সুকুমার রায়-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো।
সুকুমার রায়-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা
সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ,
আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা।
আজ ৩০ অক্টোবর। আজ আমরা এমন এক কালজয়ী স্রষ্টার জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি বাংলা সাহিত্যে ‘ননসেন্স রাইম’ বা আবোল-তাবোল ধারার প্রবর্তক। তিনি আমাদের শৈশবকে রাঙিয়ে দেওয়া সেই প্রিয় মানুষ, যার কল্পনার জগতে হুকোমুখো হ্যাংলা থেকে শুরু করে কাঠবুড়োরা ভিড় করে। তিনি আর কেউ নন—সুকুমার রায়।
উপস্থিত সুধী,
সুকুমার রায় ১৮৮৭ সালের ৩০ অক্টোবর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক ও মুদ্রণ বিশেষজ্ঞ উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী এবং মা বিধুমুখী দেবী। উল্লেখ্য যে, বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় তাঁরই সুযোগ্য পুত্র। সুকুমার রায় কেবল একজন লেখক বা কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন উচ্চশিক্ষিত বিজ্ঞানী ও আলোকচিত্র শিল্পী। তিনি ইংল্যান্ড থেকে প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র হিসেবে রসায়ন ও পদার্থবিদ্যায় স্নাতক করার পর মুদ্রণ বিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন।
সুকুমার রায়ের সাহিত্য মানেই কেবল নিছক হাসি নয়, বরং গভীর হিউমার আর যুক্তির এক অপূর্ব মেলবন্ধন। তাঁর ‘আবোল-তাবোল’, ‘হ-য-ব-র-ল’, ‘পাগলা দাশু’ এবং ‘খাই-খাই’ বাংলা সাহিত্যের এমন অমূল্য সম্পদ যা ছোট-বড় সকল পাঠককে সমানভাবে আনন্দ দেয়। তাঁর সৃষ্টিতে আমরা পাই এক আশ্চর্য অদ্ভুত দুনিয়া, যা আমাদের প্রথাগত চিন্তার বাইরে নিয়ে যায়। তাঁর কালজয়ী কিছু পঙক্তি আজও আমাদের মুখে মুখে ঘোরে:
“হাঁস ছিল সজারু, (ব্যাকরণ মানি না) হয়ে গেল হাঁসজারু কেমনে তা জানি না।”
“বদ্যিনাথ তলায় গো, আছে এক তিল্লাই রে…”
মজার ব্যাপার হলো, তাঁর ব্যঙ্গাত্মক লেখাগুলোর গভীরে সমাজ ও মানুষের আচরণের সূক্ষ্ম সমালোচনা লুকিয়ে থাকতো। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে তিনি মারা গেলেও তাঁর রেখে যাওয়া কাজ আজও বাংলা সাহিত্যের আকাশে ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল।
প্রিয় সুধী,
সুকুমার রায় আমাদের শিখিয়েছেন কল্পনার ডানা মেলে দিতে এবং গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে চিন্তা করতে। তাঁর জীবন ও সাহিত্য আমাদের সৃজনশীল হতে অনুপ্রাণিত করে।
আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন—
‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’।
সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার এই অনন্য স্রষ্টার নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর আত্মার শান্তি কামনায় সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন সুকুমার রায়ের সেই অনাবিল আনন্দ আর সৃজনশীলতাকে আমাদের জীবনে ধারণ করতে পারি।
সুকুমার রায় তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে প্রতিটি বাঙালির শৈশবে ও হৃদয়ে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন।
ধন্যবাদ সবাইকে।
জয় বাংলা!
জয় গুরুকুল!
আরও দেখুন: