গুরুকুল ক্যাম্পাস লার্নিং নেটওয়ার্ক, GCLN

পহেলা ফাল্গুন ও বসন্ত উৎসব উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো।

পহেলা ফাল্গুন ও বসন্ত উৎসব উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা

সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ,

আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই ঋতুরাজ বসন্তের রঙিন শুভেচ্ছা ও আন্তরিক প্রীতি।

আজ প্রকৃতিতে এক নতুন প্রাণের স্পন্দন। শীতের রিক্ততা কাটিয়ে প্রকৃতি আজ সেজেছে নতুন সাজে। শিমুল-পলাশের রক্তিম আভা আর কোকিলের কুহুতানে আজ আমরা বরণ করে নিচ্ছি বাঙালির প্রাণের ঋতু বসন্তকে। আজ পহেলা ফাল্গুন।

উপস্থিত সুধী,

বসন্ত উৎসব কেবল ঋতু পরিবর্তনের বার্তা দেয় না, এটি আমাদের সংস্কৃতির এক বিশাল উৎসব। ‘ফাল্গুনে বিকশিত কাঞ্চন ফুল, ডালে ডালে পুঞ্জিত আম্রমুকুল’—কবিগুরুর এই পঙক্তির মতোই আজ আমাদের মনও বিকশিত হওয়ার দিন। প্রাচীনকাল থেকেই এই জনপদে বসন্ত উদযাপনের রীতি চলে আসছে। মোগল সম্রাট আকবরের সময় থেকে বঙ্গাব্দ গণনার মাধ্যমে ফাল্গুন মাসকে ঘিরে যে উৎসবের সূচনা হয়েছিল, আজ তা আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

পহেলা ফাল্গুন মানেই চারদিকে রঙের খেলা। বাসন্তী রঙের শাড়ি আর পাঞ্জাবিতে সেজে তরুণ-তরুণীরা আজ প্রকৃতির সাথে মিতালি করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি প্রান্ত আজ মেলা, গান আর উৎসবে মুখর। বসন্ত মানেই পুনর্জন্ম; গাছের পুরনো পাতা ঝরে যেমন নতুন কিশলয় গজায়, তেমনি আমাদের মনেও সঞ্চারিত হয় নতুন আশা ও উদ্দীপনা।

প্রিয় সুধী,

বাঙালির ইতিহাসে বসন্তের এক ভিন্ন তাৎপর্যও রয়েছে। ১৯৫২ সালের সেই রক্তঝরা ফাল্গুন মাসেই আমাদের তরুণরা মায়ের ভাষার অধিকার আদায়ে রাজপথ রঞ্জিত করেছিল। তাই এই বসন্ত উৎসব একইসাথে আমাদের আনন্দ এবং আমাদের সাহসের প্রতীক।

আজকের এই বিশ্বায়নের যুগে আমরা যখন যান্ত্রিকতায় ডুবে যাচ্ছি, তখন এই উৎসবগুলোই আমাদের মানবিক ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখে।

আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর প্রায়শই একটি অত্যন্ত গভীর কথা বলেন—

“প্রতিজন মানুষের নৃতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় এমন এক ধরণের পরিচয় যা বদলানো যায় না। একজন মানুষ তার নিজের সেই সংস্কৃতি যখন চর্চা করে এবং তা উন্নত করতে কাজ করে, তখন সেই সংস্কৃতি তাকে পরিপূর্ণ এবং ‘ওয়েল ফর্মড’ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করে। আপনি নিজের সংস্কৃতির সাথে যুক্ত থাকলে বিশ্বের অন্য জাতিগোষ্ঠীর কাছে সম্মানিত হবেন। কিন্তু নিজের সংস্কৃতি বাদ দিয়ে অন্য সংস্কৃতির চর্চা করলে তা কখনোই আপনাকে পূর্ণ মানুষ হতে দেবে না। তাই আমরা বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতিগুলোর চর্চা ও প্রতিনিয়ত উন্নয়ন করতে কাজ করতে চাই।”

সেই দর্শনে অনুপ্রাণিত হয়েই আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বসন্তের রঙে নিজেদের রাঙিয়ে নিয়েছি। আমরা বিশ্বাস করি, এই ফাল্গুন, এই পলাশ আর শিমুল—এসবই আমাদের জাতিগত শৌর্য। আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিই আমাদের বিশ্বদরবারে অনন্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করবে।

সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই বসন্ত উৎসবে মানুষের মনে শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন আধুনিকতার মোহে আমাদের শেকড় আর আমাদের ঐতিহ্যের এই চিরচেনা বাংলাকে কখনো ভুলে না যাই।

বসন্তের এই রঙিন দিনগুলো প্রতিটি বাঙালির জীবনে আনন্দ ও শান্তি বয়ে আনুক।

ধন্যবাদ সবাইকে।

জয় বাংলা!

জয় গুরুকুল!