বিজ্ঞান ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রীর হাতে গুরুকুল ক্যাম্পাসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন

ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণ এবং কারিগরি শিক্ষার প্রসারে এক নতুন মাইলফলক স্পর্শ করল কুষ্টিয়ার গুরুকুল শিক্ষা পরিবার। বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় বিজ্ঞান ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান কুষ্টিয়া শহরের কালিশংকরপুর এলাকায় অবস্থিত গুরুকুলের নবনির্মিত আধুনিক ক্যাম্পাসের আনুষ্ঠানিক শুভ উদ্বোধন করেছেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মাননীয় মন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান গুরুকুলের শিক্ষা কার্যক্রম এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার প্রসারে প্রতিষ্ঠানটির অগ্রণী ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন: “প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা কেবল দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে না, বরং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথকে ত্বরান্বিত করে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের তরুণ প্রজন্মকে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করা সময়ের দাবি। গুরুকুল এ ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।” উদ্বোধনকৃত এই বিশাল ক্যাম্পাসটি মূলত গুরুকুলের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান ‘কামরুল ইসলাম সিদ্দিক ইন্সটিটিউট’-এর শিক্ষার্থীদের জন্য উৎসর্গ করা হয়েছে। এখানে আধুনিক অবকাঠামো এবং বিশ্বমানের ল্যাবরেটরি সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। এই ক্যাম্পাসে নিয়মিতভাবে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ডিসিপ্লিনে পাঠদান করা হবে, যার মধ্যে রয়েছে – ডিপ্লোমা ইন সিভিল, মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল, পাওয়ার, কম্পিউটার ও টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং। ফিতা কেটে উদ্বোধন শেষে মাননীয় মন্ত্রী প্রতিষ্ঠানের অত্যাধুনিক কম্পিউটার ল্যাব, সিভিল ল্যাব এবং ইলেকট্রিক্যাল ওয়ার্কশপসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ঘুরে দেখেন। এসময় গুরুকুল প্রমুখ এবং প্রখ্যাত তথ্যপ্রযুক্তিবিদ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর মাননীয় মন্ত্রীকে ল্যাবরেটরিগুলোর সক্ষমতা এবং গবেষণার সুযোগ সম্পর্কে বিস্তারিত ব্রিফিং প্রদান করেন। মন্ত্রী শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী প্রকল্পগুলো দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন গুরুকুলের চেয়ারম্যান আজিজা আহমেদ, প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিভাগের প্রধানগণ এবং কুষ্টিয়ার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। গুরুকুল কর্তৃপক্ষ জানায়, এই নতুন ক্যাম্পাসটি শিক্ষার্থীদের জন্য কেবল একটি ভবন নয়, বরং এটি একটি গবেষণাকেন্দ্র এবং দক্ষতা উন্নয়নের ‘হাব’ হিসেবে কাজ করবে। শিক্ষার্থীদের জন্য প্রযুক্তিসম্পন্ন ও অনুকূল শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং পড়াশোনা শেষে তাদের কর্মসংস্থানের উপযোগী করে গড়ে তোলাই এই ক্যাম্পাসের মূল লক্ষ্য। মাননীয় মন্ত্রীর এই সফর এবং নতুন ক্যাম্পাসের উদ্বোধন কুষ্টিয়ার কারিগরি শিক্ষার ইতিহাসে একটি বিশেষ দিকচিহ্ন হয়ে থাকবে। এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে গুরুকুল শিক্ষা পরিবার দেশের দক্ষ মানবসম্পদ গড়ার অঙ্গীকারকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল। আরও দেখুন: গুরুকুল ট্রাস্ট ফান্ডের উপবৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠান ২০১১
ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপ্লোমার ২য় ও ৪থ সেমিস্টারের চূড়ান্ত পরীক্ষার নোটিশ
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপ্লোমা কোর্সের ২০১১-২০১২ সেশনের ২য় সেমিস্টার এবং ২০১০-২০১১ সেশনের ৪র্থ সেমিস্টারের চূড়ান্ত পরীক্ষার সময়সূচী ও কেন্দ্র তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। আগামী ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১২ তারিখ থেকে এই পরীক্ষা একযোগে শুরু হতে যাচ্ছে। পরীক্ষা ও সেশনের বিবরণ প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, পরীক্ষার জন্য দুটি পৃথক সেশনের শিক্ষার্থীদের জন্য কেন্দ্র নির্ধারণ করা হয়েছে: ৪র্থ সেমিস্টার (সেশন ২০১০-২০১১): এই সেশনের পরীক্ষার্থীদের জন্য পরীক্ষা কেন্দ্র হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে কুষ্টিয়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট। ২য় সেমিস্টার (সেশন ২০১১-২০১২): এই সেশনের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী ইনস্টিটিউট কেন্দ্রে। পরীক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা পরীক্ষা সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে কর্তৃপক্ষ নিম্নোক্ত নির্দেশনা প্রদান করেছেন: সকল পরীক্ষার্থীকে নির্ধারিত তারিখ ও নির্ধারিত কেন্দ্রে সঠিক সময়ে উপস্থিত থাকতে হবে। পরীক্ষা শুরুর নূন্যতম ৩০ মিনিট আগে কেন্দ্রে প্রবেশ করে নিজ নিজ আসন গ্রহণ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। পরীক্ষার্থীদের প্রবেশপত্র (Admit Card) এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ সঙ্গে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতি সম্পন্ন করার জন্য পর্যাপ্ত সময় ও সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। সুষ্ঠু ও নকলমুক্ত পরিবেশে পরীক্ষা সম্পন্ন করতে কেন্দ্র সচিব ও কক্ষ পরিদর্শকদের বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। পরীক্ষার রুটিন ও কেন্দ্র সংক্রান্ত কোনো জটিলতা থাকলে শিক্ষার্থীদের দ্রুত নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক শাখার সাথে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। দেশের কারিগরি শিক্ষার মানোন্নয়নে এবং দক্ষ প্রকৌশলী গড়ার এই প্রক্রিয়ায় পরীক্ষার্থীদের সাফল্য কামনা করেছে কর্তৃপক্ষ।
কুষ্টিয়ায় ‘প্রযুক্তিতে কুষ্টিয়া’র আয়োজনে উদ্যোক্তা উন্নয়ন সেমিনার অনুষ্ঠিত

স্থানীয় তরুণদের মেধা ও উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যে কুষ্টিয়ায় অনুষ্ঠিত হলো ‘উদ্যোক্তা উন্নয়ন সেমিনার’-এর প্রথম সেশন। ‘প্রযুক্তিতে কুষ্টিয়া’-এর উদ্যোগে এবং গুরুকুল-এর বিশেষ সহযোগিতায় কুষ্টিয়া পাবলিক লাইব্রেরি মাঠ প্রাঙ্গণে এই সেমিনারটি অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন হয়। মূলত ‘প্রযুক্তি উৎসব ২০১১’-এর একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে এই বিশেষ সেশনটি আয়োজন করা হয়েছিল। একজন তরুণ স্বপ্নদ্রষ্টা কীভাবে তাঁর প্রাথমিক আইডিয়া বা উদ্যোগকে একটি লাভজনক ও স্থায়ী ব্যবসায় রূপান্তর করতে পারেন, সে বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা দেওয়াই ছিল এই সেমিনারের মূল লক্ষ্য। বিশেষ করে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসা রেজিস্ট্রেশনের আইনি প্রক্রিয়া, দক্ষ ব্যবসা পরিচালনা এবং স্টার্টআপ সংক্রান্ত বিভিন্ন কারিগরি ও কৌশলগত দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়। সেমিনারে স্থানীয় তরুণ উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে এক প্রাণবন্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আমন্ত্রিত বিশেষজ্ঞ বক্তারা একজন সফল উদ্যোক্তা হওয়ার পেছনে পাঁচটি মূল স্তম্ভের ওপর গুরুত্বারোপ করেন: সঠিক পরিকল্পনা: দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যের জন্য বাস্তবসম্মত বিজনেস প্ল্যান তৈরি। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা: প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখার কৌশল। বাজার বিশ্লেষণ: ভোক্তার চাহিদা বুঝে পণ্যের বিপণন নিশ্চিত করা। ডিজিটাল মার্কেটিং: প্রযুক্তির ব্যবহার করে বিশ্বব্যাপী ব্যবসার প্রসার ঘটানো। নেটওয়ার্কিং: অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী ও মেন্টরদের সাথে শক্তিশালী পেশাদার সম্পর্ক গড়ে তোলা। সেমিনারে বক্তারা উল্লেখ করেন যে, উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেবল ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনে না, বরং এটি একটি দেশের কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উদ্ভাবনী সমাধানের অন্যতম চাবিকাঠি। বক্তারা তাঁদের বক্তব্যে বলেন: “নতুন প্রজন্মকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে হলে কেবল ইচ্ছা থাকলেই চলবে না, বরং আত্মবিশ্বাস, আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞানের সঠিক সমন্বয় প্রয়োজন। সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে আমাদের তরুণরা স্থানীয় অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম।” সেমিনারের শেষ অংশে অংশগ্রহণকারীদের জন্য ছিল একটি বিশেষ ইন্টারঅ্যাক্টিভ সেশন। সেখানে উপস্থিত তরুণরা উদ্যোক্তা হওয়ার পথে তাঁদের বাস্তবমুখী প্রতিবন্ধকতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাগুলো শেয়ার করেন। বক্তারা অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন কৌতূহলী প্রশ্নের উত্তর দেন এবং মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার আলোকে গঠনমূলক পরামর্শ প্রদান করেন। ‘প্রযুক্তিতে কুষ্টিয়া’ এবং ‘গুরুকুল’-এর এই যৌথ প্রয়াস কুষ্টিয়ার তরুণদের মাঝে নতুনত্বের উদ্দীপনা তৈরি করেছে। তরুণদের ব্যবসায়িক ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান বিকাশে এ ধরণের সেমিনার আগামী দিনেও একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন আয়োজকরা।
কুষ্টিয়া জেলার নামকরণের ইতহাস

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার এবং দেশের অন্যতম সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত জেলা ‘কুষ্টিয়া’। একদিকে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত শিলাইদহ, অন্যদিকে বাউল সম্রাট লালন শাহের আধ্যাত্মিক সাধনার পুণ্যভূমি—এই দুইয়ের মেলবন্ধনে কুষ্টিয়া জেলা বিশ্বদরবারে এক অনন্য উচ্চতায় আসীন। তবে এই জনপদের নামকরণের ইতিহাস যেমন বৈচিত্র্যময়, তেমনি কৌতূহল উদ্দীপক। কুষ্টিয়া নামের উৎপত্তি নিয়ে ইতিহাসবিদ, ভাষাতাত্ত্বিক এবং স্থানীয় জনশ্রুতিগুলোর মধ্যে রয়েছে নানা মতভেদ। আজ থেকে কয়েক শতাব্দী আগে এই জনপদটি কী নামে পরিচিত ছিল এবং কেনই বা এর নাম ‘কুষ্টিয়া’ হলো, তা জানতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ইতিহাসের পাতায়। কুষ্টিয়া জেলার নামকরণের ইতহাস নামকরণের উৎস: প্রধান মতবাদসমূহ কুষ্টিয়া জেলার নামকরণ নিয়ে মূলত তিনটি প্রধান মতবাদ প্রচলিত রয়েছে। এগুলো হলো— ভৌগোলিক কারণ, পণ্য বা ব্যবসার প্রভাব এবং স্থানীয় ভাষা বা অপভ্রংশের প্রভাব। নিচে এই মতবাদগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো: ১. ‘কুষ্ঠিয়া’ বা পাটের প্রভাবে নামকরণ কুষ্টিয়া নামের উৎপত্তির সবচেয়ে শক্তিশালী এবং যুক্তিনির্ভর কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এ অঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক পণ্য ‘পাট’ বা ‘কোষ্ঠ’কে। স্থানীয় আঞ্চলিক ভাষায় পাটকে ‘কোষ্ঠ’ বা ‘কুষ্ঠি’ বলা হতো। প্রাচীনকাল থেকেই গড়াই এবং পদ্মা নদীর তীরবর্তী এই অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে পাটের চাষ হতো। সে সময় কুষ্টিয়া ছিল নদীকেন্দ্রিক বাণিজ্যের একটি অন্যতম বন্দর। এখান থেকে নদীপথে পাটের বড় বড় চালান বিভিন্ন স্থানে যেত। ব্যবসায়ীরা একে ‘কুষ্ঠি’ বা পাটের আড়ত হিসেবে চিনতেন। ভাষাতাত্ত্বিকদের মতে, ‘কুষ্ঠি’ (পাটের স্থানীয় নাম) শব্দটির সাথে স্থানবাচক প্রত্যয় যুক্ত হয়ে বা দীর্ঘকাল অপভ্রংশ হয়ে ‘কুষ্টিয়া’ নামের উৎপত্তি হয়েছে। ব্রিটিশ আমলের নথিপত্রেও এই অঞ্চলের পাটের ব্যবসার কথা বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে, যা এই মতবাদকে আরও জোরালো করে। ২. ‘কুষ্টি’ বা ক্ষুদ্র কাঠের নৌকা অনেকের মতে, নদীমাতৃক এই অঞ্চলে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল নৌকা। প্রাচীনকালে এই এলাকায় এক ধরণের ছোট ও বিশেষ আকৃতির কাঠের নৌকা চলাচল করত, যাকে স্থানীয়রা ‘কুষ্টি’ বা ‘কোষ্ঠি’ বলত। যেহেতু এলাকাটি নদীবহুল ছিল এবং সর্বত্র এই বিশেষ নৌকার আধিক্য দেখা যেত, তাই পর্যটক বা বহিরাগতদের কাছে এটি ‘কুষ্টি’র এলাকা হিসেবে পরিচিতি পায়। কালক্রমে সেই ‘কুষ্টি’ থেকেই আজকের ‘কুষ্টিয়া’ নামের সৃষ্টি। ৩. ফরাসি বা ফারসি শব্দের প্রভাব (Kushtia) ঐতিহাসিকদের একটি অংশ মনে করেন, ফারসি শব্দ ‘কুশ্ত’ (Kusht) থেকে এই নামের উদ্ভব হতে পারে। ফারসি ভাষায় ‘কুশ্ত’ শব্দের অর্থ হলো চাষাবাদ বা কৃষি। মোঘল আমলে এই অঞ্চলে কৃষি বিপ্লব এবং নতুন জনপদ স্থাপনের ফলে ফারসি ভাষার প্রভাব ব্যাপকভাবে ছিল। কুশ্ত থেকে ‘কুশ্তিয়া’ এবং সেখান থেকে ‘কুষ্টিয়া’ হওয়া অসম্ভব নয়। বিশেষ করে মোঘল সম্রাট শাহজাহানের আমলে এই জনপদের প্রশাসনিক গুরুত্ব বাড়লে ফারসি নামকরণের প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক বিবর্তন কুষ্টিয়া নামকরণের ইতিহাস পূর্ণাঙ্গভাবে বুঝতে হলে এর প্রশাসনিক বিবর্তন জানাও জরুরি। প্রাচীনকালে কুষ্টিয়া জেলা বর্তমানে যেভাবে আছে, তেমন ছিল না। এটি ছিল মূলত প্রাচীন ‘বঙ্গ’ এবং ‘রাঢ়’ অঞ্চলের মধ্যবর্তী একটি জনপদ। মোঘল আমল: মোঘল শাসনামলে কুষ্টিয়া সরকার ফতেহাবাদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সে সময় নদীপথের নিরাপত্তার জন্য এবং খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে এখানে একটি সেনানিবাস বা প্রশাসনিক কেন্দ্র গড়ে ওঠে। তবে তখনো ‘কুষ্টিয়া’ নামটি একক জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ব্রিটিশ আমল ও নীলকরদের প্রভাব: ১৭৮১ সালে কুষ্টিয়াকে যশোর জেলার অধীনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে ১৮৬০ সালে নীল বিদ্রোহের সময় এবং প্রশাসনিক সংস্কারের প্রয়োজনে কুষ্টিয়াকে নদীয় জেলার একটি মহকুমা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে কুষ্টিয়া ছিল গুরুত্বপূর্ণ নৌ-বন্দর। তখন রেল যোগাযোগ এবং গড়াই নদীর ওপর রেলসেতু নির্মিত হলে এর নাম ‘কুষ্টিয়া’ হিসেবে চূড়ান্তভাবে পরিচিতি পায়। ১৯৪৭ পরবর্তী সময়: দেশভাগের সময় কুষ্টিয়াকে নদীয়া জেলা থেকে বিচ্ছিন্ন করে পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তখন কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা মিলে বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলা গঠিত হয়। ১৯৮৪ সালে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে কুষ্টিয়া ভেঙে তিনটি আলাদা জেলা (কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর) করা হয়। নদী ও বন্দরের ভূমিকা কুষ্টিয়া জেলা গড়ে ওঠার পেছনে গড়াই এবং পদ্মা নদীর ভূমিকা অপরিসীম। ইংরেজ আমলে কুষ্টিয়া কেবল একটি গ্রাম ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সমৃদ্ধ বন্দর। নদীপথের এই গুরুত্বই কুষ্টিয়াকে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় দিয়েছে। প্রাচীন মানচিত্রগুলোতে দেখা যায়, গড়াই নদীর তীরে ‘কুষ্টিয়া’ নামক একটি জনপদের উল্লেখ আছে যা মূলত আঠারো শতকের শেষের দিকে জনপ্রিয় হতে শুরু করে। নৌ-বাণিজ্যের সাথে জড়িত মাঝিমাল্লা এবং সওদাগরদের মুখেই এই নামটি প্রথম শ্রুতিমধুর রূপ লাভ করে। সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রভাব কুষ্টিয়ার নামকরণের ইতিহাসের সাথে এর মাটির মানুষের কৃষ্টি ও সংস্কৃতিরও একটি যোগসূত্র রয়েছে। কুষ্টিয়া কেবল একটি ভৌগোলিক সীমারেখা নয়, এটি একটি চেতনার নাম। বাউল সম্রাট লালন শাহ এই মাটিতেই তাঁর জীবনের দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন। তাঁর গানে ‘কুষ্টিয়া’ বা এই অঞ্চলের পারিপার্শ্বিকতার বর্ণনা পাওয়া যায়। আবার মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন শিলাইদহে জমিদারি পরিচালনা করতে আসতেন, তখন থেকেই এই জনপদটি আধুনিক শিক্ষিত সমাজের কাছে ‘কুষ্টিয়া’ নামেই সুপরিচিতি পায়। ঠাকুর পরিবারের আসা-যাওয়া এবং এখানে ‘কুঠি’ স্থাপনের ফলেও অনেকে মনে করেন ‘কুঠি’ থেকে ‘কুষ্টিয়া’ নামের কোনো সংযোগ থাকতে পারে, যদিও এটি ঐতিহাসিকভাবে খুব বেশি সমর্থিত নয়। জনশ্রুতি বনাম বাস্তবতা অনেকে লোককথায় বলেন, কোনো এক প্রভাবশালী জমিদার বা পীরের নামের সাথে মিলিয়ে এই নাম হয়েছে। তবে এর কোনো দালিলিক প্রমাণ ইতিহাসে পাওয়া যায় না। বরং পাটের ব্যবসার প্রভাব (কোষ্ঠ বা কুষ্ঠি) এবং নদীপথের নৌকার আধিক্য (কুষ্টি নৌকা)—এই দুটি কারণকেই আধুনিক ইতিহাসবিদগণ সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন। ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার তাঁর ‘A Statistical Account of Bengal’ বইতে কুষ্টিয়া অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বর্ণনা করতে গিয়ে এই অঞ্চলের নদী ও কৃষিজ পণ্যের যে চিত্র তুলে ধরেছেন, তা নামকরণের কোষ্ঠি-তত্ত্বকেই সমর্থন করে। কুষ্টিয়া জেলার নামকরণের ইতিহাস মূলত এর মাটির উর্বরতা এবং গড়াই নদীর কলতানের সাথে মিশে আছে। যে ‘কোষ্ঠ’ বা সোনালী আঁশ এককালে এই অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করেছিল, সেই সোনালী আঁশের আঞ্চলিক নাম থেকেই আজকের এই ঐতিহ্যবাহী ‘কুষ্টিয়া’ নামের উৎপত্তি। আজকের কুষ্টিয়া কেবল তার নামকরণের ইতিহাসের জন্যই নয়, বরং তার অসাম্প্রদায়িক চেতনা, লালনের একতারা এবং বিশ্বকবির ছিন্নপত্রের পাতায় অমর হয়ে আছে। ভৌগোলিক সীমানা ছোট হলেও কুষ্টিয়া নামের মাহাত্ম্য এবং এর পেছনের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস প্রতিটি বাঙালির কাছে গর্বের বিষয়। পাটের ‘কুষ্ঠি’ থেকে শুরু হওয়া এই নামের পথচলা আজ এক বিশাল সাংস্কৃতিক জনপদে রূপ নিয়েছে, যা ভবিষ্যতেও তার নামের সার্থকতা বজায় রাখবে। তথ্যসূত্র: ১. কুষ্টিয়ার ইতিহাস – ড. এম. এ. বারী। ২. নদীয়া কাহিনী – কুমুদনাথ মল্লিক। ৩. A Statistical Account of Bengal – W. W. Hunter. ৪. কুষ্টিয়া জেলা গেজেটিয়ার।