গুরুকুল ক্যাম্পাস লার্নিং নেটওয়ার্ক, GCLN

কর্মক্ষেত্রে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—শুনতে এটি কেবল একটা সাধারণ ডিউটি মনে হলেও, দিনশেষে এটি অত্যন্ত মহৎ এবং একই সাথে বিশাল দায়িত্বের একটা পেশা। আমাদের দেশে একটা সময় ছিল যখন ‘সেফটি’ মানে মনে করা হতো দেয়ালে একটা ফায়ার এক্সটিঙ্গুইশার ঝুলিয়ে রাখা। কিন্তু সময় বদলেছে, বিশেষ করে রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর আমাদের দেশের শিল্পকারখানার পুরো চিন্তাভাবনা আমূল বদলে গেছে। এখন বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে HSE (Health, Safety, and Environment) প্রফেশনালদের চাহিদা আকাশচুম্বী। আর এই পেশায় নিজেকে আন্তর্জাতিক মানের একজন ‘টপ-ক্লাস’ অফিসার হিসেবে প্রমাণ করার সবচেয়ে ধারালো হাতিয়ার হলো একটি NEBOSH IGC সার্টিফিকেট।

সাধারণ একজন সেফটি অফিসার আর একজন নিবোশ সার্টিফাইড অফিসারের মধ্যে তফাতটা আকাশ-পাতাল। নিবোশ আপনাকে শুধু আইনের বই মুখস্থ করায় না, এটি আপনাকে শেখায় কীভাবে একদম বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে একটা জ্বলজ্যান্ত কারখানার ঝুঁকিগুলো চোখের পলকে স্ক্যান করে দুর্ঘটনা থামিয়ে দিতে হয়। চলুন, এই ক্যারিয়ারের একদম বাস্তবসম্মত খুঁটিনাটি নিয়ে আড্ডা দেওয়া যাক।

নিবোশ NEBOSH সেফটি অফিসার ক্যারিয়ার গাইড 2 নিবোশ (NEBOSH) সেফটি অফিসার ক্যারিয়ার গাইড

নিবোশের গোলকধাঁধা: আপনার জন্য ঠিক কোন লেভেলটি দরকার?

একটা বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার করে নেওয়া ভালো—নিবোশ কিন্তু কোনো একটা একক বা নির্দিষ্ট কোর্স না। আমাদের দেশের পড়াশোনায় যেমন প্রাইমারি, হাই স্কুল, কলেজ আর ইউনিভার্সিটির ডিগ্রি থাকে, ঠিক তেমনি যুক্তরাজ্যের এই নিবোশ বোর্ডেরও যোগ্যতার ওপর ভিত্তি করে আলাদা আলাদা ধাপ বা লেভেল আছে। অনেকেই না বুঝে হুট করে ভুল লেভেলে ভর্তি হয়ে টাকা আর সময় দুটোই নষ্ট করেন।

প্রথম ধাপটি হলো অ্যাওয়ার্ড লেভেল (Award Level), যার অধীনে NEBOSH HSA বা HSW কোর্সটি করানো হয়। এটাকে আপনি বলতে পারেন সেফটি জগতের হাতেখড়ি বা প্রাইমারি স্কুল। মাত্র ৩ থেকে ৪ দিনের এই ছোটখাটো কোর্সের সিলেবাস বেশ হালকা এবং পাস করাও সহজ। যারা সরাসরি সেফটি অফিসার হতে চান না, কিন্তু কাজের জায়গায় টুকটাক নিরাপত্তা নিয়ে ধারণা রাখতে চান যেমন এইচআর টিম বা ফ্যাক্টরি ফোরম্যান, তাদের জন্য এটি উপযুক্ত। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে বড় বেতনের প্রফেশনাল জবের জন্য শুধু এই লেভেল দিয়ে কাজ হবে না।

ক্যারিয়ারের আসল সুপারস্টার হলো এর পরের ধাপটি, যাকে বলা হয় সার্টিফিকেট লেভেল (Certificate Level)। এর মূল আকর্ষণ হলো বিশ্বখ্যাত NEBOSH IGC (International General Certificate)। বিশ্বজুড়ে কোম্পানিগুলো যখন “নিবোশ সার্টিফাইড লোক চাই” বলে বিজ্ঞাপন দেয়, তারা মূলত এই লেভেলটাই খোঁজে। এটি ইউকে স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী লেভেল-৩ কোয়ালিফিকেশন, যা আমাদের দেশের ডিপ্লোমা বা ইন্টারমিডিয়েটের সমতুল্য। আন্তর্জাতিক বাজারে পা রাখার এবং প্রফেশনাল ভিসা পাওয়ার আসল চাবিকাঠি হলো এই সার্টিফিকেট লেভেল।

এর ওপরে রয়েছে ডিপ্লোমা লেভেল (Diploma Level) বা NEBOSH International Diploma (IDip)। এটি সেফটি জগতের এক বিশাল ও ভারী ডিগ্রি, যা ইউকে স্ট্যান্ডার্ডে অনার্স ডিগ্রির সমতুল্য। যারা অলরেডি আইজিসি শেষ করে ফিল্ডে ৩ থেকে ৫ বছর বাস্তব লড়াই করে ফেলেছেন এবং এখন কোম্পানির ‘এইচএসই ম্যানেজার’ বা ‘হেড অফ সেফটি’ হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন, তাদের জন্য এই মহাযজ্ঞ। এই কোর্স শেষ করতে জানপ্রাণ দিয়ে অন্তত ১ থেকে ২ বছর পড়াশোনা করতে হয়। তবে এটি পকেটে থাকলে পৃথিবীর যেকোনো বড় মাল্টিন্যাショナル কোম্পানি আপনাকে রেডিমেড স্যালারি দিয়ে লুফে নেবে।

সর্বোচ্চ শিখর হলো মাস্টার্স লেভেল (Masters Degree), যা নিবোশ সরাসরি যুক্তরাজ্যের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে পার্টনারশিপের মাধ্যমে দিয়ে থাকে। এখানে পড়াশোনা মানে মূলত থিসিস পেপার জমা দেওয়া, প্রজেক্ট ডিজাইন করা এবং স্ট্র্যাটেজিক লিডারশিপ শেখা। এটি এই পেশার সর্বোচ্চ স্তর, যা আপনাকে এই খাতের একজন শীর্ষস্থানীয় নীতি-নির্ধারক বানিয়ে দেবে।

এখানে একজন সিনিয়রের মতো খাঁটি এক পিস পরামর্শ হলো—আপনি যদি এই ফিল্ডে নতুন বা মাঝারি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হন, তবে ভুলেও শুরুতেই ডিপ্লোমা বা মাস্টার্সের মতো বড় হাতি মারতে যাবেন না। আপনার প্রথম এবং একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত NEBOSH IGC। এটা দিয়ে ক্যারিয়ারের খাতা খুলুন, মাঠের তপ্ত রোদে ২-৩ বছর কাজ করে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করুন, পকেট ভারী করুন; তারপর নিজেকে আরও উঁচুতে নিয়ে যাওয়ার জন্য ডিপ্লোমার দিকে পা বাড়াবেন।

বাজার কেমন আর ফিল্ডে আপনার দাম কত?

খুব সোজাসাপ্টা কথা—আপনার যদি একটা নিবোশ আইজিসি সার্টিফিকেট থাকে, তবে দেশ-বিদেশে আপনার জন্য অসংখ্য বড় বড় দরজার তালা একবারে খুলে যাবে। প্রথমেই আসা যাক আমাদের তৈরি পোশাক বা আরএমজি খাতের কথায়। আন্তর্জাতিক বায়ারদের কড়া নির্দেশ থাকে যে ফ্যাক্টরিতে কমপ্লায়েন্স এবং আন্তর্জাতিক মানের সেফটি অফিসার থাকতেই হবে, তাই নামী-দামী সব গার্মেন্টস এখন নিবোশ হোল্ডারদের লুফে নিচ্ছে।

পোশাক খাতের বাইরে তাকালে দেখবেন আমাদের চারপাশেই এখন মেগা প্রজেক্ট ও কনস্ট্রাকশনের মহোৎসব চলছে। মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর বা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো বিশাল সব মেগা প্রজেক্টে যারা কাজ করছে (যেমন জাপানি, চাইনিজ বা কোরিয়ান কোম্পানি), তারা নিবোশ সার্টিফিকেট ছাড়া সেফটি অফিসার হিসেবে ইন্টারভিউ দেওয়ার সুযোগই দিতে চায় না।

একই কথা প্রযোজ্য শেভরন, বাপেক্স বা সামিট পাওয়ারের মতো হেভি-ইন্ডাস্ট্রির তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতের জন্য। এখানে ঝুঁকির মাত্রা সবচেয়ে বেশি, সামান্য ভুল মানেই কোটি টাকার ক্ষতি আর জীবনহানি। তাই এখানে প্রসেস সেফটি সামলানোর জন্য নিবোশ করা অফিসারদের রাজকীয় বেতনে নিয়োগ দেওয়া হয়।

এছাড়া ইউনিলিভার, নেসলে বা ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর মতো গলোবাল জায়ান্টরা তাদের ফ্যাক্টরি আর সাপ্লাই চেইনের নিরাপত্তার জন্য সবসময় নিবোশ ধারীদের ফার্স্ট প্রায়োরিটি দেয়। আর আপনি যদি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে দুবাই, কাতার, সৌদি আরব বা ওমানের কনস্ট্রাকশন এবং অয়েল অ্যান্ড গ্যাস সেক্টরে পা রাখতে চান, তবে নিবোশ হলো আপনার এন্ট্রি টিকিট।

অফিসের এসি রুম বনাম মাঠের বাস্তব লড়াই

যদি ভেবে থাকেন এই চাকরিটা সুট-টাই পরে এসি রুমে বসে কফি খাওয়ার চাকরি, তবে ভাই আপনি ভুল ভাবছেন! একজন সেফটি অফিসারের আসল জগত হলো তপ্ত ফিল্ডে, শ্রমিকদের মাঝে। প্রতিদিন সকালে সাইটে গিয়ে তার প্রথম কাজ হয় ঝুঁকি খুঁজে বের করা, যাকে আমরা টেকনিক্যাল ভাষায় বলি রিস্ক অ্যাসেমনেন্ট। কাজের জায়গায় কোথায় একটা আলগা তার পড়ে আছে, কোন মাচাটা দুর্বল, বা কোন কেমিক্যালের ড্রামটা লিক করতে পারে—তা সাধারণ মানুষের চোখে না পড়লেও একজন সেফটি অফিসারের বাজপাখির মতো চোখে পড়তে হবে এবং তার তাত্ক্ষণিক সমাধান বের করতে হবে।

তাকে নিয়মিত সাইট ঘুরে দেখতে হয় শ্রমিকরা ঠিকমতো হেলমেট, গ্লাভস বা সেফটি বেল্ট (PPE) পরেছেন কি না এবং বড় বড় মেশিনগুলো নিরাপদে চলছে কি না। পাশাপাশি সাধারণ শ্রমিকদের খুব সহজ ভাষায় ফায়ার সেফটি, ফার্স্ট এইড এবং কোনো জরুরি অবস্থা তৈরি হলে কীভাবে শান্ত থেকে জীবন বাঁচাতে হবে, তা নিয়মিত ট্রেইন আপ করতে হয়। আর যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটেই যায়, তখন সেফটি অফিসারের কাজ কিন্তু শুধু “কার দোষ” তা খুঁজে বের করা নয়। তার কাজ হলো দুর্ঘটনার আসল কারণ বা রুট কজ (Root Cause) খুঁজে বের করা, যাতে ভবিষ্যতে ওই একই দুর্ঘটনা আর কোনোদিন না ঘটে।

নিবোশ সার্টিফিকেশন আপনার ক্যারিয়ারের শুরুতে একটি শক্তিশালী বুস্ট দেয়। কাজের অভিজ্ঞতা বাড়ার সাথে সাথে পদবি এবং বেতন—দুটোই বেশ আকর্ষণীয় হারে বাড়ে। নিচে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটা আনুমানিক বেতনের আইডিয়া দেওয়া হলো:

ক্যারিয়ারের স্তরসম্ভাব্য পদবিআনুমানিক মাসিক বেতন (বাংলাদেশ)
এন্ট্রি লেভেল (০-২ বছর)সেফটি অফিসার / এইচএসই এক্সিকিউティブ২৫,০০০ – ৪০,০০০ টাকা
মিড লেভেল (৩-৫ বছর)সিনিয়র সেফটি অফিসার / এইচএসই কো-অর্ডিনেটর৫০,০০০ – ৮০,০০০ টাকা
সিনিয়র লেভেল (৫-১০ বছর+)এইচএসই ম্যানেজার / সেফটি হেড১,০০,০০০ – ২,০০,০০০+ টাকা

আপনি যদি মধ্যপ্রাচ্যের ভালো কোনো প্রজেক্টে ঢুকে যেতে পারেন, তবে এই বেতনের স্কেল অভিজ্ঞতাভেদে বাংলাদেশি টাকায় ১.৫ লাখ থেকে শুরু করে ৫ লাখ টাকা বা তারও বেশি হতে পারে!

তবে এই পেশার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানুষের ‘মানসিকতা’ পরিবর্তন করা। ভরদুপুরে প্রচণ্ড গরমে একজন শ্রমিককে হেলমেট বা সেফটি হারনেস পরিয়ে রাখা যে কত কঠিন, তা কেবল একজন মাঠপর্যায়ের অফিসারই জানেন। আবার অনেক সময় ফ্যাক্টরির মালিকপক্ষও সেফটি ইকুইপমেন্টের খরচকে “অপচয়” মনে করেন। এই দুই পক্ষের মাঝখানে পড়ে আপনাকে মাথা ঠাণ্ডা রেখে সেফটি কালচার তৈরি করতে হবে।

কিন্তু দিনশেষে এই পেশার মানসিক তৃপ্তিটা অতুলনীয়। আপনার একটা সঠিক সিদ্ধান্তের কারণে যখন কোনো গরিব শ্রমিকের জীবন বেঁচে যায় এবং সে দিনশেষে সুস্থ শরীরে তার পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পারে, সেই আনন্দের সামনে লাখ টাকার বেতনও তুচ্ছ মনে হবে। আপনি আক্ষরিক অর্থেই মানুষের জীবন বাঁচানোর এক উছিলা হিসেবে কাজ করছেন।

নিবোশ আইজিসি পরীক্ষা: ওপেন বুক এক্সামের গোলকধাঁধা

২০২০ সালের পর থেকে নিবোশ তাদের পুরনো যুগের মুখস্থ করার পরীক্ষা পদ্ধতি পুরোপুরি বাদ দিয়ে ঘরে বসে ওপেন বুক এক্সাম (OBE) নেওয়ার নিয়ম চালু করেছে। তবে সাবধান! “ওপেন বুক” শুনেই ভাববেন না যে বই দেখে দেখে হুবহু উত্তর লিখে দিলেই পাস। এই ফাঁদে পা দিয়ে প্রতি বছর হাজার হাজার স্টুডেন্ট ফেল করে। এটি সম্পূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক এবং প্র্যাক্টিক্যাল পরীক্ষা।

পরীক্ষার দিন ইউকে টাইম অনুযায়ী সকাল ৯টায় নিবোশের পোর্টালে প্রশ্ন চলে আসে। পরবর্তী ঠিক ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আপনাকে উত্তর লিখে পোর্টালে সাবমিট করতে হবে। সময় শেষ তো খেলা শেষ! প্রশ্নে আপনাকে একটা বিশাল কাল্পনিক কর্মক্ষেত্রের বাস্তবসম্মত গল্প শোনানো হবে। সেখানে কী কী কাজ হয়, ম্যানেজার কী ভুল করেছেন, শ্রমিকরা কেন নিয়ম মানছে না—তার একটা নিখুঁত বিবরণ থাকবে। আপনাকে সেই গল্পটা পড়ে, একজন সেফটি কনসালট্যান্ট হিসেবে প্রতিটি সমস্যার সমাধান দিতে হবে। পরীক্ষায় জীবনেও ডিরেক্ট প্রশ্ন আসবে না যে, “ফায়ার সেফটির ৫টি নিয়ম লেখো।” প্রশ্ন আসবে এমন—”গল্পে বর্ণিত কারখানায় যে আগুন লেগেছিল, সেখানে ম্যানেজারের কোন কোন গাফিলতি দায়ী ছিল এবং নিবোশের গাইডলাইন অনুযায়ী তার কী করা উচিত ছিল?”

পুরো উত্তরপত্রটি সাধারণত ৩,০০০ শব্দের মধ্যে শেষ করতে হয়, তাই বানিয়ে বানিয়ে পৃষ্ঠা ভরানোর কোনো সুযোগ নেই। আর সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো প্লেজারিজম বা চুরির কঠিন শাস্তি। আপনি গুগল, চ্যাটজিপিটি, কোনো বই বা এআই টুল থেকে একটা লাইনও হুবহু কপি-পেস্ট করতে পারবেন না। নিবোশের অ্যান্টি-প্লেজারিজম সফটওয়্যার অসম্ভব শক্তিশালী। কপি ধরা পড়লে পরীক্ষা তো বাতিল হবেই, সাথে ৫ বছরের জন্য নিবোশে আপনার নাম ব্ল্যাকলিস্টেড হয়ে যাবে। উত্তর লিখতে হবে সম্পূর্ণ নিজের ভাষায়, নিজের মাথা খাটিয়ে।

পরীক্ষা দেওয়ার ১-২ সপ্তাহের মধ্যে আপনার লার্নিং পার্টনার আপনার সাথে একটা ছোট ভিডিও কলে বসবে, যাকে বলা হয় ক্লোজিং ইন্টারভিউ। এটা নিয়ে ভয় পাওয়ার কিচ্ছু নেই, এখানে কোনো মার্কস দেওয়া হয় না। পরীক্ষক শুধু আপনার আইডি কার্ড চেক করবেন এবং আপনার লেখা খাতা থেকে ২-৩টি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করবেন। তারা শুধু নিশ্চিত হতে চান যে পরীক্ষাটা আপনি নিজেই দিয়েছেন, আপনার হয়ে অন্য কোনো মামা-চাচা পরীক্ষা লিখে দেয়নি!

এই পরীক্ষায় একবারে পাস করার জন্য কিছু ইনসাইডার স্ট্র্যাটেজি মাথায় রাখতে হবে। প্রথমত, মুখস্থ বিদ্যাকে চিরতরে বিদায় জানান। নিবোশে পাসের মূল চাবিকাঠি হলো কনসেপ্ট ক্লিয়ার রাখা। আইএলও (ILO) কনভেনশন বা সেফটি কালচার আসলে কী, তা বাস্তব জীবনের সাথে মিলিয়ে ফিল করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আপনার উত্তর যতই চমৎকার হোক, তা যদি প্রশ্নের ভেতরের ওই ‘গল্পের’ সাথে মেলানো না থাকে, তবে নিবোশ আপনাকে সোজা শূন্য দেবে। উত্তরের প্রতিটি লাইনে প্রমাণ করতে হবে যে আপনি ওই নির্দিষ্ট ফ্যাক্টরির সমস্যা নিয়েই কথা বলছেন। মেইন এক্সামে বসার আগে অন্তত ২-৩টি পুরনো প্রশ্ন নিয়ে ২৪ ঘণ্টার একটা ট্রায়াল পরীক্ষা নিজে নিজে ঘরে দেওয়া উচিত। আর পরীক্ষার দিন প্রথম ২-৩ ঘণ্টা শুধু সিনারিওটি ৫-৬ বার মন দিয়ে পড়ুন। পরের ৮-১০ ঘণ্টা ঠাণ্ডা মাথায় ড্রাফট উত্তর তৈরি করুন এবং শেষ ২ ঘণ্টা ভালো করে রিভিশন দিয়ে সঠিক ফরম্যাটে (PDF/Word) আপলোড করুন।

নিবোশ IG2: কীভাবে বানাবেন পাস করার মতো প্রজেক্ট রিপোর্ট?

নিবোশ আইজিসি-র দ্বিতীয় অংশটি হলো IG2 (Risk Assessment Project)। এটি কোনো লিখিত পরীক্ষা নয়, বরং একটা ফুল প্র্যাক্টিক্যাল প্রজেক্ট। আপনাকে আপনার নিজের চেনা-জানা কোনো বাস্তব কর্মক্ষেত্রে (যেমন কোনো গার্মেন্টস, কনস্ট্রাকশন সাইট বা এমনকি বড় কোনো কর্পোরেট অফিস) গিয়ে একটি নিখুঁত ঝুঁকি মূল্যায়ন রিপোর্ট তৈরি করতে হবে। এখানে মনে রাখার মতো বিষয় হলো, এই প্রজেক্টে কোনো ফার্স্ট ক্লাস বা সেকেন্ড ক্লাস নেই। রেজাল্ট হয় শুধু ‘Pass’ অথবা ‘Refer’ (মানে ফেল)। নিবোশের গাইডের একটা ছোট পয়েন্টও যদি বাদ যায়, তবে পুরো প্রজেক্টে ফেল চলে আসবে।

নিবোশের দেওয়া অফিশিয়াল ফরম্যাট অনুযায়ী আপনার রিপোর্টটিকে সুন্দর করে ৪টি অংশে ভাগ করতে হবে। প্রথম অংশে থাকবে আপনার প্রতিষ্ঠানের আসল চেহারা এবং পদ্ধতি। অর্থাৎ ফ্যাক্টরিটার নাম কী, তারা কী বানায়, কতজন মানুষ সেখানে শিফটে কাজ করে এবং আপনি এই সার্ভেটা কীভাবে করলেন—কার কার ইন্টারভিউ নিলেন, কোন কোন গাইড বইয়ের সাহায্য নিলেন এবং কীভাবে পুরো এলাকাটা পরিদর্শন করলেন।

দ্বিতীয় অংশটি হলো রিপোর্টের হৃৎপিণ্ড, যাকে বলে রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট টেবিল। এখানে নিবোশের কঠোর নিয়ম হলো, আপনাকে সিলেবাস থেকে অন্তত ৫টি আলাদা হ্যাজার্ড ক্যাটাগরি বেছে নিয়ে মোট ১০টি সুনির্দিষ্ট ঝুঁকি খুঁজে বের করতে হবে। ধরুন আপনি ফায়ার সেফটি থেকে ২টি নিলেন, ইলেকট্রিসিটি থেকে ২টি, উঁচু স্থানে কাজ থেকে ২টি—এভাবে বৈচিত্র্য রাখতে হবে। ছকের কলামগুলোতে দেখাতে হবে বিপদটা কী, এর কারণে কার পা ভাঙতে পারে বা কে মারা যেতে পারে, বর্তমানে সেখানে কী সেফটি আছে এবং ঝুঁকি শূন্যে নামাতে আপনার পরামর্শ অনুযায়ী আর কী কী অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার ও তা কতদিনের মধ্যে করতে হবে।

তৃতীয় অংশে আপনাকে পার্ট ২-এর ১০টি ঝুঁকির মধ্যে থেকে সবচেয়ে মারাত্মক ৩টি ঝুঁকি বেছে নিয়ে কোম্পানির ম্যানেজমেন্টের সামনে জোরালো যুক্তি দিতে হবে যে কেন এই ৩টি জায়গায় অবিলম্বে টাকা খরচ করা দরকার। যুক্তিগুলোকে নৈতিক, আইনি এবং আর্থিক—এই তিন ধারায় সাজাতে হবে। নৈতিকভাবে দেখাতে হবে যে কোনো মানুষের পঙ্গু হয়ে বাড়ি ফেরা আমরা সমর্থন করতে পারি না। আইনিভাবে দেখাতে হবে যে নিয়ম না মানলে ফ্যাক্টরি সিলগালা বা মালিকের জেল হতে পারে। আর মানসিকভাবে দেখাতে হবে যে এখন সামান্য টাকা না বাঁচালে পরে দুর্ঘটনার কারণে লাখ লাখ টাকা জরিমানা ও কোম্পানির ইজ্জত ধুলোয় মিশে যাবে।

চতুর্থ বা শেষ অংশে আপনাকে একটা নির্দিষ্ট ফিউচার রিভিউ ডেট দিতে হবে যে আজ থেকে ৬ মাস বা ১ বছর পর এই রিস্ক অ্যাসেসমেন্টটি আবার চেক করা হবে, এবং আপনি এই রিপোর্টের কপি কোম্পানির বড় সাহেবদের কীভাবে এবং কোন মিটিংয়ে দেখাবেন, তা স্পষ্ট করে লিখতে হবে।

এই প্রজেক্ট একবারে পাস করার গোপন ট্রিকস হলো ইন্টারনেটের স্যাম্পল কপি ছুঁয়েও না দেখা। মিল পেলেই তারা খাতা ক্যানসেল করে দেবে। অতিরিক্ত কাজের পাশে সব জায়গায় “১ দিন” বা “তাত্ক্ষণিক বাস্তবায়ন” লিখবেন না, বাস্তবসম্মতভাবে কোনটা ১ সপ্তাহ বা কোনটা ১ মাস—এমন সময় দিন। আর গুণ গুনে ১০টি ঝুঁকি এবং নিখুঁতভাবে ৫টি আলাদা হ্যাজার্ড ক্যাটাগরি মেইনটেইন করুন, হিসাব একটু এদিক-ওদিক হলেই কিন্তু সোজা ফেল।

গ্লোবাল মার্কেট এবং ভিসার ‘ভিআইপি’ ট্রিটমেন্ট

অনেকেরই আসল স্বপ্ন থাকে নিবোশ করে বিদেশে সেটেল হওয়া। বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে যারা মিডিল ইস্ট বা অন্য দেশে যেতে চান, তাদের জন্য নিবোশ কীভাবে ভাগ্যবদলের চাবিকাঠি হতে পারে, তা জানা দরকার। আজকের দিনে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে সেফটি আইন লঙ্ঘন করা একটা মস্ত বড় অপরাধ, তাই সেখানে সেফটি অফিসারদের কদর অন্যরকম।

বর্তমানে সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’ মেগা প্রজেক্টগুলোর কাজ পুরোদমে চলছে। NEOM (দ্য লাইন সিটি), রেড সি মেগা প্রজেক্টের মতো ট্রিলিয়ন ডলারের প্রকল্পে প্রতিদিন হাজার হাজার সেফটি অফিসারের শূন্যপদ তৈরি হচ্ছে এবং নিবোশ হোল্ডারদের জন্য তারা লাল গালিচা বিছিয়ে রেখেছে। দুবাই বা আবুধাবিতেও মিউনিসিপ্যালিটির নিয়ম খুব কড়া, যেকোনো কনস্ট্রাকশন সাইটে সার্টিফাইড সেফটি অফিসার না থাকলে প্রজেক্টের কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর কাতার, ওমান ও কুয়েতের মূল ব্যবসাই হলো তেল আর গ্যাস, যে সেক্টরের সেফটি প্রফেশনালদের বেতন এবং সুযোগ-সুবিধা যেকোনো সাধারণ জবের চেয়ে অনেক বেশি রাজকীয় হয়।

দালালের পেছনে ৫-৭ লাখ টাকা ঢেলে ‘লেবার ভিসা’ নিয়ে বিদেশ যাওয়ার দিন এখন শেষ। নিবোশ থাকলে আপনি ভিসার ক্ষেত্রে একদম ভিআইপি অগ্রাধিকার পাবেন। সাধারণ লেবার বা ক্লিনার ভিসার জন্য অ্যাম্বাসিতে কত রকমের ঝামেলা পোহাতে হয়, তা আমরা সবাই জানি। কিন্তু আপনার নিবোশ থাকলে কোম্পানি আপনার জন্য “HSE Officer” বা “Technical Professional” ক্যাটাগরির প্রফেশনাল ভিসা ইস্যু করবে। এই প্রফেশনাল ভিসা কোনো দেশ কখনো বন্ধ করে না এবং এর প্রসেসিং হয় রকেটের গতিতে।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, মধ্যপ্রাচ্যের বড় বড় কোম্পানি যখন ইন্টারভিউ নিয়ে আপনাকে পছন্দ করবে, তখন আপনার ভিসার সরকারি ফি, মেডিকেল ফি থেকে শুরু করে বিমানের টিকিট পর্যন্ত সবকিছু কোম্পানি নিজেই স্পনসর করবে। আপনি নিজের যোগ্যতায় সম্পূর্ণ ফ্রিতে বিদেশ যাওয়ার সুযোগ পাবেন। তাছাড়া নিবোশ যেহেতু একটি বিশ্বখ্যাত ব্রিটিশ কোয়ালিফিকেশন, তাই ঢাকাস্থ সৌদি বা ইউএই দূতাবাসের কর্মকর্তারা এই সার্টিফিকেট দেখলে খুব সহজেই আপনার স্কিল ও ব্যাকগ্রাউন্ডের ওপর ভরসা পান, ফলে ভিসা রিজেক্ট হওয়ার কোনো আশঙ্কাই থাকে না।

শুধুমাত্র মধ্যপ্রাচ্যই নয়, নিবোশ সার্টিফিকেট আপনাকে ইউরোপ ও অন্যান্য উন্নত দেশে যাওয়ার পথও সহজ করে দেয়। নিবোশ আইজিসি শেষ করে আপনি যদি যুক্তরাজ্যের IOSH-এর মেম্বারশিপের জন্য অ্যাপ্লাই করেন, তবে ইউরোপের দেশগুলোতে স্কিলড মাইগ্রেশন বা কাজের ভিসা পাওয়া আপনার জন্য অনেক সহজ হয়ে যাবে। আবার加拿大 বা অস্ট্রেলিয়ার পয়েন্ট-বেসড ইমিগ্রেশন সিস্টেমে আপনার সাধারণ ডিগ্রির পাশাপাশি নিবোশের মতো গ্লোবাল প্রফেশনাল সার্টিফিকেশনের জন্য এক্সট্রা বোনাস পয়েন্ট যোগ হয়, যা আপনাকে পিআর (PR) পাওয়ার দৌড়ে অনেক দূর এগিয়ে রাখবে।

বিশ্বমঞ্চে ছক্কা হাঁকানোর ৩টি গোল্ডেন টিপস

যদি সত্যিই নিবোশকে আপনার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট বানাতে চান, তবে সার্টিফিকেটের পাশাপাশি তিনটি জিনিস আজ থেকেই নিজের মধ্যে গেঁথে নিন।

প্রথমত, ইংরেজি বলার জড়তা ঝেড়ে ফেলুন। বিদেশের মাটিতে আপনার সাইটে ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানি, ব্রিটিশ বা আরবসহ সব দেশের মানুষ থাকবে, যাদের সাথে ইংরেজিতে কথা বলতে হবে এবং রিপোর্ট লিখতে হবে। তাই ইংরেজি ভালো না জানলে শুধু সার্টিফিকেট দিয়ে বেশিদূর টিকতে পারবেন না।

দ্বিতীয়ত, আপনার লিঙ্কডইন (LinkedIn) প্রোফাইল আজই আপডেট করুন। মধ্যপ্রাচ্যের বাঘা বাঘা রিক্রুটাররা এখন আর কাগজের বিজ্ঞাপন দেখে লোক নেয় না, তারা লিঙ্কডইনে সার্চ করে লোক খোঁজে। আপনার প্রোফাইলটি সুন্দর করে সাজিয়ে সেখানে “NEBOSH Certified HSE Professional” ট্যাগটি যুক্ত করুন।

আর শেষ কথা হলো, লোকাল এক্সপেরিয়েন্সের ঝুলি বড় করুন। নিবোশ শেষ করেই তাড়াহুড়ো করে বিদেশ যাওয়ার জন্য পাগল হবেন না। দেশের কোনো ভালো প্রজেক্ট বা মাল্টিন্যাショナル ফ্যাক্টরিতে অন্তত ১-২ বছর কাজ করে মাঠের বাস্তব অভিজ্ঞতা নিন। এই দেশি এক্সপেরিয়েন্স আর নিবোশ সার্টিফিকেটের যুগলবন্দীই আপনাকে বিদেশের মাটিতে রাজকীয় ক্যারিয়ার এনে দেবে।

সহজ কথায় বলতে গেলে, নিবোশ সার্টিফিকেট হলো আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে আপনার দক্ষতার একটি গ্লোবাল পাসপোর্ট। এটি আপনার visa প্রসেসিংয়ের সমস্ত দেয়াল ভেঙে, আপনাকে একজন সাধারণ কর্মী থেকে একজন অত্যন্ত সম্মানিত এবং উচ্চ আয়ের আন্তর্জাতিক মানের পেশাজীবী হিসেবে গড়ে তোলে। এবার সিদ্ধান্ত আপনার—আপনি কি সাধারণের দলেই থেকে যাবেন, নাকি নিবোশ দিয়ে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবেন?