আধুনিক বিশ্বে আর্কিটেকচার কেবল ভবন নকশা বা স্থাপত্যশিল্প নয়, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, যেখানে শিল্প, প্রকৌশল, পরিবেশবিদ্যা, এবং নকশা-শিল্প একীভূত হয়। নগরায়ণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং টেকসই উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আর্কিটেকচার টেকনোলজিস্টদের প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বাড়ছে।
বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড (BTEB) পরিচালিত ডিপ্লোমা ইন আর্কিটেকচার টেকনোলজি হলো চার বছরের একটি পূর্ণাঙ্গ কারিগরি শিক্ষা কর্মসূচি, যা শিক্ষার্থীদেরকে বাস্তবভিত্তিক স্থাপত্য শিক্ষা, ডিজাইন দক্ষতা, সফটওয়্যার ব্যবহারে দক্ষতা, নির্মাণ-পরিচালনা জ্ঞান এবং সৃজনশীল চিন্তার প্রশিক্ষণ দেয়।
ডিপ্লোমা ইন আর্কিটেকচার টেকনোলজি
কোর্স কাঠামো ও মেয়াদ
ডিপ্লোমা ইন আর্কিটেকচার প্রযুক্তি একটি ৪ বছরের প্রোগ্রাম, যা মোট ৮টি সেমিস্টারে বিভক্ত। প্রতিটি সেমিস্টারে শিক্ষার্থীরা তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক উভয় ধরনের শিক্ষা গ্রহণ করে।
মূল বিষয়সমূহ:
- প্রথম বর্ষ:
- প্রাথমিক স্থাপত্য নকশা (Basic Design)
- স্থাপত্য অঙ্কন ও ড্রাফটিং (Architectural Drafting)
- জ্যামিতি ও ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রইং
- কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন (AutoCAD পরিচিতি)
- বিল্ডিং ম্যাটেরিয়ালস
- দ্বিতীয় বর্ষ:
- আর্কিটেকচারাল ডিজাইন স্টুডিও – I
- বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন টেকনিক
- সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বেসিকস
- মডেল মেকিং ও প্রেজেন্টেশন
- কম্পিউটার গ্রাফিক্স (2D & 3D Visualization)
- তৃতীয় বর্ষ:
- আর্কিটেকচারাল ডিজাইন স্টুডিও – II
- বিল্ডিং সার্ভিস (Electrical, Plumbing, Sanitation)
- ল্যান্ডস্কেপ আর্কিটেকচার
- ইন্টেরিয়র ডিজাইন বেসিকস
- স্ট্রাকচারাল মেকানিক্স
- চতুর্থ বর্ষ:
- আর্কিটেকচারাল ডিজাইন স্টুডিও – III
- টাউন প্ল্যানিং ও আরবান ডিজাইন
- টেকসই স্থাপত্য (Sustainable Architecture)
- প্রফেশনাল প্র্যাকটিস ও কন্ট্রাক্ট ম্যানেজমেন্ট
- ফাইনাল প্রজেক্ট (Thesis Project)
শিক্ষাদান পদ্ধতি
এই প্রোগ্রামে তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা ডিজাইন স্টুডিও, কম্পিউটার ল্যাব, সাইট ভিজিট, প্রজেক্ট ওয়ার্কশপ, মডেল তৈরি এবং সফটওয়্যার ট্রেনিং এর মাধ্যমে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ পায়।
প্রধান সফটওয়্যার প্রশিক্ষণ:
- AutoCAD
- 3ds Max
- Revit Architecture
- SketchUp
- Adobe Photoshop (প্রেজেন্টেশনের জন্য)
ভর্তি যোগ্যতা
- এসএসসি/সমমান পরীক্ষায় ন্যূনতম জিপিএ ২.৫০ থাকতে হবে।
- বিজ্ঞান শাখার শিক্ষার্থীরা অগ্রাধিকার পায়, তবে অন্যান্য শাখার শিক্ষার্থীরাও আবেদন করতে পারে।
- ভর্তি পরীক্ষা/মেধার ভিত্তিতে আসন বণ্টন হয়।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র
ডিপ্লোমা ইন আর্কিটেকচার টেকনোলজিতে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের জন্য দেশি-বিদেশি নানা সুযোগ রয়েছে।
কর্মক্ষেত্র:
- স্থাপত্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান (Architectural Consultancy Firms)
- ইন্টেরিয়র ডিজাইন কোম্পানি
- নির্মাণ কোম্পানি
- রিয়েল এস্টেট সেক্টর
- সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়ন প্রকল্প
- স্থানীয় সরকার ও নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ
- আন্তর্জাতিক চাকরির বাজার (মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া, ইউরোপ ইত্যাদি)
উচ্চশিক্ষার সুযোগ
ডিপ্লোমা শেষ করার পর শিক্ষার্থীরা চাইলে—
- বুয়েট, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়েArch (Bachelor of Architecture)-এ ভর্তি হতে পারে।
- বিদেশেও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্ডারগ্রাজুয়েট প্রোগ্রামে ভর্তির সুযোগ থাকে।
ডিপ্লোমা ইন আর্কিটেকচারের গুরুত্ব
১. সৃজনশীলতা ও প্রযুক্তির সমন্বয়: স্থাপত্য শিক্ষা শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল চিন্তাকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সঙ্গে একীভূত করে।
২. ক্যারিয়ার সম্ভাবনা: দেশে-বাইরে আর্কিটেকচার টেকনোলজিস্টদের চাহিদা ক্রমবর্ধমান।
৩. টেকসই উন্নয়ন: পরিবেশবান্ধব স্থাপত্য ও সবুজ প্রযুক্তি বিষয়ে এই প্রোগ্রামে বিশেষ জোর দেওয়া হয়।
৪. উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ: অনেক শিক্ষার্থী নিজস্ব ডিজাইন ফার্ম বা ইন্টেরিয়র ডিজাইন কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে উদ্যোক্তা হিসেবে সফল হচ্ছে।

বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড পরিচালিত ডিপ্লোমা ইন আর্কিটেকচার টেকনোলজি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সৃজনশীল ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের দ্বার উন্মোচন করে। এখানে কেবল নকশা বা আঁকাজোঁকা শেখানো হয় না, বরং একজন শিক্ষার্থীকে পূর্ণাঙ্গ পেশাদার আর্কিটেকচার টেকনোলজিস্ট হিসেবে গড়ে তোলা হয়।
দেশীয় উন্নয়ন প্রকল্প থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্থাপত্যশিল্পের বিকাশে এই ডিপ্লোমা একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম। যারা শিল্প, নকশা, প্রযুক্তি এবং সৃজনশীলতার মেলবন্ধন ঘটিয়ে ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের জন্য ডিপ্লোমা ইন আর্কিটেকচার টেকনোলজি হতে পারে সর্বোত্তম নির্বাচন।