কবি আজিজুর রহমানের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো।
কবি আজিজুর রহমান এর জন্ম জয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা
সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ,
আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা।
আজ আমরা এমন এক ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি একাধারে কবি, গীতিকার, সম্পাদক এবং নিবেদিতপ্রাণ নাট্য সংগঠক। কর্মবৈচিত্র্যের দিক দিয়ে তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের এক অতলস্পর্শী সব্যসাচী প্রতিভা। তিনি আমাদের প্রিয় কুষ্টিয়ার হাটশ হরিপুর গ্রামের সন্তান—কবি আজিজুর রহমান।
উপস্থিত সুধী,
আজ একটি বিশেষ বিষয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন। আমাদের জাতীয় মন ও মননের প্রতীক বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘চরিতাভিধান’ গ্রন্থে কবির জন্ম তারিখ দেখানো হয়েছে ১৮ জানুয়ারি, ১৯১৭। কিন্তু প্রকৃত তথ্য ও দালিলিক প্রমাণ অনুযায়ী তাঁর সঠিক জন্ম তারিখ ১৮ অক্টোবর, ১৯১৪। একটি জাতির ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে বাংলা একাডেমি এই ভুলের দায় এড়াতে পারে না। আমরা আশা করি, সত্য অনুসন্ধানের মাধ্যমে জাতির এই কীর্তিমান লেখকের সঠিক ইতিহাস বিশ্বদরবারে যথাযথভাবে উপস্থাপিত হবে।
কবি আজিজুর রহমান জন্মেছিলেন এক প্রভাবশালী জমিদার পরিবারে। সেই সময়ের জমিদারদের জীবন-জৌলুস ছিল কিংবদন্তি সমান। কিন্তু কোনো মোহ তাঁকে আবিষ্ট করতে পারেনি। ফরাসি নাট্যকার জ্যাঁ জেঁনের মতো তিনিও যেন নিয়তিকে তুচ্ছ করে প্রান্তিক মানুষের সাথে গড়ে তুলেছিলেন সুনিবিড় সখ্য। সেই আভিজাত্য ত্যাগ করেই তিনি গড়ে তুলেছিলেন নাট্যদল, নিজে করেছেন অভিনয়। গণমানুষের সাথে তাঁর এই নিবিড় সম্পর্কই তাঁকে করেছে গণমানুষের কবি।
অনেকে মনে করেন কবির চেয়ে তাঁর গীতিকার পরিচয়টি অনেক বড়। যদিও বলা হয় তিনি দুই হাজার গান লিখেছেন, কিন্তু তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায় তাঁর গানের সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। বাংলা চলচ্চিত্রের যখন স্বর্ণযুগ, তখন আজিজুর রহমানের গান সেই স্বর্ণযুগের সোনার প্রতিমায় নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছিল। আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে তাঁর সেই কালজয়ী সৃষ্টিসমূহ:
“আমি রূপ নগরের রাজকন্যা রূপের জাদু এনেছি”
“বুঝি না মন যে দোলে বাঁশির সুরে”
“ভবের নাট্যশালায় মানুষ চেনা দায় রে”
“কারো মনে তুমি দিও না আঘাত, সে আঘাত লাগে কাবার ঘরে”
মজার ব্যাপার হলো, যে গানগুলো দশকের পর দশক মানুষের হূদয়ে গেঁথে আছে, সেই গানের গীতিকার যে আজিজুর রহমান—তা হয়তো অনেকেরই অজানা।
পরাধীন মাতৃভূমির স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর গান মুক্তিযোদ্ধাদের মনে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তুলেছিল। “মুজিব এনেছে বাংলাদেশের নতুন সূর্যোদয়” কিংবা “পলাশ ঢাকা কোকিল ডাকা আমারই দেশ ভাই রে”—গানগুলো আমাদের জাতীয় চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এছাড়া জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের পর ইসলামী সংগীত রচনায় কবি আজিজুর রহমানের অসামান্য অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর শেকড় সন্ধানী মনন প্রেম, প্রকৃতি ও দেশপ্রেমকে এক সুতোয় গেঁথেছিল।
প্রিয় সুধী,
আজিজুর রহমান তাঁর ‘ডাইনোসরের রাজ্যে’, ‘জীবজন্তুর কথা’ কিংবা ‘এই দেশ এই মাটি’র মতো জনপ্রিয় গ্রন্থগুলোর মাধ্যমে আমাদের সাহিত্যভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন। তিনি কেবল একজন শিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন বড় মনের মানুষ, যিনি জমিদারি বিলাসিতা ছেড়ে মানুষের দুঃখ-বেদনাকে আপন করে নিয়েছিলেন।
আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন—
‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়‘।
সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার কবির নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই সব্যসাচী শিল্পীর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের শেকড়কে ভুলে না যাই।
কবি আজিজুর রহমান তাঁর কর্মের মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন।
ধন্যবাদ সবাইকে।
জয় বাংলা!
জয় গুরুকুল!
আরও দেখুন: