে ফুলের চাইতেও সুন্দর একটা ছেলে!-হাতদু ভরে নেয় সে তাহলে। বুকের মধ্যে টনটন করে ওঠে তার। ঘুমন্ত রুগ্ন কঙ্কালসার ছেলেটাকে তুলে নিয়ে তার মুখে স্তন গুঁজেদেয়। কিšদ সেও যদি ফকিরের মতো হয়! কথাটা মনে হতেই তাঁতীবউ আড়ষ্ট হয়ে যায়, দম বন্ধ হয়ে আসে, গা ঘিন ঘিন করে ওঠে। ছেলেটাকে দুম করে বিছানায় ফেলে দিয়ে সে উঠে দাঁড়ায়। মরেছে, মরেছেÑবেশ হয়েছে। বাঘের কামড়ে গলা ফুটো হয়ে মরেছে। তাঁতীবউয়ের চোখ দুটি শ্বাপদ হিংসায় চকচক কওরেঠ। রক্তে মুখ ভরে উঠলো ভেবে-থ-ুথু করে উঠলো তাঁতী বউ। না, দরকার নেই। কোনো গুণীর কাছে সে বর চায় না। শুধু গোকুল ফিরে আসুক। সে যদি বউ নিয়ে আসে, তাও আসুক।২০

উপর্যুক্ত বর্ণনায় তাঁতীবউয়ের অন্তর্কথনে তার সন্তানাকাক্সক্ষা, ফকিরের প্রতি প্রগাঢ় বিবমিষাবোধ আর তাঁতীর প্রতি বলপ্রপ্রেম মূর্ত হয়ে উঠেছে। পূর্বে বাঁদীর ভেতর যে চিন্তাশক্তি-কল্পনাশক্তির অভাব ছিলো, তাঁতীবউ হয়ে ওঠার পর, এবং বিশেষ করে তাঁতীর নিরুদ্দেশগমনের পর তার কল্পনা ও বোধের জগৎ ক্রমশ গাঢ়বদ্ধ হয়ে ওঠে। গল্পের শুরুতে ফকিরের কাছে আত্মদানের বেদনায় আপ্লুত থাকলেও ধীরে ধীরে তাঁতীবউ সেই বেদনারবীজ উপড়ে ফেলার শক্তি অর্জন করে; বেদনার পরিবর্তে জান্তব উল্লাস আর প্রগাঢ় প্রতিহিংসার ঢেউ তার চেতনায় উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। অমিয়ভূষণ যেমন বলেছিলেন, ”আমাদের শরীরের ওই যে বিষ, কাম, ক্রোধ, হিংস্রা২১, এসবের পেছনের মূল উদ্দীপক শক্তি হল লিবিডোÑ কাজেই তাঁতী বউয়ের এই প্রতিহিংসাকেও সেইলিবিডোর ক্রিয়া হিসেবেই অভিহিত করা যায়।

অমিয়ভূষণের বেশ কিছু রচনায় ঘুরে ফিরে এসেছে ক্রীতদাস ।প্রসঙ্গনয়নতারা উপন্যাসের রূপনারায়ণ, মধু সাধু ঁ’রখা দাস ব্যবসার দাস কিংবাচাঁদবেনেউপন্যাসের প্রচুর পে‘ক্ষাপট এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে।এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ”আমি তো নতুন পরিস্থিতিতে কাউকে ক্রীতদাস রাখিনি।…আমি লিখেছি ক্রীতদাসদের প্রসঙ্গে ষোড়শ শতকের মধুর নেদ্ধকায়। রাজনগরের ক্রীতদাসকে মুক্তি দেয়া হয়েছে কিšদ রাজবাড়ীর বাইরে সে যায় না।…ঐ লোকগুলির যে ভববষরহম সেটা ভাবতে গেলে কিরকম হ্রয়ে যেতে হয় না?্র২২ উপর্যুক্ত বাক্যগুলো মমতাস্পর্শী। অমিয়ভূষণের এই বক্তব্যে রাজুর অনুচর রূপনারায়ণ সম্পর্কে যেটি বলা হয়েছে, সেটি তাঁতীবউ সম্পর্কেও প্রযোজ্য। ফকিরের নিগ‘হ, তাঁতীর আক্ষেপ কিংবা তার অন্তর্হিত হয়ে যাওয়ার পরও তাঁতীবউ বাড়ির গÐী ছেড়ে বাইরে যেতে পারেনি। অর্থাৎ তখন পর্যন্ত দাসত্ব থেকে তার মুক্তি ঘটেনি। স্বাধীনসত্তাকোবৃত অকরে আছে তার ক্রীতদাসসত্তা। ফলে দুর্বিষহ জীবন যাপন করেও তাঁতীর অনুপস্থিতিতে সে পালাতেরনা।পাে তাঁতী চলে যাবার পর তার জন্য প্রতীক্ষারত-নিস্তরঙ্গ জীবনে সংঘটিত আরেকটি আকস্মিক ঘটনা তাঁতীবউয়ের ভেতর এক নবপরিবর্তনের বীজ পে‘াথিত করে দেয়। গ‘ামের লম্পট জমিদার তাকে প্রলোভন দখায়।ে তাঁতীবউ প্রথম সাক্ষাতে বিহŸল হয়ে পড়ে তার রূপে।

রাতের অন্ধকারে সুসজ্জিত জমিদার তাঁতীবউয়ের কাছে যেন বেদনামোচনকারী এক দেবতারূপে আবির্ভূতে লাহ। কিšদ দেবতারূপী জমিদারের লাম্পট্যপূর্ণ ভাষা তাকে কদর্য বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। অমিয়ভূষণের ভাষায়:

…পায়ের শব্দ যখন একেবারে তার পাশে এসে থামলো তখন সে মুখ তুলতেও পারলো না। একটা সুন্দর সুবাস আসছে, তাঁতী বউ ভাবলোÑসুখে ছিল গোকুল তাই। কিšদ অভিমান সে করবে না, মান করা তার সাজে নাÑকী আছে তার গরবী হওয়ার।

মুখ তুলে তাঁতীবউ বিস্ময়ে অভিনবত্বে দিশেহারা হয়ে গেলো। স্বপ্নের মধ্যে যেন সে ভাবলো-তুমি দেবতা, তুমি এলে। আমার দুঃখ, তাঁতীর দুঃখ, ওই ছেলেটির দুঃখ সব মিলে তোমাকে টেনে এনেছে। তাই এত সুবাস, তাই এত সুন্দর তুমি। তোমার মুখের দিকে চাইবার সাহস নেই আমার। তুমি তো আমার মনের কথা জানো।

অনভ্যস্ত কথা বলার পরিশ্রমেই যেন তাঁতীবউ হাঁপাতে লাগলো।”শোন, তাঁতীবউ, গোকুল ফিরবে না। তুই এত দুঃখ করবি কেন? আর গোকুল যদি ফেরেই কখনো, যা দিয়ে তোকে সে কিনেছে তার চাইতে দশগুণ আমি তাকে

দিয়ে দেবো। বুঝতে পেরেছিস আমার কথা? আজই নয়…। চিনিস তো আমাকে, রাজবাড়িতে দেখেছিসও বোধ হয়্র।

দেবমূর্তি সাপ হয়ে কামড়ালেও ঁতীবউতা এতটা শিউরে উঠতো না।…পৃথিবী তখনো পায়ের তলায় দুলছে। তীব্র রূঢ় দৃষ্টিতে আগুšদকের মুখের দিকে চেয়ে রাগ করে কী বলতে গেলো সে, কিšদ অসীম ঘৃণায় সে বারবার বললো-‘ছি-ছি, তোমাকে দেবতা বলেছি, ছি-ছি-ছি’!

-”শোন, তাঁতীবউ ভেবে দ্যাখ। সময় নে।্র২৩

লম্পট জমিদারকে দেবতা ভাবার অপরাধবোধে ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে তাঁতীবউ। এমনকি, জমিদারের তাঁতীর কাছ থেকে তাকে আরো দশগুণ বেশি দামে ক্রয় করবার বিষয়টি তার আত্মসত্তায় অপমানের বীজ রোপণ করে দেয়। একারণেই তার অনুশোচনার মাত্রা দ্বিগুণ হয়ে ওঠে। তবু তাঁতীর প্রতি গভীর ভালবাসাজাত জীবনেচ্ছাটুকু বেঁচোরছিল।সেকারণেইঅ হয়তো ”প্রাণ বাঁচাবার তাগিদে তাঁতীবউকে তার উঠোনের পৃথিবীর বাইরে পা দিতে হয়েছে। হঠাৎ কারো কথা শুনলে যার প্রাণসুদ্ধ আড়ষ্ট হয়ে যেতো,এখন সে হাটে যায়। অপরিচিত দোকানির সঙ্গে দামদ¯দর করতে হয়। পয়সা উপার্জনের ফিকির সে নিজেই বার করেছে। জোলারা আসে তার কাটা সুতো নিতে। পাকা কারবারির মতো সে বাকিতে মাল দেয় না, কথার খেলাপ করে না’।২৪ নতুন করে বাঁচবার এই তাগিদ সেই জীবনেচ্ছাজাত।

পথ চলতে গিয়ে একদিন নির্নিমেষে তাকানোর মতো দুটি ছোট ছেলে তার হৃদয় কেড়ে নেয়। তাদের সুস্বাস্থ্য আর নির্মল সেদ্ধন্দর্য দেখে গোকুলের সন্তানাকাক্সক্ষাইমনেগাঢ়বদ্ধতার হয়ে ওঠে। মনে হয়, ”ঠিক এমনি চেয়েছিল গোকুল্র।২৫ যেন দেবশিশু। কিšদ শিশুদুটি লম্পট জমিদারের ঔরসজাত সন্তান জানতে পেরে রক্তহীন দুঃস্বপ্নাতুর হৃদয়ে বাড়ি ফিরেছিল সে।

কিšদ মন নিয়ে খেলতে ভালবাসেন অমিয়ভূষণ। কাজেই তাঁতীবউয়ের হৃদয়ে একদিকে জমিদারের লাম্পট্য ঘৃণা-বিবমিষা জাগায়, অন্যদিকে দেবতুল্য সন্তানপ্রাপ্তির আকাক্সক্ষা জমিদারের কাছে তার আত্মসমর্পণের এক ক্লেদাক্ত আবিল সম্ভাবনাকে আসন্ন করে তোলে।

এই গূঢ় স্ববিরোধী দোলাচলে রক্তাক্তলোহ সে। জীবনের এই দোলায়িত পর্বে তাঁতী ফিরে এল তাঁতীবউয়ের জীবনে। শীর্ণ এক অক্ষম তাঁতীর ফিরে আসা সেটি। ততোদিনেতাঁতী জেনেছে তার অক্ষমতার কথা। কোনও নারীকেই সে সন্তান দিতে পারেনি। কাজেই একদিকে সন্তানাকাক্সক্ষার পরিবর্তে অক্ষমতার তীব্র যন্ত্রণা, অন্যদিকে তাঁতীবউয়ের প্রথম সন্তানের- জীবন উৎস সম্পর্কিত চোরকাঁটা-ভবনা তাঁতীর ভেতর মনোবেদনার জন্ম দেয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় তাঁতীবউকে ফেলে এতদিনকার আত্মগোপনতার অপরাধবোধ। কিšদ ততোদিনে তাঁতীবউ পেরিয়ে গেছে তাঁতীর স্ত্রী পরিচয়ের গÐীও। সে ক্রমশ হয়ে উঠছে এক স্বাধীন নারীসত্তা, যে নিজেই নিজের যেদ্ধনাবেগ নিয়ন্ত্রণের মন্ত্র শিখে গেছে। রুগ্ন তাঁতীকেই এবার তাই তাঁতীবউয়ের আশ্রয় প্রার্থনা করতে হয়। ”বুকের মধ্যে তাঁতীর মাথাটা টেনেললো,এনে ব”এখানে চোখ বুজে থাকো, ঘুমিয়ে পড়বে।্র২৬ অমিয়ভূষণের সাহিত্যে নারীর স্তন আশ‘য়ের প্রতীক। চাঁদবেনের সনকা, মহিষকুড়ার উপকথারকমরুন, সোঁদালেরতিন্নি কিংবা হলং মানসাই উপকথা’র চন্দানি বারবারই নিজের পুরুষকে স্তনে টেনেছে। অমিয়ভূষণ বলেছিলেন, ”আমাদের শৈশবে আমাদের সবচেয়ে সুখকর স্মৃতি কি? কোথায় আমরা নির্ভয়ে থাকি? কোথায় আমাদের জীবন পরিপুষ্ট হতে থাকে? মায়ের স্তনে। যখন ব্যথা পেয়েছি মায়ের স্তনে আশ‘য়, যখন আনন্দ পেয়েছি তখনও মায়ের স্তন।…এই বোধ আমাদের কখনো নষ্ট হয় ন্রা।২৭
কাজেই অমিয়ভূষণের কাছে স্তন চিরায়ত এক আশ‘য়ের প্রতীক। উতাঁতীবতাকে স্তনে ধারণ করে সেই চিরায়ত আশ‘য়েই আশ্বস্ত করেছে। তাঁতীর অমঙ্গল কথার পরিপে‘ক্ষিতে তাঁতীবউয়ের হঠাৎ করে ”ষাট্র ”ষাট্র বলার ভেতরেও তার মাতৃসত্তা প্রগাঢ়রূপে প্রকাশমান। কিšদ গোকুলের শূন্যতাবোধ এই নারীকে ব্যথিত করে। অমিয়ভূষণের ভাষায়:

তাঁতীবউ ভাবেÑএর চাইতে অনেক ভালো তোহ যদি গোকুল আগেকার মতো গঞ্ছনা দিত তাকে। গোকুলের প্রভাহীন চোখ দুটির দিকে -চেয়েচেয়ে সে ভাবে চোখের চারদিকের ওই কালো ও যেন গোকুলের মনের ছাপ, সেখানে আশা নেই, শুধু অন্ধকার। শুধু একটা মূক অভিযোগ। সংসার করার সামান্য সাধও মেটেনি। গোকুল মুখ ফুটে তো বলেই না,জ্ঞাসাজি করলেও অস্বীকার করে পাছে তার মনে ব্যথা লাগে। সে ভালো বলেই না এত কষ্ট তার জন্য তাঁতীবউয়ের।২৮

উপর্যুক্ত বক্তব্যে গোকুলের প্রতি তাঁতীবউয়ের তীব্র ভালবাসা প্রকাশিত। গোকুলের অক্ষমতা যেন বা তারই ব্যর্থতা। গোকুলই তাকে নবজন্ম দিয়েছে, সংসারের একজন করে তুলেছে, তার ভেতর স্বাধীন হবার আকাক্সক্ষা জাগিয়েছে। সেই কৃতজ্ঞতাবোধ থেকেই তাঁতীবউ গোকুলকে অনুভব করতে সচেষ্ট। সমালোচকের ভাষায়:

”তাঁতী বউ্র গল্পটি তো রীতিমতো এক দুঃসাহসিক আখ্যান যেখানে, যেদ্ধবন সমীকরণের সমস্ত ব্যাপ্তী তছনছ হয়ে গেছে, অথচ পঙ্কিলতা ছাপিয়ে তাঁতী বউয়ের পতি-ভালোবাসা জেগে উঠেছে লাল পদ্মের মতো। যতক্ষণ পর্যন্ত –নর নারীর সম্পর্কের মধ্যে প্রেমের আলো প্রজ্বলিত থাকছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তিনিও
(অমিয়ভূষণ) উদারহস্ত।

লেখক এ গল্পে বৃত্তাকার কালপট ব্যবহার করেছেন। একবছর আগে ভাদ্রের বর্ষণেই বাঁদীর সঙ্গে তাঁতীর প্রেমপূর্ণ সহবাস ঘটেছিল। গল্প শেষে লেখক আরেক ভাদ্রের বর্ষণে ফিরে গেছেন। তবে বর্ষণের চারিত্র্য দ্রুধরনের বর্ণনায় ভিন্ন। ভাদ্রের প্রথম বর্ষণের প্রাবল্য তাঁতী আর বাঁদীকে কাছে টেনেছিল; গল্প শেষের ভাদ্রের টুপটাপ বৃষ্টি যেন এক বেদনার্ত অভিসারের ঘেরাটোপে বন্দি। গোকুলের আকাক্সক্ষা পূরণে জমিদারের কাছে আত্মদানের সিদ্ধান্তে তাঁতীবউয়ের অন্তর্গহনে যে বেদনা পুঞ্ছিভূতহয়েছিল, তারই বহিঃপ্রকাশ যেন ভাদ্রের এই বর্ষণ। যেন-বা তাঁতীবউয়ের বেদনাই টুপটাপ ঝরে পড়ছে। এভাবেই দৃশ্যপট বদলে গেছে গল্পে। অবশেষে সমস্ত পিছুটান ত্যাগ করে তাঁতীবউ এক স্বাধীন ভাবনায় উচ্চকিত হয়ে ওঠে। লেখকের ভাষায়:

ঘুমন্ত তাঁতীর ”মুঠি ছাড়িয়ে নিয়ে তাঁতীবউ উঠে দাঁড়ালো।টাসুস্থ…এক সবল ছেলে কেন তার কোলে এলো না? গাজনতলার হাটে দেখা ছেলেদের মতো একটা পেলে গোকুল হয়তো বাঁচবার জোর পেতো। এত নিবিড় করে সে গোকুলকে সুখী করতে চায় তবু কেন পারবে না। তাঁবুর অন্ধকারে গোকুলকে দেখবার প্রথমদিন থেকে সবগুলো দিনের ছবি একটার পর একটা যেন বাইরের নিবিড় অন্ধকারের গায়ে ফুটে উঠতে থাকে। কত সাহস তার হয়েছিলো যেদিন অন্ধকারের আড়ালে সে ফকিরের কাছে গিয়েছিলো মন্তর আনতে। সে কি তার সাহসÑসে তো প্রাণপণে গোকুলকে সুখী করার চেষ্টা। তারপর একদিন গোকুল চলে গেলো। গোকুলের জন্য প্রতীক্ষার দিবারাত্রিগুলির কথা ভাবতে গিয়েই মনে হলো তার সেই রাত্রির কথা যার স্মৃতিতে পৃথিবী ঘৃণায় ভরে গিয়েছিলো।- ছি ছি, দুটিকে দেখবার পর তাদের পরিচয় পাবার পর মুহূর্তের জন্য-সম্ভযোবনার কল্পনাতে ঘৃণায় শিউরে উঠেছিলো তার মন, আজ তেমনি সম্ভাবনার ইঙ্গিতটিই তাকে দিশেহারা করে দিলো। ছি-ছি-ছি, তবু তেমনি ফুটে উঠতে লাগলো কল্পনাটা’।৩০

তাঁতীবউয়ের দোলায়িত অন্তর্জগতের চিত্র মেলে এখানে। গোকুলের জন্যই তার আত্মদান। গোকুলকে পেয়ে পরাধীন সত্তায় উÐিত সাহসই তার ভেতর জীবনেচ্ছা জাগায়। একদিকে সুস্থ সন্তান পাবার মধুর আকাক্সক্ষা, অন্যদিকে জমিদারের বিকৃত লালসার হাতছানিÑএই দুই বিপরীত অনুভবের মিশেলে তাঁতীবউ দীর্ণ হয়েছে। কিšদ, গোকুলের কথা ভেবেই শেষপর্যন্ত সে সিদ্ধান্ত গ‘হণে দ্বিধাহীন। লেখক অন্ধকারের গায়ে ভবিষ্যতের তাঁতীবউয়ের ছবি আঁকলেন। অর্থাৎ তাঁতীবউ ততক্ষণে তার লক্ষ্য স্থির করে নিয়েছে। তাঁতী বউয়ের ভেতর যে ব্যক্তিত্বের স্ফূরণ ঘটেনি এতোকাল, পরাধীন সত্তায় যা কখনও কল্পনা করতে পারেনি স,ে তাঁতীকে ভালবেসে, জীবনকে ভালবেসে, স্বেচ্ছাআত্মদানেও আজ সে তৈরি। এ প্রসঙ্গে সমালোচকের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য:

অমিয়ভূষণের প্রত্যেকটি নারী চরিত্র একেকটি পজিটিভ ফোর্স। নিজে নিজেই সক্রিয়। নারী নিজেই নিজের মালিক, তার সেক্সকে যেভাকে খুশি সে ব্যবহার করতে পারে।…তাঁতী বউ্রয়ের.সহবাস. থেকে প্রেম হ্রল। তাঁতীর সন্তান সাধ মেটাতে সে ফকিরের কাছে গিয়ে রুগ্ণ সন্তান লাভ করলো। …আবার তাঁতীর ইচ্ছাপূরণ করতে সুন্দর ছেলে পাওয়ার জন্য সে জমিদারের কাছে গেল। এসবই সে করেছে তাঁতীকে বাঁচানোর জন্য, তাকে পরিপূর্ণ করার জন্য। এখানে এৎড়ংং ঝবী কে টঢ়ষরভঃ করা হয়ছেে । ৩১

গল্পের শেষ অংশে পাঠক অনুভব করবেন তাঁতীবউ কারো বাঁদী আর নয়। সে নিজেই নিজের নিয়ন্তা, নিয়ন্ত্রক শক্তি। এক অমিত স্বাধীনতা সে নিজের ভেতর বোধ করেছে। তাই জমিদারের আহবানে এগুতে গিয়ে ”একটা অস্ফুট অর্ধজান্তব আকূত্রি৩২তার চেতনায় করাঘাত করলেও ”প্রবল প্রতিরোধে হৃদপিÐকেলেঠে উঠতে না-দিয়ে ঘরের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালো স্রে।৩৩ অমিয়ভূষণ এভাবেই পরাধীন নারীসত্তাকে ইতিবাচক জীবনীশক্তি দ্বারা এক ব্যক্তিত্ববান স্বাধীন নারীতে পরিণত করেছেন। জমিদারের গৃহ থেকে ফিরে পরিক্লান্ত এই নারী যেন নিজের সেই স্বাধীনসত্তাকে সমস্ত হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছে। লেখকের ভাষায়:

…গোকুলের মুখখানি দেখবার লোভ হল তার। …কয়েক বিন্দু স্বেদ যেন দেখা দিয়েছে, আঁচল দিয়ে মুছিয়ে দিলো তাঁতীবউ। এবার কান্না পাচ্ছে। কিšদ কাঁদলেও সময় নষ্ট হবে খানিকটা। সকলেরই বিশ‘াম নেবার অধিকার আছে পৃথিবীতে, তারও আছে। ৩৪

পৃথিবীতে এই নারীরও যে কিছু অধিকার আছেÑস্বাধিকারবোধের এই প্রজ্ঞা তার তৈরি হয়েছে গোকুলকে ভালবেসে। সন্তানাকাক্সক্ষা, সিদ্ধান্ত নেবার দৃঢ়তা আর বিশ‘ামের অধিকারবোধটুকু চেতনায় বহন করেই এই নারী স্বাধীন সত্তায় উত্তীর্ণে লাহ। অধীনতা থেকে স্বাধীনতায় উত্তীর্ণ হবার এ এক কণ্টকাকীর্ণ পথ। তবু তাঁতীবউ সেই পথ অতিক্রমণের শক্তি অর্জন করেছে জীবন উৎসারিত অভিজ্ঞতায়।

অমিয়ভূষণ এ গল্পে ”আশ্চর্য যাদুতে ছোট ছোট বাক্যে, ইমেজারিহীনতা দিয়েও বুনে নিয়েছেন মসলিনপ্রতিম স্বচ্ছ আর সূক্ষè আখ্যান্র।৩৫ইঙ্গিতময়তা এ গল্পের এক অসাধারণ দিক। তাঁতীবউয়ের পরাধীন সত্তা থেকে স্বাধীন সত্তায় উপনীত হবার বিষয়গুলো ইঙ্গিত ও প্রতীকের মধ্য দিয়ে গল্পে উপস্থাপিত। এই নারীর মনোজাগতিক টানাপড়েন অঙ্কনে লেখক প্রতীকী পরিচর্যারীতির ব্যবহার করেছেন। দু একটি উদাহরণের মধ্য দিয়ে বিষয়টি অনুভূত হতে পারে। জমিদারের কাছে আত্মদানের জন্য পথে বেরিয়ে তার চেতনায় যে অনুভবের জন্ম হয়েছিল, লেখক তাকে প্রতীকী পরিচর্যায় প্রকাশ করেছেন এভাবে:

তাঁতীবউউঠোন পার হলো, সদর পার হলো, সদরের দরজা ঠেলে বন্ধ করে দাঁড়ালো পথে। অন্ধকার সামনে-পিছনে একাকার হয়ে গেছে। সামনে তবু নজর চলে। পিছনের দরজাটা এইমাত্র সে বন্ধ করে দিলো হাতড়েও সেটাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। গাঢ় অন্ধকারে আর সব অনুভূতি যেন অদৃশ্য হয়ে গেছে,…!৩৬

অতীতে যে তাঁতীবউ শুধুই বাঁদী ছিল, সেই দুঃখময় অতীতের দরজা যেন সে নিজের হাতেই বন্ধ করে দিয়ে নিজের স্বাধীন সত্তার খোঁজে এগিয়ে যাচ্ছে। যদিও সে পথ অন্ধকারে নিমজ্জমান। কিšদ তবু এই অন্ধকার মাড়িয়েই সে শুদ্ধ সত্তায় উপনীত হতে চায়। এভাবেই প্রতীকী পরিচর্যায় ভাস্বর হয়ে উঠেছে ইঙ্গিতময়তা। প্রতীকী পরিচর্যারীতিরপাশাপাশি তাঁতীবউয়ের অন্তর্জাগতিক আবেগ প্রকাশে একসপ্রেসনিস্টিক পরিচর্যারীতির ব্যবহার ঘটিয়েছেন অমিয়ভূষণ।

তাঁতীবউ গল্পে অমিয়ভূষণ পরাধীন-পরাহত এক নারীর স্বাধীন সত্তায় উপনীত হবার কথকতা রূপায়িত করেছেন। ক্রীতদাসী এই নারী তাঁতীর প্রেম ও আশ্রয়ে মৃতপ্রায় সত্তা থেকে প্রবল জীবনীশক্তিতে উজ্জীবিত হয়েছে। তাঁতীর প্রতি তার গভীর প্রেম ও সন্তানাকাক্সক্ষাই তার ভেতর ইতিবাচক এক জীবনেচ্ছা জাগিয়ে তোলে, যা তার ভেতরকার পরাধীনতার শৃঙ্খল উপড়ে ফেলে এক সুদৃঢ় স্বাধীনতাবোধের বীজ রোপন ।করেঅমিয়ভূষণ তাঁর নারীদেও এভাবেই বাঁচার লড়াইয়ে শামিল করেন; তাদের অস্তিত্বসংকটেরপরেখারূ টানেন এবং শেষ পর্যন্ত ”হয়ে ওর্ঠার মহিমায় তাকে উজ্জীবিত করেন। তাঁতীবউ গল্পটিও এমনিই এক মহৎ সাহিত্যকর্ম। এ গল্পে এক নারীর না-সত্তা থেকে হাঁ-সত্তায় উপনীত হবার এক ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ জীবনের ইতিকথা নির্মাণে অমিয়ভূষণ কুশলতার পরিচয় দিয়েছেন।

তথ্যনির্দেশ
১. অনিন্দ্য সেদ্ধরভ, সাক্ষাৎকার: অমিয়ভূষণ মজুমদার,উত্তরাধিকার, অমিয়ভূষণ মজুমদার সংযোজন সংখ্যা, পঞ্চম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা, ১৯৯৫, পৃ. ৩৯
২. অনিন্দ্য সেদ্ধরভ, সাক্ষাৎকার: অমিয়ভূষণ মজুমদার,উত্তরাধিকার, অমিয়ভূষণ মজুমদার সংখ্যা, চতুর্থ বর্ষ, প্রথম সংখ্যা, ১৯৯৪, পৃ. ২৬
৩. মোসাদ্দেক আহমেদ, ’অমিয়ভূষণের প্রেম ও যৌনচেতনা“,কালি ও কলম, দ্বাদশ বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা,
২০১৫, পৃ. ২২
৪. অমিয়ভূষণ মজুমদার,“তাঁতী বউ”,অমিয়ভূষণ রচনাসমগ্র (গ‘ন্থনা:১ তরুণ পাইন ও অপূর্বজ্যোতি মজুমদার), দ্রেজ পাবলিশিং, কলকাতা, ২০০২, পৃ. ৩৭৬
৫. তদেব, পৃ. ৩৭৭
৬. শ্যামল চক্রবর্তী, ভারতীয় সমাজের বিকাশধারা, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাঃ লিঃ, কলকাতা, ২০১৫, পৃ.
৭. অমিয়ভূষণ মজুমদার, ২০০২, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৭৭
৮. তদেব
৯. তদেব, পৃ. ৩৭৮
১০. তদেব, পৃ. ৩৭৯
১১. তদেব
১২. তদেব
১৩. অমিয়ভূষণ মজুমদার, “পদ্মাপুরাণ কথঅমিয়ভূষণা”, রচনাসমগ্র (গ‘ন্থনা:৮ অপূর্বজ্যোতি মজুমদার ও এণাক্ষী মজুমদার), দ্রেজ পাবলিশিং, কলকাতা, ২০১০, পৃ. ৫২৬
১৪. অমিয়ভূষণ মজুমদার, ’শিল্পের আনন্দ“,অমিয়ভূষণ রচনাসমগ্র (গ‘ন্থনা:৮ অপূর্বজ্যোতিমদারমজুও এণাক্ষী মজুমদার), দ্রেজ পাবলিশিং, কলকাতা, ২০১০, পৃ. ৫১৫-১৬
১৫. অমিয়ভূষণ মজুমদার, ২০০২, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৮০
১৬. তদেব, পৃ. ৩৮১-৩৮২
১৭. তদেব, পৃ. ৩৮২
১৮. শুভময় সরকার, ’অমিয়ভূষণের ছোটগল্প-এক নিজস্ব স্টাইল“ ঐক্য, ক্রোড়পত্র: অমিয়ভূষণ, ডিসেম্বর, ২০০৪, পৃ. ৬০
১৯. অমিয়ভূষণ মজুমদার, ২০০২, প্রাগুক্ত,পৃ. ৩৮৩
২০. তদেব, পৃ. ৩৮৪
২১. অনিন্দ্য সেদ্ধরভ, ১৯৯৪, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪
২২. তদেব, পৃ. ২৫
২৩. অমিয়ভূষণ মজুমদার, ২০০২, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৮৫
২৪. তদেব
২৫. তদেব, পৃ. ৩৮৬
২৬. তদেব, পৃ. ৩৮৭
২৭. দেবব্রত চক্রবর্তী, ’স্মৃতিচারণ, সাক্ষাৎকার ও পত্রালাপে অমিয়ভূষণ (১৯৭০ থেকে ১৯৮৬্রর নভেম্বর পর্যন্ত
চতুরঙ্গ, নবার্ক, বিজ্ঞাপনপর্ব, মনন‘ভপৃতি পত্রিকার সাক্ষাৎকার ও চিঠিপত্র থেকে)“, নবার্ক, প্রথম বর্ষ, প্রথ মসংখ্যা, ১৯৮৬, পৃ. ৪
২৮. অমিয়ভূষণ মজুমদার, ২০০২, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৮৭
২৯. মোসাদ্দেক আহমেদ, প্রাগুক্ত, পৃ. ২২
৩০. তদেব, পৃ. ৩৮৮
৩১. সমীর চক্রবর্তী, “ব্যক্তি অমিয়ভূষণ”,উত্তরাধিকার, পঞ্চম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা, ১৯৯৬, পৃ.-১৭৬৫
৩২. অমিয়ভূষণ মজুমদার, ২০০২, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৮৮
৩৩. তদেব
৩৪. তদেব
৩৫. স্বপন পাÐা, ’অমিয়ভূষণের গল্প: হিমশৈলের যতটুকু দেখ তুমি“, দিবারাত্রির কাব্য, নবম বর্ষ, তৃতীয় ও চতুর্থ সংখ্যা, ২০০১, পৃ. ২৪৪
৩৬. অমিয়ভূষণ মজুমদার, ২০০২, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৮৮