মুনীর চৌধুরী-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো।
মুনীর চৌধুরী-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা
সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ,
আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা।
আজ ১৯ নভেম্বর। আজ আমরা এমন এক প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি একাধারে সাহিত্যিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক এবং বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষাবিদ। তিনি আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের আলোকবর্তিকা—শহীদ মুনীর চৌধুরী।
উপস্থিত সুধী,
মুনীর চৌধুরী ১৯২৫ সালের ১৯ নভেম্বর তৎকালীন ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈত্রিক নিবাস ছিল নোয়াখালী জেলায়। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই মানুষটি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের তুখোড় অধ্যাপক। তিনি কেবল শ্রেণিকক্ষেই পাঠদান করেননি, বরং বাংলা ভাষাকে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত করার ক্ষেত্রে এক অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। টাইপরাইটারের জন্য তাঁর আবিষ্কৃত ‘মুনীর অপটিমা’ কি-বোর্ড লেআউট আজও আমাদের যান্ত্রিক জীবনে বাংলা ব্যবহারের অন্যতম ভিত্তি হয়ে আছে।
মুনীর চৌধুরীর সাহিত্যকর্ম আমাদের জাতীয় সম্পদ। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের উত্তাল সময়ে রাজবন্দী থাকাকালীন তিনি রচনা করেন তাঁর কালজয়ী নাটক ‘কবর’। জেলে বসে এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে রচিত এই নাটকটি আজও আমাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের এক অবিস্মরণীয় দলিল। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’, ‘চিঠি’, ‘দণ্ডকারণ্য’ এবং অনুবাদ নাটক ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ বাংলা নাট্যসাহিত্যের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। সাহিত্য সমালোচনায় তাঁর ‘তুলামূলক সমালোচনা’ এবং ‘বাংলা গদ্যরীতি’ বই দুটি আজ অবধি গবেষকদের জন্য পথপ্রদর্শক।
প্রিয় সুধী,
মুনীর চৌধুরী ছিলেন আপাদমস্তক এক অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল মানুষ। একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোতে তিনি দেশের মাটির মায়া ত্যাগ করেননি। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, স্বাধীনতার সূর্য উদিত হওয়ার মাত্র দুদিন আগে, ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে আল-বদর বাহিনী তাঁকে অপহরণ করে নিয়ে যায় এবং বরেণ্য এই বুদ্ধিজীবীকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। তাঁর শূন্যতা আজও অপূরণীয়।
আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন—
‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’।
সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার এই মহান চিন্তকের নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন মুনীর চৌধুরীর সেই নির্ভীক সত্যবাদিতা ও জ্ঞাননিষ্ঠার আদর্শকে আমাদের শিক্ষা জীবনে পাথেয় করতে পারি।
মুনীর চৌধুরী তাঁর কর্ম ও অসামান্য সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বাঙালির হৃদয়ে এবং বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন।
ধন্যবাদ সবাইকে।
জয় বাংলা!
জয় গুরুকুল!
আরও দেখুন: