প্রকৃতির এক বিধ্বংসী রূপ হলো বজ্রপাত। বজ্রপাত বর্তমানে বাংলাদেশে অন্যতম একটি বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন এবং জনসচেতনতার অভাব এর অন্যতম কারণ। প্রতি বছর বাংলাদেশে শত শত মানুষ বজ্রপাতে প্রাণ হারান, যাদের মধ্যে বড় একটি অংশ কৃষক ও খোলা মাঠে কাজ করা শ্রমিক।
সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিলে এই মৃত্যুঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। বজ্রপাত থেকে বাঁচতে হলে আমাদের এর বৈজ্ঞানিক আচরণ বুঝতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। আমরা আমাদের শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের সুরক্ষার জন্য এই বিষয়ে একটি বিশেষ নির্দেশনা প্রস্তত করেছি।
বজ্রপাত থেকে বাঁচবেন যেভাবে

১. মেঘের ডাক শুনলে যা করবেন (প্রাথমিক সতর্কতা)
বজ্রপাত শুরু হওয়ার আগে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হওয়া এবং গুড় গুড় শব্দ হওয়া একটি বড় সংকেত।
- ৩০-৩০ নিয়ম অনুসরণ করুন: আকাশ মেঘলা থাকলে এবং মেঘের ডাক শোনার পর যদি ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে বিজলি চমকাতে দেখেন, তবে বুঝবেন আপনি ঝুঁকির মধ্যে আছেন। দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যান। আবার শেষবার মেঘ ডাকার পর অন্তত ৩০ মিনিট ঘরের বাইরে বের হবেন না।
- খোলা মাঠ পরিহার করুন: আপনি যদি খোলা মাঠে থাকেন, তবে দ্রুত সেখান থেকে সরে যান। বড় গাছ বা বৈদ্যুতিক খুঁটির নিচে কক্ষনো আশ্রয় নেবেন না।
২. বাড়ির ভেতরে থাকাকালীন সতর্কতা
বাড়ির ভেতর থাকলেই আপনি পুরোপুরি নিরাপদ—এমনটি ভাবা ভুল। বজ্রপাতের সময় বাড়ির ভেতরেও কিছু নিয়ম মানতে হয়:
- বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করুন: বজ্রপাতের সময় ফ্রিজ, টিভি, কম্পিউটার বা এসি-র মতো দামি ইলেকট্রনিক ডিভাইসের প্লাগ খুলে রাখুন।
- ধাতব বস্তু স্পর্শ করবেন না: জানালার গ্রিল, পানির কল, ধাতব পাইপ বা সিঁড়ির রেলিং স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকুন। বজ্রপাত বাড়ির ওপর পড়লে বিদ্যুৎ এই ধাতব পথ দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে।
- পানির ব্যবহার এড়িয়ে চলুন: বজ্রপাতের সময় গোসল করা, হাত-মুখ ধোয়া বা বাসন মাজা এড়িয়ে চলুন। পানির পাইপলাইনের মাধ্যমেও বিদ্যুৎ পরিবাহিত হতে পারে।
- ল্যান্ডফোন ব্যবহার করবেন না: কর্ডলেস বা মোবাইল ফোন ব্যবহারে ঝুঁকি কম থাকলেও ল্যান্ডফোন বা তারযুক্ত ফোন ব্যবহার করবেন না।
৩. খোলা মাঠে বা বাইরে থাকাকালীন যা করবেন
যদি এমন জায়গায় থাকেন যেখানে আশেপাশে কোনো পাকা দালান নেই, তবে নিচের নিয়মগুলো আপনার জীবন বাঁচাতে পারে:
- নিচু হয়ে বসুন (Lightning Crouch): যদি আশেপাশে কোনো আশ্রয় না থাকে, তবে খোলা মাঠে মাটির ওপর শুয়ে পড়বেন না। বরং দুই পা একসাথে করে গোড়ালি উঁচু করে পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে নিচু হয়ে বসুন এবং কান দুই হাত দিয়ে চেপে ধরুন। এতে শরীরের আয়তন কম থাকবে এবং বিদ্যুৎ সরাসরি মাটিতে চলে যাওয়ার পথ পাবে।
- উঁচু গাছ থেকে দূরে থাকুন: বড় এবং একাকী গাছ বজ্রপাতকে বেশি আকর্ষণ করে। তাই গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া আত্মঘাতী হতে পারে।
- জলাশয় থেকে দূরে থাকুন: আপনি যদি নৌকা বা পানিতে থাকেন, তবে দ্রুত তীরে ফিরে আসুন। পানি বিদ্যুতের সুপরিবাহী।
- গ্রুপে থাকলে আলাদা হয়ে যান: আপনারা যদি একসাথে অনেকজন থাকেন, তবে অন্তত ৫০-১০০ ফুট দূরে দূরে সরে যান। এতে একজনের ওপর বজ্রপাত হলে অন্যরা নিরাপদ থাকতে পারবে বা সাহায্য করতে পারবে।
৪. গাড়িতে থাকাকালীন সুরক্ষা
বজ্রপাতের সময় আপনি যদি গাড়িতে থাকেন, তবে গাড়ির ভেতরেই থাকা নিরাপদ। তবে কিছু শর্ত আছে:
- গাড়ির জানালা পুরোপুরি বন্ধ রাখুন।
- গাড়ির কোনো ধাতব অংশ বা বডি স্পর্শ করবেন না।
- বজ্রপাত চলাকালীন গাড়ি কোনো বড় গাছের নিচে বা উঁচু বৈদ্যুতিক খুঁটির পাশে পার্ক করবেন না।
৫. দালান বা ভবন নির্মাণে সতর্কতা
বজ্রপাত থেকে স্থায়ী সুরক্ষার জন্য প্রতিটি দালানে ‘লাইটেনিং অ্যারেস্টার’ বা বজ্র নিরোধক দণ্ড স্থাপন করা বাধ্যতামূলক করা উচিত। এটি বজ্রপাতের বিদ্যুৎকে সরাসরি মাটিতে (Earthing) নিয়ে যায়, ফলে ভবনের ভেতরে থাকা মানুষ ও আসবাবপত্র নিরাপদ থাকে।
আধুনিক ভবন নির্মাণের সময় যেমন ‘লাইটেনিং অ্যারেস্টার’ বা বজ্র নিরোধক দণ্ড স্থাপন করা জরুরি, তেমনি প্রাকৃতিকভাবে বাঁচার জন্য বাড়ির চারপাশে তাল, নারিকেল ও সুপারি গাছ লাগানো প্রয়োজন। এই উঁচু গাছগুলো বজ্রপাতকে নিজের শরীরে ধারণ করে বিদ্যুৎ মাটিতে পৌঁছে দেয়, ফলে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি অনেকটা কমে আসে। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি তাল গাছ রোপণ করা মানে একটি জীবন রক্ষাকারী ঢাল তৈরি করা।
বজ্রপাত নিরোধক গাছ: তাল, নারকেল, সুপারি বা খেজুরের মতো উঁচু গাছগুলো প্রকৃতির নিজস্ব ‘লাইটেনিং অ্যারেস্টার’ হিসেবে কাজ করে। এই গাছগুলো উঁচু হওয়ায় এবং প্রচুর পরিমাণে কার্বন ও পানি থাকায় বজ্রপাতকে নিজের দিকে টেনে নেয় এবং বিদ্যুৎ সরাসরি মাটিতে পৌঁছে দেয়। ফলে আশেপাশে থাকা বাড়িঘর ও মানুষ বড় ধরণের বিপদ থেকে রক্ষা পায়। একে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী সুরক্ষা পদ্ধতিও বলা হয়।
বাড়ির চারপাশে বনায়ন: বাড়ির আশেপাশে একটু দূরত্ব বজায় রেখে বড় গাছ লাগানো হলে তা একটি ঢাল হিসেবে কাজ করে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, গাছ যেন শোবার ঘরের একেবারে গা ঘেঁষে না থাকে, কারণ বজ্রপাতে গাছ ভেঙে পড়ার ঝুঁকিও থাকে।
পরিবেশগত ভারসাম্য: তাল গাছ বজ্রপাত থেকে নিজে মরে গিয়ে মানুষকে বাঁচায়। তাই আধুনিক পদ্ধতিতে লাইটেনিং রড বসানোর পাশাপাশি বেশি করে তাল ও নারিকেল গাছ রোপণ করা আমাদের জাতীয় কর্তব্য হওয়া উচিত।
৬. কেউ বজ্রাহত হলে কী করবেন?
বজ্রাহত ব্যক্তিকে স্পর্শ করলে আপনার শক লাগবে না, কারণ বজ্রপাতের বিদ্যুৎ সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে মাটিতে চলে যায়।
- দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স ডাকুন বা হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করুন।
- ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃদস্পন্দন পরীক্ষা করুন। প্রয়োজনে সিপিআর (CPR) প্রদান করুন।
- শরীরের কোনো অংশ পুড়ে গেলে সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন।
বজ্রপাত একটি অনিয়ন্ত্রিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ, তবে সচেতনতাই এর থেকে বাঁচার একমাত্র ঢাল। মেঘের গর্জন শুনলে অবহেলা না করে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়া এবং অন্যদেরও সতর্ক করা আমাদের নাগরিক দায়িত্ব।
নিজে সচেতন থাকুন, পরিবারকে সুরক্ষিত রাখুন।