পৌষ সংক্রান্তি ও সাকরাইন উৎসব উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো।
পৌষ সংক্রান্তি ও সাকরাইন উৎসব উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা
সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ,
আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই পৌষের হিমেল শুভেচ্ছা এবং সাকরাইনের উষ্ণ অভিনন্দন।
আজ এক বর্ণিল দিন। আজ আমরা এমন এক উৎসব উদযাপন করতে সমবেত হয়েছি, যা আমাদের হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির এক বর্ণাঢ্য বহিঃপ্রকাশ। পৌষ মাসের শেষ দিনে বাঙালির ঘরে ঘরে পালিত হয় ‘পৌষ সংক্রান্তি’, যা পুরান ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ‘সাকরাইন’ নামে এক মহোৎসবে রূপ নেয়। ইংরেজি পঞ্জিকা মতে, প্রতি বছর ১৪ বা ১৫ই জানুয়ারি এই উৎসব উদযাপিত হয়।
উপস্থিত সুধী,
পৌষ সংক্রান্তি মূলত ফসলের উৎসব, এক ঋতু থেকে অন্য ঋতুতে পদার্পণের সন্ধিক্ষণ। আমাদের কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে এই দিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে নতুন ধানের চাল দিয়ে তৈরি হয় হরেক রকমের পিঠা-পুলি—পাটিসাপটা, চিতই, তিলপুলি আর দুধ-পুলি। গুড় আর নারিকেলের ম ম গন্ধে ভরে ওঠে চারপাশ। শীতের এই পিঠা উৎসব বাঙালির পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করে।
অন্যদিকে, এই উৎসবেরই একটি রোমাঞ্চকর দিক হলো ‘সাকরাইন’। বিশেষ করে পুরান ঢাকার আকাশ এই দিনে রঙিন হয়ে ওঠে হাজার হাজার ঘুড়িতে। নাটাই-সুতা নিয়ে ছাদে ছাদে চলে ঘুড়ি কাটাকাটির লড়াই। সন্ধ্যায় আতশবাজি আর ফানুসের আলোয় আলোকিত হয় রাতের আকাশ। সাকরাইন কেবল একটি স্থানীয় উৎসব নয়, এটি বাঙালির আনন্দপ্রিয়তা এবং সাহসিকতার প্রতীক। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রতিকূলতার সুতোয় টান পড়লেও আমরা আকাশের মতো বিশাল আর ঘুড়ির মতো স্বাধীন হতে জানি।
প্রিয় সুধী,
সংস্কৃতিই একটি জাতির প্রাণ। আজকের আধুনিক যুগে যখন আমরা বিশ্বজনীন হওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, তখন এই দেশীয় উৎসবগুলোই আমাদের আত্মপরিচয় টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে।
আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর প্রায়শই একটি অত্যন্ত গভীর কথা বলেন—
“প্রতিজন মানুষের নৃতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় এমন এক ধরণের পরিচয় যা বদলানো যায় না। একজন মানুষ তার নিজের সেই সংস্কৃতি যখন চর্চা করে এবং তা উন্নত করতে কাজ করে, তখন সেই সংস্কৃতি তাকে পরিপূর্ণ এবং ‘ওয়েল ফর্মড’ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করে। আপনি নিজের সংস্কৃতির সাথে যুক্ত থাকলে বিশ্বের অন্য জাতিগোষ্ঠীর কাছে সম্মানিত হবেন। কিন্তু নিজের সংস্কৃতি বাদ দিয়ে অন্য সংস্কৃতির চর্চা করলে তা কখনোই আপনাকে পূর্ণ মানুষ হতে দেবে না। তাই আমরা বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতিগুলোর চর্চা ও প্রতিনিয়ত উন্নয়ন করতে কাজ করতে চাই।”
সেই দর্শনে দীক্ষিত হয়েই আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে আমাদের কৃষ্টিকে নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করি। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের এই পিঠা-পুলি আর ঘুড়ি ওড়ানোর উৎসব কোনো ধর্মের বা গোষ্ঠীর নয়; বরং এটি সর্বজনীন বাঙালির ঐতিহ্য। আমরা যখন বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চাই, তখন আমাদের এই অনন্য সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই পৌষ সংক্রান্তি ও সাকরাইন উৎসবে আমাদের সকলের সমৃদ্ধি কামনা করি এবং বাংলার প্রতিটি ঘরে খুশির আমেজ বয়ে যাওয়ার প্রার্থনা করি। আসুন, আমরা অঙ্গীকার করি—আমরা যেন আধুনিকতার ভিড়ে আমাদের শেকড় আর আমাদের ঐতিহ্যের এই সুন্দর বাংলাকে কখনো হারিয়ে যেতে না দিই।
সংক্রান্তির এই মিষ্টি রোদে আর সাকরাইনের রঙিন আকাশে প্রতিটি বাঙালির জীবন আনন্দময় হয়ে উঠুক।
ধন্যবাদ সবাইকে।
জয় বাংলা!
জয় গুরুকুল!
আরও দেখুন: