গুরুকুল ক্যাম্পাস লার্নিং নেটওয়ার্ক, GCLN

মহাকবি কায়কোবাদ-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো।

মহাকবি কায়কোবাদ-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা

সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ,

আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা।

আজ আমরা এমন এক মহীরুহের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মুসলিম কবিদের মধ্যে প্রথম মহাকাব্য রচনার গৌরব অর্জন করেছিলেন। তিনি আমাদের সাহিত্যের ‘মহাকবি’—কায়কোবাদ।

উপস্থিত সুধী,

মহাকবি কায়কোবাদ ১৮৫৭ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার আগলা পূর্বপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম কাজেম আল কোরেশী। মহাকবি কায়কোবাদ ছিলেন একাধারে কবি এবং একজন নিষ্ঠাবান ডাকঘর কর্মকর্তা। কর্মজীবনের ব্যস্ততার মাঝেও তিনি যেভাবে মহাকাব্য ও কাব্যগ্রন্থের বিশাল ভাণ্ডার রেখে গেছেন, তা তাঁর একাগ্রতা ও দেশপ্রেমেরই বহিঃপ্রকাশ।

পারিবারিক আভিজাত্য বা সামাজিক প্রতিষ্ঠার চেয়েও বড় ছিল তাঁর সাহিত্যিক সাধনা। তিনি ছিলেন এমন একজন শিল্পী যিনি মধ্যযুগীয় কাব্যধারার সাথে আধুনিক কাব্যরীতির মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের ঐতিহাসিক পটভূমিতে রচিত তাঁর কালজয়ী মহাকাব্য ‘মহাশ্মশান’ বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সম্পদ। এছাড়াও ‘অশ্রুমালা’, ‘শিব-মন্দির’ এবং ‘অমিয় ধারা’র মতো কাব্যগ্রন্থগুলো তাঁর কবিত্ব শক্তির পরিচয় দেয়।

কায়কোবাদের সাহিত্যকর্মের এক প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল হিন্দু-মুসলিম মিলনের সুর এবং গভীর দেশপ্রেম। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি জাতির উন্নতির জন্য ধর্মীয় সম্প্রীতি ও ইতিহাস সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। তাঁর অমর পঙক্তি আজও আমাদের জাতীয় জীবনে প্রাসঙ্গিক:

“পাখিরা সব কলরব করিছে আকাশে/ প্রকৃতি সাজিয়া আজ নবীন বেশে” (গাওরে গাওরে আজি এ আনন্দ গান)

মজার ব্যাপার হলো, যে সময় মহাকাব্য রচনার ধারাটি প্রায় স্তিমিত হয়ে আসছিল, সেই সময়ে তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে ‘মহাশ্মশান’ রচনা করে বাংলা সাহিত্যে নিজের স্থান স্থায়ী করে নেন। ১৯৩২ সালে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সম্মেলনের মূল অধিবেশনে তাঁকে ‘মহাকবি’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

প্রিয় সুধী,

কায়কোবাদ কেবল একজন কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন নিভৃতচারী সাধক। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে নিজের সংস্কৃতির শিকড়কে আঁকড়ে ধরে বিশ্বসাহিত্যের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়।

আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন—

‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’।

সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার কবির নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই মহাকবির জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের শেকড়কে ভুলে না যাই এবং স্বদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকি।

মহাকবি কায়কোবাদ তাঁর অবিনশ্বর কর্মের মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন।

ধন্যবাদ সবাইকে।

জয় বাংলা!

জয় গুরুকুল!

আরও দেখুন: