গুরুকুল ক্যাম্পাস লার্নিং নেটওয়ার্ক, GCLN

গুরুকুলের নবীন বরণ ও বিদায় অনুষ্ঠানের নবীন শিক্ষার্থীর বক্তব্য : স্বপ্নের পথে নতুন যাত্রা

কুষ্টিয়া গুরুকুল এর ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ সমূহের বিদায় অনুষ্ঠান ২০১৬।

গুরুকুলের নবীন বরণ ও বিদায় অনুষ্ঠানের মাহেন্দ্রক্ষণে একজন নবীন  শিক্ষার্থীর পক্ষ থেকে একটি বক্তব্য পরবর্তি শিক্ষার্থীদের জণ্য আপলোড করে রাখা হলো: গুরুকুলের নবীন বরণ ও বিদায় অনুষ্ঠানের নবীন শিক্ষার্থীর বক্তব্য সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজকের দিনটি আমার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় দিন। আজ আমরা যারা নবীন হিসেবে গুরুকুলের এই পবিত্র আঙিনায় পা রেখেছি, আমাদের বরণ করে নেওয়ার যে উষ্ণ ও আন্তরিক আয়োজন আপনারা করেছেন, তার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। একই সাথে আজ আমাদের সেই বড় ভাই-বোনদের বিদায় অনুষ্ঠান, যারা এই চেনা প্রাঙ্গণে দীর্ঘ সময় পথ চলে আজ বৃহত্তর জীবনের পথে পা বাড়াচ্ছেন। আপনাদের সবার সামনে দাঁড়াতে পেরে আমি নিজেকে অত্যন্ত গর্বিত বোধ করছি। সুধীজন, আমরা যারা আজ নতুন হিসেবে এখানে যুক্ত হলাম, আমাদের সামনে রয়েছে এক অবারিত সুযোগ। গুরুকুল কেবল একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং এটি একটি আধুনিক জ্ঞানপীঠ। আমাদের ক্যাম্পাস, অডিটোরিয়াম, ল্যাব ও গুরুকুল অনলাইন লার্নিং নেটওয়ার্কের যে বিশাল ডিজিটাল ভাণ্ডার এবং কারিগরি শিক্ষার সুযোগ রয়েছে, আমাদের লক্ষ্য থাকবে তার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা। আমরা হতে চাই আধুনিক, দক্ষ এবং অনুসন্ধিৎসু—যারা কেবল ডিগ্রি অর্জনের জন্য নয়, বরং বিশ্বকে জয় করার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করবে। প্রিয় বিদায়ী বড় ভাই ও বোনেরা, আপনাদের বিদায় বেলায় আমাদের মন কিছুটা ভারাক্রান্ত হলেও, আপনাদের ফেলে যাওয়া স্মৃতি আর সাফল্য আমাদের সাহস জোগাবে। আপনারা যেভাবে এই ক্যাম্পাসের শৃঙ্খলা ও ঐতিহ্যকে সমুন্নত রেখেছেন, আমরা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি—আপনাদের সেই ধারাকে আমরা আরও গর্বের সাথে এগিয়ে নিয়ে যাব। আপনারা কর্মজীবনের যে নতুন পৃথিবীতে পা রাখছেন, সেখানে আপনাদের প্রতিটি পদক্ষেপ সফল হোক, এই কামনাই করি। শ্রদ্ধেয় শিক্ষকবৃন্দ, আপনাদের প্রতি আমাদের বিনীত প্রত্যাশা যে, আপনারা আমাদের কেবল পাঠ্যবইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব পৃথিবীর জন্য একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবেন। আমরা গুরুকুলের বাইরে থেকে সবসময়ই শুনে এসেছি যে, এখানে একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি কো-কারিকুলার ও এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিসের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিতর্ক, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা কিংবা স্কাউটিংয়ের মতো কার্যক্রমগুলোর মাধ্যমেই একজন শিক্ষার্থী জীবনের কঠিন চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার সক্ষমতা অর্জন করে এবং মানসিকভাবে সুগঠিত হয়ে ওঠে। তাই আমাদের বিনীত অনুরোধ, আপনারা যেন নিয়মিতভাবে এই সৃজনশীল কার্যক্রমগুলো পরিচালনার বিষয়টি নিশ্চিত করেন, যাতে আমরা পড়াশোনার পাশাপাশি নেতৃত্বের গুণাবলি এবং জীবনমুখী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাই। আপনারা আমাদের পথপ্রদর্শক হিসেবে পাশে থাকলে আমরা বিশ্বাস করি, গুরুকুলের প্রতিটি শিক্ষার্থী বাস্তব জীবনের যেকোনো লড়াইয়ে জয়ী হওয়ার শক্তি লাভ করবে। শ্রদ্ধেয় উপস্থিতি, বক্তৃতার এই পর্যায়ে আমি আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর স্যার সম্পর্কে কিছু বলতে চাই। এই প্রতিষ্ঠানে আসার আগে থেকেই স্যারের সম্পর্কে আমরা অনেক শুনেছি। তাঁর বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ড ও গঠনমূলক লেখালেখি সম্পর্কে জেনেছি। বিশেষ করে স্যারের ভিডিওগুলো দেখে আমি ব্যক্তিগতভাবে অনেক অনুপ্রাণিত হয়েছি। তাঁর জীবনদর্শন এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য তাঁর দিকনির্দেশনা আমাদের মতো নবীনদের মনে এক গভীর কৌতূহল ও শ্রদ্ধার জায়গা তৈরি করেছে। আমাদের স্বপ্ন ও প্রবল আকাঙ্ক্ষা রয়েছে যে, আগামী দিনগুলোতে আমাদের এই ক্যাম্পাস জীবনে আমরা স্যারের মূল্যবান সান্নিধ্য পাবো এবং তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে সরাসরি শিক্ষা নিয়ে নিজেদের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারব। উপসংহার: পরিশেষে বলতে চাই, আজ আমাদের স্বপ্নের ডানা মেলার দিন। আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকবৃন্দের হাত ধরে আমরা যেন এই গুরুকুলের আলোকবর্তিকা হয়ে আগামীর বাংলাদেশকে আরও সুন্দর করে গড়তে পারি। আমাদের যাত্রা যেন হয় ন্যায়, সত্য এবং সুন্দরের পথে। ধন্যবাদ জানাই সবাইকে এই চমৎকার আয়োজনের জন্য এবং আমাকে কথা বলার সুযোগ দেওয়ার জন্য। জয় বাংলা, জয় গুরুকুল, বাংলাদেশ চিরজীবী হোক। আরও দেখুন: গুরুকুলের নবীন বরণ ও বিদায় অনুষ্ঠানের বিদায়ী শিক্ষার্থীর বক্তব্য: স্মৃতি অম্লান, যাত্রা অনন্ত

গুরুকুলের নবীন বরণ ও বিদায় অনুষ্ঠানের বিদায়ী শিক্ষার্থীর বক্তব্য: স্মৃতি অম্লান, যাত্রা অনন্ত

নবীন বরণ ও বিদায় অনুষ্ঠান ২০২৪

গুরুকুলের নবীন বরণ ও বিদায় অনুষ্ঠানের মাহেন্দ্রক্ষণে একজন বিদায়ী শিক্ষার্থীর পক্ষ থেকে একটি বক্তব্য পরবর্তি শিক্ষার্থীদের জণ্য আপলোড করে রাখা হলো: নবীন বরণ ও বিদায় অনুষ্ঠানের বিদায়ী শিক্ষার্থীর বক্তব্য   সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজকের দিনটি আমাদের জন্য এক মিশ্র অনুভূতির। একদিকে আমাদের ছোট ভাই-বোনদের বরণ করে নেওয়ার আনন্দ, অন্যদিকে আমাদের বিদায়ের করুণ সুর। বিদায় মানেই শেষ নয়, বরং বিদায় হলো এক নতুন দিগন্তের পথে যাত্রার শুরু। তবুও, এই ক্যাম্পাস, এই প্রিয় মুখগুলো আর এই চেনা আঙিনা ছেড়ে যাওয়ার মুহূর্তটি অত্যন্ত ভারী হয়ে উঠেছে। সুধীজন, আজ থেকে কয়েক বছর আগে আমরা যখন ঠিক আপনাদের মতো নবীন হিসেবে এই গুরুকুলের দুয়ারে পা রেখেছিলাম, তখন আমাদের চোখে ছিল অনেক স্বপ্ন আর মনে ছিল এক অজানা শঙ্কা। কিন্তু গুরুকুল আমাদের কেবল একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং একটি পরিবার হিসেবে আগলে রেখেছে। এখানকার শিক্ষকরা আমাদের শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেননি, বরং শিখিয়েছেন কীভাবে একজন সত্যিকারের মানুষ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়। প্রিয় নবীন বন্ধু ও ছোট ভাই-বোনেরা, আজ আপনাদের যাত্রা শুরু হলো। আপনারা এমন এক প্রতিষ্ঠানে এসেছেন যেখানে আধুনিক প্রযুক্তি আর নৈতিক শিক্ষার এক অপূর্ব সমন্বয় রয়েছে। গুরুকুল অনলাইন লার্নিং নেটওয়ার্কের এই বিশাল জ্ঞানভাণ্ডারকে আপনারা কাজে লাগাবেন—এটাই আমাদের প্রত্যাশা। মনে রাখবেন, সময় অত্যন্ত মূল্যবান। প্রতিটি দিনকে কাজে লাগান, কৌতূহলী হোন এবং অজানাকে জানার নেশায় মত্ত থাকুন। আজ আমরা যে জায়গাটি আপনাদের জন্য খালি করে যাচ্ছি, আপনারা আপনাদের মেধা আর সৃজনশীলতা দিয়ে সেই জায়গাটি আরও উজ্জ্বল করে তুলবেন। প্রিয় শিক্ষকবৃন্দ ও গুরুকুল কর্তৃপক্ষ, আপনাদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। আমাদের ভুলগুলোকে আপনারা পরম মমতায় শুধরে দিয়েছেন। জীবনের কঠিন পিচ্ছিল পথে কীভাবে ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হয়, সেই দীক্ষা আমরা আপনাদের কাছ থেকেই পেয়েছি। আজ আমরা যেটুকু অর্জন করেছি, তার সিংহভাগই আপনাদের ত্যাগ আর অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল। আপনাদের শেখানো আদর্শকে আমরা আমাদের হৃদয়ে লালন করব সারাজীবন। সুধীজন, আজ বিদায় বেলায় আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর স্যারের প্রতিটি আদর্শিক শিক্ষা বারবার মনে পড়ছে। তাঁর সান্নিধ্যে আমরা জীবনের যে গূঢ় সত্যগুলো জেনেছি, তা আমাদের আজীবন পথ দেখাবে। স্যার সবসময় আমাদের হৃদয়ের পরিশুদ্ধির কথা বলতেন। তিনি বলতেন— “কাপড়ে নয়, সব অসুন্দর, অসত্য, নীচতা থেকে মনের হিজাব করো।” অর্থাৎ বাইরের আবরণের চেয়ে ভেতরের পবিত্রতা আর নৈতিকতাকে তিনি সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দিতেন। তিনি আমাদের মহান মানুষদের আদর্শে অনুপ্রাণিত করতে গিয়ে বলতেন— “বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়।” স্যারের এই কথাগুলো আজ আমাদের চেতনায় প্রদীপের মতো জ্বলছে। তাঁর আরও কত কথা, কত স্মৃতি আজ এই বিদায়ক্ষণে মনের মধ্যে বায়োস্কোপের মতো একে একে সরে যাচ্ছে। বিদায়ের এই ক্ষণে, সাফল্য মানে কেবল একটি ভালো চাকরি বা অনেক অর্থ উপার্জন নয়; সাফল্য মানে হলো নিজের অর্জিত জ্ঞান দিয়ে সমাজের অন্ধকার দূর করা। আমরা যখন এই চত্বর থেকে কর্মজীবনের বিশাল পৃথিবীতে পা রাখছি, তখন আমাদের অঙ্গীকার হলো—আমরা যেখানেই যাই না কেন, গুরুকুলের মান সমুন্নত রাখব। আমরা যেন আর্তমানবতার সেবায় এবং দেশের কল্যাণে নিজেদের উৎসর্গ করতে পারি, সেই আশীর্বাদ প্রার্থী। শেষ করতে ইচ্ছে করছে না, তবুও শেষ করতে হবে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় বলতে চাই— “যেতে নাহি দিব, হায়, তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়।” সময় বয়ে যাবে, আমরা হয়তো ব্যক্তিগত জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়ব, কিন্তু গুরুকুলের প্রতিটি ধূলিকণা আর স্মৃতি আমাদের হৃদয়ে অম্লান থাকবে। প্রিয় নবীন বন্ধুদের জন্য রইল অফুরন্ত শুভকামনা আর আমাদের জন্য রইল এক বুক স্মৃতি। ভালো থেকো গুরুকুল, ভালো থাকুন প্রিয় শিক্ষকমণ্ডলী। ধন্যবাদ জানাই সবাইকে এই সুন্দর আয়োজনের জন্য। জয় গুরুকুল, জয় গুরুকুল, বাংলাদেশ চিরজীবী হোক। আরও দেখুন: গুরুকুলের নবীন বরণ ও বিদায় অনুষ্ঠানের নবীন শিক্ষার্থীর বক্তব্য : স্বপ্নের পথে নতুন যাত্রা

সৈয়দ শামসুল হক-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা । ২৭ ডিসেম্বর

সৈয়দ শামসুল হক

সৈয়দ শামসুল হক-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। সৈয়দ শামসুল হক-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ ২৭ ডিসেম্বর। আজ আমরা এমন এক ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যাঁর কলমের জাদুতে বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি শাখা সমৃদ্ধ হয়েছে। কবিতা, উপন্যাস, নাটক, ছোটগল্প কিংবা কাব্যনাট্য—সবখানেই যাঁর অবাধ বিচরণ। তিনি আমাদের সাহিত্যের ‘সব্যসাচী লেখক’—সৈয়দ শামসুল হক। উপস্থিত সুধী, সৈয়দ শামসুল হক ১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সৈয়দ সিদ্দিক হুসাইন ছিলেন একজন চিকিৎসক এবং মাতা হালিমা খাতুন। শৈশব থেকেই সাহিত্যের প্রতি তাঁর ছিল গভীর অনুরাগ। তিনি কেবল একজন লেখক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অসামান্য শব্দশিল্পী। সৈয়দ শামসুল হকের সাহিত্যকর্মে এদেশের মাটি, মানুষ এবং ইতিহাসের এক নিবিড় প্রতিফলন পাওয়া যায়। বিশেষ করে তাঁর কাব্যনাট্যগুলো বাংলা সাহিত্যে এক নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘নূরলদীনের সারাজীবন’-এর সেই কালজয়ী পঙক্তি আজও আমাদের রক্তে শিহরণ জাগায়: “জাগো বাহে, কুন্ঠে সবায়ে!” এই একটি পঙক্তির মধ্য দিয়ে তিনি যেন ঘুমন্ত বাঙালি জাতিকে বারবার জেগে ওঠার ডাক দিয়ে গেছেন। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য সৃষ্টির মধ্যে রয়েছে ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, ‘নিষিদ্ধ লোবান’, ‘খেলারাম খেলে যা’ এবং ‘নীল দংশন’-এর মতো কালজয়ী কাজ। তিনি মাত্র ২৯ বছর বয়সে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন, যা সাহিত্যে তাঁর অসামান্য প্রতিভারই স্বীকৃতি। পরবর্তীতে তিনি একুশে পদক এবং স্বাধীনতা পদকেও ভূষিত হন। প্রিয় সুধী, সৈয়দ শামসুল হক আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে শব্দ দিয়ে ছবি আঁকতে হয়। তাঁর ছোটগল্পের বুনন আর উপন্যাসের গভীরতা আমাদের জীবনবোধকে প্রসারিত করে। তিনি আমৃত্যু বিশ্বাস করতেন কলমের শক্তিতে এবং মানুষের মুক্তির মিছিলে। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার এই সব্যসাচী লেখকের নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন তাঁর নির্ভীক জীবনবোধ ও সাহিত্যের নিরন্তর সাধনা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের মেধা ও মননকে বিকশিত করতে পারি। সৈয়দ শামসুল হক তাঁর অবিনশ্বর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বাঙালির হৃদয়ে এবং বাংলা সাহিত্যের আকাশে ধ্রুবতারার মতো চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

মির্জা গালিব-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা । ২৭ ডিসেম্বর

মির্জা গালিব

মির্জা গালিব-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো।   মির্জা গালিব-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ আমরা এমন এক ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যাঁর নাম উচ্চারণ মাত্রই বিশ্বসাহিত্যের এক গভীর দর্শন ও কাব্যময় জগত আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তিনি মুঘল সাম্রাজ্যের শেষ সূর্যোদয়ের সাক্ষী, উর্দু ও ফারসি ভাষার অমর কবি— মির্জা আসাদুল্লাহ খান গালিব। উপস্থিত সুধী, মির্জা গালিব ১৭৯৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর ভারতের আগ্রায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষরা ছিলেন মধ্য এশীয় তুর্কি বংশোদ্ভূত। গালিব এমন এক সময়ে কাব্যচর্চা করেছেন যখন মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ঘটছে এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন জেঁকে বসছে। এই যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে তিনি জীবনকে যে গভীরতা দিয়ে দেখেছিলেন, তা আজ আড়াইশ বছর পরও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। গালিবের কবিতার প্রধান বিষয়বস্তু ছিল মানুষের অস্তিত্বের সংকট, প্রেম, মৃত্যু এবং আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা। তিনি কেবল কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দার্শনিক। তাঁর ‘দিওয়ান-ই-গালিব’ উর্দু সাহিত্যের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠতম সংকলন হিসেবে বিবেচিত। তাঁর রচিত চিঠিপত্রগুলোও উর্দু গদ্য সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ, যা সেই সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির এক প্রামাণ্য দলিল। তাঁর কিছু অমর পঙক্তি আজও সারা বিশ্বের কাব্যপ্রেমীদের মুখে মুখে ঘোরে: “হাজারো খোয়াইশে অ্যায়সি কে হর খোয়াইশ পে দম নিকলে / বহুত নিকলে মেরে আরমান লেকিন ফির ভি কম নিকলে” (অর্থাৎ: হাজারো এমন আকাঙ্ক্ষা যার প্রতিটির জন্য প্রাণ উৎসর্গ করা যায়; অনেক আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হয়েছে ঠিকই, তবু যেন তা পর্যাপ্ত নয়।) প্রিয় সুধী, মির্জা গালিব তাঁর জীবদ্দশায় চরম দারিদ্র্য ও ব্যক্তিগত শোকের মধ্য দিয়ে গেছেন। তাঁর সাতটি সন্তানই শৈশবে মারা যায়। কিন্তু এই দুঃখ তাঁকে ভেঙে ফেলেনি, বরং তাঁর কলমকে করেছে আরও ধারালো এবং সংবেদনশীল। তিনি ছিলেন অত্যন্ত স্বাধীনচেতা এবং রসবোধ সম্পন্ন একজন মানুষ। মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফর তাঁকে ‘দাবির-উল-মুলক’ এবং ‘নাজিম-উদ-দৌলা’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে এই মহান দার্শনিকের নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সেই সুগভীর কাব্যদর্শন সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন গালিবের মতো প্রতিকূলতার মাঝেও জীবনকে দেখার নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করতে পারি এবং নিজেদের জীবনকে শিল্পের আলোয় রাঙাতে পারি। মির্জা গালিব তাঁর কালজয়ী সৃষ্টির মধ্য দিয়ে সাহিত্যের আকাশে চিরকাল ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল!   আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

মুনীর চৌধুরী-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা । ১৯ নভেম্বর

মুনীর চৌধুরী

মুনীর চৌধুরী-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। মুনীর চৌধুরী-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ ১৯ নভেম্বর। আজ আমরা এমন এক প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি একাধারে সাহিত্যিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক এবং বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষাবিদ। তিনি আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের আলোকবর্তিকা—শহীদ মুনীর চৌধুরী। উপস্থিত সুধী, মুনীর চৌধুরী ১৯২৫ সালের ১৯ নভেম্বর তৎকালীন ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈত্রিক নিবাস ছিল নোয়াখালী জেলায়। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই মানুষটি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের তুখোড় অধ্যাপক। তিনি কেবল শ্রেণিকক্ষেই পাঠদান করেননি, বরং বাংলা ভাষাকে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত করার ক্ষেত্রে এক অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। টাইপরাইটারের জন্য তাঁর আবিষ্কৃত ‘মুনীর অপটিমা’ কি-বোর্ড লেআউট আজও আমাদের যান্ত্রিক জীবনে বাংলা ব্যবহারের অন্যতম ভিত্তি হয়ে আছে। মুনীর চৌধুরীর সাহিত্যকর্ম আমাদের জাতীয় সম্পদ। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের উত্তাল সময়ে রাজবন্দী থাকাকালীন তিনি রচনা করেন তাঁর কালজয়ী নাটক ‘কবর’। জেলে বসে এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে রচিত এই নাটকটি আজও আমাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের এক অবিস্মরণীয় দলিল। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’, ‘চিঠি’, ‘দণ্ডকারণ্য’ এবং অনুবাদ নাটক ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ বাংলা নাট্যসাহিত্যের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। সাহিত্য সমালোচনায় তাঁর ‘তুলামূলক সমালোচনা’ এবং ‘বাংলা গদ্যরীতি’ বই দুটি আজ অবধি গবেষকদের জন্য পথপ্রদর্শক। প্রিয় সুধী, মুনীর চৌধুরী ছিলেন আপাদমস্তক এক অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল মানুষ। একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোতে তিনি দেশের মাটির মায়া ত্যাগ করেননি। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, স্বাধীনতার সূর্য উদিত হওয়ার মাত্র দুদিন আগে, ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে আল-বদর বাহিনী তাঁকে অপহরণ করে নিয়ে যায় এবং বরেণ্য এই বুদ্ধিজীবীকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। তাঁর শূন্যতা আজও অপূরণীয়। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার এই মহান চিন্তকের নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন মুনীর চৌধুরীর সেই নির্ভীক সত্যবাদিতা ও জ্ঞাননিষ্ঠার আদর্শকে আমাদের শিক্ষা জীবনে পাথেয় করতে পারি। মুনীর চৌধুরী তাঁর কর্ম ও অসামান্য সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বাঙালির হৃদয়ে এবং বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

সলিল চৌধুরীর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা

সলিল চৌধুরী

সলিল চৌধুরী-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। সলিল চৌধুরী-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ ১৯ নভেম্বর। আজ আমরা এমন এক কালজয়ী প্রতিভা ও সুরস্রষ্টার জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি ভারতীয় সংগীতের ব্যাকরণ ও বিন্যাসকে এক বৈপ্লবিক আধুনিকতায় ঋদ্ধ করেছেন। তিনি আমাদের প্রিয় সলিলদা—বিখ্যাত সংগীত পরিচালক, সুরকার, গীতিকার এবং গল্পকার সলিল চৌধুরী। উপস্থিত সুধী, সলিল চৌধুরী ১৯২৫ সালের ১৯ নভেম্বর দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার গাজিপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব কেটেছে আসামের চা বাগানে, যেখানে বাবার সংগ্রহে থাকা পাশ্চাত্য উচ্চাঙ্গ সংগীত এবং চা বাগানের শ্রমিকদের জীবনের সুর তাঁর সংগীত সত্তাকে সমৃদ্ধ করেছিল। জ্যাঠাতো ভাই নিখিল চৌধুরীর ঐক্যবাদন দল ‘মিলন পরিষদ’-এর মাধ্যমে সংগীতের জগতে তাঁর হাতেখড়ি। পরবর্তীতে কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজ থেকে স্নাতক করার সময় থেকেই তিনি রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়ে ওঠেন এবং ভারতীয় গণনাট্য সংঘ বা আইপিটিএ (IPTA)-এ যোগ দেন। মাত্র ২০ বছর বয়সে তিনি ‘গাঁয়ের বধু’র মতো গান সুর করে বাংলা সংগীতে এক নতুন ধারার সূচনা করেছিলেন। তাঁর সৃজনশীলতায় বাংলা গান পেয়েছিল ‘রানার’, ‘বিচারপতি’ এবং ‘অবাক পৃথিবী’র মতো কালজয়ী সব গণসংগীত। সলিল চৌধুরী কেবল বাংলাতেই নয়, হিন্দি, মালয়ালম, তামিল, তেলুগু ও মারাঠীসহ বিভিন্ন ভাষায় ৭৫টিরও বেশি হিন্দি ও ৪০টির বেশি বাংলা চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা করেছেন। ১৯৫৩ সালে তাঁরই লেখা ছোটগল্প ‘রিকসাওয়ালা’ অবলম্বনে বিমল রায় নির্মাণ করেন বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘দো ভিঘা জামিন’, যা কান চলচ্চিত্র উৎসবে আন্তর্জাতিক পুরস্কার জিতে তাঁর কর্মজীবনকে এক বিশ্বজনীন মাত্রা দান করে। প্রিয় সুধী, সলিল চৌধুরীর সংগীতে ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সংগীত এবং পাশ্চাত্য উচ্চাঙ্গ সংগীতের এক অসামান্য মেলবন্ধন লক্ষ করা যায়। মোৎজার্টের সিম্ফোনি থেকে শুরু করে শপ্যাঁর কাজ—সবকিছুকেই তিনি অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ভারতীয় গানের সাথে মিশিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি কেবল সুরকার ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দক্ষ যন্ত্রীও; বাঁশি, পিয়ানো ও এসরাজ বাজানোয় তিনি ছিলেন পারদর্শী। ১৯৫৮ সালে ‘মধুমতি’ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি ফিল্মফেয়ার সেরা সংগীত পরিচালকের পুরস্কার পান এবং ১৯৮৮ সালে লাভ করেন ‘সংগীত নাটক একাডেমী পুরস্কার’। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে সলিল চৌধুরীর নাম নিই, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর আত্মার শান্তি কামনায় সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন তাঁর নির্ভীক জীবনবোধ ও শিল্পের প্রতি নিরন্তর সাধনা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে আরও উন্নত করতে পারি। সলিল চৌধুরী তাঁর অবিনশ্বর সুর ও সৃষ্টির মধ্য দিয়ে প্রতিটি সংগীতানুরাগী মানুষের হৃদয়ে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

নবান্ন ও হেমন্ত উৎসব উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা ( ১লা অগ্রহায়ণ বা নভেম্বরের ১৫/১৬ তারিখ)

নবান্ন ও হেমন্ত উৎসব উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। নবান্ন ও হেমন্ত উৎসব উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই হেমন্তের শিশিরভেজা প্রীতি ও নবান্নের শুভেচ্ছা। আজ আমরা সমবেত হয়েছি বাঙালির প্রাণের মেলা, ঋতুচক্রের এক অপূর্ব সন্ধিক্ষণ ‘হেমন্ত উৎসব’ ও ‘নবান্ন’ উদযাপন করতে। যখন কার্তিকের কুয়াশাভেজা ভোর পেরিয়ে ১লা অগ্রহায়ণ আমাদের দুয়ারে কড়া নাড়ে, তখন বাংলার দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠ সোনালি রঙে সেজে ওঠে। আর সেই সাথে শুরু হয় বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য—নবান্ন। উপস্থিত সুধী, হেমন্ত ঋতুটি হলো শান্তি ও সমৃদ্ধির ঋতু। বর্ষার উন্মাদনা আর শীতের জড়তার মাঝে হেমন্ত আসে এক শান্ত স্নিগ্ধতা নিয়ে। এই ঋতুর সবচেয়ে বড় অলঙ্কার হলো নবান্ন। ‘নবান্ন’ শব্দের অর্থ ‘নতুন অন্ন’। প্রাচীনকাল থেকেই বাঙালি কৃষক যখন মাঠের আমন ধান কেটে প্রথম ঘরে তোলে, তখন সেই চাল দিয়ে তৈরি করা হয় প্রথম আহার। বাড়ির আঙিনায় ঢেঁকির শব্দে মুখর হয়ে ওঠে পাড়া-মহল্লা। ঘরে ঘরে নতুন চালের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি হয় হরেক রকমের পিঠা, পায়েস, ক্ষীর আর মুড়ি-মুড়কি। নবান্ন কেবল একটি ভোজন উৎসব নয়; এটি আমাদের যূথবদ্ধ জীবনের প্রতীক। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে গ্রামে গ্রামে মেলা বসে, নাগরদোলা ঘোরে, জারি-সারি ও বাউল গানের আসর বসে। উঠোনে আলপনা আঁকা হয়, আর নতুন ধানের সুবাসে আত্মীয়-স্বজনের আগমনে মুখর হয়ে ওঠে প্রতিটি গৃহকোণ। রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের ভাষায়: “আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে— এই বাংলায় / হয়তো মানুষ নয়— হয়তো বা শঙ্খচিল শালিখের বেশে; / হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে।” প্রিয় সুধী, আজকের এই যান্ত্রিক ও নাগরিক জীবনে আমরা যখন নিজেদের শেকড় হারিয়ে ফেলছি, তখন এই উৎসবগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা কে। আমাদের সংস্কৃতিই আমাদের মেরুদণ্ড। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর প্রায়শই একটি অত্যন্ত গভীর কথা বলেন— “প্রতিজন মানুষের নৃতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় এমন এক ধরণের পরিচয় যা বদলানো যায় না। একজন মানুষ তার নিজের সেই সংস্কৃতি যখন চর্চা করে এবং তা উন্নত করতে কাজ করে, তখন সেই সংস্কৃতি তাকে পরিপূর্ণ এবং ‘ওয়েল ফর্মড’ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করে। আপনি নিজের সংস্কৃতির সাথে যুক্ত থাকলে বিশ্বের অন্য জাতিগোষ্ঠীর কাছে সম্মানিত হবেন। কিন্তু নিজের সংস্কৃতি বাদ দিয়ে অন্য সংস্কৃতির চর্চা করলে তা কখনোই আপনাকে পূর্ণ মানুষ হতে দেবে না। তাই আমরা বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতিগুলোর চর্চা ও প্রতিনিয়ত উন্নয়ন করতে কাজ করতে চাই।” সেই দর্শনে দীক্ষিত হয়েই আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে আমাদের কৃষ্টিকে নতুনভাবে চিনে নিতে চাই। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের এই নবান্ন, আমাদের এই পিঠা-পুলির উৎসব—এসবই আমাদের জাতিগত অস্তিত্ব। আমরা যখন বিশ্বনাগরিক হওয়ার স্বপ্ন দেখি, তখন আমাদের এই অনন্য বাঙালি সংস্কৃতিই হবে বিশ্বের দরবারে আমাদের শ্রেষ্ঠ পরিচয়। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই নবান্ন ও হেমন্ত উৎসবে আমাদের কৃষিজীবী মানুষের সমৃদ্ধি কামনা করি এবং সমৃদ্ধ আগামীর প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন আধুনিকতার মোহে আমাদের শেকড় আর আমাদের ঐতিহ্যের এই সোনার বাংলাকে কখনো ভুলে না যাই। হেমন্তের এই শান্ত শ্রী আর নবান্নের এই অকৃত্রিম আনন্দ প্রতিটি মানুষের মনে স্থায়ী হয়ে থাকুক। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

মওলানা আবুল কালাম আজাদ-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা । ১১ নভেম্বর

মওলানা আবুল কালাম আজাদ

মওলানা আবুল কালাম আজাদ-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। মওলানা আবুল কালাম আজাদ-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ ১১ নভেম্বর। আজ আমরা এমন এক ক্ষণজন্মা মহাপুরুষের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি একাধারে প্রখর ধীসম্পন্ন রাজনীতিবিদ, অনন্য সুবক্তা, দূরদর্শী শিক্ষাবিদ এবং সাংবাদিক। তিনি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব—মওলানা আবুল কালাম আজাদ। উপস্থিত সুধী, মওলানা আবুল কালাম আজাদ ১৮৮৮ সালের ১১ নভেম্বর সৌদি আরবের মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল মুহিউদ্দিন আহমেদ, তবে তিনি ‘আবুল কালাম’ নামেই বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পান এবং তাঁর কলম থেকে নির্গত তেজস্বী লেখার কারণে তিনি ‘আজাদ’ ছদ্মনাম গ্রহণ করেন। খুব অল্প বয়সেই তিনি বিভিন্ন ভাষায় পাণ্ডিত্য অর্জন করেন এবং তাঁর সম্পাদিত ‘আল হিলাল’ পত্রিকার মাধ্যমে ব্রিটিশবিরোধী জনমত গঠনে অভূতপূর্ব ভূমিকা রাখেন। মওলানা আজাদ ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক জীবন্ত কিংবদন্তি। তিনি হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রবল প্রবক্তা ছিলেন এবং দেশভাগের ঘোর বিরোধী ছিলেন। ১৯২৩ সালে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সর্বকনিষ্ঠ সভাপতি নির্বাচিত হন। মহাত্মা গান্ধী তাঁকে অভিহিত করেছিলেন ‘প্লাটোর সমান মেধার অধিকারী’ (A man of the calibre of Plato) হিসেবে। প্রিয় সুধী, স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে মওলানা আজাদের অবদান অনস্বীকার্য। আজকের আধুনিক ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি তাঁরই হাতে গড়া। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতির মুক্তি সম্ভব নয়। তাঁর নেতৃত্বেই ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি’ (IIT) এবং ‘ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশন’ (UGC) এর মতো বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে ওঠে। শিক্ষার প্রসারে তাঁর এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁর জন্মদিনটিকে ভারতে ‘জাতীয় শিক্ষা দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। ১৯৯২ সালে তাঁকে মরণোত্তর ‘ভারতরত্ন’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার এই মহান জ্ঞানতাপসের নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর ত্যাগ ও শিক্ষার দর্শন সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন মওলানা আজাদের মতো জ্ঞানের সন্ধানে ব্রতী হয়ে একটি আলোকিত ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গড়ে তুলতে পারি। মওলানা আবুল কালাম আজাদ তাঁর কর্ম ও প্রজ্ঞার মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

কবি জয় গোস্বামী-এর জন্মদিন উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা । ১০ নভেম্বর

জয় গোস্বামী

কবি জয় গোস্বামী-এর জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। কবি জয় গোস্বামী-এর জন্মদিন উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ ১০ নভেম্বর। আজ আমরা এমন এক কবির জন্মদিন উদযাপন করছি, যিনি গত কয়েক দশকে বাংলা কবিতার শরীরে এক অলৌকিক মায়া আর অসাধারণ গদ্যছন্দের কারুকাজ বুনে দিয়েছেন। যিনি ‘পাগলী তোমার সঙ্গে’ কিংবা ‘উন্মাদিনী’র কবি—আমাদের প্রিয় জয় গোস্বামী। উপস্থিত সুধী, জয় গোস্বামী ১৯৫৪ সালের ১০ নভেম্বর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তবে তাঁর শৈশব ও কৈশোরের বড় একটি সময় কেটেছে নদীয়া জেলার রানাঘাটে। তাঁর বাবা মধুসূদন গোস্বামী ছিলেন একজন বিশিষ্ট রাজনৈতিক কর্মী। খুব অল্প বয়স থেকেই কবি এক বিচিত্র জীবনসংগ্রামের মধ্য দিয়ে গিয়েছেন, আর সেই অভিজ্ঞতাই তাঁর কবিতাকে করেছে ঋদ্ধ ও সংবেদনশীল। সত্তরের দশকে যখন তিনি লিখতে শুরু করেন, তখন থেকেই তাঁর কলম প্রচলিত ধারাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল। তাঁর কবিতার চিত্রকল্প ও শব্দবিন্যাস পাঠককে এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে নিয়ে যায়। ১৯৯৭ সালে তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘যত্রতত্র’ এবং পরবর্তীতে ২০০০ সালে ‘পাগলী তোমার সঙ্গে’ কাব্যের জন্য তিনি অর্জন করেন মর্যাদাপূর্ণ ‘সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার’। এছাড়া তিনি দুইবার ‘আনন্দ পুরস্কার’ সহ অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। তাঁর কালজয়ী কাব্যগ্রন্থ ও উপন্যাসসমূহ বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ: ‘ক্রিসমাস ও শীতের সনেটগুচ্ছ’ ‘হাঁসখালি থেকে আসা একদল পরীরা’ ‘যারা বৃষ্টিতে ভিজেছিল’ ‘সেই সব শিয়ালরা’ (উপন্যাস) প্রিয় সুধী, জয় গোস্বামী এমন একজন কবি, যিনি আমাদের চারপাশের অতি সাধারণ মুহূর্তগুলোকে অলৌকিক করে তোলেন। তাঁর কবিতায় প্রেম যেমন তীব্র, তেমনি সমাজের অসংগতি আর মানুষের একাকিত্বের হাহাকারও সমানভাবে মূর্ত। তিনি কেবল নিভৃতচারী কবি নন, বরং তাঁর কলম সবসময় মানবতার পক্ষে সোচ্চার। বাংলা কবিতার পাঠকদের কাছে তিনি এক ধ্রুবতারার মতো, যাঁর আলো নতুন প্রজন্মের কবিদের পথ দেখায়। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে এই মহৎ কবির নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনায় সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন কবির সেই সংবেদনশীল দৃষ্টি দিয়ে জীবন ও জগৎকে দেখতে শিখি এবং নিজেদের সাংস্কৃতিক চেতনাকে আরও উন্নত করি। কবি জয় গোস্বামী তাঁর অমর কাব্যকীর্তির মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যের ভুবনে চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

সুকুমার রায়-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা । ৩০ অক্টোবর

সুকুমার রায়-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। সুকুমার রায়-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ ৩০ অক্টোবর। আজ আমরা এমন এক কালজয়ী স্রষ্টার জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি বাংলা সাহিত্যে ‘ননসেন্স রাইম’ বা আবোল-তাবোল ধারার প্রবর্তক। তিনি আমাদের শৈশবকে রাঙিয়ে দেওয়া সেই প্রিয় মানুষ, যার কল্পনার জগতে হুকোমুখো হ্যাংলা থেকে শুরু করে কাঠবুড়োরা ভিড় করে। তিনি আর কেউ নন—সুকুমার রায়। উপস্থিত সুধী, সুকুমার রায় ১৮৮৭ সালের ৩০ অক্টোবর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক ও মুদ্রণ বিশেষজ্ঞ উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী এবং মা বিধুমুখী দেবী। উল্লেখ্য যে, বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় তাঁরই সুযোগ্য পুত্র। সুকুমার রায় কেবল একজন লেখক বা কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন উচ্চশিক্ষিত বিজ্ঞানী ও আলোকচিত্র শিল্পী। তিনি ইংল্যান্ড থেকে প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র হিসেবে রসায়ন ও পদার্থবিদ্যায় স্নাতক করার পর মুদ্রণ বিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। সুকুমার রায়ের সাহিত্য মানেই কেবল নিছক হাসি নয়, বরং গভীর হিউমার আর যুক্তির এক অপূর্ব মেলবন্ধন। তাঁর ‘আবোল-তাবোল’, ‘হ-য-ব-র-ল’, ‘পাগলা দাশু’ এবং ‘খাই-খাই’ বাংলা সাহিত্যের এমন অমূল্য সম্পদ যা ছোট-বড় সকল পাঠককে সমানভাবে আনন্দ দেয়। তাঁর সৃষ্টিতে আমরা পাই এক আশ্চর্য অদ্ভুত দুনিয়া, যা আমাদের প্রথাগত চিন্তার বাইরে নিয়ে যায়। তাঁর কালজয়ী কিছু পঙক্তি আজও আমাদের মুখে মুখে ঘোরে: “হাঁস ছিল সজারু, (ব্যাকরণ মানি না) হয়ে গেল হাঁসজারু কেমনে তা জানি না।” “বদ্যিনাথ তলায় গো, আছে এক তিল্লাই রে…” মজার ব্যাপার হলো, তাঁর ব্যঙ্গাত্মক লেখাগুলোর গভীরে সমাজ ও মানুষের আচরণের সূক্ষ্ম সমালোচনা লুকিয়ে থাকতো। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে তিনি মারা গেলেও তাঁর রেখে যাওয়া কাজ আজও বাংলা সাহিত্যের আকাশে ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল। প্রিয় সুধী, সুকুমার রায় আমাদের শিখিয়েছেন কল্পনার ডানা মেলে দিতে এবং গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে চিন্তা করতে। তাঁর জীবন ও সাহিত্য আমাদের সৃজনশীল হতে অনুপ্রাণিত করে। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার এই অনন্য স্রষ্টার নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর আত্মার শান্তি কামনায় সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন সুকুমার রায়ের সেই অনাবিল আনন্দ আর সৃজনশীলতাকে আমাদের জীবনে ধারণ করতে পারি। সুকুমার রায় তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে প্রতিটি বাঙালির শৈশবে ও হৃদয়ে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা