গুরুকুল ক্যাম্পাস লার্নিং নেটওয়ার্ক, GCLN

সত্যজিৎ রায়-এর জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো।

সত্যজিৎ রায়-এর জন্মদিন উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা

সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ,

আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা।

আজ আমরা এমন এক ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি বাংলা ও বাঙালির সংস্কৃতিকে বিশ্ব চলচ্চিত্রের দরবারে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তিনি কেবল একজন চলচ্চিত্র পরিচালক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একাধারে লেখক, চিত্রকর, সঙ্গীত পরিচালক, ক্যালিগ্রাফার এবং অমর সব চরিত্রের স্রষ্টা। তিনি আমাদের গর্ব—সত্যজিৎ রায়।

উপস্থিত সুধী,

সত্যজিৎ রায় ১৯২১ সালের ২ মে কলকাতার বিখ্যাত ‘রায় পরিবারে’ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী এবং পিতা সুকুমার রায়—উভয়েই ছিলেন বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি। ১৯৫৫ সালে ‘পথের পাঁচালী’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি বিশ্ব চলচ্চিত্রে পা রাখেন এবং প্রথম ছবিতেই আন্তর্জাতিক মহলে হইচই ফেলে দেন। তাঁর হাত ধরেই বিশ্ব চিনেছে অপু, দুর্গা আর নিশ্চিন্তপুরের সেই রেললাইন দেখার গল্প।

কর্মবৈচিত্র্যের দিক দিয়ে তিনি ছিলেন এক কালজয়ী প্রতিভা। তাঁর পরিচালিত ৩২টি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এবং ডকুফিল্মগুলো আজও চলচ্চিত্রের পাঠ্যবই হিসেবে গণ্য করা হয়। শুধু চলচ্চিত্র নয়, বাংলা সাহিত্যে তাঁর অমর সৃষ্টি ‘ফেলুদা’ ও ‘প্রফেসর শঙ্কু’ আমাদের শৈশবকে করেছে রোমাঞ্চকর। এছাড়া তাঁর অনন্য শিল্পবোধ ফুটে উঠেছে বইয়ের প্রচ্ছদ অলঙ্করণ এবং নিজের তৈরি করা ফন্ট ‘রে রোমান’ (Ray Roman)-এর মাধ্যমে। ১৯৯২ সালে তিনি বিশ্বের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র সম্মান ‘অস্কার’ (একাডেমি অ্যাওয়ার্ড) লাভ করেন আজীবন অবদানের জন্য।

সত্যজিৎ রায়ের কালজয়ী কিছু সৃষ্টি ও সিরিজের কথা না বললেই নয়:

  • অপু ট্রিলজি: পথের পাঁচালী, অপরাজিত ও অপুর সংসার।
  • ফেলুদা সিরিজ: সোনার কেল্লা, জয় বাবা ফেলুনাথ-এর মতো কালজয়ী চলচ্চিত্র ও উপন্যাস।
  • হীরক রাজার দেশে: যেখানে তিনি রূপকের মাধ্যমে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার বার্তা দিয়েছেন।
  • জলসাঘর ও চারুলতা: যা বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নির্মাণ।

প্রিয় সুধী,

সত্যজিৎ রায় তাঁর শিল্পচর্চায় সবসময় মাটির কাছাকাছি থেকেছেন, কিন্তু তাঁর চিন্তা ছিল বিশ্বজনীন। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে অত্যন্ত পরিমিতিবোধ ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে শিল্পকে সার্থক করে তোলা যায়। তাঁর জীবন ছিল কাজের প্রতি একাগ্রতা ও নিষ্ঠার এক জীবন্ত পাঠশালা।

আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন—

‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’।

সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার এই মহান শিল্পীর নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন সত্যজিৎ রায়ের জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের প্রতিভা ও দেশজ সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে সঠিকভাবে উপস্থাপিত করতে পারি।

সত্যজিৎ রায় তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে এবং বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে চিরকাল ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন।

ধন্যবাদ সবাইকে।

জয় বাংলা!

জয় গুরুকুল!

আরও দেখুন: