গুরুকুল ক্যাম্পাস লার্নিং নেটওয়ার্ক, GCLN

নবান্ন ও হেমন্ত উৎসব উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো।

নবান্ন ও হেমন্ত উৎসব উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা

সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ,

আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই হেমন্তের শিশিরভেজা প্রীতি ও নবান্নের শুভেচ্ছা।

আজ আমরা সমবেত হয়েছি বাঙালির প্রাণের মেলা, ঋতুচক্রের এক অপূর্ব সন্ধিক্ষণ ‘হেমন্ত উৎসব’ ও ‘নবান্ন’ উদযাপন করতে। যখন কার্তিকের কুয়াশাভেজা ভোর পেরিয়ে ১লা অগ্রহায়ণ আমাদের দুয়ারে কড়া নাড়ে, তখন বাংলার দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠ সোনালি রঙে সেজে ওঠে। আর সেই সাথে শুরু হয় বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য—নবান্ন।

উপস্থিত সুধী,

হেমন্ত ঋতুটি হলো শান্তি ও সমৃদ্ধির ঋতু। বর্ষার উন্মাদনা আর শীতের জড়তার মাঝে হেমন্ত আসে এক শান্ত স্নিগ্ধতা নিয়ে। এই ঋতুর সবচেয়ে বড় অলঙ্কার হলো নবান্ন। ‘নবান্ন’ শব্দের অর্থ ‘নতুন অন্ন’। প্রাচীনকাল থেকেই বাঙালি কৃষক যখন মাঠের আমন ধান কেটে প্রথম ঘরে তোলে, তখন সেই চাল দিয়ে তৈরি করা হয় প্রথম আহার। বাড়ির আঙিনায় ঢেঁকির শব্দে মুখর হয়ে ওঠে পাড়া-মহল্লা। ঘরে ঘরে নতুন চালের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি হয় হরেক রকমের পিঠা, পায়েস, ক্ষীর আর মুড়ি-মুড়কি।

নবান্ন কেবল একটি ভোজন উৎসব নয়; এটি আমাদের যূথবদ্ধ জীবনের প্রতীক। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে গ্রামে গ্রামে মেলা বসে, নাগরদোলা ঘোরে, জারি-সারি ও বাউল গানের আসর বসে। উঠোনে আলপনা আঁকা হয়, আর নতুন ধানের সুবাসে আত্মীয়-স্বজনের আগমনে মুখর হয়ে ওঠে প্রতিটি গৃহকোণ। রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের ভাষায়:

“আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে— এই বাংলায় / হয়তো মানুষ নয়— হয়তো বা শঙ্খচিল শালিখের বেশে; / হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে।”

প্রিয় সুধী,

আজকের এই যান্ত্রিক ও নাগরিক জীবনে আমরা যখন নিজেদের শেকড় হারিয়ে ফেলছি, তখন এই উৎসবগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা কে। আমাদের সংস্কৃতিই আমাদের মেরুদণ্ড।

আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর প্রায়শই একটি অত্যন্ত গভীর কথা বলেন—

“প্রতিজন মানুষের নৃতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় এমন এক ধরণের পরিচয় যা বদলানো যায় না। একজন মানুষ তার নিজের সেই সংস্কৃতি যখন চর্চা করে এবং তা উন্নত করতে কাজ করে, তখন সেই সংস্কৃতি তাকে পরিপূর্ণ এবং ‘ওয়েল ফর্মড’ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করে। আপনি নিজের সংস্কৃতির সাথে যুক্ত থাকলে বিশ্বের অন্য জাতিগোষ্ঠীর কাছে সম্মানিত হবেন। কিন্তু নিজের সংস্কৃতি বাদ দিয়ে অন্য সংস্কৃতির চর্চা করলে তা কখনোই আপনাকে পূর্ণ মানুষ হতে দেবে না। তাই আমরা বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতিগুলোর চর্চা ও প্রতিনিয়ত উন্নয়ন করতে কাজ করতে চাই।”

সেই দর্শনে দীক্ষিত হয়েই আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে আমাদের কৃষ্টিকে নতুনভাবে চিনে নিতে চাই। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের এই নবান্ন, আমাদের এই পিঠা-পুলির উৎসব—এসবই আমাদের জাতিগত অস্তিত্ব। আমরা যখন বিশ্বনাগরিক হওয়ার স্বপ্ন দেখি, তখন আমাদের এই অনন্য বাঙালি সংস্কৃতিই হবে বিশ্বের দরবারে আমাদের শ্রেষ্ঠ পরিচয়।

সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই নবান্ন ও হেমন্ত উৎসবে আমাদের কৃষিজীবী মানুষের সমৃদ্ধি কামনা করি এবং সমৃদ্ধ আগামীর প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন আধুনিকতার মোহে আমাদের শেকড় আর আমাদের ঐতিহ্যের এই সোনার বাংলাকে কখনো ভুলে না যাই।

হেমন্তের এই শান্ত শ্রী আর নবান্নের এই অকৃত্রিম আনন্দ প্রতিটি মানুষের মনে স্থায়ী হয়ে থাকুক।

ধন্যবাদ সবাইকে।

জয় বাংলা!

জয় গুরুকুল!

আরও দেখুন: