গুরুকুল ক্যাম্পাস লার্নিং নেটওয়ার্ক, GCLN

কবি জীবনানন্দ দাশ-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো।

কবি জীবনানন্দ দাশ-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা

সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ,

আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা।

আজ আমরা এমন এক ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি বাংলা কাব্যসাহিত্যের প্রচলিত ধারাকে বদলে দিয়ে আধুনিকতার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন। তিনি প্রকৃতির শুদ্ধতম কবি, রূপসী বাংলার রূপকার—আমাদের চিরচেনা কবি জীবনানন্দ দাশ।

উপস্থিত সুধী,

কবি জীবনানন্দ দাশ ১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশ) বরিশাল শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সত্যানন্দ দাশ ছিলেন একজন শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক এবং মাতা কুসুমকুমারী দাশ ছিলেন একজন সুপরিচিত কবি। শৈশব থেকেই এক গভীর সাহিত্যিক পরিবেশে তাঁর বেড়ে ওঠা। কর্মজীবনে তিনি অধ্যাপনার সাথে যুক্ত ছিলেন এবং ব্রজমোহন কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন।

জীবনানন্দ দাশ কেবল একজন কবি ছিলেন না; তিনি ছিলেন আধুনিক মানুষের একাকিত্ব, বিষণ্নতা এবং প্রকৃতির রূপমাধুর্যের শ্রেষ্ঠ ভাষ্যকার। তাঁর কবিতায় যে চিত্রকল্প ও শব্দবিন্যাস আমরা দেখি, তা বিশ্বসাহিত্যে বিরল। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কবিতাকে ‘চিত্ররূপময়’ বলে অভিহিত করেছিলেন। জীবনানন্দ তাঁর সৃষ্টিতে বারবার ফিরে এসেছেন নদী, পাখি আর ধানসিঁড়ি তীরের এই বাংলায়।

তাঁর কালজয়ী কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘বনলতা সেন’, ‘রূপসী বাংলা’, ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ এবং ‘বেলা অবেলা কালবেলা’ বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। তাঁর কবিতার কিছু অমর পঙক্তি আজও আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ:

  • “আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে— এই বাংলায়” * “হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে” * “সুরঞ্জনা, আজো তুমি আমাদের পৃথিবীতে আছো” মজার ব্যাপার হলো, নিভৃতচারী এই কবি তাঁর জীবদ্দশায় যতটা না পরিচিত ছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপিগুলো যখন আবিষ্কৃত হয়, তখন তাঁর প্রতিভার বিশালতা সারা বিশ্বকে অবাক করে দেয়। তাঁর ‘মাল্যবান’ উপন্যাসে আমরা এক ভিন্নধর্মী গদ্যকারের পরিচয় পাই।

প্রিয় সুধী,

জীবনানন্দ দাশ তাঁর জীবন ও কর্মের মধ্য দিয়ে আমাদের শিখিয়েছেন মাটির কাছাকাছি থাকতে, তুচ্ছ ঘাস কিংবা সামান্য ঘাসফড়িঙের ভেতরেও সৌন্দর্য খুঁজে পেতে। তিনি ছিলেন একজন শেকড় সন্ধানী মানুষ, যিনি দেশভাগের কষ্ট এবং আধুনিক জীবনের জটিলতাকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে প্রকাশ করেছেন।

আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন—

‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’।

সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার কবির নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই রূপসী বাংলার কবির জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের শেকড় এবং প্রকৃতির প্রতি মমত্ববোধকে ভুলে না যাই।

কবি জীবনানন্দ দাশ তাঁর অবিনশ্বর কর্মের মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন।

ধন্যবাদ সবাইকে।

জয় বাংলা!

জয় গুরুকুল!

আরও দেখুন: [গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা]