গুরুকুল ক্যাম্পাস লার্নিং নেটওয়ার্ক, GCLN

ডেভিড হিউম (David Hume) ছিলেন আঠারো শতকের একজন প্রভাবশালী স্কটিশ দার্শনিক, ইতিহাসবিদ, অর্থনীতিবিদ, গ্রন্থাগারিক এবং প্রাবন্ধিক। তিনি ১৭১১ সালের ২৬ এপ্রিল (পুরানো স্টাইল) বা ৭ মে (নতুন স্টাইল) স্কটল্যান্ডের এডিনবরায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব কাটে বারউইকশায়ারের নিনাভলেসে তাঁদের পারিবারিক ভিটায়। ১৭৩৪ সালে তিনি নিজের উপাধি ‘হোম’ (Home) থেকে পরিবর্তন করে ‘হিউম’ (Hume) করেন, যাতে ইংরেজদের পক্ষে এর সঠিক উচ্চারণ করা সহজ হয়।

ডেভিড হিউম: অভিজ্ঞতাবাদ ও সংশয়বাদের এক অনন্য আলোকবর্তিকা

দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিজ্ঞতাবাদ

ডেভিড হিউমকে জন লক, ফ্রান্সিস বেকন এবং টমাস হবসের সাথে ব্রিটিশ অভিজ্ঞতাবাদের অন্যতম স্তম্ভ মনে করা হয়। তাঁর প্রথম ও প্রধান কাজ ‘A Treatise of Human Nature’ (১৭৩৯-৪০), যেখানে তিনি মানব প্রকৃতির একটি মনস্তাত্ত্বিক ও প্রাকৃতিক ভিত্তি তৈরির চেষ্টা করেন। হিউমের মতে, সমস্ত মানব জ্ঞানের ভিত্তি হলো অভিজ্ঞতা। তিনি যুক্তি দেন যে, ধারণাগুলো অবশ্যই ইন্দ্রিয়জাত অভিজ্ঞতা থেকে উদ্ভূত হতে হবে।

সংশয়বাদ ও কার্যকারণ তত্ত্ব

হিউমের দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো কার্যকারণ (Causality) সংক্রান্ত সংশয়বাদ। তিনি দাবি করেন যে, আমরা যখন কোনো একটি ঘটনাকে অন্য একটি ঘটনার কারণ হিসেবে দেখি, তা আসলে ঘটনার ‘ধ্রুবক সংযোগ’ (Constant conjunction) থেকে আসা এক ধরণের মানসিক অভ্যাস। তিনি যুক্তি দেন যে, কোনো ঘটনা যে অন্য একটি ঘটনার কারণ হবে, তা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে প্রমাণ করা সম্ভব নয়; বরং এটি অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমাদের এক ধরণের বিশ্বাস মাত্র।

নৈতিকতা ও ধর্মতত্ত্ব

নৈতিকতার ক্ষেত্রে হিউম যুক্তি দেন যে, আমাদের নৈতিক মূল্যায়ন বুদ্ধি বা যুক্তির পরিবর্তে আবেগ ও অনুভূতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। তাঁর বিখ্যাত উক্তি হলো— “বুদ্ধি হলো আবেগ বা অনুভূতির দাস” (Reason is and ought only to be the slave of the passions)। এছাড়া ঈশ্বরের অস্তিত্বের জন্য প্রদত্ত ‘টেলিলজিক্যাল’ বা উদ্দেশ্যমূলক যুক্তির বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ডারউইনবাদের পূর্ববর্তী সময়ের সবচেয়ে জোরালো বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টা হিসেবে স্বীকৃত।

প্রভাব ও উত্তরাধিকার

হিউমের দর্শন পরবর্তীকালে ইমানুয়েল কান্টকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। কান্ট স্বীকার করেছিলেন যে, হিউমের কাজই তাঁকে তাঁর “ডগমেটিক স্ল্যাম্বার” বা অন্ধ বিশ্বাস থেকে জাগিয়ে তুলেছিল। হিউম উপযোগবাদ, জ্ঞানতত্ত্ব, বিশ্লেষণধর্মী দর্শন এবং আধুনিক সংজ্ঞানাত্মক বিজ্ঞানের (Cognitive Science) পথপ্রদর্শক হিসেবে আজও স্বীকৃত।

ব্যক্তিগত জীবন ও শেষকাল

হিউম সারাজীবন অবিবাহিত ছিলেন। তাঁর জীবনের অনেকটা সময় তিনি লেখালেখি এবং গবেষণার কাজে ব্যয় করেন। তাঁর ভাতিজা ডেভিড হিউম অফ নিনাভলেস পরবর্তীকালে এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক এবং বিশিষ্ট স্কটিশ ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। ১৭৭৬ সালের ২৫ আগস্ট এই মহান দার্শনিকের মৃত্যু হয়। তাঁকে এডিনবরার ওল্ড কেল্টন সিমেট্রিতে সমাহিত করা হয়।

আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন—

‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’।

সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই জন্মদিনে ডেভিড হিউমকে স্মরণ করি এবং আধুনিক দর্শনে তাঁর অসামান্য অবদানের কথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি।

ডেভিড হিউম
ডেভিড হিউম