গুরুকুলের নবীন বরণ ও বিদায় অনুষ্ঠানের মাহেন্দ্রক্ষণে একজন বিদায়ী শিক্ষার্থীর পক্ষ থেকে একটি বক্তব্য পরবর্তি শিক্ষার্থীদের জণ্য আপলোড করে রাখা হলো:
নবীন বরণ ও বিদায় অনুষ্ঠানের বিদায়ী শিক্ষার্থীর বক্তব্য
সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ,
আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা।
আজকের দিনটি আমাদের জন্য এক মিশ্র অনুভূতির। একদিকে আমাদের ছোট ভাই-বোনদের বরণ করে নেওয়ার আনন্দ, অন্যদিকে আমাদের বিদায়ের করুণ সুর। বিদায় মানেই শেষ নয়, বরং বিদায় হলো এক নতুন দিগন্তের পথে যাত্রার শুরু। তবুও, এই ক্যাম্পাস, এই প্রিয় মুখগুলো আর এই চেনা আঙিনা ছেড়ে যাওয়ার মুহূর্তটি অত্যন্ত ভারী হয়ে উঠেছে।
সুধীজন,
আজ থেকে কয়েক বছর আগে আমরা যখন ঠিক আপনাদের মতো নবীন হিসেবে এই গুরুকুলের দুয়ারে পা রেখেছিলাম, তখন আমাদের চোখে ছিল অনেক স্বপ্ন আর মনে ছিল এক অজানা শঙ্কা। কিন্তু গুরুকুল আমাদের কেবল একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং একটি পরিবার হিসেবে আগলে রেখেছে। এখানকার শিক্ষকরা আমাদের শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেননি, বরং শিখিয়েছেন কীভাবে একজন সত্যিকারের মানুষ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়।
প্রিয় নবীন বন্ধু ও ছোট ভাই-বোনেরা,
আজ আপনাদের যাত্রা শুরু হলো। আপনারা এমন এক প্রতিষ্ঠানে এসেছেন যেখানে আধুনিক প্রযুক্তি আর নৈতিক শিক্ষার এক অপূর্ব সমন্বয় রয়েছে। গুরুকুল অনলাইন লার্নিং নেটওয়ার্কের এই বিশাল জ্ঞানভাণ্ডারকে আপনারা কাজে লাগাবেন—এটাই আমাদের প্রত্যাশা। মনে রাখবেন, সময় অত্যন্ত মূল্যবান। প্রতিটি দিনকে কাজে লাগান, কৌতূহলী হোন এবং অজানাকে জানার নেশায় মত্ত থাকুন। আজ আমরা যে জায়গাটি আপনাদের জন্য খালি করে যাচ্ছি, আপনারা আপনাদের মেধা আর সৃজনশীলতা দিয়ে সেই জায়গাটি আরও উজ্জ্বল করে তুলবেন।
প্রিয় শিক্ষকবৃন্দ ও গুরুকুল কর্তৃপক্ষ,
আপনাদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। আমাদের ভুলগুলোকে আপনারা পরম মমতায় শুধরে দিয়েছেন। জীবনের কঠিন পিচ্ছিল পথে কীভাবে ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হয়, সেই দীক্ষা আমরা আপনাদের কাছ থেকেই পেয়েছি। আজ আমরা যেটুকু অর্জন করেছি, তার সিংহভাগই আপনাদের ত্যাগ আর অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল। আপনাদের শেখানো আদর্শকে আমরা আমাদের হৃদয়ে লালন করব সারাজীবন।
সুধীজন,
আজ বিদায় বেলায় আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর স্যারের প্রতিটি আদর্শিক শিক্ষা বারবার মনে পড়ছে। তাঁর সান্নিধ্যে আমরা জীবনের যে গূঢ় সত্যগুলো জেনেছি, তা আমাদের আজীবন পথ দেখাবে। স্যার সবসময় আমাদের হৃদয়ের পরিশুদ্ধির কথা বলতেন। তিনি বলতেন— “কাপড়ে নয়, সব অসুন্দর, অসত্য, নীচতা থেকে মনের হিজাব করো।” অর্থাৎ বাইরের আবরণের চেয়ে ভেতরের পবিত্রতা আর নৈতিকতাকে তিনি সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দিতেন।
তিনি আমাদের মহান মানুষদের আদর্শে অনুপ্রাণিত করতে গিয়ে বলতেন— “বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়।” স্যারের এই কথাগুলো আজ আমাদের চেতনায় প্রদীপের মতো জ্বলছে। তাঁর আরও কত কথা, কত স্মৃতি আজ এই বিদায়ক্ষণে মনের মধ্যে বায়োস্কোপের মতো একে একে সরে যাচ্ছে।
বিদায়ের এই ক্ষণে,
সাফল্য মানে কেবল একটি ভালো চাকরি বা অনেক অর্থ উপার্জন নয়; সাফল্য মানে হলো নিজের অর্জিত জ্ঞান দিয়ে সমাজের অন্ধকার দূর করা। আমরা যখন এই চত্বর থেকে কর্মজীবনের বিশাল পৃথিবীতে পা রাখছি, তখন আমাদের অঙ্গীকার হলো—আমরা যেখানেই যাই না কেন, গুরুকুলের মান সমুন্নত রাখব। আমরা যেন আর্তমানবতার সেবায় এবং দেশের কল্যাণে নিজেদের উৎসর্গ করতে পারি, সেই আশীর্বাদ প্রার্থী।
শেষ করতে ইচ্ছে করছে না, তবুও শেষ করতে হবে,
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় বলতে চাই— “যেতে নাহি দিব, হায়, তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়।” সময় বয়ে যাবে, আমরা হয়তো ব্যক্তিগত জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়ব, কিন্তু গুরুকুলের প্রতিটি ধূলিকণা আর স্মৃতি আমাদের হৃদয়ে অম্লান থাকবে।
প্রিয় নবীন বন্ধুদের জন্য রইল অফুরন্ত শুভকামনা আর আমাদের জন্য রইল এক বুক স্মৃতি। ভালো থেকো গুরুকুল, ভালো থাকুন প্রিয় শিক্ষকমণ্ডলী।
ধন্যবাদ জানাই সবাইকে এই সুন্দর আয়োজনের জন্য।
জয় গুরুকুল,
জয় গুরুকুল,
বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।
আরও দেখুন: