গুরুকুল ক্যাম্পাস লার্নিং নেটওয়ার্ক, GCLN

কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো।

কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা

সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ,

আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা।

আজ আমরা এমন এক ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি একাধারে কবি, সাংবাদিক, শিক্ষক এবং সারা বিশ্বের মজলুম ও নিপীড়িত মানুষের অবিনাশী কণ্ঠস্বর। তিনি বিংশ শতাব্দীর উর্দু সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র—কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ।

উপস্থিত সুধী,

ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ ১৯১১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি অবিভক্ত ভারতের শিয়ালকোটে জন্মগ্রহণ করেন। আজকের এই ভাষা আন্দোলনের দেশে দাঁড়িয়ে অনেকে হয়তো অবাক হয়ে ভাবতে পারেন যে, কেন আমরা একজন উর্দু কবিকে উদযাপন করছি। তাঁদের উদ্দেশ্যে আমাদের গুরুকুলের স্পষ্ট অবস্থান হলো—আমাদের ভাষা হিসেবে উর্দুর সাথে কোনো শত্রুতা নেই। আমরা ভাষা আন্দোলন করেছিলাম আমাদের মায়ের ভাষা বাংলার অধিকার প্রতিষ্ঠায়, উর্দুর বিরুদ্ধে নয়। ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ এমন একজন কবি, যিনি প্রগতিশীল লেখক আন্দোলনের তাঁর সময়ের সবচেয়ে বড় নাম। তিনি সবসময় মানবতা, বন্ধুত্ব (দোস্তি), উদারতা (দিলবারি) এবং অকৃত্রিম বন্ধুত্বের (খুলুস) কথা বলেছেন।

তিনি ছিলেন একাধারে প্রেমের ও বিপ্লবের সব্যসাচী কবি। ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ তাঁর আদর্শের কারণে পাকিস্তানে কখনও ক্ষমতার আশ্রয়ে থাকতে পারেননি। সত্য ও ন্যায়ের কথা বলায় জীবনের দীর্ঘ সময় তাঁকে কাটাতে হয়েছে কারান্তরালে অথবা নির্বাসনে। কিন্তু কোনো প্রাচীরই তাঁর কলমকে স্তব্ধ করতে পারেনি। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এদেশের মানুষের ওপর হওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সোচ্চার। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে এসে তিনি লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা—

“হাম কে ঠ্যাহরে আজনবি ইতনি মুদারাতোঁ কে বাদ”

(অর্থাৎ: এত খাতির-যত্নের পরও আমরা যেন আজব এক ভিনদেশি হয়ে রইলাম।)

তাঁর জনপ্রিয় সৃষ্টিগুলো আজও সারা বিশ্বে মানুষের হৃদয়ে গেঁথে আছে। তাঁর কালজয়ী গান ও কবিতার কিছু পঙক্তি আজও আমাদের রক্তে শিহরণ জাগায়:

  • “মুঝসে পহলি সি মহব্বত মেরে মেহবুব না মাঙ”

  • “হাম দেখেঙ্গে, লাজিম হ্যায় কে হাম ভি দেখেঙ্গে”

তাঁর শেকড় সন্ধানী মনন প্রেম, প্রকৃতি ও দ্রোহকে এক সুতোয় গেঁথেছিল। তিনি কেবল একজন কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন বিশাল হৃদয়ের মানুষ, যিনি রাজকীয় বিলাসিতা ছেড়ে মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইকে আপন করে নিয়েছিলেন।

আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন—

‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’।

সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার কবির নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই প্রগতিশীল শিল্পীর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের আদর্শ ও মানবিকতাকে ভুলে না যাই।

কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ তাঁর অবিনশ্বর কর্মের মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন।

ধন্যবাদ সবাইকে।

জয় বাংলা!

জয় গুরুকুল!

আরও দেখুন: