গুরুকুল ক্যাম্পাস লার্নিং নেটওয়ার্ক, GCLN

আমাদের শেখ রাসেল: বাঙালির হৃদয়ে এক অমর নক্ষত্র

আমাদের শেখ রাসেল

বাঙালি জাতির সহস্রাব্দের ইতিহাসে ধ্রুবতারার মতো অসংখ্য মহান ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটেছে। কেউ আমাদের দিয়েছেন রাজনৈতিক স্বাধীনতা, কেউ দিয়েছেন সাংস্কৃতিক মুক্তি, আবার কেউ দিয়েছেন আত্মপরিচয়ের অধিকার। তাঁদের অসামান্য ত্যাগ আর কর্মে গড়ে উঠেছে আজকের বাংলাদেশ। সাধারণত ইতিহাসের বড় বড় নামগুলো তাঁদের বিশাল সব কীর্তির জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকেন, কিন্তু আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক মর্মন্তুদ অথচ অম্লান অধ্যায় জুড়ে আছেন এমন একজন, যাঁর জীবনের ব্যাপ্তি ছিল মাত্র এগারো বসন্তের। তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ পুত্র, আমাদের পরম আদরের ছোট্ট সোনামণি শেখ রাসেল। শেখ রাসেল কেবল একটি নাম নয়; শেখ রাসেল একটি হারানো শৈশবের নাম, একটি অপূর্ণ স্বপ্নের নাম এবং ঘাতকের নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে এক চিরন্তন প্রতিবাদী স্তব্ধতা। বঙ্গবন্ধু পরিবারের উজ্জ্বল এই সদস্যের জীবনপ্রদীপ মাত্র এগারো বছরে নিভে গেলেও, তাঁর সেই স্বল্পস্থায়ী জীবন বাঙালির জাতীয় মানসকে এক গভীর মমত্ববোধে আবিষ্ট করে রেখেছে। আজ তিনি কেবল বঙ্গবন্ধুর পুত্র নন, বরং বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে তিনি হয়ে উঠেছেন এক চিরকালীন বন্ধু এবং প্রতিটি শিশুর আদর্শ। শেখ রাসেলের শুভ জন্মলগ্ন: ধন্য হলো বাংলার মাটি ১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর। বাংলার প্রকৃতি তখন হেমন্তের সোনালী আভায় সেজেছে। মাঠে মাঠে নতুন ধানের গন্ধে মাতোয়ারা বাতাস। ঠিক এমনই এক স্নিগ্ধ লগ্নে ঢাকার ধানমন্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বর সড়কের সেই বাড়িতে আলোর ঝিলিক ছড়িয়ে জন্ম নিলেন শেখ রাসেল। রাসেলের জন্মক্ষণটি ছিল আনন্দ আর উত্তোজনায় ভরপুর। বাড়ির বড় বোন শেখ হাসিনার ঘরের পাশে যখন রাসেলের কান্নার শব্দ শোনা গেল, তখন পুরো বাড়িতে আনন্দের জোয়ার বয়ে গিয়েছিল। জাতির পিতা তখন রাজনৈতিক ব্যস্ততা আর বাঙালির অধিকার আদায়ে দিনরাত এক করছেন, তবুও কনিষ্ঠ পুত্রের আগমনে তিনি হয়েছিলেন আবেগাপ্লুত। বড় বোন শেখ হাসিনা পরম মমতায় নিজের ওড়না দিয়ে ভাইয়ের ভেজা মাথা মুছে দিয়েছিলেন। শৈশবে রাসেল ছিলেন বেশ স্বাস্থ্যবান এবং অসম্ভব চটপটে। তাঁর সেই মায়াবী চেহারার হাসিতে ৩২ নম্বরের বিষণ্ণ রাজনৈতিক আবহও যেন মুহূর্তে আনন্দময় হয়ে উঠত। রাসেলের জন্ম যেন শুধু একটি পরিবারের আনন্দ ছিল না, তা ছিল আগামীর এক অমিত সম্ভাবনার উদয়। নামকরণ ও দর্শনের মিতালী: কেন তিনি ‘রাসেল’? শেখ রাসেলের নামকরণের পেছনে লুকিয়ে আছে বিশ্ববিখ্যাত এক দর্শন এবং বঙ্গবন্ধুর উদার আন্তর্জাতিকতাবোধের পরিচয়। বঙ্গবন্ধু শুধু বাঙালির মুক্তি নিয়ে ভাবতেন না, তিনি ভাবতেন সারা বিশ্বের শান্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ নোবেল বিজয়ী দার্শনিক ও গণিতবিদ বার্ট্রান্ড রাসেলের (Bertrand Russell) একনিষ্ঠ ভক্ত। বার্ট্রান্ড রাসেল ছিলেন বিশ্বশান্তির এক মহান দূত। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে পৃথিবী যখন পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কায় থরথর করে কাঁপছিল, তখন তিনি যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল তাঁর সন্তানও যেন বিশ্বশান্তির আদর্শে বড় হয়, যেন তার হৃদয়ে থাকে মানবতার প্রতি গভীর ভালোবাসা। এই মহান দার্শনিকের প্রতি শ্রদ্ধা এবং তাঁর আদর্শকে ধারণ করার আকাঙ্ক্ষা থেকেই বঙ্গবন্ধু নিজের কনিষ্ঠ পুত্রের নাম রেখেছিলেন ‘শেখ রাসেল’। নামের সার্থকতা অনুযায়ী রাসেলের আচরণেও ছোটবেলা থেকেই সেই মানবিক গুণাবলি ও শান্তিকামী মনোভাব লক্ষ্য করা যেত। রাসেলের রঙিন শৈশব ও কারাজীবনের স্মৃতি শেখ রাসেলের শৈশব আর দশটা সাধারণ শিশুর মতো সহজ ও স্বাভাবিক ছিল না। তাঁর জন্ম এমন এক সময়ে, যখন বাংলার স্বাধিকার আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নিচ্ছে। ফলে জন্মের পর থেকেই রাসেল পিতাকে খুব কাছে পাননি। রাজনৈতিক কারণে বঙ্গবন্ধুকে জীবনের অধিকাংশ সময় কাটাতে হয়েছে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। ছোট্ট রাসেলের কাছে ‘বাবা’ শব্দটি ছিল এক রহস্যময় অনুভূতির মতো। শৈশবে রাসেল যখন তাঁর বড় বোন শেখ হাসিনার সঙ্গে কারাগারে বঙ্গবন্ধুকে দেখতে যেতেন, তখন এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য তৈরি হতো। মাত্র দুই বছর বয়সে রাসেল তাঁর আপাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তোমার বাবাকে কি আমি বাবা বলে ডাকতে পারি?” এই একটি বাক্যই বলে দেয়, পিতৃত্বের স্নেহ থেকে তিনি কতটা বঞ্চিত ছিলেন। রাসেল যখন একটু বড় হলেন, তখন তিনি বুঝতে শুরু করেন যে তাঁর বাবা সাধারণ কেউ নন। তবুও বাবার অভাব তাঁকে পীড়া দিত। কারাগারে বঙ্গবন্ধুকে দেখে যখন ফেরার সময় হতো, রাসেল কিছুতেই বাবাকে ছেড়ে আসতে চাইতেন না। তখন তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বোঝানো হতো যে, জেলখানাই তাঁর বাবার বাড়ি, সেখানেই বাবা থাকেন। এই বিষণ্ণ বাস্তবতা নিয়েই বেড়ে উঠেছেন আমাদের রাসেল। ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল ও রাসেলের ছাত্রজীবন রাসেলের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল ও কলেজে। ১৯৭৫ সালে যখন তিনি শাহাদাত বরণ করেন, তখন তিনি চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন। স্কুলের শিক্ষকদের কাছে রাসেল ছিলেন অত্যন্ত শান্ত ও বিনয়ী এক ছাত্র। যদিও তিনি রাষ্ট্রপতির পুত্র ছিলেন, কিন্তু তাঁর চালচলনে কোনো রাজকীয় অহংকার ছিল না। তিনি সাধারণ ছাত্রদের মতোই সবার সঙ্গে মিশতেন। তাঁর সহপাঠীরা আজও মনে করেন, রাসেল ছিলেন ক্লাসের সবচেয়ে চটপটে এবং বুদ্ধিমান ছেলে। তাঁর স্কুল ব্যাগটি কাঁধে নিয়ে যখন তিনি করিডোর দিয়ে হেঁটে যেতেন, তখন এক অন্যরকম আভিজাত্য ফুটে উঠত তাঁর চোখেমুখে। স্কুলে যাতায়াতের জন্য তিনি রাষ্ট্রীয় প্রটোকল খুব একটা পছন্দ করতেন না; বরং সুযোগ পেলেই তাঁর প্রিয় বাইসাইকেলটি চালিয়ে স্কুলে যেতে চাইতেন। এই সাধারণ জীবনযাপনের শিক্ষা তিনি পেয়েছিলেন তাঁর মা বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের কাছ থেকে। মানবিকতা ও প্রাণিকুলের প্রতি ভালোবাসা রাসেলের হৃদয়ে ছিল এক অতলান্ত ভালোবাসা। কেবল মানুষের প্রতি নয়, পশুপাখির প্রতিও তাঁর ছিল অগাধ মায়া। বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের বাড়িতে ‘টমি’ নামে একটি কুকুর ছিল। টমি ছিল রাসেলের খেলার সঙ্গী। কথিত আছে, একদিন খেলার সময় টমি জোরে ঘেউ ঘেউ করে ডাকলে রাসেল কেঁদে ফেলে তাঁর মেজো আপা শেখ রেহানার কাছে নালিশ করেছিলেন যে, টমি তাঁকে বকেছে! এই সরলতা ও নির্ভেজাল অনুভুতিই ছিল রাসেলের অলঙ্কার। মাছ ধরার প্রতিও তাঁর দারুণ নেশা ছিল। তবে তাঁর মাছ ধরা ছিল এক বিচিত্র খেলা। তিনি বরশি দিয়ে মাছ ধরতেন ঠিকই, কিন্তু মাছের কষ্ট দেখে পরক্ষণেই আবার সেগুলোকে পুকুরের পানিতে ছেড়ে দিতেন। এই যে অন্যের কষ্ট অনুভব করার শক্তি, তা তিনি ছোটবেলা থেকেই ধারণ করেছিলেন। বাড়ির কাজের লোক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—সবার সঙ্গে তিনি সমানভাবে মিশতেন এবং সবাইকে সম্মান করতেন। তাঁর এই মানবিক গুণাবলি প্রমাণ করে যে, বেঁচে থাকলে তিনি হতেন এদেশের মানুষের এক পরম আশ্রয়স্থল। ১৫ই আগস্ট: এক দেবশিশুর রক্তে রঞ্জিত ইতিহাস ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট—বাঙালি জাতির ললাটে এক কলঙ্কিত মহাকাব্য। সেই কালরাত্রিতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কটি হয়ে উঠেছিল এক মৃত্যুপুরী। একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা ও ষড়যন্ত্রকারী অপশক্তি যখন কামানের গোলা আর ট্যাংকের গর্জনে পুরো এলাকা থরথর করে কাঁপিয়ে দিচ্ছিল, তখন শিশু রাসেলের মনেও ছিল এক অজানা আতঙ্ক। ঘাতকরা যখন একের পর এক পরিবারের সদস্যদের নিথর দেহ মেঝেতে লুটিয়ে দিচ্ছিল, রাসেল তখন ভয়ে জবুথবু হয়ে ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত কর্মচারী মহিতুল ইসলামের বয়ান অনুযায়ী, ছোট্ট রাসেল দৌড়ে এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, “ওরা কি আমাকেও মেরে ফেলবে?” ঘাতকরা যখন তাঁকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল, রাসেল তখন বারংবার তাঁর মায়ের কাছে যাওয়ার আকুতি জানিয়েছিলেন। নিষ্ঠুর ঘাতকদল মরণপণ এই আকুতি শোনেনি; বরং মায়ের কাছে নিয়ে যাওয়ার ছলনা করে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়

অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়কে জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি

আজ ১ মার্চ—বাংলা ইতিহাসচর্চার অন্যতম পথিকৃৎ, প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও সমাজসংস্কারক অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়–এর জন্মদিন। এই মহামানবের জন্মদিনে “গুরুকুল ক্যাম্পাস লার্নিং নেটওয়ার্ক”-এর পক্ষ থেকে আমরা জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় ছিলেন কেবল একজন ইতিহাসবিদ নন—তিনি ছিলেন একটি যুগের বিবেক। যিনি সত্য ও যুক্তির আলোয় উপনিবেশিক ইতিহাসের বিকৃত ভাষ্যকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন। ব্রিটিশ ঐতিহাসিকদের নির্মিত মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বয়ানের বিপরীতে দাঁড়িয়ে তিনি গবেষণা, প্রমাণ ও যুক্তির মাধ্যমে বাংলার ইতিহাসকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেন। তাঁর “সিরাজদ্দৌলা” গ্রন্থ আজও সত্যনিষ্ঠ ইতিহাসচর্চার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন বর্তমান কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার শিমুলিয়া গ্রামে, মামার বাড়িতে। কুষ্টিয়ার মানুষ হিসেবে আমরা গর্বের সাথে বলতে পারি—এই মহৎ মনীষীর শৈশব ও শিক্ষা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ এই মাটিতেই গড়ে উঠেছিল। এখান থেকেই তাঁর জ্ঞানপিপাসা, সাহিত্যপ্রেম ও ইতিহাসচেতনার বীজ রোপিত হয়। কুষ্টিয়ার সন্তান হিসেবে তাঁর অবদান আমাদের জন্য গর্ব, অনুপ্রেরণা ও দায়িত্বের বার্তা। অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় বুঝেছিলেন—নিজস্ব ইতিহাস না জানলে জাতি আত্মপরিচয় হারায়। তাই তিনি সাহিত্য ও প্রত্নতত্ত্ব—এই দুই উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে বাংলার প্রাচীন ও মধ্যযুগের ইতিহাস নতুন করে নির্মাণ করেন। বরেন্দ্র রিসার্চ সোসাইটি ও বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি গবেষণার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি গড়ে তোলেন, যা আজও বাংলা গবেষণার অন্যতম কেন্দ্র। তিনি শুধু ইতিহাসবিদই নন—তিনি ছিলেন সমাজসংস্কারক, শিক্ষাব্রতী, শিল্পপৃষ্ঠপোষক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অগ্রপথিক। রাজশাহী পৌরসভার কমিশনার হিসেবে তিনি নাগরিক উন্নয়ন ও সাংস্কৃতিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। শিক্ষা, শিল্প, নাটক, চিত্রকলা ও ক্রীড়াক্ষেত্রেও তাঁর ছিল গভীর আগ্রহ ও সক্রিয় অংশগ্রহণ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে আধুনিক বাংলা লেখকদের শীর্ষস্থানীয় বলে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন—এ এক বিরল সম্মান। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে হলে সাহস, অধ্যবসায় ও গভীর অধ্যয়ন অপরিহার্য। আজ তাঁর জন্মদিনে আমরা নতুন প্রজন্মকে আহ্বান জানাই—অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়ের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ইতিহাস, সাহিত্য ও জ্ঞানের আলোয় নিজেদের গড়ে তুলতে। গুরুকুল ক্যাম্পাস লার্নিং নেটওয়ার্ক বিশ্বাস করে—এই মহান চিন্তাবিদের আদর্শ আমাদের বাঙালি পরিচয়ের শক্ত ভিত গড়ে তুলবে। শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়—অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়।

শারদীয় দুর্গাপূজা ২০১১ উপলক্ষে ছুটির নোটিশ

শারদীয় দুর্গা পূজা, ছুটির নোটিশ

বাঙালি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার মহালগ্নে ‘বিজয়া দশমী’ উপলক্ষে ‘গুরুকুল ক্যাম্পাস লার্নিং নেটওয়ার্কের কুষ্টিয়া ক্যাম্পাস’-এ আগামী ০৬ অক্টোবর ২০১১ (বৃহস্পতিবার) সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এই দিন প্রতিষ্ঠানের সকল একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে বন্ধ থাকবে। প্লুরালিস্ট সোসাইটি ও গুরুকুলের জীবনদর্শন গুরুকুল ক্যাম্পাস লার্নিং নেটওয়ার্ক একটি ‘প্লুরালিস্ট সোসাইটি’ বা বহুত্ববাদী সমাজ বিনির্মাণে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী। গুরুকুল মনে করে, একটি আদর্শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আঙিনা হবে এমন এক মিলনমেলা যেখানে সকল ধর্ম, বর্ণ ও মতের মানুষ তাদের স্ব-স্ব বিশ্বাস ও সংস্কৃতি নিয়ে অত্যন্ত মর্যাদার সাথে সহাবস্থান করবে। শারদীয় দুর্গাপূজার এই ছুটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক বিরতি নয়, বরং প্রতিটি সম্প্রদায়ের উৎসবকে সমান গুরুত্ব প্রদানের মাধ্যমে সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সুদৃঢ় করার একটি সনিষ্ঠ প্রয়াস। ছুটির বিস্তারিত সময়সূচী প্রশাসন বিভাগ কর্তৃক জারিকৃত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী: ছুটির তারিখ: ০৬ অক্টোবর ২০১১ (বৃহস্পতিবার)। কার্যক্রম পুনরায় শুরু: ০৭ অক্টোবর ২০১১ (শুক্রবার) থেকে ক্যাম্পাসের সকল ক্লাস, ল্যাব, পরীক্ষা এবং দাপ্তরিক কাজ পূর্বনির্ধারিত সময়সূচী অনুযায়ী যথারীতি পরিচালিত হবে। নিরাপত্তা ও ভ্রাতৃত্বের নির্দেশনা উৎসবকালীন সময়ে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও উৎসবের পবিত্রতা বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। বিজ্ঞপ্তিতে সকল শিক্ষার্থীকে নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও সংযতভাবে উৎসব উদযাপনের জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে। গুরুকুল বিশ্বাস করে, উৎসবের আনন্দ যখন বৈষম্যহীনভাবে সকলের মাঝে ভাগ করে নেওয়া হয়, তখনই একটি সহনশীল ও সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে ওঠে। কর্তৃপক্ষের বার্তা গুরুকুল কুষ্টিয়া ক্যাম্পাসের প্রশাসন বিভাগ জানিয়েছে, “গুরুকুল পরিবার বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যে বিশ্বাস করে। আমাদের ক্যাম্পাসে সব ধর্মের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানই আমাদের প্রকৃত শিক্ষার পরিচয়। বিজয়া দশমীর এই পুণ্য তিথিতে আমরা সকল ধর্মাবলম্বীদের মাঝে মৈত্রী ও সংহতির জয়গান গাই।” গুরুকুল ক্যাম্পাস লার্নিং নেটওয়ার্কের কুষ্টিয়া ক্যাম্পাস পরিবারের পক্ষ থেকে কুষ্টিয়াবাসীসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে শারদীয় দুর্গাপূজা ও বিজয়া দশমীর আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানানো হয়েছে। আরও দেখুন: গুরুকুল ক্যাম্পাসে দ্বীন ও ধর্ম বিষয়ক নীতিমালা

গুরুকুল ট্রাস্ট ফান্ডের উপবৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠান ২০১১

গুরুকুল ট্রাষ্ট ফান্ডের উপবৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠান

গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় কুষ্টিয়া শহরের কালিশংকরপুরে অবস্থিত কুষ্টিয়া গুরুকুল-এর পদ্মা ক্যাম্পাসে ২০১১ সালের গুরুকুল ট্রাস্ট ফান্ড ও সাসেগ ট্রাস্ট ফান্ড এর উপবৃত্তি প্রদান ও কৃতি শিক্ষার্থীদের মাঝে উপবৃত্তির চেক হস্তান্তর অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। কুষ্টিয়া গুরুকুল মিলনায়তনে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মু. ফজলুর রহমান। অনুষ্ঠানে ট্রাস্ট ফান্ড দুটির আওতায় ২০১১ সালের জন্য ৯টি নতুন ট্রাস্ট ফান্ড ঘোষণা করেন গুরুকুল ক্যাম্পাস লার্নিং নেটওয়ার্ক এর প্রতিষ্টাতা প্রযুক্তিবিদ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর। নতুন ঘোষিত ট্রাস্ট ফান্ডগুলোর নাম:১. ফকির লালন শাহ২. মীর মোশাররফ হোসেন৩. কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার৪. ড. প্রফেসর হুমায়ুন আজাদ৫. মুহাম্মদ আবুবকর৬. সুফি মুহাম্মদ আইনুদ্দিন৭. হাজী মোকাদ্দেস হোসেন৮. গাজী হাবিবুর রহমান৯. দানবীর আলাউদ্দিন আহমেদ কুষ্টিয়া গুরুকুল মিলনায়তনে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মু. ফজলুর রহমান। তিনি বলেন “বর্তমান বিশ্বে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে কারিগরি শিক্ষার বিকল্প নেই। গুরুকুলের উদ্যোগ তরুণদের কর্মসংস্থানের নতুন দ্বার উন্মোচন করবে।”। বিশেষ অতিথীর বক্তব্যে এফবিএবি কুষ্টিয়া শাখার সভাপতি জনাব আক্কাস আলী মঞ্জু বলেন “ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে প্রশিক্ষিত কারিগরি জনশক্তি অপরিহার্য। গুরুকুলের শিক্ষার্থীরা আগামী দিনে শিল্পখাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।” এছাড়া কুষ্টিয়া গুরুকুলের কামরুল ইসলাম সিদ্দিক ইন্সটিটিউটের সহযোগী পরিচালক জনাব মো. ইয়াসিন আলী বলেন “আমাদের শিক্ষার্থীরা তত্ত্ব ও practically সমৃদ্ধ হয়ে বেরোচ্ছে। এটি জাতীয় উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক।”।  কুষ্টিয়া পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের পাওয়ার টেকনোলজির চিফ ইন্সট্রাক্টর জনাব মো. লিয়াকত আলী বলেন “কুষ্টিয়া পলিটেকনিকের অভিজ্ঞতায় বলছি—কারিগরি শিক্ষার প্রসারই শিল্পায়নের প্রধান চাবিকাঠি।” কুষ্টিয়া গুরুকুলের কামরুল ইসলাম সিদ্দিক ইন্সটিটিউটের পরিচালনা পর্ষদ সদস্য জনাব মনির হাসান বলেন “গুরুকুলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো তরুণদের জীবনে গুণগত পরিবর্তন আনছে। এই ধারা অব্যাহত থাকুক।” সভাপতির বক্তব্যে সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর বলেন, “বাংলাদেশের জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করতে কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষার প্রসারে গুরুকুল ইতিমধ্যেই কয়েকটি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছে এবং আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাজ চলমান। এখান থেকে স্বল্প খরচে শিক্ষার্থীরা দ্রুত সময়ে কর্মমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশ গঠনে অবদান রাখতে সক্ষম হবে।” অনুষ্ঠানে গুরুকুলের কৃতি ছাত্র–ছাত্রী, অভিভাবক এবং স্থানীয় বিশিষ্টজনেরা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনা অনুষ্ঠান শেষে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও কুষ্টিয়ার জনপ্রিয় শিল্পীদের অংশগ্রহণে এক মনোজ্ঞ ব্যান্ড শো অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সাসেগ-এর সমন্বয়কারী তানভীর মেহেদী এবং অ্যাডমিন অফিসার আনোয়ার কবির বকুল। আরও দেখুন: বিজ্ঞান ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রীর হাতে গুরুকুল ক্যাম্পাসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন

বিজ্ঞান ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রীর হাতে গুরুকুল ক্যাম্পাসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন

Minister of SICT inaugurating SASEG campus

ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণ এবং কারিগরি শিক্ষার প্রসারে এক নতুন মাইলফলক স্পর্শ করল কুষ্টিয়ার গুরুকুল শিক্ষা পরিবার। বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় বিজ্ঞান ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান কুষ্টিয়া শহরের কালিশংকরপুর এলাকায় অবস্থিত গুরুকুলের নবনির্মিত আধুনিক ক্যাম্পাসের আনুষ্ঠানিক শুভ উদ্বোধন করেছেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মাননীয় মন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান গুরুকুলের শিক্ষা কার্যক্রম এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার প্রসারে প্রতিষ্ঠানটির অগ্রণী ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন: “প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা কেবল দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে না, বরং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথকে ত্বরান্বিত করে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের তরুণ প্রজন্মকে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করা সময়ের দাবি। গুরুকুল এ ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।” উদ্বোধনকৃত এই বিশাল ক্যাম্পাসটি মূলত গুরুকুলের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান ‘কামরুল ইসলাম সিদ্দিক ইন্সটিটিউট’-এর শিক্ষার্থীদের জন্য উৎসর্গ করা হয়েছে। এখানে আধুনিক অবকাঠামো এবং বিশ্বমানের ল্যাবরেটরি সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। এই ক্যাম্পাসে নিয়মিতভাবে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ডিসিপ্লিনে পাঠদান করা হবে, যার মধ্যে রয়েছে – ডিপ্লোমা ইন সিভিল, মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল, পাওয়ার, কম্পিউটার ও টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং। ফিতা কেটে উদ্বোধন শেষে মাননীয় মন্ত্রী প্রতিষ্ঠানের অত্যাধুনিক কম্পিউটার ল্যাব, সিভিল ল্যাব এবং ইলেকট্রিক্যাল ওয়ার্কশপসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ঘুরে দেখেন। এসময় গুরুকুল প্রমুখ এবং প্রখ্যাত তথ্যপ্রযুক্তিবিদ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর মাননীয় মন্ত্রীকে ল্যাবরেটরিগুলোর সক্ষমতা এবং গবেষণার সুযোগ সম্পর্কে বিস্তারিত ব্রিফিং প্রদান করেন। মন্ত্রী শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী প্রকল্পগুলো দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন গুরুকুলের চেয়ারম্যান আজিজা আহমেদ, প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিভাগের প্রধানগণ এবং কুষ্টিয়ার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। গুরুকুল কর্তৃপক্ষ জানায়, এই নতুন ক্যাম্পাসটি শিক্ষার্থীদের জন্য কেবল একটি ভবন নয়, বরং এটি একটি গবেষণাকেন্দ্র এবং দক্ষতা উন্নয়নের ‘হাব’ হিসেবে কাজ করবে। শিক্ষার্থীদের জন্য প্রযুক্তিসম্পন্ন ও অনুকূল শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং পড়াশোনা শেষে তাদের কর্মসংস্থানের উপযোগী করে গড়ে তোলাই এই ক্যাম্পাসের মূল লক্ষ্য। মাননীয় মন্ত্রীর এই সফর এবং নতুন ক্যাম্পাসের উদ্বোধন কুষ্টিয়ার কারিগরি শিক্ষার ইতিহাসে একটি বিশেষ দিকচিহ্ন হয়ে থাকবে। এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে গুরুকুল শিক্ষা পরিবার দেশের দক্ষ মানবসম্পদ গড়ার অঙ্গীকারকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল। আরও দেখুন: গুরুকুল ট্রাস্ট ফান্ডের উপবৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠান ২০১১

সৈয়দ শামসুল হক-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা । ২৭ ডিসেম্বর

সৈয়দ শামসুল হক

সৈয়দ শামসুল হক-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। সৈয়দ শামসুল হক-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ ২৭ ডিসেম্বর। আজ আমরা এমন এক ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যাঁর কলমের জাদুতে বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি শাখা সমৃদ্ধ হয়েছে। কবিতা, উপন্যাস, নাটক, ছোটগল্প কিংবা কাব্যনাট্য—সবখানেই যাঁর অবাধ বিচরণ। তিনি আমাদের সাহিত্যের ‘সব্যসাচী লেখক’—সৈয়দ শামসুল হক। উপস্থিত সুধী, সৈয়দ শামসুল হক ১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সৈয়দ সিদ্দিক হুসাইন ছিলেন একজন চিকিৎসক এবং মাতা হালিমা খাতুন। শৈশব থেকেই সাহিত্যের প্রতি তাঁর ছিল গভীর অনুরাগ। তিনি কেবল একজন লেখক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অসামান্য শব্দশিল্পী। সৈয়দ শামসুল হকের সাহিত্যকর্মে এদেশের মাটি, মানুষ এবং ইতিহাসের এক নিবিড় প্রতিফলন পাওয়া যায়। বিশেষ করে তাঁর কাব্যনাট্যগুলো বাংলা সাহিত্যে এক নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘নূরলদীনের সারাজীবন’-এর সেই কালজয়ী পঙক্তি আজও আমাদের রক্তে শিহরণ জাগায়: “জাগো বাহে, কুন্ঠে সবায়ে!” এই একটি পঙক্তির মধ্য দিয়ে তিনি যেন ঘুমন্ত বাঙালি জাতিকে বারবার জেগে ওঠার ডাক দিয়ে গেছেন। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য সৃষ্টির মধ্যে রয়েছে ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, ‘নিষিদ্ধ লোবান’, ‘খেলারাম খেলে যা’ এবং ‘নীল দংশন’-এর মতো কালজয়ী কাজ। তিনি মাত্র ২৯ বছর বয়সে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন, যা সাহিত্যে তাঁর অসামান্য প্রতিভারই স্বীকৃতি। পরবর্তীতে তিনি একুশে পদক এবং স্বাধীনতা পদকেও ভূষিত হন। প্রিয় সুধী, সৈয়দ শামসুল হক আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে শব্দ দিয়ে ছবি আঁকতে হয়। তাঁর ছোটগল্পের বুনন আর উপন্যাসের গভীরতা আমাদের জীবনবোধকে প্রসারিত করে। তিনি আমৃত্যু বিশ্বাস করতেন কলমের শক্তিতে এবং মানুষের মুক্তির মিছিলে। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার এই সব্যসাচী লেখকের নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন তাঁর নির্ভীক জীবনবোধ ও সাহিত্যের নিরন্তর সাধনা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের মেধা ও মননকে বিকশিত করতে পারি। সৈয়দ শামসুল হক তাঁর অবিনশ্বর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বাঙালির হৃদয়ে এবং বাংলা সাহিত্যের আকাশে ধ্রুবতারার মতো চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

মির্জা গালিব-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা । ২৭ ডিসেম্বর

মির্জা গালিব

মির্জা গালিব-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো।   মির্জা গালিব-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ আমরা এমন এক ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যাঁর নাম উচ্চারণ মাত্রই বিশ্বসাহিত্যের এক গভীর দর্শন ও কাব্যময় জগত আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তিনি মুঘল সাম্রাজ্যের শেষ সূর্যোদয়ের সাক্ষী, উর্দু ও ফারসি ভাষার অমর কবি— মির্জা আসাদুল্লাহ খান গালিব। উপস্থিত সুধী, মির্জা গালিব ১৭৯৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর ভারতের আগ্রায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষরা ছিলেন মধ্য এশীয় তুর্কি বংশোদ্ভূত। গালিব এমন এক সময়ে কাব্যচর্চা করেছেন যখন মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ঘটছে এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন জেঁকে বসছে। এই যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে তিনি জীবনকে যে গভীরতা দিয়ে দেখেছিলেন, তা আজ আড়াইশ বছর পরও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। গালিবের কবিতার প্রধান বিষয়বস্তু ছিল মানুষের অস্তিত্বের সংকট, প্রেম, মৃত্যু এবং আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা। তিনি কেবল কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দার্শনিক। তাঁর ‘দিওয়ান-ই-গালিব’ উর্দু সাহিত্যের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠতম সংকলন হিসেবে বিবেচিত। তাঁর রচিত চিঠিপত্রগুলোও উর্দু গদ্য সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ, যা সেই সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির এক প্রামাণ্য দলিল। তাঁর কিছু অমর পঙক্তি আজও সারা বিশ্বের কাব্যপ্রেমীদের মুখে মুখে ঘোরে: “হাজারো খোয়াইশে অ্যায়সি কে হর খোয়াইশ পে দম নিকলে / বহুত নিকলে মেরে আরমান লেকিন ফির ভি কম নিকলে” (অর্থাৎ: হাজারো এমন আকাঙ্ক্ষা যার প্রতিটির জন্য প্রাণ উৎসর্গ করা যায়; অনেক আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হয়েছে ঠিকই, তবু যেন তা পর্যাপ্ত নয়।) প্রিয় সুধী, মির্জা গালিব তাঁর জীবদ্দশায় চরম দারিদ্র্য ও ব্যক্তিগত শোকের মধ্য দিয়ে গেছেন। তাঁর সাতটি সন্তানই শৈশবে মারা যায়। কিন্তু এই দুঃখ তাঁকে ভেঙে ফেলেনি, বরং তাঁর কলমকে করেছে আরও ধারালো এবং সংবেদনশীল। তিনি ছিলেন অত্যন্ত স্বাধীনচেতা এবং রসবোধ সম্পন্ন একজন মানুষ। মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফর তাঁকে ‘দাবির-উল-মুলক’ এবং ‘নাজিম-উদ-দৌলা’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে এই মহান দার্শনিকের নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সেই সুগভীর কাব্যদর্শন সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন গালিবের মতো প্রতিকূলতার মাঝেও জীবনকে দেখার নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করতে পারি এবং নিজেদের জীবনকে শিল্পের আলোয় রাঙাতে পারি। মির্জা গালিব তাঁর কালজয়ী সৃষ্টির মধ্য দিয়ে সাহিত্যের আকাশে চিরকাল ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল!   আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপ্লোমার ২য় ও ৪থ সেমিস্টারের চূড়ান্ত পরীক্ষার নোটিশ

কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপ্লোমা কোর্সের ২০১১-২০১২ সেশনের ২য় সেমিস্টার এবং ২০১০-২০১১ সেশনের ৪র্থ সেমিস্টারের চূড়ান্ত পরীক্ষার সময়সূচী ও কেন্দ্র তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। আগামী ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১২ তারিখ থেকে এই পরীক্ষা একযোগে শুরু হতে যাচ্ছে। পরীক্ষা ও সেশনের বিবরণ প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, পরীক্ষার জন্য দুটি পৃথক সেশনের শিক্ষার্থীদের জন্য কেন্দ্র নির্ধারণ করা হয়েছে: ৪র্থ সেমিস্টার (সেশন ২০১০-২০১১): এই সেশনের পরীক্ষার্থীদের জন্য পরীক্ষা কেন্দ্র হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে কুষ্টিয়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট। ২য় সেমিস্টার (সেশন ২০১১-২০১২): এই সেশনের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী ইনস্টিটিউট কেন্দ্রে। পরীক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা পরীক্ষা সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে কর্তৃপক্ষ নিম্নোক্ত নির্দেশনা প্রদান করেছেন: সকল পরীক্ষার্থীকে নির্ধারিত তারিখ ও নির্ধারিত কেন্দ্রে সঠিক সময়ে উপস্থিত থাকতে হবে। পরীক্ষা শুরুর নূন্যতম ৩০ মিনিট আগে কেন্দ্রে প্রবেশ করে নিজ নিজ আসন গ্রহণ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। পরীক্ষার্থীদের প্রবেশপত্র (Admit Card) এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ সঙ্গে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতি সম্পন্ন করার জন্য পর্যাপ্ত সময় ও সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। সুষ্ঠু ও নকলমুক্ত পরিবেশে পরীক্ষা সম্পন্ন করতে কেন্দ্র সচিব ও কক্ষ পরিদর্শকদের বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। পরীক্ষার রুটিন ও কেন্দ্র সংক্রান্ত কোনো জটিলতা থাকলে শিক্ষার্থীদের দ্রুত নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক শাখার সাথে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। দেশের কারিগরি শিক্ষার মানোন্নয়নে এবং দক্ষ প্রকৌশলী গড়ার এই প্রক্রিয়ায় পরীক্ষার্থীদের সাফল্য কামনা করেছে কর্তৃপক্ষ।

কুষ্টিয়ায় ‘প্রযুক্তিতে কুষ্টিয়া’র আয়োজনে উদ্যোক্তা উন্নয়ন সেমিনার অনুষ্ঠিত

Technology Festival 2011 | প্রযুক্তি উৎসব ২০১১)

স্থানীয় তরুণদের মেধা ও উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যে কুষ্টিয়ায় অনুষ্ঠিত হলো ‘উদ্যোক্তা উন্নয়ন সেমিনার’-এর প্রথম সেশন। ‘প্রযুক্তিতে কুষ্টিয়া’-এর উদ্যোগে এবং গুরুকুল-এর বিশেষ সহযোগিতায় কুষ্টিয়া পাবলিক লাইব্রেরি মাঠ প্রাঙ্গণে এই সেমিনারটি অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন হয়। মূলত ‘প্রযুক্তি উৎসব ২০১১’-এর একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে এই বিশেষ সেশনটি আয়োজন করা হয়েছিল। একজন তরুণ স্বপ্নদ্রষ্টা কীভাবে তাঁর প্রাথমিক আইডিয়া বা উদ্যোগকে একটি লাভজনক ও স্থায়ী ব্যবসায় রূপান্তর করতে পারেন, সে বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা দেওয়াই ছিল এই সেমিনারের মূল লক্ষ্য। বিশেষ করে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসা রেজিস্ট্রেশনের আইনি প্রক্রিয়া, দক্ষ ব্যবসা পরিচালনা এবং স্টার্টআপ সংক্রান্ত বিভিন্ন কারিগরি ও কৌশলগত দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়। সেমিনারে স্থানীয় তরুণ উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে এক প্রাণবন্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আমন্ত্রিত বিশেষজ্ঞ বক্তারা একজন সফল উদ্যোক্তা হওয়ার পেছনে পাঁচটি মূল স্তম্ভের ওপর গুরুত্বারোপ করেন: সঠিক পরিকল্পনা: দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যের জন্য বাস্তবসম্মত বিজনেস প্ল্যান তৈরি। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা: প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখার কৌশল। বাজার বিশ্লেষণ: ভোক্তার চাহিদা বুঝে পণ্যের বিপণন নিশ্চিত করা। ডিজিটাল মার্কেটিং: প্রযুক্তির ব্যবহার করে বিশ্বব্যাপী ব্যবসার প্রসার ঘটানো। নেটওয়ার্কিং: অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী ও মেন্টরদের সাথে শক্তিশালী পেশাদার সম্পর্ক গড়ে তোলা। সেমিনারে বক্তারা উল্লেখ করেন যে, উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেবল ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনে না, বরং এটি একটি দেশের কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উদ্ভাবনী সমাধানের অন্যতম চাবিকাঠি। বক্তারা তাঁদের বক্তব্যে বলেন: “নতুন প্রজন্মকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে হলে কেবল ইচ্ছা থাকলেই চলবে না, বরং আত্মবিশ্বাস, আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞানের সঠিক সমন্বয় প্রয়োজন। সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে আমাদের তরুণরা স্থানীয় অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম।” সেমিনারের শেষ অংশে অংশগ্রহণকারীদের জন্য ছিল একটি বিশেষ ইন্টারঅ্যাক্টিভ সেশন। সেখানে উপস্থিত তরুণরা উদ্যোক্তা হওয়ার পথে তাঁদের বাস্তবমুখী প্রতিবন্ধকতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাগুলো শেয়ার করেন। বক্তারা অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন কৌতূহলী প্রশ্নের উত্তর দেন এবং মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার আলোকে গঠনমূলক পরামর্শ প্রদান করেন। ‘প্রযুক্তিতে কুষ্টিয়া’ এবং ‘গুরুকুল’-এর এই যৌথ প্রয়াস কুষ্টিয়ার তরুণদের মাঝে নতুনত্বের উদ্দীপনা তৈরি করেছে। তরুণদের ব্যবসায়িক ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান বিকাশে এ ধরণের সেমিনার আগামী দিনেও একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন আয়োজকরা।

মুনীর চৌধুরী-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা । ১৯ নভেম্বর

মুনীর চৌধুরী

মুনীর চৌধুরী-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। মুনীর চৌধুরী-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ ১৯ নভেম্বর। আজ আমরা এমন এক প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি একাধারে সাহিত্যিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক এবং বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষাবিদ। তিনি আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের আলোকবর্তিকা—শহীদ মুনীর চৌধুরী। উপস্থিত সুধী, মুনীর চৌধুরী ১৯২৫ সালের ১৯ নভেম্বর তৎকালীন ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈত্রিক নিবাস ছিল নোয়াখালী জেলায়। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই মানুষটি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের তুখোড় অধ্যাপক। তিনি কেবল শ্রেণিকক্ষেই পাঠদান করেননি, বরং বাংলা ভাষাকে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত করার ক্ষেত্রে এক অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। টাইপরাইটারের জন্য তাঁর আবিষ্কৃত ‘মুনীর অপটিমা’ কি-বোর্ড লেআউট আজও আমাদের যান্ত্রিক জীবনে বাংলা ব্যবহারের অন্যতম ভিত্তি হয়ে আছে। মুনীর চৌধুরীর সাহিত্যকর্ম আমাদের জাতীয় সম্পদ। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের উত্তাল সময়ে রাজবন্দী থাকাকালীন তিনি রচনা করেন তাঁর কালজয়ী নাটক ‘কবর’। জেলে বসে এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে রচিত এই নাটকটি আজও আমাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের এক অবিস্মরণীয় দলিল। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’, ‘চিঠি’, ‘দণ্ডকারণ্য’ এবং অনুবাদ নাটক ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ বাংলা নাট্যসাহিত্যের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। সাহিত্য সমালোচনায় তাঁর ‘তুলামূলক সমালোচনা’ এবং ‘বাংলা গদ্যরীতি’ বই দুটি আজ অবধি গবেষকদের জন্য পথপ্রদর্শক। প্রিয় সুধী, মুনীর চৌধুরী ছিলেন আপাদমস্তক এক অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল মানুষ। একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোতে তিনি দেশের মাটির মায়া ত্যাগ করেননি। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, স্বাধীনতার সূর্য উদিত হওয়ার মাত্র দুদিন আগে, ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে আল-বদর বাহিনী তাঁকে অপহরণ করে নিয়ে যায় এবং বরেণ্য এই বুদ্ধিজীবীকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। তাঁর শূন্যতা আজও অপূরণীয়। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার এই মহান চিন্তকের নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন মুনীর চৌধুরীর সেই নির্ভীক সত্যবাদিতা ও জ্ঞাননিষ্ঠার আদর্শকে আমাদের শিক্ষা জীবনে পাথেয় করতে পারি। মুনীর চৌধুরী তাঁর কর্ম ও অসামান্য সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বাঙালির হৃদয়ে এবং বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা