বিশ্বজুড়ে নার্স সংকট: স্বাস্থ্যসেবায় এক ক্রমবর্ধমান সংকট

বর্তমান সময়ে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাত নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে উঠেছে নার্স সংকট। ধীরে ধীরে কর্মী সংখ্যা বাড়লেও বিশ্বব্যাপী এখনো লক্ষাধিক হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান পর্যাপ্ত নার্স পাচ্ছে না। এর ফলে সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা অর্জনের অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছে। আজ আমরা নার্স সংকটের পরিসর, কারণ, আঞ্চলিক বৈষম্য, এর প্রভাব এবং সম্ভাব্য চিত্র নিয়ে আলোচনা করবো।

 

বৈশ্বিক চিত্র: বৃদ্ধি ঘাটতি একসাথে

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ২০২৫ সালের মে মাসে State of the World’s Nursing 2025 প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালে বিশ্বে নার্সের সংখ্যা ছিল ২৭.৯ মিলিয়ন। ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯.৮ মিলিয়ন

২০২০ সালে এই ঘাটতি ছিল ৬.২ মিলিয়ন। ২০২৩ সালে ৫.৮ মিলিয়ন নার্সের ঘাটতি ছিল।  অর্থাৎ কিছুটা কমেছে।

ধরা হচ্ছে, পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হলে ২০৩০ সালে ঘাটতি নেমে আসতে পারে ৪.১ মিলিয়নে। তবে নার্সের চাহিদা বাড়তেই থাকবে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বিশ্বে ১০ থেকে ১৩ মিলিয়ন নার্স ও ধাত্রীর পদ ফাঁকা থাকতে পারে।

নার্সিং ২ বিশ্বজুড়ে নার্স সংকট: স্বাস্থ্যসেবায় এক ক্রমবর্ধমান সংকট

 

কারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত? আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বৈষম্য

উচ্চ-আয়ের দেশগুলো

বিশ্বের মাত্র ১৭% জনসংখ্যা উচ্চ-আয়ের দেশে বাস করলেও তারা বিশ্বব্যাপী নার্সদের প্রায় ৪৬% চাকরি দেয়। জার্মানি, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের ঘাটতি মেটাতে বিদেশি নার্সের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করে।

নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশগুলো

সাব-সাহারান আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার কিছু দেশে নার্সের ঘাটতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। সেখানকার নার্সরা উন্নত বেতন ও সুযোগের কারণে ধনী দেশে চলে যাচ্ছে। ফলে স্থানীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে। কিছু বিশেষজ্ঞ একে স্বাস্থ্যখাতে নতুন ধরনের “ঔপনিবেশিকতা” হিসেবেও বর্ণনা করেছেন।

 

সংকটের প্রধান কারণগুলো

⚠️ অবসর কর্মী হ্রাস

আগামী ১০ বছরে বিশ্বব্যাপী ১৭% নার্স অবসরে যাবেন, ফলে কেবল বর্তমান সংখ্যাই ধরে রাখতে ৪.মিলিয়ন নতুন নার্স নিয়োগ প্রয়োজন হবে। করোনা মহামারি এই হার আরও বাড়িয়েছে।

ক্লান্তি কর্মপরিবেশের দুরবস্থা

দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, চাপ, পর্যাপ্ত জনবল না থাকা এবং প্রত্যাশার চেয়ে কম বেতনের কারণে বিশ্বজুড়ে ৪০% নার্স পেশাগত ক্লান্তি ও ৪৩% মানসিক অবসাদে ভুগছেন।

প্রশিক্ষণ সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা

অনেক দেশেই পর্যাপ্ত নার্সিং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রশিক্ষণ সুবিধা, ভালো বেতন ও কর্মপরিবেশের অভাব রয়েছে। এর ফলে পর্যাপ্ত সংখ্যক নতুন নার্স তৈরি করা যাচ্ছে না।

আন্তর্জাতিক মাইগ্রেশন (Brain Drain)

উন্নত দেশগুলো নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নার্স নিয়োগ করে। আফ্রিকা, ক্যারিবিয়ান ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে অভিজ্ঞ নার্স চলে যাওয়ায় স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে।

 

আঞ্চলিক প্রবণতা উদাহরণ

যুক্তরাজ্য জার্মানি

যুক্তরাজ্যে হাজার হাজার নার্সের পদ শূন্য থাকায় ২০২০–২০২৪ সালের মধ্যে ৩২,০০০-এর বেশি বিদেশি প্রশিক্ষিত নার্স নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জার্মানি ২০২৫ সালের মধ্যে ১,৫০,০০০ নার্সের ঘাটতি পূরণের জন্য বিদেশ থেকে নিয়োগ দিচ্ছে।

আফ্রিকা নিম্ন আয়ের দেশগুলো

গাম্বিয়া, ক্যামেরুন ও ঘানায় অল্প বেতনের (< $100/মাস) কারণে নার্সরা দেশ ছাড়ছেন। শুধু ঘানাতেই স্বাস্থ্যকর্মীদের ৪২% দেশ ত্যাগের পরিকল্পনা করছেন।

উত্তর আমেরিকা কানাডা

কানাডায় ২০১৭ সাল থেকে নার্সের শূন্যপদ ২০০% বেড়ে ২০২৩ সালে দাঁড়িয়েছে ২৮,০০০-এরও বেশি। যুক্তরাষ্ট্রেও একই প্রবণতা বিদ্যমান।

 

মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় প্রভাব

রোগীর যত্নে প্রভাব

অপর্যাপ্ত নার্সিং স্টাফের কারণে হাসপাতালে নিরাপদ সেবা বিঘ্নিত হয়। রোগী-নার্স অনুপাত কমে গেলে ভুল চিকিৎসা ও মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে।

অর্থনৈতিক ক্ষতি

একজন নার্সকে প্রশিক্ষণ দিতে দেশের বড় অঙ্কের বিনিয়োগ লাগে। তাই সেবা না দিয়ে বিদেশে চলে গেলে প্রতি নার্সে প্রচুর আর্থিক ক্ষতি হয়।

সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার হুমকি

অসাম্যপূর্ণ নার্স বণ্টনের কারণে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (SDG 3) পূরণে বড় বাধা তৈরি হচ্ছে।

 

করণীয় নীতি প্রস্তাবনা

১. শিক্ষা ও ধরে রাখায় বিনিয়োগ
নতুন নার্স তৈরি করতে বেশি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। বিদ্যমান প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর মান উন্নত করতে হবে। নার্সদের বেতন বাড়াতে হবে এবং পদোন্নতি বা বিশেষ প্রশিক্ষণের মতো ক্যারিয়ার উন্নয়নের সুযোগ দিতে হবে। নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে নার্সরা দীর্ঘদিন পেশায় থাকতে আগ্রহী হয়।

২. নৈতিক নিয়োগ নীতি
উন্নত দেশগুলোকে নার্স নিয়োগের সময় WHO-র নৈতিক নিয়োগ নীতি মেনে চলতে হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়া এমন হতে হবে যাতে নিম্ন আয়ের দেশগুলোর স্বাস্থ্যব্যবস্থায় কোনো ক্ষতি না হয়। সম্ভব হলে উন্নত দেশগুলো নিয়োগের পাশাপাশি উৎস দেশগুলোর নার্স তৈরির প্রকল্পে সহযোগিতা করবে।

৩. টাস্ক শিফটিং (Task Shifting)
হাসপাতাল ও ক্লিনিকে কিছু নিয়মিত কাজ, যেমন রোগীর প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ, ওষুধ সাজানো বা ফলো-আপ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী কর্মীদের দিয়ে করানো যেতে পারে। এতে নার্সরা জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য বেশি সময় দিতে পারবেন এবং রোগীর যত্নের মান বাড়বে।

৪. আন্তর্জাতিক সহায়তা ও অর্থায়ন
নার্স সংকটে থাকা দেশগুলোকে বৈদেশিক সহায়তা বাড়াতে হবে। উন্নত দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে স্বাস্থ্যকর্মী প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহে বিনিয়োগ করতে হবে। এতে এসব দেশের স্বাস্থ্যখাত দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী হবে এবং নার্স সংকট কমবে।

 

কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ

নার্সিং এখন বিশ্বের অন্যতম চাহিদাসম্পন্ন পেশা। বৃদ্ধ জনগোষ্ঠী ও মহামারির প্রভাবে এই পেশার চাকরির সুযোগ আরও বাড়ছে। তবে এ সুযোগ কাজে লাগাতে হলে প্রশিক্ষণ, নৈতিক নিয়োগ ও টেকসই কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

গুরুকুলে নার্সিং ভর্তি বিজ্ঞপ্তি [ Nursing Admission @ Gurukul ]

নার্স সংকট শুধু কর্মী ঘাটতির সমস্যা নয়—এটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংকট। বর্তমানে বিশ্বে ৫.মিলিয়ন নার্স কম রয়েছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এই ঘাটতি ১০ মিলিয়নের বেশি হতে পারে। তাই শিক্ষা, নৈতিক নিয়োগ, ধরে রাখার কৌশল ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় বিনিয়োগ করা এখন সময়ের দাবি।

 

তথ্যসূত্র

  1. State of the World’s Nursing 2025 Report. Geneva: WHO; May 12 2025
  2. Health Policy Watch. “Critical Global Shortage of Nurses Undermines Universal Healthcare.” May 2025 – healthpolicy-watch.news
  3. Nurses International. “Global Nursing Shortage by 2030.” May 2023 – nursesinternational.org
  4. International Council of Nurses. ICN report: Nursing shortage is a global health emergency. Mar 2023 – icn.ch
  5. Financial Times. “Health Worker Shortage Effects.” 2024 – ft.com
  6. The Guardian. “Recruitment of nurses from global south branded ‘new form of colonialism’.” Mar 2024
  7. The Guardian. “UK cuts health aid while hiring nurses” Jan 2025
  8. McKinsey & Company. Nursing in 2023 – mckinsey.com