সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো।
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা
সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ,
আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা।
আজ আমরা এমন এক মহান ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যাঁর নাম উচ্চারণ করলে আজও পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রেরণা জাগে। তিনি ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের কিংবদন্তি নায়ক, আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় ‘নেতাজি’ সুভাষচন্দ্র বসু। কর্মবৈচিত্র্য, অদম্য সাহস আর ত্যাগের মহিমায় তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের এক অতলস্পর্শী সব্যসাচী দেশপ্রেমিক।
উপস্থিত সুধী,
আজ একটি বিশেষ বিষয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন। সুভাষচন্দ্র বসুর জন্ম ১৮৯৭ সালের ২৩ জানুয়ারি উড়িষ্যার কটক শহরে। তাঁর পিতা জানকীনাথ বসু ছিলেন একজন খ্যাতিমান আইনজীবী এবং মাতা প্রভাবতী দেবী। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন এবং ১৯২০ সালে ইংল্যান্ডে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস (ICS) পরীক্ষায় চতুর্থ স্থান অধিকার করেছিলেন। কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের অধীনে চাকরি করার বিলাসিতা তাঁকে মোহাবিষ্ট করতে পারেনি। দেশমাতার মুক্তির নেশায় তিনি আইসিএস থেকে পদত্যাগ করে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন বীরত্বের প্রতীক। ১৯৩৮ ও ১৯৩৯ সালে তিনি দুবার ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। পরবর্তীকালে মতাদর্শগত পার্থক্যের কারণে তিনি কংগ্রেস ত্যাগ করে ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ গঠন করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন তিনি বিশ্বাস করতেন, সশস্ত্র সংগ্রাম ছাড়া ভারতের মুক্তি সম্ভব নয়। সেই সুদূর বার্লিন থেকে টোকিও পর্যন্ত তাঁর রোমাঞ্চকর যাত্রা আজও আমাদের শিহরিত করে। ১৯৪৩ সালে তিনি ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’-এর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং তাঁর অমর স্লোগান— “তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব”—কোটি কোটি মানুষের মনে স্বাধীনতার সূর্যোদয় ঘটিয়েছিল।
অনেকে মনে করেন তাঁর জীবন কেবল যুদ্ধের কথা বলে, কিন্তু তাঁর চিন্তা ছিল অনেক গভীর। তিনি একটি এমন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতেন যেখানে কোনো জাত-পাত বা ধর্মের বৈষম্য থাকবে না। আজাদ হিন্দ ফৌজে তিনি সকল ধর্মের মানুষকে এক পতাকাতলে এনেছিলেন, যা মূলত আমাদের গুরুকুলের ‘প্লুরালিস্ট সোসাইটি’ বা বহুত্ববাদী সমাজেরই মূল ভিত্তি।
মজার ব্যাপার হলো, আজও নেতাজির মহাপ্রয়াণ নিয়ে নানা বিতর্ক ও রহস্য বিদ্যমান। ১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট তাইহোকু বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যুর খবর প্রচার করা হলেও, অনেক ইতিহাসবিদ ও তাঁর অনুসারীরা তা মেনে নিতে পারেননি। তবে বিতর্ক যাই হোক, তাঁর আদর্শ ও সাহসের কাছে কোনো বিতর্কই বড় নয়।
প্রিয় সুধী,
আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন—
‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’।
সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার নেতাজির নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর ত্যাগ ও আদর্শ সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই বীর সেনানীর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের শেকড়কে ভুলে না যাই। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং দেশকে ভালোবাসার যে শিক্ষা তিনি দিয়ে গেছেন, তা যেন আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের পাথেয় হয়।
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু তাঁর দেশপ্রেম ও অজেয় ইচ্ছাশক্তির মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন।
ಧন্যবাদ সবাইকে।
জয় বাংলা!
জয় গুরুকুল!
আরও দেখুন: