১১ই জুলাই ‘সেক্টর কমান্ডার্স ডে’ উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো।
১১ই জুলাই: সেক্টর কমান্ডার্স ডে উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা
সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ,
আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই ঐতিহাসিক ১১ই জুলাই ‘সেক্টর কমান্ডার্স ডে’-র বিনম্র শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা।
আজ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে কলকাতার ৮ নম্বর থিয়েটার রোডে শুরু হয়েছিল এক মহাকাব্যিক সামরিক মহড়া, যা ‘সেক্টর কমান্ডার্স কনফারেন্স ১৯৭১’ নামে পরিচিত। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর সরকারের (প্রবাসী সরকার) প্রধান কার্যালয় বা ওয়ার টাইম হেডকোয়ার্টার হিসেবে ব্যবহৃত হতো ছিল সেই ৮ থিয়েটার রোড। ১১ই জুলাই থেকে ১৭ই জুলাই পর্যন্ত চলা সেই ঐতিহাসিক সম্মেলনের শুরুর দিনটিকে স্মরণ করে গুরুকুল আজ পালন করছে ‘সেক্টর কমান্ডার্স ডে’।

উপস্থিত সুধী,
১৯৭১ সালের মার্চের পর থেকে সারা দেশে যে বিচ্ছিন্ন ও বিশৃঙ্খল প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল, তাকে একটি সুশৃঙ্খল যুদ্ধের রূপ দিতে এই সম্মেলনের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। এই কনফারেন্সের মাধ্যমেই আনুষ্ঠানিকভাবে সমগ্র বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করা হয় এবং প্রতিটি সেক্টরের জন্য একজন করে যোগ্য কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়। প্রধান সেনাপতি জেনারেল আতাউল গণি ওসমানীর নেতৃত্বে এই দিন থেকেই মুক্তিবাহিনীর ‘চেইন অব কমান্ড’ বা প্রশাসনিক কাঠামো পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়। ১১ জুলাই অনুষ্ঠিত বৈঠকে মুজিবনগর সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কর্নেল এম. এ. জি. ওসমানীকে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি (C-in-C) হিসেবে পুনঃনিয়োগ দেয়। এই দিনেই লেঃ কর্নেল আবদুর রবকে সেনাবাহিনী প্রধান এবং গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকারকে উপ-প্রধান সেনাপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই কনফারেন্সটি ১১ জুলাই শুরু হয়ে ১৭ জুলাই পর্যন্ত চলেছিল, যেখানে কমান্ডারদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া এবং যুদ্ধ কৌশল চূড়ান্ত করা হয়।
আজ এই মাহেন্দ্রক্ষণে আমরা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি সেই বীর সেনানী সেক্টর কমান্ডারদের:
১ নম্বর সেক্টর: মেজর জিয়াউর রহমান (পরবর্তীতে মেজর রফিকুল ইসলাম দায়িত্ব পালন করেন)।
২ নম্বর সেক্টর: মেজর খালেদ মোশাররফ (পরবর্তীতে মেজর এ.টি.এম হায়দার দায়িত্ব পালন করেন)।
৩ নম্বর সেক্টর: মেজর কে.এম. শফিউল্লাহ (পরবর্তীতে মেজর এ.এন.এম নূরুজ্জামান দায়িত্ব পালন করেন)।
৪ নম্বর সেক্টর: মেজর সি.আর. দত্ত।
৫ নম্বর সেক্টর: মেজর মীর শওকত আলী।
৬ নম্বর সেক্টর: উইং কমান্ডার এম. খাদেমুল বাশার।
৭ নম্বর সেক্টর: মেজর নাজমুল হক (পরবর্তীতে মেজর কাজী নুরুজ্জামান দায়িত্ব পালন করেন)।
৮ নম্বর সেক্টর: মেজর আবু ওসমান চৌধুরী (পরবর্তীতে মেজর এম.এ. মঞ্জুর দায়িত্ব পালন করেন)।
৯ নম্বর সেক্টর: মেজর এম.এ. জলিল (পরবর্তীতে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন মেজর এম.এ. মঞ্জুর ও মেজর জয়নাল আবেদীন)।
১০ নম্বর সেক্টর: এটি ছিল নৌ-সেক্টর, যা সরাসরি প্রধান সেনাপতির অধীনে ছিল।
১১ নম্বর সেক্টর: মেজর আবু তাহের (পরবর্তীতে মেজর এম. হামিদুল্লাহ খান দায়িত্ব পালন করেন)।
সেক্টর কমান্ডারদের এই সম্মেলনেই যুদ্ধের কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। সাধারণ মানুষ ও তরুণদের সমন্বয়ে গঠিত গেরিলা বাহিনী এবং সম্মুখ সমরের যোদ্ধাদের মাঝে সমন্বয় সাধনের জন্য এটি ছিল এক মাইলফলক। বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধ থেকে একটি সুসংগঠিত সামরিক বাহিনীতে রূপান্তরিত হওয়ার সেই ঐতিহাসিক যাত্রার সূচনালগ্ন ছিল আজকের এই ১১ই জুলাই। আমাদের বীর সেক্টর কমান্ডারদের সেই দূরদর্শী সিদ্ধান্তই বাংলাদেশের বিজয়কে ত্বরান্বিত করেছিল।

প্রিয় সুধী,
একটি জাতির স্বাধীনতা অর্জনের জন্য কেবল আবেগ নয়, প্রয়োজন হয় সুশৃঙ্খল নেতৃত্ব এবং সাংগঠনিক শক্তি। আমাদের মুক্তিবাহিনীর এই সাংগঠনিক কাঠামো আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।
আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এই দিবসের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন—
“১৯৭১ সালের সেক্টর কমান্ডারদের এই ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস কেবল একটি সামরিক পরিকল্পনা ছিল না, এটি ছিল বাঙালির লড়াকু সংস্কৃতির এক সুশৃঙ্খল বহিঃপ্রকাশ। একজন মানুষ যখন তাঁর দেশের ইতিহাসের এই বীরত্বগাথা ও রণকৌশলকে হৃদয়ে ধারণ করে নিজের জীবনকে সুশৃঙ্খল করে তোলে, তখনই সে প্রকৃত ও ওয়েল-ফর্মড মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। আমরা যদি আমাদের এই মুক্তি সংগ্রামের সাংগঠনিক ইতিহাসকে ভুলে যাই, তবে আমাদের জাতীয় পরিচয় অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তাই আমরা মুক্তিবাহিনীর সেই চেইন অব কমান্ড এবং সেক্টর কমান্ডারদের ত্যাগের ইতিহাসকে প্রতিনিয়ত আমাদের জাতীয় জীবনে চর্চা করতে চাই।”
সেই দর্শনে দীক্ষিত হয়েই আমরা আজ এই ‘সেক্টর কমান্ডার্স ডে’ পালন করছি। আমরা বিশ্বাস করি, সেক্টর কমান্ডারদের সেই সাহস ও শৃঙ্খলার শিক্ষা আমাদের প্রজন্মের পর প্রজন্মের জন্য দেশপ্রেমের এক অনন্য পাঠ হয়ে থাকবে।

সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে আমাদের সকল সেক্টর কমান্ডার এবং অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধাদের গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি এবং তাঁদের সুস্বাস্থ্য ও আত্মার শান্তি কামনায় সম্মিলিত প্রার্থনা করি। সেই সাথে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি মহান মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লক্ষ শহীদ ও ২ লক্ষ সম্ভ্রমহারা মা-বোনকে। গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি বাংলাদেশের জাতির পিতা ও মুক্তিযুদ্ধের সুপ্রিম কমান্ডার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদসহ মুক্তিযুদ্ধকালীন সকল নেতৃত্ব এবং জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করা সকল বীর মুক্তিযোদ্ধাকে।
আজ আমরা অঙ্গীকার করি—আমরা যেন তাঁদের সেই ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া এই স্বাধীন বাংলাদেশকে একটি সুশৃঙ্খল ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারি।
বাংলাদেশের সকল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জয় হোক।
ধন্যবাদ সবাইকে।
জয় বাংলা!
জয় বঙ্গবন্ধু!
জয় গুরুকুল!
