কবি নির্মলেন্দু গুণ-এর জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো।
কবি নির্মলেন্দু গুণ-এর জন্মদিন উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা
সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ,
আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা।
আজ আমরা এমন এক কবির জন্মদিন উদযাপন করছি, যাঁর কবিতার শব্দে বারুদ আছে, আছে প্রেমের গভীর আকুতি এবং রাজনীতির অমোঘ সত্য। তিনি আমাদের আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অবিনাশী কণ্ঠস্বর, গণমানুষের কবি—নির্মলেন্দু গুণ।
উপস্থিত সুধী,
নির্মলেন্দু গুণ ১৯৪৫ সালের ২১ জুন নেত্রকোনা জেলার বারহাট্টার কাশবন গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম সুখেন্দুবিকাশ গুণ এবং মায়ের নাম বিনাপাণি গুণ। কর্মবৈচিত্র্যের দিক দিয়ে তিনি একাধারে কবি, সাংবাদিক এবং একজন দক্ষ চিত্রশিল্পী। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ প্রকাশিত হওয়ার পরেই তিনি বাংলা সাহিত্যে তাঁর শক্ত অবস্থান তৈরি করে নেন।
আজ একটি বিশেষ বিষয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন। নির্মলেন্দু গুণ সেই বিরল সাহসীদের একজন, যিনি ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের বিয়োগান্তক ঘটনার পর যখন সারা দেশে এক স্তব্ধতা নেমে এসেছিল, তখন বুক ফুলিয়ে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে কবিতা লিখেছিলেন। তাঁর সেই কালজয়ী কবিতা ‘হুলিয়া’ বা ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’—বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে তাঁর পঙক্তিগুলো আমাদের জাতীয় চেতনার অংশ হয়ে আছে।
প্রিয় সুধী,
কবির সৃষ্টিতে প্রেম ও রাজনীতি সমান্তরালভাবে চলে। তিনি কেবল রাজপথের কবি নন, তিনি হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতিরও রূপকার। তাঁর লেখনীতে যেমন উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের বঞ্চনার কথা, তেমনি ফুটে উঠেছে রূপসী বাংলার নিসর্গ। তাঁর জনপ্রিয় কিছু পঙক্তি আজও আমাদের মুখে মুখে ফেরে:
- “স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো”
- “আমি যখন মেজাজ হারিয়ে ফেলি, তখন তুমি আকাশ হয়ে যাও”
- “হাত বাড়িয়ে দাও, আমি তোমার আঙুল ছুঁতে চাই”
তিনি তাঁর অসামান্য সাহিত্যকর্মের জন্য ১৯৮২ সালে ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার’ এবং ২০০১ সালে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত হন। ২০১৬ সালে তিনি লাভ করেন ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’। কবির জীবন আমাদের শিখিয়েছে আদর্শের প্রতি অবিচল থেকে কীভাবে শিল্পের মাধ্যমে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হয়।
আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন—
‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’।
সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার এই মহৎ কবির নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই অকুতোভয় কবির জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের ভাষা, দেশ এবং সংস্কৃতির প্রতি আজীবন অনুগত থাকতে পারি।
কবি নির্মলেন্দু গুণ তাঁর কালজয়ী কবিতার মধ্য দিয়ে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে এবং বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন।
ধন্যবাদ সবাইকে।
জয় বাংলা!
জয় গুরুকুল!
