বজ্রপাত থেকে বাঁচবেন যেভাবে?

প্রকৃতির এক বিধ্বংসী রূপ হলো বজ্রপাত। বজ্রপাত বর্তমানে বাংলাদেশে অন্যতম একটি বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন এবং জনসচেতনতার অভাব এর অন্যতম কারণ। প্রতি বছর বাংলাদেশে শত শত মানুষ বজ্রপাতে প্রাণ হারান, যাদের মধ্যে বড় একটি অংশ কৃষক ও খোলা মাঠে কাজ করা শ্রমিক। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিলে এই মৃত্যুঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। বজ্রপাত থেকে বাঁচতে হলে আমাদের এর বৈজ্ঞানিক আচরণ বুঝতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। আমরা আমাদের শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের সুরক্ষার জন্য এই বিষয়ে একটি বিশেষ নির্দেশনা প্রস্তত করেছি। বজ্রপাত থেকে বাঁচবেন যেভাবে ১. মেঘের ডাক শুনলে যা করবেন (প্রাথমিক সতর্কতা) বজ্রপাত শুরু হওয়ার আগে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হওয়া এবং গুড় গুড় শব্দ হওয়া একটি বড় সংকেত। ৩০-৩০ নিয়ম অনুসরণ করুন: আকাশ মেঘলা থাকলে এবং মেঘের ডাক শোনার পর যদি ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে বিজলি চমকাতে দেখেন, তবে বুঝবেন আপনি ঝুঁকির মধ্যে আছেন। দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যান। আবার শেষবার মেঘ ডাকার পর অন্তত ৩০ মিনিট ঘরের বাইরে বের হবেন না। খোলা মাঠ পরিহার করুন: আপনি যদি খোলা মাঠে থাকেন, তবে দ্রুত সেখান থেকে সরে যান। বড় গাছ বা বৈদ্যুতিক খুঁটির নিচে কক্ষনো আশ্রয় নেবেন না। ২. বাড়ির ভেতরে থাকাকালীন সতর্কতা বাড়ির ভেতর থাকলেই আপনি পুরোপুরি নিরাপদ—এমনটি ভাবা ভুল। বজ্রপাতের সময় বাড়ির ভেতরেও কিছু নিয়ম মানতে হয়: বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করুন: বজ্রপাতের সময় ফ্রিজ, টিভি, কম্পিউটার বা এসি-র মতো দামি ইলেকট্রনিক ডিভাইসের প্লাগ খুলে রাখুন। ধাতব বস্তু স্পর্শ করবেন না: জানালার গ্রিল, পানির কল, ধাতব পাইপ বা সিঁড়ির রেলিং স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকুন। বজ্রপাত বাড়ির ওপর পড়লে বিদ্যুৎ এই ধাতব পথ দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। পানির ব্যবহার এড়িয়ে চলুন: বজ্রপাতের সময় গোসল করা, হাত-মুখ ধোয়া বা বাসন মাজা এড়িয়ে চলুন। পানির পাইপলাইনের মাধ্যমেও বিদ্যুৎ পরিবাহিত হতে পারে। ল্যান্ডফোন ব্যবহার করবেন না: কর্ডলেস বা মোবাইল ফোন ব্যবহারে ঝুঁকি কম থাকলেও ল্যান্ডফোন বা তারযুক্ত ফোন ব্যবহার করবেন না। ৩. খোলা মাঠে বা বাইরে থাকাকালীন যা করবেন যদি এমন জায়গায় থাকেন যেখানে আশেপাশে কোনো পাকা দালান নেই, তবে নিচের নিয়মগুলো আপনার জীবন বাঁচাতে পারে: নিচু হয়ে বসুন (Lightning Crouch): যদি আশেপাশে কোনো আশ্রয় না থাকে, তবে খোলা মাঠে মাটির ওপর শুয়ে পড়বেন না। বরং দুই পা একসাথে করে গোড়ালি উঁচু করে পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে নিচু হয়ে বসুন এবং কান দুই হাত দিয়ে চেপে ধরুন। এতে শরীরের আয়তন কম থাকবে এবং বিদ্যুৎ সরাসরি মাটিতে চলে যাওয়ার পথ পাবে। উঁচু গাছ থেকে দূরে থাকুন: বড় এবং একাকী গাছ বজ্রপাতকে বেশি আকর্ষণ করে। তাই গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া আত্মঘাতী হতে পারে। জলাশয় থেকে দূরে থাকুন: আপনি যদি নৌকা বা পানিতে থাকেন, তবে দ্রুত তীরে ফিরে আসুন। পানি বিদ্যুতের সুপরিবাহী। গ্রুপে থাকলে আলাদা হয়ে যান: আপনারা যদি একসাথে অনেকজন থাকেন, তবে অন্তত ৫০-১০০ ফুট দূরে দূরে সরে যান। এতে একজনের ওপর বজ্রপাত হলে অন্যরা নিরাপদ থাকতে পারবে বা সাহায্য করতে পারবে। ৪. গাড়িতে থাকাকালীন সুরক্ষা বজ্রপাতের সময় আপনি যদি গাড়িতে থাকেন, তবে গাড়ির ভেতরেই থাকা নিরাপদ। তবে কিছু শর্ত আছে: গাড়ির জানালা পুরোপুরি বন্ধ রাখুন। গাড়ির কোনো ধাতব অংশ বা বডি স্পর্শ করবেন না। বজ্রপাত চলাকালীন গাড়ি কোনো বড় গাছের নিচে বা উঁচু বৈদ্যুতিক খুঁটির পাশে পার্ক করবেন না। ৫. দালান বা ভবন নির্মাণে সতর্কতা বজ্রপাত থেকে স্থায়ী সুরক্ষার জন্য প্রতিটি দালানে ‘লাইটেনিং অ্যারেস্টার’ বা বজ্র নিরোধক দণ্ড স্থাপন করা বাধ্যতামূলক করা উচিত। এটি বজ্রপাতের বিদ্যুৎকে সরাসরি মাটিতে (Earthing) নিয়ে যায়, ফলে ভবনের ভেতরে থাকা মানুষ ও আসবাবপত্র নিরাপদ থাকে। আধুনিক ভবন নির্মাণের সময় যেমন ‘লাইটেনিং অ্যারেস্টার’ বা বজ্র নিরোধক দণ্ড স্থাপন করা জরুরি, তেমনি প্রাকৃতিকভাবে বাঁচার জন্য বাড়ির চারপাশে তাল, নারিকেল ও সুপারি গাছ লাগানো প্রয়োজন। এই উঁচু গাছগুলো বজ্রপাতকে নিজের শরীরে ধারণ করে বিদ্যুৎ মাটিতে পৌঁছে দেয়, ফলে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি অনেকটা কমে আসে। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি তাল গাছ রোপণ করা মানে একটি জীবন রক্ষাকারী ঢাল তৈরি করা। বজ্রপাত নিরোধক গাছ: তাল, নারকেল, সুপারি বা খেজুরের মতো উঁচু গাছগুলো প্রকৃতির নিজস্ব ‘লাইটেনিং অ্যারেস্টার’ হিসেবে কাজ করে। এই গাছগুলো উঁচু হওয়ায় এবং প্রচুর পরিমাণে কার্বন ও পানি থাকায় বজ্রপাতকে নিজের দিকে টেনে নেয় এবং বিদ্যুৎ সরাসরি মাটিতে পৌঁছে দেয়। ফলে আশেপাশে থাকা বাড়িঘর ও মানুষ বড় ধরণের বিপদ থেকে রক্ষা পায়। একে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী সুরক্ষা পদ্ধতিও বলা হয়। বাড়ির চারপাশে বনায়ন: বাড়ির আশেপাশে একটু দূরত্ব বজায় রেখে বড় গাছ লাগানো হলে তা একটি ঢাল হিসেবে কাজ করে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, গাছ যেন শোবার ঘরের একেবারে গা ঘেঁষে না থাকে, কারণ বজ্রপাতে গাছ ভেঙে পড়ার ঝুঁকিও থাকে। পরিবেশগত ভারসাম্য: তাল গাছ বজ্রপাত থেকে নিজে মরে গিয়ে মানুষকে বাঁচায়। তাই আধুনিক পদ্ধতিতে লাইটেনিং রড বসানোর পাশাপাশি বেশি করে তাল ও নারিকেল গাছ রোপণ করা আমাদের জাতীয় কর্তব্য হওয়া উচিত। ৬. কেউ বজ্রাহত হলে কী করবেন? বজ্রাহত ব্যক্তিকে স্পর্শ করলে আপনার শক লাগবে না, কারণ বজ্রপাতের বিদ্যুৎ সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে মাটিতে চলে যায়। দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স ডাকুন বা হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করুন। ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃদস্পন্দন পরীক্ষা করুন। প্রয়োজনে সিপিআর (CPR) প্রদান করুন। শরীরের কোনো অংশ পুড়ে গেলে সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন। বজ্রপাত একটি অনিয়ন্ত্রিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ, তবে সচেতনতাই এর থেকে বাঁচার একমাত্র ঢাল। মেঘের গর্জন শুনলে অবহেলা না করে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়া এবং অন্যদেরও সতর্ক করা আমাদের নাগরিক দায়িত্ব। নিজে সচেতন থাকুন, পরিবারকে সুরক্ষিত রাখুন।
মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘বঙ্গভাষা’ কবিতার বিশ্লেষণ ও মূলভাব

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩) এক ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত হয়েছিলেন। মধ্যযুগীয় পয়ারের শৃঙ্খল ভেঙে তিনি বাংলা কবিতায় এনেছিলেন আধুনিকতার ছোঁয়া, প্রবর্তন করেছিলেন অমিত্রাক্ষর ছন্দ এবং সনেট বা চতুর্দশপদী কবিতা। তাঁর এই কালজয়ী সৃষ্টির অন্যতম একটি নিদর্শন হলো ‘বঙ্গভাষা’ সনেটটি। এই কবিতাটি কেবল একটি সাহিত্যকর্ম নয়, বরং এটি একজন পথভ্রষ্ট প্রতিভার ঘরে ফেরার আকুতি, মাতৃভাষার প্রতি গভীর অনুশোচনা এবং স্বদেশপ্রেমের এক অনন্য দলিল। পটভূমি ও প্রেক্ষাপট মধুসূদনের জীবনের প্রথমার্ধ ছিল উচ্চাভিলাষ এবং পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রতি অন্ধ মোহে আচ্ছন্ন। তিনি মনে করতেন, বাংলা ভাষায় মহৎ সাহিত্য সৃষ্টি অসম্ভব। তাই তিনি ইংরেজি ভাষায় সাহিত্যচর্চা করে বিশ্ববিখ্যাত হওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন এবং বিলেতে পাড়ি জমান। কিন্তু বিদেশের মাটিতে বসে তিনি উপলব্ধি করেন যে, পরভাষায় সাহিত্যচর্চা করে প্রকৃত সম্মান পাওয়া সম্ভব নয়। জীবনের এই চরম সত্য এবং বিদেশের মাটিতে নিঃসঙ্গতা তাঁকে তাঁর শেকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। এই মানসিক পরিবর্তনেরই এক শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশ হলো ‘বঙ্গভাষা’ কবিতাটি। কবিতার মূলভাব ‘বঙ্গভাষা’ কবিতার মূল সুর হলো— অনুশোচনা এবং মাতৃভাষার মাহাত্ম্য উপলব্ধি। কবি এখানে স্বীকার করেছেন যে, তিনি নিজ ভাষার অমূল্য রত্নভাণ্ডারকে অবজ্ঞা করে বিদেশের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করেছেন। কবিতার প্রতিটি চরণে কবির আত্মগ্লানি ফুটে উঠেছে। তিনি বাংলাকে ‘মণি-মাণিক্য’ খচিত খনির সাথে তুলনা করেছেন, যা তিনি আগে চিনতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত দৈববাণী বা অন্তরাত্মার আহ্বানে তিনি বুঝতে পারেন যে, তাঁর নিজের ঘরেই (মাতৃভাষায়) পরম শান্তি ও ঐশ্বর্য বিদ্যমান। এই বোধদয়ই কবিতার প্রধান উপজীব্য। পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ ১. আত্মধিক্কার ও মোহাচ্ছন্ন অতীত কবিতার শুরুতে কবি অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে বলেছেন— “হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন;— / তা সবে, (অবোধ আমি!) অবহেলা করি,” এখানে ‘অবোধ’ শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কবি নিজেকে নির্বোধ বলছেন কারণ তিনি নিজ ভাষার সম্পদ না বুঝে পরদেশের সম্পদের পেছনে ছুটেছেন। তিনি বিদেশের ‘পরধন’ লোভে মত্ত হয়ে নিজ ভাষার অমূল্য সম্পদকে তুচ্ছ জ্ঞান করেছিলেন। এটি কেবল মধুসূদনের ব্যক্তিগত আক্ষেপ নয়, বরং তৎকালীন ইংরেজি শিক্ষিত বাঙালি সমাজের এক গভীর সংকটের প্রতিফলন। ২. প্রবাস জীবনের কষ্ট ও ব্যর্থতা কবি তাঁর প্রবাস জীবনের দিনগুলোকে বর্ণনা করেছেন এক দীর্ঘ দুঃস্বপ্ন হিসেবে। তিনি বলেন— “পরদেশে, ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচরি। / কাটাইনু বহুকাল সুখ পরিহরি।” নিজ দেশ ও ভাষা ছেড়ে তিনি পরদেশে এক প্রকার ‘মানসিক ভিক্ষাবৃত্তি’ করেছেন। ইংরেজি ভাষায় সাহিত্যচর্চা করে তিনি যে যশ চেয়েছিলেন, তা পাননি। এর ফলে তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। “ম্লান তনু মনঃ সদা কুচিন্তায় মরি”– এই চরণের মাধ্যমে কবি তাঁর তৎকালীন যন্ত্রণাদায়ক মানসিক অবস্থার চিত্র তুলে ধরেছেন। ৩. স্বপ্নের বার্তা বা দৈববাণী কবিতার মাঝপথে একটি নাটকীয় মোড় আসে। কবি যখন চরম হতাশায় নিমজ্জিত, তখন তিনি স্বপ্নে তাঁর ‘কুললক্ষ্মী’ বা মাতৃভাষার অধিষ্ঠাত্রী দেবীর দর্শন পান। সেই দৈববাণী কবিকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে— “ওরে বাছা, মাতৃকোষে রতনের রাজি, / এ ভিখারী-দশা তবে কেন তোর আজি?” এই অংশটি কবির জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। তিনি বুঝতে পারেন যে, তাঁর নিজের ঘরেই রত্নভাণ্ডার পূর্ণ, অথচ তিনি বাইরে ভিখারির মতো ঘুরছেন। এটি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে— অর্থাৎ বাংলা ভাষার যে সম্ভাবনা ও সৌন্দর্য, তা তিনি আগে অনুধাবন করতে পারেননি। ৪. মাতৃভাষায় প্রত্যাবর্তন দেবীর আদেশে কবি যখন তাঁর ‘স্বদেশী ভাষা’ বা বাংলা সাহিত্যের চর্চায় মনোনিবেশ করেন, তখন তাঁর সামনে এক নতুন জগৎ উন্মোচিত হয়। তিনি দেখেন— “পালিলাম আজ্ঞা সুখে; পাইলাম কালে / মাতৃভাষা-রূপ খনি, পূর্ণ মণি-জালে।” এখানে কবি বাংলাকে ‘খনি’র সাথে তুলনা করেছেন। যে খনি মণি-মুক্তায় পূর্ণ। অর্থাৎ বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনা করেই তিনি প্রকৃত তৃপ্তি এবং সফলতা খুঁজে পেলেন। চতুর্দশপদী কবিতার বৈশিষ্ট্য ও শিল্পরূপ ‘বঙ্গভাষা’ একটি সনেট বা চতুর্দশপদী কবিতা। সনেটের নিয়ম অনুযায়ী এতে ১৪টি চরণ এবং প্রতিটি চরণে ১৪টি অক্ষর রয়েছে। এটি মূলত দুটি অংশে বিভক্ত: অষ্টক (Octave): প্রথম আট চরণে কবির দুঃখ, প্রবাস জীবন এবং ভুলের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এখানে ভাবের প্রবর্তনা ঘটেছে। ষষ্ঠক (Sestet): শেষের ছয় চরণে দৈববাণী এবং কবির ভুল ভেঙে মাতৃভাষায় ফেরার আনন্দ বর্ণিত হয়েছে। এখানে ভাবের পরিণতি ঘটেছে। মধুসূদন এখানে ক-খ-খ-ক / ক-খ-খ-ক এবং গ-ঘ-ঙ / গ-ঘ-ঙ এই মিলবিন্যাস (Rhyme Scheme) অনুসরণ করেছেন। তাঁর নিপুণ কারুকাজে কবিতাটি গাম্ভীর্যপূর্ণ এবং ধ্রুপদী রূপ লাভ করেছে। ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক গুরুত্ব বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ‘বঙ্গভাষা’ কবিতাটি একটি মাইলফলক। এটি কেবল একটি আবেগপ্রবণ কবিতা নয়, বরং এটি বাংলা ভাষার শক্তি ও সামর্থ্যের জয়গান। ১. ভাষাপ্রীতি: কবিতাটি পাঠকদের মনে স্বভাষার প্রতি মমত্ববোধ জাগিয়ে তোলে। ২. আধুনিকতার সূত্রপাত: মধ্যযুগের দেব-দেবী নির্ভর সাহিত্য থেকে বেরিয়ে এসে মধুসূদন এই কবিতায় মানুষের ব্যক্তিগত আবেগ ও অনুশোচনাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। ৩. প্রেরণা: এই কবিতাটি পরবর্তী প্রজন্মের সাহিত্যিকদের জন্য একটি বড় শিক্ষা যে, শেকড়কে অস্বীকার করে মহৎ কিছু সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। পরিশেষে বলা যায়, মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘বঙ্গভাষা’ কবিতাটি এক পথভ্রষ্ট শিল্পীর ঘরে ফেরার গান। নিজ ভাষার প্রতি যে অবহেলা তিনি একসময় করেছিলেন, এই কবিতার মাধ্যমে তিনি সেই পাপস্খালন করেছেন। ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ লেখার আগে তিনি যেভাবে নিজেকে বাংলা সাহিত্যের যোগ্য করে গড়ে তুলেছিলেন, তার এক কাব্যিক ইশতেহার হলো এই সনেটটি। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মাতৃভাষা আমাদের অস্তিত্বের মূল ভিত্তি। পরভাষার চাকচিক্য সাময়িক মোহ সৃষ্টি করলেও, প্রাণের আরাম এবং মনের তৃপ্তি কেবল জননী ও জন্মভূমির ভাষাতেই খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
যুব উন্নয়নে ক্রীড়ার ভূমিকা
যুব উন্নয়নে ক্রীড়ার ভূমিকা : সারাবিশ্বের কাছে দ্রুত উন্নয়নশীল বাংলাদেশের পরিচিতি এখন লক্ষ্যনীয়। এই অর্জনের অন্যতম অংশীদার বাংলাদেশের। ক্রীড়াঙ্গন। বাংলাদেশ অধিকাংশ MDG সহ অন্যান্য সূচক অর্জনের মাধ্যমে মধ্যবিত্ত আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হওয়া। বর্তমানে আমাদের দেশ SDG অর্জনের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যা অর্জনের জন্য প্রয়োজন কঠোর পরিশ্রম এবং নিয়মনীতি। সুতরাং এটি অর্জনের জন্য যুব ও ক্রীড়ার উন্নয়ন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ক্রীড়ার মধ্যদিয়ে প্রশিক্ষিত যুব সমাজকে সুসংঘটিত ও সুশৃঙ্খলভাবে গড়ে তুলে জাতীয় উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা সম্ভব। ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও প্রশিক্ষণের মধ্যদিয়ে যুবকদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশলাভ করার পাশাপাশি তাদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, মূল্যবোধ ও নৈতিকতা সৃষ্টি, আত্নবিশ্বাস প্রতিষ্ঠাসহ আত্ননির্ভরশীল করে গড়ে তোলা যায়। ফলে পরিবার, সমাজ তথা দেশের আপামর জনসাধারণের শারীরিক ও মানসিক উন্নয়নে সুস্থ যুব সমাজ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারে। ক্রীড়া কি? শুধুমাত্র শারীরিক কসরতই ক্রীড়া নয়। সুনিদিষ্ট, সুনির্ধারিত, নিয়মনীতি সম্বলিত, কৌশলপূর্ণ শারীরিক কার্যক্রমকেই ক্রীড়া বলা হয়। অন্যভাবে বলতে গেলে নিছক আনন্দ লাভ নয় বরঞ্চ পরিকল্পনামাফিক সুনির্ধারিত কার্যক্রমই ক্রীড়া। মূলত ক্রীড়া হচ্ছে সংগঠিত, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, বিনোদনধর্মী এবং দক্ষতাসূচক শারীরিক কার্যকলাপ প্রদর্শনের উত্তম ক্ষেত্র। যুব কি? যুব শব্দটি অতি পরিচিত হলেও এর কোন বৈশ্বিক সংজ্ঞা পাওয়া যায় না। তদুপরি প্রথাগতভাবে আমরা বলতে পারি, শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত সময়ের মধ্যবর্তী সময়কালই হল যুব সময়। African Youth Forum, UNESCO, UN এর ভাষ্যমতে ১৫-২৪ বত্সর বয়স্ক কুসংস্কারবিহীন ব্যক্তি যুব বা যুবক। Sub-Sahara African-দের মতে ১৫-৩০/৩৫ বৎসর বয়স্ক ব্যাক্তি হল যুবক। Youth Dictionary এর সংজ্ঞা অনুযায়ী সেইসব ব্যক্তিবর্গ যুবক বা খুব যারা এখনও পর্যন্ত প্রাপ্তবয়স্ক সময়ে পদার্পণ করেনি। Cambridge English সংজ্ঞা অনুযায়ী যুব হচ্ছে তারা যারা মনে করে তারা তরুণ এবং তরুণ থাকতে চান। সর্বোপরি বাংলাদেশের যুবনীতি মতে, বর্তমানে বাংলাদেশের ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়স্ক নাগরিক যুবক হিসেবে সংজ্ঞায়িত। যুবকদের স্বাস্থ্য উন্নয়নে ক্রীড়া : প্রতিনিয়ত ক্যামিকেলযুক্ত খাবার গ্রহনের ফলে আমাদের স্বাস্থ্য ক্রমান্বয়ে হুমকির মুখে সম্মুখীন হচ্ছে। এছাড়া নম কমিউনিকেবল ডিজিজ(NCD) যথা: ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, ক্যান্সার ইত্যাদি মরনব্যাধি আক্রান্ত হচ্ছে অসংখ্য মানুষ। তাই যুবকদের স্বাস্থ্যের উন্নয়ন না হলে প্রতিযোগিতামূলক পৃথিবীতে টিকে থাকা অসম্ভব। মানুষের সু-স্বাস্থ্য গঠনে ক্রীড়া অর্থনী ভূমিকা পালন করতে পারে। ক্রীড়ার মাধ্যমে যেসব শারীরিক উন্নয়ন হয় তার অন্যতম হলঃ শারীরিক কাঠামো শক্তিশালী হওয়া, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, অধিক পরিশ্রম করার ক্ষমতা তৈরি, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, বিষণ্ণতা, হতাশা ইত্যাদি রোগ হতে মুক্তি ইত্যাদি। শিক্ষা উন্নয়নে ক্রীড়া : একটা দেশের মান নির্ভর করে সেদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উপর। প্রবাদ আছে যে জাতি যত শিক্ষিত সে জাতি তত উন্নত। জাতিকে উন্নত করতে যেমন শিক্ষার বিকল্প নেই তেমনি শিক্ষার মান উন্নয়নে শিক্ষার পাশাপাশি সুস্থ বিনোদনের প্রয়োজন। সুস্থ বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম হল ক্রীড়া। এ বিবেচনা থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন আঙ্গিকে ক্রীড়াকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। ২০১২ সালে ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত শারীরিক শিক্ষা স্বাস্থ্য বিজ্ঞান ও খেলাধুলা’ নামক একটি বিষয় বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল যা শিক্ষার্থীকে ক্রীড়া ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছিল। কিন্তু ২০১৬ সালে এ বিষয়টি শিক্ষা কারিকলাম থেকে বাদ দেয়ায় ক্রীড়া ক্ষেত্রে অংশ গ্রহণ অনেকাংশে কমে গিয়েছে। স্কুল পর্যায় হতে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ক্রীড়া সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক কর্মসূচী, প্রশিক্ষণ প্রভৃতির ব্যবস্থা করা হলে শিক্ষার্থীদের মধ্য হতে হতাশা, মাদক গ্রহণ, জঙ্গিবাদ, কর্মবিমুখতা ইত্যাদি দূরীভূত করা সম্ভব হবে। ক্রীড়া সুস্থ দেহ সুস্থ মন, জ্ঞানার্জনে মনোনিবেশসহ উন্নত ও আলোকিত মানুষ সৃষ্টিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। সামাজিক উন্নয়নে ক্রীড়া : জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল বিজয় নয় সংগ্রাম, সমাজকে সর্বদা সংগ্রামের মাধ্যমে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়। সমাজের কারিগররা যদি দুর্বল বা সংগ্রামে ভীত হয় তবে সমাজ সমানে অগ্রসর হতে পারেনা। সমাজকে উন্নয়নের দিকে অগ্রসর করার পূর্ব শর্ত হল সমাজকর্মীদের সুস্থ, সুশিক্ষিত ও শক্তিশালী করা। তাই ব্যরন পিয়ারে দ্যা কুবার্তে বলেছিলেন।”খেলাধুলা না করিলে নিছক বিদ্যানুশীলন জীবনের উদ্যম, শক্তি ও কর্মক্ষমতার অপচয় করিবে”। ক্রীড়া যুবকদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বোধ তৈরি, নেতৃত্বদানের গুণাবলী, মানুষের মধ্যে আন্তঃ সম্পর্ক তৈরি, অধিক পরিশ্রমী করা, পরাজয়ে ধৈর্য্য ধারণ ও জয়ে আতৃবিশ্বাসী হওয়া, জাতি, ধর্ম,ও বর্ণগত বৈষম্যবিহীন সমাজ বিনির্মাণ, সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তন, নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপনে উৎসাহিত ও সময় সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করে। অর্থনৈতিক উন্নয়নে ক্রীড়া : বর্তমান বিশ্বে বহুল প্রচলিত একটি কথা হল “প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ব।”। প্রত্যেকটা দেশ এ প্রতিযোগিতায় নিজেদেরকে সক্রিয় অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে। এ প্রতিযোগিতার মূল বিষয় হল অর্থনৈতিকভাবে দেশকে সমৃদ্ধ করা। দেশকে অর্থনৈতিকভাবে গতিশীল করার জন্য সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে যুব সমাজ। আর যুব সমাজকে এ জাতীয় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তুত করতে পারে একমাত্র ক্রীড়া। এছাড়া বর্তমান বিশ্বে বহু উন্নত দেশের যুবকরা ক্রীড়াকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করছে। স্বল্প সময়ে অধিক বৈধ অর্থ উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম হল ক্রীড়া। এ বিষয়টি এখন সকলের কাছে স্পষ্ট ইউরোপ-আমেরিকার ফুটবলার, টেনিস খেলোয়াড়সহ সারা বিশ্বের অনেক অপরিচিত ইভেন্টের খেলোয়াড়ও এখন আর্থিকভাবে সাবলম্বী। দেশের অনেক খেলোয়াড় এখন রীতিমত ধনী। সুতরাং অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম মাধ্যম হতে পারে ক্রীড়া। ক্রীড়ার মাধ্যমে শারীরিক সক্ষমতা বাড়লে উপার্জনশীলতা বৃদ্ধি পায়, চিকিৎসা ব্যয় কমে, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয় ও অধিক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়। মনস্তাত্বিক উন্নয়নে ক্রীড়া : যুবকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি কাজ করে তা হল সিদ্ধান্তহীনতা। যে কোন কাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে যুবকরা এ জটিলতার সম্মুখীন হয়। গবেষণায় দেখা যায় যে, ২০-৪০ বছর বয়সী একটি সুস্থ মস্তিস্কে প্রতি সেকেন্ডে ৫০টি সিদ্ধান্ত প্রবেশ ও বাহির হতে পারে। কিন্তু যুবক যদি ক্রীড়ার সাথে সম্পৃক্ত হয় তবে ক্রীড়া তাকে সব দুঃশ্চিন্তা থেকে দূর করে একটি লক্ষ্যের দিকে মনকে স্থির করে। এতে যুবকদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে অনেকাংশে সহযোগিতা করে এবং নিন্দিষ্ট কাজের প্রতি বিশেষ একাগ্রতা তৈরী করে। ক্রীড়ায় অংশ নেওয়ার ফলে যুবকদের মধ্যে যেসব ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ্য করা যায় তমধ্যে মানসিক চাপ নেয়ার মত ক্ষমতা তৈরী, কোন বিশেষ বিষয়ের প্রতি একাগ্রতা সৃষ্টি, দুশ্চিন্তা মুক্ত হওয়া, হতাশা দূর হওয়া ও মানসিক শক্তি বৃদ্ধি অন্যতম। বাংলাদেশে ক্রীড়ার বর্তমান অবস্থা: বাংলাদেশে ক্রীড়া উন্নয়নে যে সব প্রতিষ্ঠান কাজ করে থাকে তাদের মধ্যে রয়েছে ক্রীড়া পরিদপ্তর, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ, বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি) ও বঙ্গবন্ধু ক্রীড়া সেবী ফাউন্ডেশন। ক্রীড়া পরিদপ্তরের মাধ্যমে দেশের ৬৪টি জেলায় অবস্থিত জেলা ক্রীড়া অফিস ও ৬টি বিভাগীয় পর্যায়ে স্থাপিত শারীরিক শিক্ষার মাধ্যমে ক্রীড়া কার্যক্রম পরিচালিত হয়। জেলা পর্যায়ে ক্রীড়া ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও প্রশিক্ষণের আয়োজন জেলা ক্রীড়া অফিসারের অন্যতম দায়িত্ব। ৬টি শারীরিক শিক্ষা কলেজের মাধ্যমে ১০০০ জন ছাত্র-ছাত্রীকে বিপিএড এবং ১০০জন ছাত্র-ছাত্রীকে এমপিএড কোর্সের মাধ্যমে ডিগ্রী প্রদান করা হয়। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের নিয়ন্ত্রণে ৩৫টি ফেডারেশন ও ১৪টি এসোসিয়েশন রয়েছে যারা বিভাগ, জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে। বিভিন্ন ক্রীড়ার আয়োজন করে থাকেন। দেশে বর্তমানে ৮টি ক্রিকেট স্টেডিয়াম, ৫টি বিভাগীয় স্টেডিয়াম, ৬২টি জেলা স্টেডিয়াম, ৭টি ইনডোর স্টেডিয়াম, ২টি ফুটবল স্টেডিয়াম, ২০টি সুইমিং পুল ও ৬টি মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্স রয়েছে। এছাড়াও সম্প্রতি সরকার ৪৯০টি উপজেলায়
ভাষা ও মাতৃভাষা: বাংলা ভাষার স্বরূপ, প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য
ভাষা মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্পদ এবং ভাব প্রকাশের প্রধান মাধ্যম। সৃষ্টির আদিকাল থেকে মানুষ নিজের আনন্দ, বেদনা, ক্ষোভ কিংবা প্রয়োজন অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য যে সুসংবদ্ধ ধ্বনি বা সংকেত ব্যবহার করে আসছে, তার নামই ভাষা। নিচে ভাষা বিষয়ক প্রাথমিক জ্ঞান—বিশেষ করে ভাষার সংজ্ঞা, মাতৃভাষা এবং বাংলা ভাষার প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো। ভাষা ও মাতৃভাষা: বাংলা ভাষার স্বরূপ, প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য ১. ভাষার সংজ্ঞা: ভাবের শৈল্পিক প্রকাশ ভাষা হলো নির্দিষ্ট জনসমাজে মানুষের মনের ভাব প্রকাশের জন্য বাগযন্ত্রের সাহায্যে উচ্চারিত অর্থবোধক ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টি। বিভিন্ন ভাষাবিজ্ঞানী ভাষাকে বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। ভাষাবিজ্ঞানী ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে: “মনের ভাব প্রকাশের জন্য বাগযন্ত্রের সাহায্যে উচ্চারিত ধ্বনির দ্বারা নিষ্পন্ন কোনো বিশেষ জনসমাজে ব্যবহৃত, স্বতন্ত্রভাবে অবস্থিত তথা বাক্যে প্রযুক্ত শব্দসমষ্টিকে ভাষা বলে।” সহজ কথায়, আমরা মুখ দিয়ে যা বলি তা-ই ভাষা নয়; সেই ধ্বনিকে অবশ্যই অর্থপূর্ণ হতে হবে এবং একটি নির্দিষ্ট জনসমাজে তার সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা থাকতে হবে। ভাষা পরিবর্তনশীল। দেশ, কাল ও পরিবেশ ভেদে ভাষার রূপ বদলায়। পৃথিবীর সকল মানুষের ভাষা এক নয় বলেই আজ বিশ্বে কয়েক হাজার ভাষার অস্তিত্ব বিদ্যমান। ২. মাতৃভাষা: অস্তিত্বের শিকড় মাতৃভাষা হলো সেই ভাষা, যা শিশু জন্মের পর থেকে তার মায়ের কোলে বেড়ে ওঠার সময় প্রথম শেখে। এটি কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং এটি মানুষের চিন্তা, আবেগ এবং অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষ তার মাতৃভাষাতেই সবচেয়ে স্বচ্ছভাবে চিন্তা করতে পারে এবং স্বপ্ন দেখে। একটি শিশুর বিকাশে মাতৃভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। মাতৃভাষার মাধ্যমেই শিশু তার চারপাশের জগৎকে চিনতে শুরু করে। এটি হলো তার স্বকীয়তা ও সংস্কৃতির ধারক। ইউনেস্কো কর্তৃক ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে বিশ্বের সকল জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষার অধিকার ও মর্যাদাকে সম্মান জানানো হয়েছে। ৩. মাতৃভাষা হিসেবে বাংলা বাঙালি জাতির কাছে তার মাতৃভাষা ‘বাংলা’ কেবল একটি ভাষা নয়, এটি এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ইতিহাস। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালিরা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে এই ভাষার মর্যাদা রক্ষা করেছে। বাংলা ভাষা আজ বিশ্বের অন্যতম প্রধান ভাষা। প্রায় ৩০ কোটি মানুষের এই ভাষাটি জনসংখ্যার দিক থেকে পৃথিবীতে চতুর্থ বা পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে। এটি বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসামের একাংশের মানুষের প্রধান ভাষা। বাংলা সাহিত্যের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার, বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল বিজয় এবং কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী চেতনা এই ভাষাকে বিশ্বদরবারে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। মাতৃভাষা হিসেবে বাংলা আমাদের আত্মপরিচয়ের মূল ভিত্তি। ৪. বাংলা ভাষার প্রকৃতি ও উৎস বাংলা ভাষার জন্ম হয়েছে হাজার বছর আগে। এটি ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা বংশের অন্তর্গত। মূলত সংস্কৃত থেকে প্রাকৃত এবং প্রাকৃত থেকে অপভ্রংশের পথ ধরে বাংলা ভাষার বিবর্তন ঘটেছে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, বাংলা ভাষার উদ্ভব হয়েছে ‘গৌড়ীয় প্রাকৃত’ থেকে, অন্যদিকে ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে এর উৎস ‘মাগধী প্রাকৃত’। বাংলা ভাষার প্রকৃতি অত্যন্ত উদার ও নমনীয়। এর নিজস্ব ব্যাকরণিক কাঠামো থাকলেও এটি যুগে যুগে বিভিন্ন বিদেশি শব্দকে (যেমন: আরবি, ফারসি, ইংরেজি, পর্তুগিজ) আপন করে নিয়েছে। এই গ্রহণ করার ক্ষমতা বাংলাকে এক প্রাণবন্ত ও গতিশীল ভাষায় রূপান্তরিত করেছে। ৫. বাংলা ভাষার প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ বাংলা ভাষার নিজস্ব কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা একে অন্যান্য ভাষা থেকে আলাদা করে তোলে: ধ্বনিগত বৈচিত্র্য: বাংলা ভাষায় স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনির চমৎকার বিন্যাস রয়েছে। বিশেষ করে ‘চন্দ্রবিন্দু’র নাসিক্য উচ্চারণ এবং তদ্ভব শব্দের প্রাধান্য এর শ্রুতিমধুরতা বৃদ্ধি করে। শব্দসম্ভার: বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডারকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয়েছে: তৎসম, অর্ধ-তৎসম, তদ্ভব, দেশি ও বিদেশি। এর ফলে বাংলা ভাষা বিশাল শব্দসম্ভারে সমৃদ্ধ। ক্রিয়াপদ ও লিঙ্গভেদ: বাংলা ভাষায় ক্রিয়াপদ সাধারণত বাক্যের শেষে বসে। মজার বিষয় হলো, বাংলায় সর্বনাম বা ক্রিয়াপদের ক্ষেত্রে কোনো লিঙ্গভেদ নেই। যেমন: ‘সে যায়’—এখানে ‘সে’ ছেলে বা মেয়ে উভয়কেই বোঝাতে পারে। মৌখিক ও রৈখিক রূপ: বাংলা ভাষার দুটি প্রধান রীতি রয়েছে—সাধু ও চলিত। বর্তমানে চলিত রীতির ব্যবহারই সর্বাধিক। এছাড়া আঞ্চলিক বৈচিত্র্য বা উপভাষার দিক থেকেও বাংলা অত্যন্ত সমৃদ্ধ (যেমন: চট্টগ্রামের ভাষা, সিলেটি ভাষা ইত্যাদি)। অক্ষরভিত্তিক লিখন পদ্ধতি: বাংলা বর্ণমালা একটি বিশেষ লিখন পদ্ধতির অনুসারী। এর স্বরবর্ণের কার-চিহ্নগুলো ব্যঞ্জনবর্ণের সাথে যুক্ত হয়ে নতুন রূপ ধারণ করে, যা লিখন শৈলীতে সৌন্দর্য যোগ করে। ভাষা হলো একটি প্রবহমান নদীর মতো। বাংলা ভাষা সেই প্রাচীন কাল থেকে শুরু করে আজ অবধি আপন মহিমায় টিকে আছে এবং সমৃদ্ধ হচ্ছে। মাতৃভাষা হিসেবে বাংলা আমাদের হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতির বাহন। এর সঠিক চর্চা, বানান সচেতনতা এবং মর্যাদা রক্ষা করা প্রতিটি বাঙালির নৈতিক দায়িত্ব। ভাষার প্রকৃতি ও ব্যাকরণিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমেই আমরা আমাদের এই মহান সম্পদকে বিশ্বব্যাপী আরও ছড়িয়ে দিতে পারি।
আমাদের শেখ রাসেল: বাঙালির হৃদয়ে এক অমর নক্ষত্র

বাঙালি জাতির সহস্রাব্দের ইতিহাসে ধ্রুবতারার মতো অসংখ্য মহান ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটেছে। কেউ আমাদের দিয়েছেন রাজনৈতিক স্বাধীনতা, কেউ দিয়েছেন সাংস্কৃতিক মুক্তি, আবার কেউ দিয়েছেন আত্মপরিচয়ের অধিকার। তাঁদের অসামান্য ত্যাগ আর কর্মে গড়ে উঠেছে আজকের বাংলাদেশ। সাধারণত ইতিহাসের বড় বড় নামগুলো তাঁদের বিশাল সব কীর্তির জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকেন, কিন্তু আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক মর্মন্তুদ অথচ অম্লান অধ্যায় জুড়ে আছেন এমন একজন, যাঁর জীবনের ব্যাপ্তি ছিল মাত্র এগারো বসন্তের। তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ পুত্র, আমাদের পরম আদরের ছোট্ট সোনামণি শেখ রাসেল। শেখ রাসেল কেবল একটি নাম নয়; শেখ রাসেল একটি হারানো শৈশবের নাম, একটি অপূর্ণ স্বপ্নের নাম এবং ঘাতকের নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে এক চিরন্তন প্রতিবাদী স্তব্ধতা। বঙ্গবন্ধু পরিবারের উজ্জ্বল এই সদস্যের জীবনপ্রদীপ মাত্র এগারো বছরে নিভে গেলেও, তাঁর সেই স্বল্পস্থায়ী জীবন বাঙালির জাতীয় মানসকে এক গভীর মমত্ববোধে আবিষ্ট করে রেখেছে। আজ তিনি কেবল বঙ্গবন্ধুর পুত্র নন, বরং বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে তিনি হয়ে উঠেছেন এক চিরকালীন বন্ধু এবং প্রতিটি শিশুর আদর্শ। শেখ রাসেলের শুভ জন্মলগ্ন: ধন্য হলো বাংলার মাটি ১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর। বাংলার প্রকৃতি তখন হেমন্তের সোনালী আভায় সেজেছে। মাঠে মাঠে নতুন ধানের গন্ধে মাতোয়ারা বাতাস। ঠিক এমনই এক স্নিগ্ধ লগ্নে ঢাকার ধানমন্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বর সড়কের সেই বাড়িতে আলোর ঝিলিক ছড়িয়ে জন্ম নিলেন শেখ রাসেল। রাসেলের জন্মক্ষণটি ছিল আনন্দ আর উত্তোজনায় ভরপুর। বাড়ির বড় বোন শেখ হাসিনার ঘরের পাশে যখন রাসেলের কান্নার শব্দ শোনা গেল, তখন পুরো বাড়িতে আনন্দের জোয়ার বয়ে গিয়েছিল। জাতির পিতা তখন রাজনৈতিক ব্যস্ততা আর বাঙালির অধিকার আদায়ে দিনরাত এক করছেন, তবুও কনিষ্ঠ পুত্রের আগমনে তিনি হয়েছিলেন আবেগাপ্লুত। বড় বোন শেখ হাসিনা পরম মমতায় নিজের ওড়না দিয়ে ভাইয়ের ভেজা মাথা মুছে দিয়েছিলেন। শৈশবে রাসেল ছিলেন বেশ স্বাস্থ্যবান এবং অসম্ভব চটপটে। তাঁর সেই মায়াবী চেহারার হাসিতে ৩২ নম্বরের বিষণ্ণ রাজনৈতিক আবহও যেন মুহূর্তে আনন্দময় হয়ে উঠত। রাসেলের জন্ম যেন শুধু একটি পরিবারের আনন্দ ছিল না, তা ছিল আগামীর এক অমিত সম্ভাবনার উদয়। নামকরণ ও দর্শনের মিতালী: কেন তিনি ‘রাসেল’? শেখ রাসেলের নামকরণের পেছনে লুকিয়ে আছে বিশ্ববিখ্যাত এক দর্শন এবং বঙ্গবন্ধুর উদার আন্তর্জাতিকতাবোধের পরিচয়। বঙ্গবন্ধু শুধু বাঙালির মুক্তি নিয়ে ভাবতেন না, তিনি ভাবতেন সারা বিশ্বের শান্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ নোবেল বিজয়ী দার্শনিক ও গণিতবিদ বার্ট্রান্ড রাসেলের (Bertrand Russell) একনিষ্ঠ ভক্ত। বার্ট্রান্ড রাসেল ছিলেন বিশ্বশান্তির এক মহান দূত। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে পৃথিবী যখন পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কায় থরথর করে কাঁপছিল, তখন তিনি যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল তাঁর সন্তানও যেন বিশ্বশান্তির আদর্শে বড় হয়, যেন তার হৃদয়ে থাকে মানবতার প্রতি গভীর ভালোবাসা। এই মহান দার্শনিকের প্রতি শ্রদ্ধা এবং তাঁর আদর্শকে ধারণ করার আকাঙ্ক্ষা থেকেই বঙ্গবন্ধু নিজের কনিষ্ঠ পুত্রের নাম রেখেছিলেন ‘শেখ রাসেল’। নামের সার্থকতা অনুযায়ী রাসেলের আচরণেও ছোটবেলা থেকেই সেই মানবিক গুণাবলি ও শান্তিকামী মনোভাব লক্ষ্য করা যেত। রাসেলের রঙিন শৈশব ও কারাজীবনের স্মৃতি শেখ রাসেলের শৈশব আর দশটা সাধারণ শিশুর মতো সহজ ও স্বাভাবিক ছিল না। তাঁর জন্ম এমন এক সময়ে, যখন বাংলার স্বাধিকার আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নিচ্ছে। ফলে জন্মের পর থেকেই রাসেল পিতাকে খুব কাছে পাননি। রাজনৈতিক কারণে বঙ্গবন্ধুকে জীবনের অধিকাংশ সময় কাটাতে হয়েছে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। ছোট্ট রাসেলের কাছে ‘বাবা’ শব্দটি ছিল এক রহস্যময় অনুভূতির মতো। শৈশবে রাসেল যখন তাঁর বড় বোন শেখ হাসিনার সঙ্গে কারাগারে বঙ্গবন্ধুকে দেখতে যেতেন, তখন এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য তৈরি হতো। মাত্র দুই বছর বয়সে রাসেল তাঁর আপাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তোমার বাবাকে কি আমি বাবা বলে ডাকতে পারি?” এই একটি বাক্যই বলে দেয়, পিতৃত্বের স্নেহ থেকে তিনি কতটা বঞ্চিত ছিলেন। রাসেল যখন একটু বড় হলেন, তখন তিনি বুঝতে শুরু করেন যে তাঁর বাবা সাধারণ কেউ নন। তবুও বাবার অভাব তাঁকে পীড়া দিত। কারাগারে বঙ্গবন্ধুকে দেখে যখন ফেরার সময় হতো, রাসেল কিছুতেই বাবাকে ছেড়ে আসতে চাইতেন না। তখন তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বোঝানো হতো যে, জেলখানাই তাঁর বাবার বাড়ি, সেখানেই বাবা থাকেন। এই বিষণ্ণ বাস্তবতা নিয়েই বেড়ে উঠেছেন আমাদের রাসেল। ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল ও রাসেলের ছাত্রজীবন রাসেলের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল ও কলেজে। ১৯৭৫ সালে যখন তিনি শাহাদাত বরণ করেন, তখন তিনি চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন। স্কুলের শিক্ষকদের কাছে রাসেল ছিলেন অত্যন্ত শান্ত ও বিনয়ী এক ছাত্র। যদিও তিনি রাষ্ট্রপতির পুত্র ছিলেন, কিন্তু তাঁর চালচলনে কোনো রাজকীয় অহংকার ছিল না। তিনি সাধারণ ছাত্রদের মতোই সবার সঙ্গে মিশতেন। তাঁর সহপাঠীরা আজও মনে করেন, রাসেল ছিলেন ক্লাসের সবচেয়ে চটপটে এবং বুদ্ধিমান ছেলে। তাঁর স্কুল ব্যাগটি কাঁধে নিয়ে যখন তিনি করিডোর দিয়ে হেঁটে যেতেন, তখন এক অন্যরকম আভিজাত্য ফুটে উঠত তাঁর চোখেমুখে। স্কুলে যাতায়াতের জন্য তিনি রাষ্ট্রীয় প্রটোকল খুব একটা পছন্দ করতেন না; বরং সুযোগ পেলেই তাঁর প্রিয় বাইসাইকেলটি চালিয়ে স্কুলে যেতে চাইতেন। এই সাধারণ জীবনযাপনের শিক্ষা তিনি পেয়েছিলেন তাঁর মা বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের কাছ থেকে। মানবিকতা ও প্রাণিকুলের প্রতি ভালোবাসা রাসেলের হৃদয়ে ছিল এক অতলান্ত ভালোবাসা। কেবল মানুষের প্রতি নয়, পশুপাখির প্রতিও তাঁর ছিল অগাধ মায়া। বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের বাড়িতে ‘টমি’ নামে একটি কুকুর ছিল। টমি ছিল রাসেলের খেলার সঙ্গী। কথিত আছে, একদিন খেলার সময় টমি জোরে ঘেউ ঘেউ করে ডাকলে রাসেল কেঁদে ফেলে তাঁর মেজো আপা শেখ রেহানার কাছে নালিশ করেছিলেন যে, টমি তাঁকে বকেছে! এই সরলতা ও নির্ভেজাল অনুভুতিই ছিল রাসেলের অলঙ্কার। মাছ ধরার প্রতিও তাঁর দারুণ নেশা ছিল। তবে তাঁর মাছ ধরা ছিল এক বিচিত্র খেলা। তিনি বরশি দিয়ে মাছ ধরতেন ঠিকই, কিন্তু মাছের কষ্ট দেখে পরক্ষণেই আবার সেগুলোকে পুকুরের পানিতে ছেড়ে দিতেন। এই যে অন্যের কষ্ট অনুভব করার শক্তি, তা তিনি ছোটবেলা থেকেই ধারণ করেছিলেন। বাড়ির কাজের লোক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—সবার সঙ্গে তিনি সমানভাবে মিশতেন এবং সবাইকে সম্মান করতেন। তাঁর এই মানবিক গুণাবলি প্রমাণ করে যে, বেঁচে থাকলে তিনি হতেন এদেশের মানুষের এক পরম আশ্রয়স্থল। ১৫ই আগস্ট: এক দেবশিশুর রক্তে রঞ্জিত ইতিহাস ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট—বাঙালি জাতির ললাটে এক কলঙ্কিত মহাকাব্য। সেই কালরাত্রিতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কটি হয়ে উঠেছিল এক মৃত্যুপুরী। একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা ও ষড়যন্ত্রকারী অপশক্তি যখন কামানের গোলা আর ট্যাংকের গর্জনে পুরো এলাকা থরথর করে কাঁপিয়ে দিচ্ছিল, তখন শিশু রাসেলের মনেও ছিল এক অজানা আতঙ্ক। ঘাতকরা যখন একের পর এক পরিবারের সদস্যদের নিথর দেহ মেঝেতে লুটিয়ে দিচ্ছিল, রাসেল তখন ভয়ে জবুথবু হয়ে ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত কর্মচারী মহিতুল ইসলামের বয়ান অনুযায়ী, ছোট্ট রাসেল দৌড়ে এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, “ওরা কি আমাকেও মেরে ফেলবে?” ঘাতকরা যখন তাঁকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল, রাসেল তখন বারংবার তাঁর মায়ের কাছে যাওয়ার আকুতি জানিয়েছিলেন। নিষ্ঠুর ঘাতকদল মরণপণ এই আকুতি শোনেনি; বরং মায়ের কাছে নিয়ে যাওয়ার ছলনা করে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়
সৈয়দ শামসুল হক-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা । ২৭ ডিসেম্বর

সৈয়দ শামসুল হক-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। সৈয়দ শামসুল হক-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ ২৭ ডিসেম্বর। আজ আমরা এমন এক ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যাঁর কলমের জাদুতে বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি শাখা সমৃদ্ধ হয়েছে। কবিতা, উপন্যাস, নাটক, ছোটগল্প কিংবা কাব্যনাট্য—সবখানেই যাঁর অবাধ বিচরণ। তিনি আমাদের সাহিত্যের ‘সব্যসাচী লেখক’—সৈয়দ শামসুল হক। উপস্থিত সুধী, সৈয়দ শামসুল হক ১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সৈয়দ সিদ্দিক হুসাইন ছিলেন একজন চিকিৎসক এবং মাতা হালিমা খাতুন। শৈশব থেকেই সাহিত্যের প্রতি তাঁর ছিল গভীর অনুরাগ। তিনি কেবল একজন লেখক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অসামান্য শব্দশিল্পী। সৈয়দ শামসুল হকের সাহিত্যকর্মে এদেশের মাটি, মানুষ এবং ইতিহাসের এক নিবিড় প্রতিফলন পাওয়া যায়। বিশেষ করে তাঁর কাব্যনাট্যগুলো বাংলা সাহিত্যে এক নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘নূরলদীনের সারাজীবন’-এর সেই কালজয়ী পঙক্তি আজও আমাদের রক্তে শিহরণ জাগায়: “জাগো বাহে, কুন্ঠে সবায়ে!” এই একটি পঙক্তির মধ্য দিয়ে তিনি যেন ঘুমন্ত বাঙালি জাতিকে বারবার জেগে ওঠার ডাক দিয়ে গেছেন। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য সৃষ্টির মধ্যে রয়েছে ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, ‘নিষিদ্ধ লোবান’, ‘খেলারাম খেলে যা’ এবং ‘নীল দংশন’-এর মতো কালজয়ী কাজ। তিনি মাত্র ২৯ বছর বয়সে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন, যা সাহিত্যে তাঁর অসামান্য প্রতিভারই স্বীকৃতি। পরবর্তীতে তিনি একুশে পদক এবং স্বাধীনতা পদকেও ভূষিত হন। প্রিয় সুধী, সৈয়দ শামসুল হক আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে শব্দ দিয়ে ছবি আঁকতে হয়। তাঁর ছোটগল্পের বুনন আর উপন্যাসের গভীরতা আমাদের জীবনবোধকে প্রসারিত করে। তিনি আমৃত্যু বিশ্বাস করতেন কলমের শক্তিতে এবং মানুষের মুক্তির মিছিলে। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার এই সব্যসাচী লেখকের নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন তাঁর নির্ভীক জীবনবোধ ও সাহিত্যের নিরন্তর সাধনা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের মেধা ও মননকে বিকশিত করতে পারি। সৈয়দ শামসুল হক তাঁর অবিনশ্বর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বাঙালির হৃদয়ে এবং বাংলা সাহিত্যের আকাশে ধ্রুবতারার মতো চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা
মির্জা গালিব-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা । ২৭ ডিসেম্বর

মির্জা গালিব-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। মির্জা গালিব-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ আমরা এমন এক ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যাঁর নাম উচ্চারণ মাত্রই বিশ্বসাহিত্যের এক গভীর দর্শন ও কাব্যময় জগত আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তিনি মুঘল সাম্রাজ্যের শেষ সূর্যোদয়ের সাক্ষী, উর্দু ও ফারসি ভাষার অমর কবি— মির্জা আসাদুল্লাহ খান গালিব। উপস্থিত সুধী, মির্জা গালিব ১৭৯৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর ভারতের আগ্রায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষরা ছিলেন মধ্য এশীয় তুর্কি বংশোদ্ভূত। গালিব এমন এক সময়ে কাব্যচর্চা করেছেন যখন মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ঘটছে এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন জেঁকে বসছে। এই যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে তিনি জীবনকে যে গভীরতা দিয়ে দেখেছিলেন, তা আজ আড়াইশ বছর পরও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। গালিবের কবিতার প্রধান বিষয়বস্তু ছিল মানুষের অস্তিত্বের সংকট, প্রেম, মৃত্যু এবং আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা। তিনি কেবল কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দার্শনিক। তাঁর ‘দিওয়ান-ই-গালিব’ উর্দু সাহিত্যের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠতম সংকলন হিসেবে বিবেচিত। তাঁর রচিত চিঠিপত্রগুলোও উর্দু গদ্য সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ, যা সেই সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির এক প্রামাণ্য দলিল। তাঁর কিছু অমর পঙক্তি আজও সারা বিশ্বের কাব্যপ্রেমীদের মুখে মুখে ঘোরে: “হাজারো খোয়াইশে অ্যায়সি কে হর খোয়াইশ পে দম নিকলে / বহুত নিকলে মেরে আরমান লেকিন ফির ভি কম নিকলে” (অর্থাৎ: হাজারো এমন আকাঙ্ক্ষা যার প্রতিটির জন্য প্রাণ উৎসর্গ করা যায়; অনেক আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হয়েছে ঠিকই, তবু যেন তা পর্যাপ্ত নয়।) প্রিয় সুধী, মির্জা গালিব তাঁর জীবদ্দশায় চরম দারিদ্র্য ও ব্যক্তিগত শোকের মধ্য দিয়ে গেছেন। তাঁর সাতটি সন্তানই শৈশবে মারা যায়। কিন্তু এই দুঃখ তাঁকে ভেঙে ফেলেনি, বরং তাঁর কলমকে করেছে আরও ধারালো এবং সংবেদনশীল। তিনি ছিলেন অত্যন্ত স্বাধীনচেতা এবং রসবোধ সম্পন্ন একজন মানুষ। মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফর তাঁকে ‘দাবির-উল-মুলক’ এবং ‘নাজিম-উদ-দৌলা’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে এই মহান দার্শনিকের নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সেই সুগভীর কাব্যদর্শন সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন গালিবের মতো প্রতিকূলতার মাঝেও জীবনকে দেখার নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করতে পারি এবং নিজেদের জীবনকে শিল্পের আলোয় রাঙাতে পারি। মির্জা গালিব তাঁর কালজয়ী সৃষ্টির মধ্য দিয়ে সাহিত্যের আকাশে চিরকাল ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা
মুনীর চৌধুরী-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা । ১৯ নভেম্বর

মুনীর চৌধুরী-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। মুনীর চৌধুরী-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ ১৯ নভেম্বর। আজ আমরা এমন এক প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি একাধারে সাহিত্যিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক এবং বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষাবিদ। তিনি আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের আলোকবর্তিকা—শহীদ মুনীর চৌধুরী। উপস্থিত সুধী, মুনীর চৌধুরী ১৯২৫ সালের ১৯ নভেম্বর তৎকালীন ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈত্রিক নিবাস ছিল নোয়াখালী জেলায়। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই মানুষটি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের তুখোড় অধ্যাপক। তিনি কেবল শ্রেণিকক্ষেই পাঠদান করেননি, বরং বাংলা ভাষাকে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত করার ক্ষেত্রে এক অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। টাইপরাইটারের জন্য তাঁর আবিষ্কৃত ‘মুনীর অপটিমা’ কি-বোর্ড লেআউট আজও আমাদের যান্ত্রিক জীবনে বাংলা ব্যবহারের অন্যতম ভিত্তি হয়ে আছে। মুনীর চৌধুরীর সাহিত্যকর্ম আমাদের জাতীয় সম্পদ। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের উত্তাল সময়ে রাজবন্দী থাকাকালীন তিনি রচনা করেন তাঁর কালজয়ী নাটক ‘কবর’। জেলে বসে এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে রচিত এই নাটকটি আজও আমাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের এক অবিস্মরণীয় দলিল। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’, ‘চিঠি’, ‘দণ্ডকারণ্য’ এবং অনুবাদ নাটক ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ বাংলা নাট্যসাহিত্যের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। সাহিত্য সমালোচনায় তাঁর ‘তুলামূলক সমালোচনা’ এবং ‘বাংলা গদ্যরীতি’ বই দুটি আজ অবধি গবেষকদের জন্য পথপ্রদর্শক। প্রিয় সুধী, মুনীর চৌধুরী ছিলেন আপাদমস্তক এক অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল মানুষ। একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোতে তিনি দেশের মাটির মায়া ত্যাগ করেননি। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, স্বাধীনতার সূর্য উদিত হওয়ার মাত্র দুদিন আগে, ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে আল-বদর বাহিনী তাঁকে অপহরণ করে নিয়ে যায় এবং বরেণ্য এই বুদ্ধিজীবীকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। তাঁর শূন্যতা আজও অপূরণীয়। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার এই মহান চিন্তকের নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন মুনীর চৌধুরীর সেই নির্ভীক সত্যবাদিতা ও জ্ঞাননিষ্ঠার আদর্শকে আমাদের শিক্ষা জীবনে পাথেয় করতে পারি। মুনীর চৌধুরী তাঁর কর্ম ও অসামান্য সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বাঙালির হৃদয়ে এবং বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা
সলিল চৌধুরীর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা

সলিল চৌধুরী-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। সলিল চৌধুরী-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ ১৯ নভেম্বর। আজ আমরা এমন এক কালজয়ী প্রতিভা ও সুরস্রষ্টার জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি ভারতীয় সংগীতের ব্যাকরণ ও বিন্যাসকে এক বৈপ্লবিক আধুনিকতায় ঋদ্ধ করেছেন। তিনি আমাদের প্রিয় সলিলদা—বিখ্যাত সংগীত পরিচালক, সুরকার, গীতিকার এবং গল্পকার সলিল চৌধুরী। উপস্থিত সুধী, সলিল চৌধুরী ১৯২৫ সালের ১৯ নভেম্বর দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার গাজিপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব কেটেছে আসামের চা বাগানে, যেখানে বাবার সংগ্রহে থাকা পাশ্চাত্য উচ্চাঙ্গ সংগীত এবং চা বাগানের শ্রমিকদের জীবনের সুর তাঁর সংগীত সত্তাকে সমৃদ্ধ করেছিল। জ্যাঠাতো ভাই নিখিল চৌধুরীর ঐক্যবাদন দল ‘মিলন পরিষদ’-এর মাধ্যমে সংগীতের জগতে তাঁর হাতেখড়ি। পরবর্তীতে কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজ থেকে স্নাতক করার সময় থেকেই তিনি রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়ে ওঠেন এবং ভারতীয় গণনাট্য সংঘ বা আইপিটিএ (IPTA)-এ যোগ দেন। মাত্র ২০ বছর বয়সে তিনি ‘গাঁয়ের বধু’র মতো গান সুর করে বাংলা সংগীতে এক নতুন ধারার সূচনা করেছিলেন। তাঁর সৃজনশীলতায় বাংলা গান পেয়েছিল ‘রানার’, ‘বিচারপতি’ এবং ‘অবাক পৃথিবী’র মতো কালজয়ী সব গণসংগীত। সলিল চৌধুরী কেবল বাংলাতেই নয়, হিন্দি, মালয়ালম, তামিল, তেলুগু ও মারাঠীসহ বিভিন্ন ভাষায় ৭৫টিরও বেশি হিন্দি ও ৪০টির বেশি বাংলা চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা করেছেন। ১৯৫৩ সালে তাঁরই লেখা ছোটগল্প ‘রিকসাওয়ালা’ অবলম্বনে বিমল রায় নির্মাণ করেন বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘দো ভিঘা জামিন’, যা কান চলচ্চিত্র উৎসবে আন্তর্জাতিক পুরস্কার জিতে তাঁর কর্মজীবনকে এক বিশ্বজনীন মাত্রা দান করে। প্রিয় সুধী, সলিল চৌধুরীর সংগীতে ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সংগীত এবং পাশ্চাত্য উচ্চাঙ্গ সংগীতের এক অসামান্য মেলবন্ধন লক্ষ করা যায়। মোৎজার্টের সিম্ফোনি থেকে শুরু করে শপ্যাঁর কাজ—সবকিছুকেই তিনি অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ভারতীয় গানের সাথে মিশিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি কেবল সুরকার ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দক্ষ যন্ত্রীও; বাঁশি, পিয়ানো ও এসরাজ বাজানোয় তিনি ছিলেন পারদর্শী। ১৯৫৮ সালে ‘মধুমতি’ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি ফিল্মফেয়ার সেরা সংগীত পরিচালকের পুরস্কার পান এবং ১৯৮৮ সালে লাভ করেন ‘সংগীত নাটক একাডেমী পুরস্কার’। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে সলিল চৌধুরীর নাম নিই, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর আত্মার শান্তি কামনায় সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন তাঁর নির্ভীক জীবনবোধ ও শিল্পের প্রতি নিরন্তর সাধনা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে আরও উন্নত করতে পারি। সলিল চৌধুরী তাঁর অবিনশ্বর সুর ও সৃষ্টির মধ্য দিয়ে প্রতিটি সংগীতানুরাগী মানুষের হৃদয়ে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা
নবান্ন ও হেমন্ত উৎসব উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা ( ১লা অগ্রহায়ণ বা নভেম্বরের ১৫/১৬ তারিখ)
নবান্ন ও হেমন্ত উৎসব উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। নবান্ন ও হেমন্ত উৎসব উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই হেমন্তের শিশিরভেজা প্রীতি ও নবান্নের শুভেচ্ছা। আজ আমরা সমবেত হয়েছি বাঙালির প্রাণের মেলা, ঋতুচক্রের এক অপূর্ব সন্ধিক্ষণ ‘হেমন্ত উৎসব’ ও ‘নবান্ন’ উদযাপন করতে। যখন কার্তিকের কুয়াশাভেজা ভোর পেরিয়ে ১লা অগ্রহায়ণ আমাদের দুয়ারে কড়া নাড়ে, তখন বাংলার দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠ সোনালি রঙে সেজে ওঠে। আর সেই সাথে শুরু হয় বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য—নবান্ন। উপস্থিত সুধী, হেমন্ত ঋতুটি হলো শান্তি ও সমৃদ্ধির ঋতু। বর্ষার উন্মাদনা আর শীতের জড়তার মাঝে হেমন্ত আসে এক শান্ত স্নিগ্ধতা নিয়ে। এই ঋতুর সবচেয়ে বড় অলঙ্কার হলো নবান্ন। ‘নবান্ন’ শব্দের অর্থ ‘নতুন অন্ন’। প্রাচীনকাল থেকেই বাঙালি কৃষক যখন মাঠের আমন ধান কেটে প্রথম ঘরে তোলে, তখন সেই চাল দিয়ে তৈরি করা হয় প্রথম আহার। বাড়ির আঙিনায় ঢেঁকির শব্দে মুখর হয়ে ওঠে পাড়া-মহল্লা। ঘরে ঘরে নতুন চালের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি হয় হরেক রকমের পিঠা, পায়েস, ক্ষীর আর মুড়ি-মুড়কি। নবান্ন কেবল একটি ভোজন উৎসব নয়; এটি আমাদের যূথবদ্ধ জীবনের প্রতীক। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে গ্রামে গ্রামে মেলা বসে, নাগরদোলা ঘোরে, জারি-সারি ও বাউল গানের আসর বসে। উঠোনে আলপনা আঁকা হয়, আর নতুন ধানের সুবাসে আত্মীয়-স্বজনের আগমনে মুখর হয়ে ওঠে প্রতিটি গৃহকোণ। রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের ভাষায়: “আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে— এই বাংলায় / হয়তো মানুষ নয়— হয়তো বা শঙ্খচিল শালিখের বেশে; / হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে।” প্রিয় সুধী, আজকের এই যান্ত্রিক ও নাগরিক জীবনে আমরা যখন নিজেদের শেকড় হারিয়ে ফেলছি, তখন এই উৎসবগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা কে। আমাদের সংস্কৃতিই আমাদের মেরুদণ্ড। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর প্রায়শই একটি অত্যন্ত গভীর কথা বলেন— “প্রতিজন মানুষের নৃতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় এমন এক ধরণের পরিচয় যা বদলানো যায় না। একজন মানুষ তার নিজের সেই সংস্কৃতি যখন চর্চা করে এবং তা উন্নত করতে কাজ করে, তখন সেই সংস্কৃতি তাকে পরিপূর্ণ এবং ‘ওয়েল ফর্মড’ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করে। আপনি নিজের সংস্কৃতির সাথে যুক্ত থাকলে বিশ্বের অন্য জাতিগোষ্ঠীর কাছে সম্মানিত হবেন। কিন্তু নিজের সংস্কৃতি বাদ দিয়ে অন্য সংস্কৃতির চর্চা করলে তা কখনোই আপনাকে পূর্ণ মানুষ হতে দেবে না। তাই আমরা বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতিগুলোর চর্চা ও প্রতিনিয়ত উন্নয়ন করতে কাজ করতে চাই।” সেই দর্শনে দীক্ষিত হয়েই আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে আমাদের কৃষ্টিকে নতুনভাবে চিনে নিতে চাই। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের এই নবান্ন, আমাদের এই পিঠা-পুলির উৎসব—এসবই আমাদের জাতিগত অস্তিত্ব। আমরা যখন বিশ্বনাগরিক হওয়ার স্বপ্ন দেখি, তখন আমাদের এই অনন্য বাঙালি সংস্কৃতিই হবে বিশ্বের দরবারে আমাদের শ্রেষ্ঠ পরিচয়। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই নবান্ন ও হেমন্ত উৎসবে আমাদের কৃষিজীবী মানুষের সমৃদ্ধি কামনা করি এবং সমৃদ্ধ আগামীর প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন আধুনিকতার মোহে আমাদের শেকড় আর আমাদের ঐতিহ্যের এই সোনার বাংলাকে কখনো ভুলে না যাই। হেমন্তের এই শান্ত শ্রী আর নবান্নের এই অকৃত্রিম আনন্দ প্রতিটি মানুষের মনে স্থায়ী হয়ে থাকুক। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা