কুষ্টিয়া জেলার নামকরণ নিয়ে বিভিন্ন মত প্রচলিত রয়েছে। ১৮২০ সালে প্রকাশিত হেমিলটনের Indigo Gazetteer-এ এ অঞ্চলকে KUSTEE বা কুষ্টি নামে উল্লেখ করা হয়। স্থানীয় জনগণ আজও সংক্ষেপে একে “কুষ্টে” বলে থাকে। ঐতিহাসিক সৈয়দ মুর্তাজা আলী মনে করেন, “কুষ্টিয়া” শব্দটি ফারসি কুশতাহ বা কুস্তা শব্দ থেকে এসেছে। আবার অনেকে মনে করেন এটি কোষ্টা বা পাট থেকে উদ্ভূত। প্রাচীন বানান পর্যবেক্ষণে ধারণা করা যায়, কুস্তি (খেলা) বা ফারসি কুশতং থেকেও এ নামের উৎপত্তি হতে পারে। ধীরে ধীরে কুষ্টা, কুস্তে হয়ে বর্তমান কুষ্টিয়া রূপে প্রচলিত হয়। কেউ কেউ মনে করেন, এখানে অবস্থিত কুষ্টিয়া গ্রাম থেকেই জেলার নামকরণ হয়েছে।

ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট
- আয়তন: ১,৬২১.১৫ বর্গকিলোমিটার
- অবস্থান: রাজশাহী বিভাগের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে; উত্তরে পদ্মা নদী, দক্ষিণে ঝিনাইদহ, পশ্চিমে চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর, পূর্বে পাবনা ও রাজবাড়ী জেলা।
- উপজেলা: ৬টি – কুষ্টিয়া সদর, খোকসা, কুমারখালী, দৌলতপুর, ভেড়ামারা ও মিরপুর।
- নদ-নদী: পদ্মা, গড়াই, কুমার, মাথাভাঙ্গা প্রভৃতি।
জনসংখ্যা ও জনজীবন
১৯৯১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী জেলার জনসংখ্যা ছিল ১৭,১৩,২২৪ জন। বর্তমানে তা প্রায় ২৫ লক্ষাধিক বলে ধারণা করা হয়। এখানে মুসলমান, হিন্দু ও অন্যান্য সম্প্রদায় শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বসবাস করছে। কুষ্টিয়ার গ্রামীণ জনজীবন কৃষিনির্ভর, তবে শহরাঞ্চলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও ক্ষুদ্র শিল্পের প্রসার ঘটেছে।
অর্থনীতি ও কৃষি
কুষ্টিয়া বাংলাদেশের অন্যতম কৃষি সমৃদ্ধ জেলা। প্রধান ফসলের মধ্যে ধান, আখ, তামাক, পাট, গম, ভুট্টা ও সরিষা উল্লেখযোগ্য। আখচাষের কারণে কুষ্টিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কুষ্টিয়া সুগার মিলস, যা দেশের প্রাচীনতম চিনিকলগুলির একটি। তামাক চাষও এই জেলার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কুষ্টিয়ার আম, লিচু, কলা ও সবজি দেশজুড়ে সমাদৃত।
শিক্ষা ও সাহিত্য
কুষ্টিয়া বাংলাদেশের শিক্ষা ও সাহিত্য আন্দোলনের কেন্দ্র। এখানে অবস্থিত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ, মিরপুর ডিগ্রি কলেজসহ বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
- ঔপন্যাসিক মীর মশাররফ হোসেন তাঁর “বিষাদসিন্ধু” গ্রন্থের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন।
- সাংবাদিক কাঙাল হরিনাথ দে ছিলেন আদি সামাজিক সংস্কারক ও সত্যবাদী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ।
- কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলাইদহে অবস্থানকালে বহু অমর সাহিত্যকর্ম রচনা করেন।
সংগীত ও সংস্কৃতি
কুষ্টিয়া বাউল সংগীতের আধ্যাত্মিক রাজধানী।
- ছেউড়িয়ায় অবস্থিত লালন শাহের মাজার বাউলধর্মী দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিবছর এখানে লালন মেলা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে দেশ-বিদেশের হাজারো মানুষ অংশগ্রহণ করেন।
- কুষ্টিয়া থেকে উঠে আসা শিল্পীদের মধ্যে আছেন আবদুল জব্বার, ফরিদা পারভীন ও আরও অনেকে, যারা বাউল ও লালনসংগীত বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছেন।
ঐতিহাসিক ও চিত্তাকর্ষক স্থান
- শিলাইদহ কুঠিবাড়ি – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত স্থান।
- ছেউড়িয়া – ফকির লালন শাহের মাজার।
- বাস্তাভিটা – ঔপন্যাসিক মীর মশাররফ হোসেনের জন্মস্থান।
- খোকসার কালিমন্দির – প্রাচীন হিন্দু স্থাপত্য ঐতিহ্য।
- হার্ডিঞ্জ ব্রিজ – পদ্মা নদীর উপর ব্রিটিশ আমলের স্থাপত্য বিস্ময়।
- সোলেমান শাহের মাজার – আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের অংশ।
বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব
- মীর মশাররফ হোসেন
- কাজী মোতাহার হোসেন
- রাধাবিনোদ পাল
- আজিজুর রহমান
- অক্ষয়কুমার মিত্র
- বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ
- কাঙাল হরিনাথ দে
- শিল্পী আবদুল জব্বার, ফরিদা পারভীন
- ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম
- হাবিবুল বাসার (বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক)
কুষ্টিয়া শুধু একটি প্রশাসনিক জেলা নয়, বরং ইতিহাস, সাহিত্য, সংগীত ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের এক অনন্য ভান্ডার। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যচর্চা, লালনের বাউল দর্শন, মীর মশাররফ হোসেনের সাহিত্যকীর্তি, কাঙাল হরিনাথের সাংবাদিকতা—সব মিলিয়ে কুষ্টিয়া বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে সমুজ্জ্বল। কৃষি ও শিল্পে অবদান রেখে এটি অর্থনৈতিকভাবেও দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
