বাঙালির জাতীয় জীবনে ২৫শে মার্চ একটি বিভীষিকাময় শোকের দিন। ১৯৭১ সালের এই রাতটি কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ ছিল না, এটি ছিল ইতিহাসের এক পৈশাচিক অধ্যায়, যা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে কুখ্যাত। একটি নিরস্ত্র ও নিরপরাধ জাতির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক জান্তা যে বর্বরোচিত গণহত্যা শুরু করেছিল, তা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। ৩০ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতার সূর্যোদয় ঘটেছিল ২৫শে মার্চের সেই রক্তস্নাত অন্ধকার পথ পাড়ি দিয়েই।
দেশভাগের ট্র্যাজেডি ও বৈষম্যের বীজ
১৯৪৭ সালের আগস্টে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে ভারতীয় উপমহাদেশে। দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে জন্ম নেয় ভারত ও পাকিস্তান। অদ্ভুত ভৌগোলিক কাঠামো নিয়ে গঠিত পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে দূরত্ব ছিল হাজার মাইলেরও বেশি। এই দুই অংশের মধ্যে ধর্মের মিল থাকলেও ভাষা, সংস্কৃতি, কৃষ্টি এবং জীবন দর্শনে ছিল আকাশ-পাতাল ব্যবধান। শাসনের শুরু থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানকে (বাংলাদেশ) তাদের উপনিবেশ মনে করতে থাকে। অর্থনীতি, রাজনীতি, সম্পদ ও সরকারের সর্বময় ক্ষমতা কুক্ষিগত ছিল পশ্চিমের হাতে। পূর্ব পাকিস্তান বঞ্চিত হতে থাকে তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে।
ভাষা আন্দোলন ও স্বাধিকার চেতনার উন্মেষ
পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে প্রথম বিরোধের সৃষ্টি হয় মাতৃভাষা বাংলাকে কেন্দ্র করে। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করেন, ‘উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। অথচ পাকিস্তানের ৫৬ শতাংশ মানুষের মুখের ভাষা ছিল বাংলা। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে পূর্ব বাংলার ছাত্রসমাজ। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারদের বুকের রক্তে রঞ্জিত হয় রাজপথ। ৫২-র এই ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই মূলত বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ বপন করা হয়েছিল। ১৯৫৬ সালে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও শাসকগোষ্ঠীর শোষণমূলক আচরণ পরিবর্তন হয়নি।
ছয় দফা: বাঙালির মুক্তির সনদ
১৯৬৬ সালে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লাহোরে অনুষ্ঠিত এক রাজনৈতিক বৈঠকে ঐতিহাসিক ‘ছয় দফা’ পেশ করেন। এই ছয় দফা ছিল বাঙালির স্বায়ত্তশাসন ও শৃঙ্খল মুক্তির রূপরেখা। বঙ্গবন্ধু যখন এই দাবি নিয়ে জনগণের দুয়ারে পৌঁছালেন, তখন তাঁর জনপ্রিয়তায় ভীত হয়ে পড়ে আইয়ুব খান সরকার। তারা দমন-পীড়নের পথ বেছে নেয়, যা বাঙালির মনে স্বাধীনতার প্রবল আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ও গণঅভ্যুত্থান
১৯৬৮ সালে বঙ্গবন্ধুকে প্রধান আসামি করে ৩৫ জনের বিরুদ্ধে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ দায়ের করা হয়। লক্ষ্য ছিল আন্দোলনের কণ্ঠরোধ করা। কিন্তু এর ফল হয় উল্টো। ১৯৬৯ সালে ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে আসে। আসাদ ও সার্জেন্ট জহুরুল হকের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হলে তা গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। পতন ঘটে লৌহমানব আইয়ুব খানের। ক্ষমতায় আসেন ইয়াহিয়া খান। গণদাবিতে বঙ্গবন্ধু কারাগার থেকে মুক্তি পান এবং তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
৭০-এর নির্বাচন ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের রাজনীতি
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। কিন্তু পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি শুরু করে। ইয়াহিয়া খান বারবার জাতীয় পরিষদের অধিবেশন পিছিয়ে দিতে থাকেন। এর প্রতিবাদে পুরো পূর্ব বাংলা অসহযোগ আন্দোলনে ফেটে পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় আসে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের সেই মহাকাব্যিক ভাষণ। বঙ্গবন্ধু স্পষ্ট ঘোষণা করেন— “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”
অপারেশন সার্চলাইট: ইতিহাসের নৃশংসতম নীল নকশা
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ যখন ইয়াহিয়া খান ঢাকা ত্যাগ করেন, তখনই সংকেত দেওয়া হয় বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার। পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক জান্তা এই পৈশাচিক অভিযানের নাম দিয়েছিল ‘অপারেশন সার্চলাইট’। তাদের উদ্দেশ্য ছিল স্রেফ ভূমি দখল করা, মানুষ নয়। জেনারেল রাও ফরমান আলীর সেই কুখ্যাত উক্তি ছিল— “আমরা পূর্ব পাকিস্তানের মাটি চাই, মানুষ নয়।” রাত ১১টা ৩০ মিনিটে সেনানিবাস থেকে ঘাতক বাহিনী ট্যাংক ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নিয়ে বের হয়ে আসে। ঘুমের ঘোরে আচ্ছন্ন ঢাকা শহর মুহূর্তেই রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রক্তস্নাত জনপদ
পাকিস্তানি হানাদারদের মূল লক্ষ্য ছিল মুক্তবুদ্ধির চর্চাকেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তারা জগন্নাথ হল, ইকবাল হল (বর্তমান জহুরুল হক হল) এবং শিক্ষকদের আবাসিক এলাকায় পৈশাচিক তাণ্ডব চালায়। বৃষ্টির মতো গুলি চালিয়ে শত শত ছাত্র ও শিক্ষককে হত্যা করা হয়। ইতিহাসের বর্বরোচিত এই অধ্যায়ে শহীদ হন ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব, ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা এবং অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যসহ দেশবরেণ্য বুদ্ধিজীবীরা। শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, পিলখানা ইপিআর হেডকোয়ার্টার এবং রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সেও একই সময়ে হামলা চালানো হয়। বীর পুলিশ সদস্যরা থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল দিয়ে আধুনিক ট্যাংকের প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে ইতিহাসের পাতায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেন। মধ্যরাতে ঢাকার আকাশ আগুনের লেলিহান শিখায় লাল হয়ে ওঠে, আর চারদিকে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে আর্তচিৎকার।
বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা ও কারাবরণ
২৫শে মার্চের সেই চরম মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বুঝতে পারেন, আপস করার আর কোনো পথ খোলা নেই। ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে (অর্থাৎ ২৫শে মার্চ রাত ১২টার পর) তিনি ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কস্থ নিজ বাসভবন থেকে ওয়্যারলেসের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তিনি ঘোষণা করেন—
“ইহাই হয়তো আমার শেষ বার্তা, আজ হইতে বাংলাদেশ স্বাধীন। … পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলার মাটি হইতে বিতাড়িত না করা পর্যন্ত এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জন না হওয়া পর্যন্ত আপনাদের লড়াই জারি রাখুন।”
এর কিছু পরেই পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়। কিন্তু তাঁর সেই অমোঘ ঘোষণা মুহূর্তের মধ্যেই দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং বাঙালির হৃদয়ে প্রতিরোধের আগুন জ্বালিয়ে দেয়।
গণহত্যা দিবসের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও তাৎপর্য
দীর্ঘকাল এই ভয়াল রাতটিকে কেবল একটি কালরাত হিসেবে পালন করা হলেও, ২০১৭ সালে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে ২৫শে মার্চকে ‘জাতীয় গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই দিবসের মূল তাৎপর্য হলো বিশ্ববাসীকে মনে করিয়ে দেওয়া যে, একাত্তরের এই রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যে অপরাধ করেছিল, তা ছিল বিংশ শতাব্দীর অন্যতম বৃহৎ ‘জেনোসাইড’। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় স্বাধীনতার মূল্য কতখানি এবং শহীদদের রক্তের ঋণ কতটা ভারী।
স্বাধীনতা অর্জন: রক্তের বিনিময়ে কেনা মানচিত্র
২৫শে মার্চের সেই ধ্বংসস্তূপ থেকেই শুরু হয় প্রতিরোধ। নয় মাসের দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, ৩০ লক্ষ শহিদের আত্মদান এবং দুই লক্ষ মা-বোনের অসীম ত্যাগের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর অর্জিত হয় চূড়ান্ত বিজয়। ২৫শে মার্চের গণহত্যা বাঙালিকে ঘরকুনো জাতি থেকে একটি লড়াকু জাতিতে রূপান্তরিত করেছিল। সেদিন যদি বাঙালি ভয়ে পিছু হটত, তবে আজকের এই স্বাধীন মানচিত্র আমরা পেতাম না।
উপসংহার
২৫শে মার্চ বাঙালির ইতিহাসে চিরকাল একটি কালো তিলক হয়ে থাকবে। এই কালরাত আমাদের মনে করিয়ে দেয় পাকিস্তানি শাসনামলের চরম নৃশংসতা এবং বাঙালির অজেয় দেশপ্রেম। আমাদের জাতীয় দায়িত্ব হলো এই গণহত্যার সঠিক ইতিহাস পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া। শহীদদের সেই রক্তস্নাত আত্মত্যাগকে বৃথা যেতে দেওয়া যাবে না। তাই আধুনিক ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ার শপথ নিতে হবে এই দিনেই, যেন আর কোনো অপশক্তি বাংলার মাটিতে এমন কালরাত ফিরিয়ে আনার দুঃসাহস না দেখায়।
শহীদদের স্মৃতি অমর হোক।
জয় বাংলা।
আরও দেখুন: