বাংলাদেশ একটি ক্রমবর্ধমান শিল্পোন্নত দেশ। এখানে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি থেকে শুরু করে টেক্সটাইল, ফার্মাসিউটিক্যাল, ফুড প্রসেসিং, সিমেন্ট, পেট্রোকেমিক্যাল ও সার শিল্প দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। এই শিল্পগুলোর জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে কারিগরি শিক্ষার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে ডিপ্লোমা ইন কেমিক্যাল টেকনোলজি একটি বিশেষায়িত শিক্ষাক্রম, যা বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড (BTEB) অনুমোদিত চার বছর মেয়াদী ডিপ্লোমা প্রোগ্রাম হিসেবে পরিচালিত হয়ে আসছে।
ডিপ্লোমা ইন কেমিক্যাল টেকনোলজি
শিক্ষাক্রমের কাঠামো
ডিপ্লোমা ইন কেমিক্যাল টেকনোলজি সাধারণত চার বছর মেয়াদী, যেখানে মোট ৮টি সেমিস্টার রয়েছে। প্রতিটি সেমিস্টারে শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট কিছু তত্ত্বীয় ও ব্যবহারিক (ল্যাবভিত্তিক) কোর্স সম্পন্ন করে।
প্রধান কোর্সসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
- বেসিক কেমিস্ট্রি (Inorganic, Organic, Physical, Analytical)
- কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ক্যালকুলেশন
- ইন্ডাস্ট্রিয়াল কেমিস্ট্রি (ফার্মাসিউটিক্যাল, ফার্টিলাইজার, পেইন্ট, টেক্সটাইল প্রসেসিং)
- ইউনিট অপারেশন ও প্রসেস কন্ট্রোল
- ইন্সট্রুমেন্টাল অ্যানালাইসিস
- পলিমার ও পেট্রোকেমিক্যাল টেকনোলজি
- এনভায়রনমেন্টাল কেমিস্ট্রি ও ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট
- প্রসেস ইকুইপমেন্ট ডিজাইন
- ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেফটি ও হ্যাজার্ড ম্যানেজমেন্ট
ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ
শিক্ষার্থীদের ল্যাবে বিভিন্ন প্রক্রিয়া যেমন টাইট্রেশন, স্পেকট্রোফটোমিটার ব্যবহার, ডিস্টিলেশন, ক্রোমাটোগ্রাফি, ফ্লুইড ফ্লো, হিট ট্রান্সফার প্রভৃতি বিষয়ে হাতে-কলমে শিক্ষা দেওয়া হয়।
দক্ষতা অর্জন
এই কোর্স শেষে শিক্ষার্থীরা—
- কেমিক্যাল বিশ্লেষণ ও গুণগত মান নিয়ন্ত্রণে দক্ষতা অর্জন করে।
- শিল্পকারখানায় কেমিক্যাল প্রসেস ডিজাইন ও অপারেশনে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়।
- পরিবেশ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় সচেতন হয়ে উঠে।
- গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) কাজে প্রাথমিক দক্ষতা অর্জন করে।
- আধুনিক সফটওয়্যার ব্যবহার করে ডাটা অ্যানালাইসিস ও প্রসেস সিমুলেশন শিখে নেয়।
ভর্তি যোগ্যতা
- এসএসসি (সাধারণ/ভোকেশনাল) বা সমমান পরীক্ষায় ন্যূনতম জিপিএ ২.৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা আবেদন করতে পারে।
- বিজ্ঞান বিভাগ থেকে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা এখানে বেশি সুযোগ পেয়ে থাকে।
কর্মক্ষেত্র ও ক্যারিয়ার সম্ভাবনা
ডিপ্লোমা ইন কেমিক্যাল টেকনোলজির শিক্ষার্থীদের জন্য বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিস্তৃত কর্মক্ষেত্র রয়েছে।
দেশীয় শিল্পে:
- সার কারখানা (BCIC এর অধীন বিভিন্ন ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরি)
- টেক্সটাইল ও ডাইং ইন্ডাস্ট্রি
- ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি
- ফুড প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রি
- সিমেন্ট ও সিরামিক শিল্প
- তেল, গ্যাস ও পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প
- ওয়াটার ট্রিটমেন্ট ও এনভায়রনমেন্টাল ম্যানেজমেন্ট
বিদেশে:
মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, কোরিয়া ও ইউরোপে কেমিক্যাল টেকনোলজিস্টদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে তেল-গ্যাস ও পেট্রোকেমিক্যাল সেক্টরে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা ভালো অবস্থানে কাজ করছেন।
উচ্চশিক্ষার সুযোগ
ডিপ্লোমা শেষে শিক্ষার্থীরা—
- বিএসসি ইন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং (বিশেষ ভর্তির সুযোগ)
- বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং, এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং ইত্যাদি কোর্সে ভর্তি হতে পারে।
- বিভিন্ন প্রফেশনাল ট্রেনিং ও সার্টিফিকেশন (ISO, OSHA, Safety Management) গ্রহণ করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও দক্ষ হতে পারে।
জাতীয় উন্নয়নে গুরুত্ব
কেমিক্যাল প্রযুক্তি শিল্পায়নের অন্যতম ভিত্তি। বাংলাদেশে সার, ওষুধ, খাদ্য, বস্ত্র, প্লাস্টিক, প্রসাধনী ইত্যাদি প্রতিটি খাতেই কেমিক্যাল টেকনোলজির ব্যবহার অপরিহার্য। ফলে দক্ষ কেমিক্যাল ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার তৈরি করা মানে জাতীয় অর্থনীতিকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা এবং আমদানি নির্ভরতা কমানো।

ডিপ্লোমা ইন কেমিক্যাল টেকনোলজি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সময়োপযোগী ও সম্ভাবনাময় কারিগরি শিক্ষা কর্মসূচি। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা শুধু শিল্প ও উৎপাদন খাতেই নয়, গবেষণা, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও উদ্যোক্তা খাতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড পরিচালিত এই কোর্স জাতীয় শিল্প উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি আয়ে বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখছে।