বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার এবং দেশের অন্যতম সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত জেলা ‘কুষ্টিয়া’। একদিকে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত শিলাইদহ, অন্যদিকে বাউল সম্রাট লালন শাহের আধ্যাত্মিক সাধনার পুণ্যভূমি—এই দুইয়ের মেলবন্ধনে কুষ্টিয়া জেলা বিশ্বদরবারে এক অনন্য উচ্চতায় আসীন। তবে এই জনপদের নামকরণের ইতিহাস যেমন বৈচিত্র্যময়, তেমনি কৌতূহল উদ্দীপক। কুষ্টিয়া নামের উৎপত্তি নিয়ে ইতিহাসবিদ, ভাষাতাত্ত্বিক এবং স্থানীয় জনশ্রুতিগুলোর মধ্যে রয়েছে নানা মতভেদ। আজ থেকে কয়েক শতাব্দী আগে এই জনপদটি কী নামে পরিচিত ছিল এবং কেনই বা এর নাম ‘কুষ্টিয়া’ হলো, তা জানতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ইতিহাসের পাতায়।
কুষ্টিয়া জেলার নামকরণের ইতহাস
নামকরণের উৎস: প্রধান মতবাদসমূহ
কুষ্টিয়া জেলার নামকরণ নিয়ে মূলত তিনটি প্রধান মতবাদ প্রচলিত রয়েছে। এগুলো হলো— ভৌগোলিক কারণ, পণ্য বা ব্যবসার প্রভাব এবং স্থানীয় ভাষা বা অপভ্রংশের প্রভাব। নিচে এই মতবাদগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
১. ‘কুষ্ঠিয়া’ বা পাটের প্রভাবে নামকরণ
কুষ্টিয়া নামের উৎপত্তির সবচেয়ে শক্তিশালী এবং যুক্তিনির্ভর কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এ অঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক পণ্য ‘পাট’ বা ‘কোষ্ঠ’কে। স্থানীয় আঞ্চলিক ভাষায় পাটকে ‘কোষ্ঠ’ বা ‘কুষ্ঠি’ বলা হতো। প্রাচীনকাল থেকেই গড়াই এবং পদ্মা নদীর তীরবর্তী এই অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে পাটের চাষ হতো।
সে সময় কুষ্টিয়া ছিল নদীকেন্দ্রিক বাণিজ্যের একটি অন্যতম বন্দর। এখান থেকে নদীপথে পাটের বড় বড় চালান বিভিন্ন স্থানে যেত। ব্যবসায়ীরা একে ‘কুষ্ঠি’ বা পাটের আড়ত হিসেবে চিনতেন। ভাষাতাত্ত্বিকদের মতে, ‘কুষ্ঠি’ (পাটের স্থানীয় নাম) শব্দটির সাথে স্থানবাচক প্রত্যয় যুক্ত হয়ে বা দীর্ঘকাল অপভ্রংশ হয়ে ‘কুষ্টিয়া’ নামের উৎপত্তি হয়েছে। ব্রিটিশ আমলের নথিপত্রেও এই অঞ্চলের পাটের ব্যবসার কথা বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে, যা এই মতবাদকে আরও জোরালো করে।
২. ‘কুষ্টি’ বা ক্ষুদ্র কাঠের নৌকা
অনেকের মতে, নদীমাতৃক এই অঞ্চলে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল নৌকা। প্রাচীনকালে এই এলাকায় এক ধরণের ছোট ও বিশেষ আকৃতির কাঠের নৌকা চলাচল করত, যাকে স্থানীয়রা ‘কুষ্টি’ বা ‘কোষ্ঠি’ বলত। যেহেতু এলাকাটি নদীবহুল ছিল এবং সর্বত্র এই বিশেষ নৌকার আধিক্য দেখা যেত, তাই পর্যটক বা বহিরাগতদের কাছে এটি ‘কুষ্টি’র এলাকা হিসেবে পরিচিতি পায়। কালক্রমে সেই ‘কুষ্টি’ থেকেই আজকের ‘কুষ্টিয়া’ নামের সৃষ্টি।
৩. ফরাসি বা ফারসি শব্দের প্রভাব (Kushtia)
ঐতিহাসিকদের একটি অংশ মনে করেন, ফারসি শব্দ ‘কুশ্ত’ (Kusht) থেকে এই নামের উদ্ভব হতে পারে। ফারসি ভাষায় ‘কুশ্ত’ শব্দের অর্থ হলো চাষাবাদ বা কৃষি। মোঘল আমলে এই অঞ্চলে কৃষি বিপ্লব এবং নতুন জনপদ স্থাপনের ফলে ফারসি ভাষার প্রভাব ব্যাপকভাবে ছিল। কুশ্ত থেকে ‘কুশ্তিয়া’ এবং সেখান থেকে ‘কুষ্টিয়া’ হওয়া অসম্ভব নয়। বিশেষ করে মোঘল সম্রাট শাহজাহানের আমলে এই জনপদের প্রশাসনিক গুরুত্ব বাড়লে ফারসি নামকরণের প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক বিবর্তন
কুষ্টিয়া নামকরণের ইতিহাস পূর্ণাঙ্গভাবে বুঝতে হলে এর প্রশাসনিক বিবর্তন জানাও জরুরি। প্রাচীনকালে কুষ্টিয়া জেলা বর্তমানে যেভাবে আছে, তেমন ছিল না। এটি ছিল মূলত প্রাচীন ‘বঙ্গ’ এবং ‘রাঢ়’ অঞ্চলের মধ্যবর্তী একটি জনপদ।
মোঘল আমল: মোঘল শাসনামলে কুষ্টিয়া সরকার ফতেহাবাদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সে সময় নদীপথের নিরাপত্তার জন্য এবং খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে এখানে একটি সেনানিবাস বা প্রশাসনিক কেন্দ্র গড়ে ওঠে। তবে তখনো ‘কুষ্টিয়া’ নামটি একক জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
ব্রিটিশ আমল ও নীলকরদের প্রভাব: ১৭৮১ সালে কুষ্টিয়াকে যশোর জেলার অধীনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে ১৮৬০ সালে নীল বিদ্রোহের সময় এবং প্রশাসনিক সংস্কারের প্রয়োজনে কুষ্টিয়াকে নদীয় জেলার একটি মহকুমা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে কুষ্টিয়া ছিল গুরুত্বপূর্ণ নৌ-বন্দর। তখন রেল যোগাযোগ এবং গড়াই নদীর ওপর রেলসেতু নির্মিত হলে এর নাম ‘কুষ্টিয়া’ হিসেবে চূড়ান্তভাবে পরিচিতি পায়।
১৯৪৭ পরবর্তী সময়: দেশভাগের সময় কুষ্টিয়াকে নদীয়া জেলা থেকে বিচ্ছিন্ন করে পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তখন কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা মিলে বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলা গঠিত হয়। ১৯৮৪ সালে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে কুষ্টিয়া ভেঙে তিনটি আলাদা জেলা (কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর) করা হয়।
নদী ও বন্দরের ভূমিকা
কুষ্টিয়া জেলা গড়ে ওঠার পেছনে গড়াই এবং পদ্মা নদীর ভূমিকা অপরিসীম। ইংরেজ আমলে কুষ্টিয়া কেবল একটি গ্রাম ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সমৃদ্ধ বন্দর। নদীপথের এই গুরুত্বই কুষ্টিয়াকে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় দিয়েছে। প্রাচীন মানচিত্রগুলোতে দেখা যায়, গড়াই নদীর তীরে ‘কুষ্টিয়া’ নামক একটি জনপদের উল্লেখ আছে যা মূলত আঠারো শতকের শেষের দিকে জনপ্রিয় হতে শুরু করে। নৌ-বাণিজ্যের সাথে জড়িত মাঝিমাল্লা এবং সওদাগরদের মুখেই এই নামটি প্রথম শ্রুতিমধুর রূপ লাভ করে।
সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রভাব
কুষ্টিয়ার নামকরণের ইতিহাসের সাথে এর মাটির মানুষের কৃষ্টি ও সংস্কৃতিরও একটি যোগসূত্র রয়েছে। কুষ্টিয়া কেবল একটি ভৌগোলিক সীমারেখা নয়, এটি একটি চেতনার নাম। বাউল সম্রাট লালন শাহ এই মাটিতেই তাঁর জীবনের দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন। তাঁর গানে ‘কুষ্টিয়া’ বা এই অঞ্চলের পারিপার্শ্বিকতার বর্ণনা পাওয়া যায়। আবার মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন শিলাইদহে জমিদারি পরিচালনা করতে আসতেন, তখন থেকেই এই জনপদটি আধুনিক শিক্ষিত সমাজের কাছে ‘কুষ্টিয়া’ নামেই সুপরিচিতি পায়। ঠাকুর পরিবারের আসা-যাওয়া এবং এখানে ‘কুঠি’ স্থাপনের ফলেও অনেকে মনে করেন ‘কুঠি’ থেকে ‘কুষ্টিয়া’ নামের কোনো সংযোগ থাকতে পারে, যদিও এটি ঐতিহাসিকভাবে খুব বেশি সমর্থিত নয়।
জনশ্রুতি বনাম বাস্তবতা
অনেকে লোককথায় বলেন, কোনো এক প্রভাবশালী জমিদার বা পীরের নামের সাথে মিলিয়ে এই নাম হয়েছে। তবে এর কোনো দালিলিক প্রমাণ ইতিহাসে পাওয়া যায় না। বরং পাটের ব্যবসার প্রভাব (কোষ্ঠ বা কুষ্ঠি) এবং নদীপথের নৌকার আধিক্য (কুষ্টি নৌকা)—এই দুটি কারণকেই আধুনিক ইতিহাসবিদগণ সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন। ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার তাঁর ‘A Statistical Account of Bengal’ বইতে কুষ্টিয়া অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বর্ণনা করতে গিয়ে এই অঞ্চলের নদী ও কৃষিজ পণ্যের যে চিত্র তুলে ধরেছেন, তা নামকরণের কোষ্ঠি-তত্ত্বকেই সমর্থন করে।

কুষ্টিয়া জেলার নামকরণের ইতিহাস মূলত এর মাটির উর্বরতা এবং গড়াই নদীর কলতানের সাথে মিশে আছে। যে ‘কোষ্ঠ’ বা সোনালী আঁশ এককালে এই অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করেছিল, সেই সোনালী আঁশের আঞ্চলিক নাম থেকেই আজকের এই ঐতিহ্যবাহী ‘কুষ্টিয়া’ নামের উৎপত্তি।
আজকের কুষ্টিয়া কেবল তার নামকরণের ইতিহাসের জন্যই নয়, বরং তার অসাম্প্রদায়িক চেতনা, লালনের একতারা এবং বিশ্বকবির ছিন্নপত্রের পাতায় অমর হয়ে আছে। ভৌগোলিক সীমানা ছোট হলেও কুষ্টিয়া নামের মাহাত্ম্য এবং এর পেছনের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস প্রতিটি বাঙালির কাছে গর্বের বিষয়। পাটের ‘কুষ্ঠি’ থেকে শুরু হওয়া এই নামের পথচলা আজ এক বিশাল সাংস্কৃতিক জনপদে রূপ নিয়েছে, যা ভবিষ্যতেও তার নামের সার্থকতা বজায় রাখবে।
তথ্যসূত্র:
১. কুষ্টিয়ার ইতিহাস – ড. এম. এ. বারী।
২. নদীয়া কাহিনী – কুমুদনাথ মল্লিক।
৩. A Statistical Account of Bengal – W. W. Hunter.
৪. কুষ্টিয়া জেলা গেজেটিয়ার।