সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা
সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ,
আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা।
আজ ৭ সেপ্টেম্বর। আজ আমরা এমন এক কালজয়ী কথাশিল্পীর জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি গত শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে বাংলা সাহিত্যকে এক নতুন আধুনিকতা ও প্রাণপ্রাচুর্য দান করেছিলেন। তিনি আমাদের প্রিয় ‘নীললোহিত’, আমাদের প্রিয় ‘সনাতন পাঠক’—অমর সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।
উপস্থিত সুধী,
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ১৯৩৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ফরিদপুর জেলার (বর্তমান বাংলাদেশ) মাদারীপুরে জন্মগ্রহণ করেন। দেশভাগের পর তাঁদের পরিবার কলকাতায় চলে গেলেও তাঁর লেখায় ও হৃদয়ে বাংলাদেশ সবসময় এক বিশেষ স্থান জুড়ে ছিল। তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার ও সাংবাদিক। বাংলা সাহিত্যে ১৯৫০-এর দশকে যে নতুন কাব্যধারার সূচনা হয়েছিল, তিনি ছিলেন তার অন্যতম পথিকৃৎ এবং বিখ্যাত সাহিত্য পত্রিকা ‘কৃত্তিবাস’-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাহিত্যকর্মের ব্যপ্তি বিশাল। তাঁর ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘সেই সময়’ ও ‘প্রথম আলো’ বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘একা এবং কয়েকজন’ বাংলা কবিতার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। তিনি কেবল বড়দের জন্যই লেখেননি; তাঁর সৃষ্ট কিশোর গোয়েন্দা চরিত্র ‘কাকাবাবু’ আজও প্রজন্মের পর প্রজন্মকে রোমাঞ্চের স্বাদ দিচ্ছে। ১৯৮৫ সালে তিনি ‘সেই সময়’ উপন্যাসের জন্য ভারতের জাতীয় ‘সাহিত্য অকাদেমি’ পুরস্কারে ভূষিত হন।
তাঁর জনপ্রিয় সৃষ্টির কিছু পঙক্তি ও চরিত্র আজও আমাদের মুখে মুখে ঘোরে:
- “কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটল, কেউ কথা রাখেনি”
- “নীরা, এই জানলার কাছে এসে দাঁড়াও”
- কাকাবাবু ও সন্তুর সেই রোমাঞ্চকর অভিযানগুলো।
প্রিয় সুধী,
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন আপাদমস্তক একজন সংস্কৃতিবান ও আধুনিক মানুষ। তিনি দুই বাংলার সাহিত্যিক ও পাঠকদের মাঝে এক সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করেছেন। তাঁর লেখনীতে যেমন ফুটে উঠেছে নাগরিক জীবনের প্রেম ও একাকিত্ব, তেমনি উঠে এসেছে ইতিহাসের বিশাল ক্যানভাস। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে ইতিহাসের ধূসর পাতা থেকে প্রাণবন্ত মানুষগুলোকে খুঁজে আনতে হয়।
আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন—
‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’।
সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার এই কথাশিল্পীর নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর আত্মার শান্তি কামনায় সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন তাঁর নির্ভীক ও আধুনিক সাহিত্যবোধ থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের জীবনকে জ্ঞান ও মননশীলতায় আলোকিত করতে পারি।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর অবিনশ্বর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের হৃদয়ে চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন।
ধন্যবাদ সবাইকে।
জয় বাংলা!
জয় গুরুকুল!
