কাজী নজরুল ইসলাম-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো।
কাজী নজরুল ইসলাম-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা
সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ,
আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা।
আজ এগারোই জ্যৈষ্ঠ। আজ আমরা এমন এক আগ্নেয়গিরির জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যার কলম পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার গান গেয়েছে, যার সুর বাঙালির হৃদয়ে সাহসের সঞ্চার করেছে। তিনি আমাদের জাতীয় কবি, আমাদের চিরকালের বিদ্রোহী কবি—কাজী নজরুল ইসলাম।
উপস্থিত সুধী,
কাজী নজরুল ইসলাম ১৮৯৯ সালের ২৪ মে (বাংলা পঞ্জিকা মতে ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ই জ্যৈষ্ঠ) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জীবন ছিল এক মহাকাব্যিক লড়াইয়ের গল্প। অতি দারিদ্র্যের কারণে তাঁর শৈশব কেটেছে ‘দুখু মিয়া’ হয়ে, কাজ করেছেন লেটোর দলে, এমনকি রুটির দোকানেও। কিন্তু কোনো প্রতিকূলতাই তাঁর ভেতরের প্রতিভাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। কর্মবৈচিত্র্যের দিক দিয়ে তিনি ছিলেন এক অতুলনীয় সব্যসাচী—তিনি একাধারে কবি, সাংবাদিক, সংগীতজ্ঞ, নাট্যকার এবং সৈনিক।
আজ একটি বিশেষ বিষয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন। নজরুল কেবল প্রেমের কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন সাম্যের কবি। ১৯২২ সালে তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রকাশিত হওয়ার পর বাংলা সাহিত্যে এক অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি হয়। পরাধীন ভারতবর্ষে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে তাঁর কলম ছিল কামানের গোলার মতো শক্তিশালী। ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতার জন্য তাঁকে কারাবরণ করতে হয়েছিল, কিন্তু শিকল পরে তিনি গেয়েছেন শিকল ভাঙার গান।
প্রিয় সুধী,
নজরুলের অবদান কেবল সাহিত্যে সীমাবদ্ধ নয়; তিনি বাংলা সংগীতের এক বিশাল ভাণ্ডার তৈরি করে দিয়ে গেছেন। প্রায় ৩০০০-এর বেশি গান রচনা করেছেন তিনি, যা ‘নজরুল গীতি’ নামে পরিচিত। ধ্রুপদী রাগাশ্রয়ী গান থেকে শুরু করে গজল, শ্যামাসংগীত এবং বিশেষ করে ইসলামী সংগীত রচনায় তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। আজও আমাদের প্রতিটি জাতীয় উৎসবে তাঁর সেই কালজয়ী সৃষ্টিসমূহ নতুন করে প্রাণের সঞ্চার করে:
- “বল বীর— বল উন্নত মম শির!”
- “কারার ঐ লৌহকপাট, ভেঙে ফেল কর রে লোপাট”
- “ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশির ঈদ”
- “মোর প্রিয়া হবে এসো রানী, দেব খোঁপায় তারার ফুল”
১৯৭২ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে কবিকে সপরিবারে বাংলাদেশে আনা হয় এবং তাঁকে বাংলাদেশের জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া হয়। তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনা আজও আমাদের দেশপ্রেমের শ্রেষ্ঠ পাথেয়।
আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন—
‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’।
সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার আমাদের জাতীয় কবির নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন নজরুলের বিদ্রোহী ও মানবিক জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পারি।
কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর অবিনশ্বর কর্মের মধ্য দিয়ে প্রতিটি বাঙালির রক্তে ও চেতনায় চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন।
ধন্যবাদ সবাইকে।
জয় বাংলা!
জয় নজরুল!
জয় গুরুকুল!
আরও দেখুন: