বর্তমানে সারাবিশ্বে নার্সদের যে তীব্র সংকট চলছে, সেখানে বিএসসি এবং ডিপ্লোমা—উভয় ধরণের নার্সদেরই চাহিদা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যেমন ডিপ্লোমা নার্সদের প্রধান গন্তব্য, তেমনি ইউরোপ ও জাপানেও বর্তমানে নতুন নতুন দুয়ার খুলছে। তবে বিএসসি নার্সদের তুলনায় ডিপ্লোমা নার্সদের কিছু নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
যেসব দেশে ডিপ্লোমা নার্সদের চাহিদা সবচেয়ে বেশি
মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহ (সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, ওমান, আরব আমিরাত)
ডিপ্লোমা নার্সদের জন্য সবচেয়ে সহজ এবং জনপ্রিয় বাজার হলো মধ্যপ্রাচ্য।
- সুযোগ: সৌদি আরব বা কুয়েতের মতো দেশগুলোতে প্রচুর পরিমাণে ডিপ্লোমা নার্স নিয়োগ দেওয়া হয়। বিশেষ করে সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বড় বড় বেসরকারি ক্লিনিক ও স্পেশালাইজড সেন্টারে তাদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
- অভিজ্ঞতা: সাধারণত ডিপ্লোমা পাসের পর ২ থেকে ৩ বছরের ক্লিনিক্যাল অভিজ্ঞতা থাকলেই আবেদন করা যায়।
- বেতন: অভিজ্ঞতা ও হাসপাতালের ধরণ অনুযায়ী বাংলাদেশি টাকায় ৬০ হাজার থেকে ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
জাপান (কেয়ারগিভার ও নার্সিং সেক্টর)
জাপানে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়ায় সেখানে নার্সদের চাহিদা আকাশচুম্বী।
- সুযোগ: জাপানে সরাসরি নার্স হিসেবে কাজ করতে হলে জাপানি ভাষা শিখতে হয় এবং তাদের নিজস্ব নার্সিং লাইসেন্স পরীক্ষা দিতে হয়। তবে ডিপ্লোমা নার্সরা খুব সহজেই ‘স্পেসিফাইড স্কিলড ওয়ার্কার’ (SSW) ক্যাটাগরিতে কেয়ারগিভার হিসেবে যেতে পারেন।
- সুবিধা: কেয়ারগিভার হিসেবে গেলেও বেতন নার্সদের কাছাকাছি এবং কাজের পরিবেশ অত্যন্ত উন্নত। জাপানি ভাষা (N4 বা N3 লেভেল) জানা থাকলে এটি একটি দারুণ সুযোগ।
ইউরোপের দেশসমূহ (জার্মানি ও ইতালি)
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জার্মানি বাংলাদেশ থেকে নার্স নেওয়ার জন্য বিশেষ আগ্রহ দেখাচ্ছে।
- জার্মানি: জার্মানি বিএসসি এবং ডিপ্লোমা—উভয়কেই গ্রহণ করে। তবে শর্ত হলো আপনার নার্সিং পাঠ্যক্রমটি তাদের দেশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে (Equivalency check)। এরপর সেখানে গিয়ে বি২ (B2) লেভেলের ভাষা শিখলে এবং একটি ছোট পরীক্ষা দিলে পূর্ণ লাইসেন্স পাওয়া যায়।
- সুযোগ: জার্মানিতে বেতন ও নাগরিকত্বের সুযোগ অন্যান্য দেশের চেয়ে বেশি।
প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও বাধা
ডিপ্লোমা নার্সদের বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হয়:
১. রেজিস্ট্রেশন: বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিল (BNMC) থেকে অবশ্যই নিবন্ধিত হতে হবে।
২. অভিজ্ঞতা: ডিপ্লোমা শেষ করার পর কমপক্ষে ২ বছর একটি ১০০ শয্যা বিশিষ্ট (বা তার বেশি) হাসপাতালে কাজ করার অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। (আইসিইউ, সিসিইউ বা ইমার্জেন্সি বিভাগে অভিজ্ঞতা থাকলে অগ্রাধিকার বেশি)।
৩. ভাষাগত দক্ষতা: মধ্যপ্রাচ্যের জন্য ইংরেজি (বেসিক) এবং ইউরোপের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের ভাষা জানা বাধ্যতামূলক। ইংরেজি ভাষাভাষী দেশগুলোর (যেমন: যুক্তরাজ্য বা কানাডা) জন্য ডিপ্লোমা নার্সদের ক্ষেত্রে আয়েলেস (IELTS) স্কোর অর্জন করা বেশ চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।
৪. অতিরিক্ত কোর্স: অনেক দেশ ডিপ্লোমা নার্সদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কিছু শর্ট কোর্স বা ব্রিজ কোর্স (Bridge Course) করার শর্ত দিয়ে থাকে।
আবেদন পদ্ধতি ও ধাপসমূহ
ডিপ্লোমা নার্সদের বিদেশে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি সাধারণত নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করে সম্পন্ন হয়:
সরকারি মাধ্যমে আবেদন (BOESL):
বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল) নিয়মিতভাবে কুয়েত, সৌদি আরব এবং জর্ডানে নার্স নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেয়।
পদ্ধতি: বোয়েসেলের ওয়েবসাইটে (www.boesl.gov.bd) নজর রাখুন এবং বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী অনলাইনে আবেদন করুন।
সুবিধা: খরচ খুবই কম এবং কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর ভয় থাকে না।
ডাটাফ্লো (DataFlow) ভেরিফিকেশন:
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে (সৌদি, কাতার, ওমান, দুবাই) যেতে হলে আপনার ডিপ্লোমা সনদ এবং অভিজ্ঞতার সার্টিফিকেট ‘ডাটাফ্লো’ পদ্ধতিতে যাচাই করতে হয়। এটি একটি আন্তর্জাতিক পদ্ধতি যা নিশ্চিত করে আপনার কাগজগুলো আসল।
প্রোমেট্রিক পরীক্ষা (Prometric Exam):
অধিকাংশ দেশে নার্সিং লাইসেন্স পাওয়ার জন্য একটি এমসিকিউ (MCQ) পরীক্ষা দিতে হয়। ডিপ্লোমা নার্সদের জন্যও এই পরীক্ষা বাধ্যতামূলক। ঢাকাতেই এই পরীক্ষা দেওয়ার সেন্টার রয়েছে।
উন্নত দেশগুলোর (UK, USA, Canada) চ্যালেঞ্জ
যুক্তরাজ্য, কানাডা বা আমেরিকার মতো দেশে ডিপ্লোমা নার্সদের জন্য কিছু বাড়তি চ্যালেঞ্জ রয়েছে:
শিক্ষাগত সমমান (Equivalency): এই দেশগুলো সাধারণত বিএসসি বা চার বছরের ডিগ্রিকে অগ্রাধিকার দেয়। তবে ডিপ্লোমা নার্সরা যদি ২-৩ বছরের পোস্ট বেসিক বিএসসি (Post Basic BSc) সম্পন্ন করেন, তবে তাদের জন্য এই দেশগুলোর দরজা খুলে যায়।
ভাষার পরীক্ষা: এই দেশগুলোতে যেতে হলে আয়েলেস (IELTS)-এ গড়ে ৭.০ বা ওটিই (OET)-তে ‘বি’ গ্রেড পেতে হয়, যা অনেক সময় ডিপ্লোমা নার্সদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
পরামর্শ: সরাসরি এই দেশে যাওয়ার চেষ্টা না করে প্রথমে মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশে ২-৩ বছর কাজ করে অভিজ্ঞতা অর্জন করলে পরবর্তীতে এসব উন্নত দেশে যাওয়া অনেক সহজ হয়।
ডিপ্লোমা নার্সদের জন্য বিশেষ প্রস্তুতির টিপস
যদি আপনি ডিপ্লোমা শেষ করে বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন, তবে নিচের প্রস্তুতিগুলো এখনই শুরু করুন:
১. ক্লিনিক্যাল দক্ষতা বৃদ্ধি: শুধুমাত্র সাধারণ ওয়ার্ডে কাজ না করে চেষ্টা করুন আইসিইউ (ICU), সিসিইউ (CCU), এনআইসিইউ (NICU) বা ডায়ালাইসিস ইউনিটে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে। স্পেশালাইজড নার্সদের বেতন ডিপ্লোমা হলেও অনেক বেশি হয়।
২. ইংরেজি ভাষা চর্চা: প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা ইংরেজি পড়ার ও বলার অভ্যাস করুন। ভাইভা বোর্ডে ইংরেজিতে উত্তর দিতে পারলে আপনার গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেড়ে যাবে।
৩. কম্পিউটার জ্ঞান: বিদেশের সব হাসপাতালে এখন কম্পিউটারাইজড সিস্টেমে চার্টিং ও রিপোর্টিং হয়। তাই বেসিক কম্পিউটার চালনায় দক্ষ হয়ে উঠুন।
৪. পাসপোর্ট প্রস্তুত রাখা: সুযোগ যেকোনো সময় আসতে পারে, তাই পাসপোর্ট আগে থেকেই করে রাখুন।
৫. পোস্ট বেসিক বিএসসি: যদি সম্ভব হয়, ডিপ্লোমার পর দুই বছরের পোস্ট বেসিক বিএসসি কোর্সটি করে নিন। এটি আপনাকে বিএসসি নার্সদের সমান মর্যাদা ও সুযোগ এনে দেবে।
একজন ডিপ্লোমা নার্স হিসেবে আপনার সামনেও বিশ্বের মানচিত্র খোলা রয়েছে। সঠিক পরিকল্পনা, ভাষাগত দক্ষতা এবং নিজের কাজের প্রতি আন্তরিকতা থাকলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে ইউরোপ পর্যন্ত আপনি আপনার ক্যারিয়ার গড়তে পারেন। দালালের খপ্পরে না পড়ে নিয়মিত সরকারি বিজ্ঞপ্তির দিকে নজর রাখুন এবং নিজেকে বৈশ্বিক মানের নার্স হিসেবে গড়ে তুলুন।
