কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো।
কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা
সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ,
আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা।
আজ আমরা এমন এক ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি ছিলেন একাধারে বরেণ্য কবি, উচ্চপদস্থ আমলা এবং বাংলাদেশের কৃষি ও পানিসম্পদ মন্ত্রী। তাঁর শব্দচয়ন ও কাব্যশৈলী বাংলা সাহিত্যকে দিয়েছে এক অনন্য মাত্রা। তিনি আমাদের লোকজ ঐতিহ্যের সার্থক রূপকার—কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ।
উপস্থিত সুধী,
কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ ১৯৩৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার অন্তর্গত বহেরচর ক্ষুদ্রকাঠি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আব্দুল জব্বার খান ছিলেন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সাবেক স্পিকার। কবির পুরো নাম ছিল আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ খান। তিনি কেবল একজন কবিই ছিলেন না, তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর শিক্ষা লাভ করেছিলেন এবং সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ছিলেন।
কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর যাপিত জীবন ছিল বৈচিত্র্যপূর্ণ। তিনি ১৯৫৪ সালে সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তানে (CSP) যোগ দেন এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকারের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এত বড় প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের মাঝেও কবিতার জগত থেকে তিনি কখনো বিচ্ছিন্ন হননি। তাঁর কবিতায় ফুটে উঠেছে আবহমান বাংলার গ্রামীণ জীবন, মানুষের লড়াই এবং শেকড়ের গভীর টান।
অনেকে মনে করেন আধুনিক বাংলা কবিতায় তিনি এক নতুন ধারার প্রবর্তন করেছিলেন। তাঁর রচিত ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’ কবিতাটি বাংলাদেশের সাহিত্য ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় মাইলফলক। কবির উচ্চারণ— “আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি, তাঁর করতলে পলিমাটির সৌরভ ছিল…”—আমাদের ঐতিহ্যের প্রতি দায়বদ্ধতা মনে করিয়ে দেয়। তাঁর ‘সাত নরী হার’ কিংবা ‘বৃষ্টি ও রৌদ্রের জন্য প্রার্থনা’ কাব্যগ্রন্থগুলো বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।
মজার ব্যাপার হলো, তাঁর অনেক পাঠক হয়তো জানেন না যে, তিনি পেশাদার জীবনে সফল কূটনীতিক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এবং ইউনেস্কোর এশিয়া-পশান্ত অঞ্চলের পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর শেকড় সন্ধানী মনন প্রশাসন ও শিল্পকে এক সুতোয় গেঁথেছিল।
প্রিয় সুধী,
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ তাঁর অসামান্য সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৯ সালে ‘একুশে পদক’ এবং ১৯৮৫ সালে ‘বাংলা একাডেমি পুরস্কার’ লাভ করেন। তাঁর প্রতিটি সৃষ্টিতে তিনি দেশপ্রেম ও ঐতিহ্যের জয়গান গেয়েছেন।
আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন—
‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’।
সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার কবির নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই প্রজ্ঞাবান কবির জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের শেকড়কে ভুলে না যাই।
কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ ২০০১ সালের ১৯ মার্চ ইন্তেকাল করেন। তিনি তাঁর কালজয়ী কর্মের মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন।
ধন্যবাদ সবাইকে।
জয় বাংলা!
জয় গুরুকুল!
আরও দেখুন: