গুরুকুল ক্যাম্পাস লার্নিং নেটওয়ার্ক, GCLN

সৈয়দ শামসুল হক-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা । ২৭ ডিসেম্বর

সৈয়দ শামসুল হক

সৈয়দ শামসুল হক-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। সৈয়দ শামসুল হক-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ ২৭ ডিসেম্বর। আজ আমরা এমন এক ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যাঁর কলমের জাদুতে বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি শাখা সমৃদ্ধ হয়েছে। কবিতা, উপন্যাস, নাটক, ছোটগল্প কিংবা কাব্যনাট্য—সবখানেই যাঁর অবাধ বিচরণ। তিনি আমাদের সাহিত্যের ‘সব্যসাচী লেখক’—সৈয়দ শামসুল হক। উপস্থিত সুধী, সৈয়দ শামসুল হক ১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সৈয়দ সিদ্দিক হুসাইন ছিলেন একজন চিকিৎসক এবং মাতা হালিমা খাতুন। শৈশব থেকেই সাহিত্যের প্রতি তাঁর ছিল গভীর অনুরাগ। তিনি কেবল একজন লেখক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অসামান্য শব্দশিল্পী। সৈয়দ শামসুল হকের সাহিত্যকর্মে এদেশের মাটি, মানুষ এবং ইতিহাসের এক নিবিড় প্রতিফলন পাওয়া যায়। বিশেষ করে তাঁর কাব্যনাট্যগুলো বাংলা সাহিত্যে এক নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘নূরলদীনের সারাজীবন’-এর সেই কালজয়ী পঙক্তি আজও আমাদের রক্তে শিহরণ জাগায়: “জাগো বাহে, কুন্ঠে সবায়ে!” এই একটি পঙক্তির মধ্য দিয়ে তিনি যেন ঘুমন্ত বাঙালি জাতিকে বারবার জেগে ওঠার ডাক দিয়ে গেছেন। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য সৃষ্টির মধ্যে রয়েছে ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, ‘নিষিদ্ধ লোবান’, ‘খেলারাম খেলে যা’ এবং ‘নীল দংশন’-এর মতো কালজয়ী কাজ। তিনি মাত্র ২৯ বছর বয়সে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন, যা সাহিত্যে তাঁর অসামান্য প্রতিভারই স্বীকৃতি। পরবর্তীতে তিনি একুশে পদক এবং স্বাধীনতা পদকেও ভূষিত হন। প্রিয় সুধী, সৈয়দ শামসুল হক আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে শব্দ দিয়ে ছবি আঁকতে হয়। তাঁর ছোটগল্পের বুনন আর উপন্যাসের গভীরতা আমাদের জীবনবোধকে প্রসারিত করে। তিনি আমৃত্যু বিশ্বাস করতেন কলমের শক্তিতে এবং মানুষের মুক্তির মিছিলে। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার এই সব্যসাচী লেখকের নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন তাঁর নির্ভীক জীবনবোধ ও সাহিত্যের নিরন্তর সাধনা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের মেধা ও মননকে বিকশিত করতে পারি। সৈয়দ শামসুল হক তাঁর অবিনশ্বর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বাঙালির হৃদয়ে এবং বাংলা সাহিত্যের আকাশে ধ্রুবতারার মতো চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

মির্জা গালিব-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা । ২৭ ডিসেম্বর

মির্জা গালিব

মির্জা গালিব-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো।   মির্জা গালিব-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ আমরা এমন এক ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যাঁর নাম উচ্চারণ মাত্রই বিশ্বসাহিত্যের এক গভীর দর্শন ও কাব্যময় জগত আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তিনি মুঘল সাম্রাজ্যের শেষ সূর্যোদয়ের সাক্ষী, উর্দু ও ফারসি ভাষার অমর কবি— মির্জা আসাদুল্লাহ খান গালিব। উপস্থিত সুধী, মির্জা গালিব ১৭৯৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর ভারতের আগ্রায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষরা ছিলেন মধ্য এশীয় তুর্কি বংশোদ্ভূত। গালিব এমন এক সময়ে কাব্যচর্চা করেছেন যখন মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ঘটছে এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন জেঁকে বসছে। এই যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে তিনি জীবনকে যে গভীরতা দিয়ে দেখেছিলেন, তা আজ আড়াইশ বছর পরও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। গালিবের কবিতার প্রধান বিষয়বস্তু ছিল মানুষের অস্তিত্বের সংকট, প্রেম, মৃত্যু এবং আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা। তিনি কেবল কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দার্শনিক। তাঁর ‘দিওয়ান-ই-গালিব’ উর্দু সাহিত্যের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠতম সংকলন হিসেবে বিবেচিত। তাঁর রচিত চিঠিপত্রগুলোও উর্দু গদ্য সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ, যা সেই সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির এক প্রামাণ্য দলিল। তাঁর কিছু অমর পঙক্তি আজও সারা বিশ্বের কাব্যপ্রেমীদের মুখে মুখে ঘোরে: “হাজারো খোয়াইশে অ্যায়সি কে হর খোয়াইশ পে দম নিকলে / বহুত নিকলে মেরে আরমান লেকিন ফির ভি কম নিকলে” (অর্থাৎ: হাজারো এমন আকাঙ্ক্ষা যার প্রতিটির জন্য প্রাণ উৎসর্গ করা যায়; অনেক আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হয়েছে ঠিকই, তবু যেন তা পর্যাপ্ত নয়।) প্রিয় সুধী, মির্জা গালিব তাঁর জীবদ্দশায় চরম দারিদ্র্য ও ব্যক্তিগত শোকের মধ্য দিয়ে গেছেন। তাঁর সাতটি সন্তানই শৈশবে মারা যায়। কিন্তু এই দুঃখ তাঁকে ভেঙে ফেলেনি, বরং তাঁর কলমকে করেছে আরও ধারালো এবং সংবেদনশীল। তিনি ছিলেন অত্যন্ত স্বাধীনচেতা এবং রসবোধ সম্পন্ন একজন মানুষ। মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফর তাঁকে ‘দাবির-উল-মুলক’ এবং ‘নাজিম-উদ-দৌলা’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে এই মহান দার্শনিকের নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সেই সুগভীর কাব্যদর্শন সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন গালিবের মতো প্রতিকূলতার মাঝেও জীবনকে দেখার নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করতে পারি এবং নিজেদের জীবনকে শিল্পের আলোয় রাঙাতে পারি। মির্জা গালিব তাঁর কালজয়ী সৃষ্টির মধ্য দিয়ে সাহিত্যের আকাশে চিরকাল ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল!   আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

মুনীর চৌধুরী-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা । ১৯ নভেম্বর

মুনীর চৌধুরী

মুনীর চৌধুরী-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। মুনীর চৌধুরী-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ ১৯ নভেম্বর। আজ আমরা এমন এক প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি একাধারে সাহিত্যিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক এবং বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষাবিদ। তিনি আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের আলোকবর্তিকা—শহীদ মুনীর চৌধুরী। উপস্থিত সুধী, মুনীর চৌধুরী ১৯২৫ সালের ১৯ নভেম্বর তৎকালীন ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈত্রিক নিবাস ছিল নোয়াখালী জেলায়। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই মানুষটি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের তুখোড় অধ্যাপক। তিনি কেবল শ্রেণিকক্ষেই পাঠদান করেননি, বরং বাংলা ভাষাকে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত করার ক্ষেত্রে এক অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। টাইপরাইটারের জন্য তাঁর আবিষ্কৃত ‘মুনীর অপটিমা’ কি-বোর্ড লেআউট আজও আমাদের যান্ত্রিক জীবনে বাংলা ব্যবহারের অন্যতম ভিত্তি হয়ে আছে। মুনীর চৌধুরীর সাহিত্যকর্ম আমাদের জাতীয় সম্পদ। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের উত্তাল সময়ে রাজবন্দী থাকাকালীন তিনি রচনা করেন তাঁর কালজয়ী নাটক ‘কবর’। জেলে বসে এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে রচিত এই নাটকটি আজও আমাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের এক অবিস্মরণীয় দলিল। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’, ‘চিঠি’, ‘দণ্ডকারণ্য’ এবং অনুবাদ নাটক ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ বাংলা নাট্যসাহিত্যের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। সাহিত্য সমালোচনায় তাঁর ‘তুলামূলক সমালোচনা’ এবং ‘বাংলা গদ্যরীতি’ বই দুটি আজ অবধি গবেষকদের জন্য পথপ্রদর্শক। প্রিয় সুধী, মুনীর চৌধুরী ছিলেন আপাদমস্তক এক অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল মানুষ। একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোতে তিনি দেশের মাটির মায়া ত্যাগ করেননি। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, স্বাধীনতার সূর্য উদিত হওয়ার মাত্র দুদিন আগে, ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে আল-বদর বাহিনী তাঁকে অপহরণ করে নিয়ে যায় এবং বরেণ্য এই বুদ্ধিজীবীকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। তাঁর শূন্যতা আজও অপূরণীয়। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার এই মহান চিন্তকের নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন মুনীর চৌধুরীর সেই নির্ভীক সত্যবাদিতা ও জ্ঞাননিষ্ঠার আদর্শকে আমাদের শিক্ষা জীবনে পাথেয় করতে পারি। মুনীর চৌধুরী তাঁর কর্ম ও অসামান্য সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বাঙালির হৃদয়ে এবং বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

সলিল চৌধুরীর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা

সলিল চৌধুরী

সলিল চৌধুরী-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। সলিল চৌধুরী-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ ১৯ নভেম্বর। আজ আমরা এমন এক কালজয়ী প্রতিভা ও সুরস্রষ্টার জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি ভারতীয় সংগীতের ব্যাকরণ ও বিন্যাসকে এক বৈপ্লবিক আধুনিকতায় ঋদ্ধ করেছেন। তিনি আমাদের প্রিয় সলিলদা—বিখ্যাত সংগীত পরিচালক, সুরকার, গীতিকার এবং গল্পকার সলিল চৌধুরী। উপস্থিত সুধী, সলিল চৌধুরী ১৯২৫ সালের ১৯ নভেম্বর দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার গাজিপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব কেটেছে আসামের চা বাগানে, যেখানে বাবার সংগ্রহে থাকা পাশ্চাত্য উচ্চাঙ্গ সংগীত এবং চা বাগানের শ্রমিকদের জীবনের সুর তাঁর সংগীত সত্তাকে সমৃদ্ধ করেছিল। জ্যাঠাতো ভাই নিখিল চৌধুরীর ঐক্যবাদন দল ‘মিলন পরিষদ’-এর মাধ্যমে সংগীতের জগতে তাঁর হাতেখড়ি। পরবর্তীতে কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজ থেকে স্নাতক করার সময় থেকেই তিনি রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়ে ওঠেন এবং ভারতীয় গণনাট্য সংঘ বা আইপিটিএ (IPTA)-এ যোগ দেন। মাত্র ২০ বছর বয়সে তিনি ‘গাঁয়ের বধু’র মতো গান সুর করে বাংলা সংগীতে এক নতুন ধারার সূচনা করেছিলেন। তাঁর সৃজনশীলতায় বাংলা গান পেয়েছিল ‘রানার’, ‘বিচারপতি’ এবং ‘অবাক পৃথিবী’র মতো কালজয়ী সব গণসংগীত। সলিল চৌধুরী কেবল বাংলাতেই নয়, হিন্দি, মালয়ালম, তামিল, তেলুগু ও মারাঠীসহ বিভিন্ন ভাষায় ৭৫টিরও বেশি হিন্দি ও ৪০টির বেশি বাংলা চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা করেছেন। ১৯৫৩ সালে তাঁরই লেখা ছোটগল্প ‘রিকসাওয়ালা’ অবলম্বনে বিমল রায় নির্মাণ করেন বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘দো ভিঘা জামিন’, যা কান চলচ্চিত্র উৎসবে আন্তর্জাতিক পুরস্কার জিতে তাঁর কর্মজীবনকে এক বিশ্বজনীন মাত্রা দান করে। প্রিয় সুধী, সলিল চৌধুরীর সংগীতে ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সংগীত এবং পাশ্চাত্য উচ্চাঙ্গ সংগীতের এক অসামান্য মেলবন্ধন লক্ষ করা যায়। মোৎজার্টের সিম্ফোনি থেকে শুরু করে শপ্যাঁর কাজ—সবকিছুকেই তিনি অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ভারতীয় গানের সাথে মিশিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি কেবল সুরকার ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দক্ষ যন্ত্রীও; বাঁশি, পিয়ানো ও এসরাজ বাজানোয় তিনি ছিলেন পারদর্শী। ১৯৫৮ সালে ‘মধুমতি’ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি ফিল্মফেয়ার সেরা সংগীত পরিচালকের পুরস্কার পান এবং ১৯৮৮ সালে লাভ করেন ‘সংগীত নাটক একাডেমী পুরস্কার’। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে সলিল চৌধুরীর নাম নিই, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর আত্মার শান্তি কামনায় সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন তাঁর নির্ভীক জীবনবোধ ও শিল্পের প্রতি নিরন্তর সাধনা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে আরও উন্নত করতে পারি। সলিল চৌধুরী তাঁর অবিনশ্বর সুর ও সৃষ্টির মধ্য দিয়ে প্রতিটি সংগীতানুরাগী মানুষের হৃদয়ে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

মওলানা আবুল কালাম আজাদ-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা । ১১ নভেম্বর

মওলানা আবুল কালাম আজাদ

মওলানা আবুল কালাম আজাদ-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। মওলানা আবুল কালাম আজাদ-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ ১১ নভেম্বর। আজ আমরা এমন এক ক্ষণজন্মা মহাপুরুষের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি একাধারে প্রখর ধীসম্পন্ন রাজনীতিবিদ, অনন্য সুবক্তা, দূরদর্শী শিক্ষাবিদ এবং সাংবাদিক। তিনি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব—মওলানা আবুল কালাম আজাদ। উপস্থিত সুধী, মওলানা আবুল কালাম আজাদ ১৮৮৮ সালের ১১ নভেম্বর সৌদি আরবের মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল মুহিউদ্দিন আহমেদ, তবে তিনি ‘আবুল কালাম’ নামেই বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পান এবং তাঁর কলম থেকে নির্গত তেজস্বী লেখার কারণে তিনি ‘আজাদ’ ছদ্মনাম গ্রহণ করেন। খুব অল্প বয়সেই তিনি বিভিন্ন ভাষায় পাণ্ডিত্য অর্জন করেন এবং তাঁর সম্পাদিত ‘আল হিলাল’ পত্রিকার মাধ্যমে ব্রিটিশবিরোধী জনমত গঠনে অভূতপূর্ব ভূমিকা রাখেন। মওলানা আজাদ ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক জীবন্ত কিংবদন্তি। তিনি হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রবল প্রবক্তা ছিলেন এবং দেশভাগের ঘোর বিরোধী ছিলেন। ১৯২৩ সালে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সর্বকনিষ্ঠ সভাপতি নির্বাচিত হন। মহাত্মা গান্ধী তাঁকে অভিহিত করেছিলেন ‘প্লাটোর সমান মেধার অধিকারী’ (A man of the calibre of Plato) হিসেবে। প্রিয় সুধী, স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে মওলানা আজাদের অবদান অনস্বীকার্য। আজকের আধুনিক ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি তাঁরই হাতে গড়া। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতির মুক্তি সম্ভব নয়। তাঁর নেতৃত্বেই ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি’ (IIT) এবং ‘ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশন’ (UGC) এর মতো বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে ওঠে। শিক্ষার প্রসারে তাঁর এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁর জন্মদিনটিকে ভারতে ‘জাতীয় শিক্ষা দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। ১৯৯২ সালে তাঁকে মরণোত্তর ‘ভারতরত্ন’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার এই মহান জ্ঞানতাপসের নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর ত্যাগ ও শিক্ষার দর্শন সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন মওলানা আজাদের মতো জ্ঞানের সন্ধানে ব্রতী হয়ে একটি আলোকিত ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গড়ে তুলতে পারি। মওলানা আবুল কালাম আজাদ তাঁর কর্ম ও প্রজ্ঞার মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

পাবলো পিকাসো-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা । ২৫ অক্টোবর

পাবলো পিকাসো

পাবলো পিকাসো-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। পাবলো পিকাসো-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ ২৫ অক্টোবর। আজ আমরা বিংশ শতাব্দীর শিল্পকলা আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ, আধুনিক চিত্রকলার জাদুকর পাবলো পিকাসো-এর জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি। তিনি এমন একজন শিল্পী ছিলেন যিনি ক্যানভাসে সুন্দরের প্রচলিত সংজ্ঞাকে ভেঙে চুরমার করে দিয়ে নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গি উপহার দিয়েছিলেন। উপস্থিত সুধী, পাবলো পিকাসো ১৮৮১ সালের ২৫ অক্টোবর স্পেনের মালাগা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুরো নাম ছিল অবিশ্বাস্য রকমের দীর্ঘ, তবে বিশ্ব তাঁকে এক নামেই চেনে—পিকাসো। তাঁর বাবা হোসে রুইজ ব্লাস্কো নিজেও একজন চিত্রশিল্পী ও শিক্ষক ছিলেন। শৈশব থেকেই পিকাসোর প্রতিভা ছিল বিস্ময়কর। বলা হয়ে থাকে, কথা বলা শেখার আগেই তিনি ছবি আঁকতে শিখেছিলেন। পিকাসোর শিল্পজীবন ছিল অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। তিনি কেবল চিত্রশিল্পী ছিলেন না; তিনি একাধারে ভাস্কর, ছাপচিত্র শিল্পী, মৃৎশিল্পী এবং মঞ্চ নকশাকার। শিল্পকলার ইতিহাসে তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিত তাঁর উদ্ভাবিত ‘কিউবিজম’ বা ঘনকবাদ আন্দোলনের জন্য। তাঁর আঁকা ছবিগুলোকে বিভিন্ন কালখণ্ডে ভাগ করা হয়, যার মধ্যে ‘ব্লু পিরিয়ড’ (Blue Period) এবং ‘রোজ পিরিয়ড’ (Rose Period) অত্যন্ত বিখ্যাত। তাঁর কালজয়ী সৃষ্টির মধ্যে ১৯৩৭ সালে আঁকা ‘গুয়ের্নিকা’ (Guernica) চিত্রকর্মটি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এবং যুদ্ধের ভয়াবহতার বিরুদ্ধে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী শিল্প-প্রতিবাদ হিসেবে স্বীকৃত। প্রিয় সুধী, পিকাসো তাঁর দীর্ঘ ৯১ বছরের জীবনে প্রায় ৫০ হাজারেরও বেশি শিল্পকর্ম সৃষ্টি করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, “প্রতিটি শিশুই একজন শিল্পী, সমস্যা হলো বড় হওয়ার পরও কীভাবে শিল্পী থাকা যায় তা নিয়ে।” তাঁর কাজ আমাদের শেখায় প্রথাগত নিয়ম ভেঙে কীভাবে সৃজনশীলতার নতুন দুয়ার উন্মোচন করা যায়। তিনি ছিলেন আধুনিকতার প্রতীক, যিনি শিল্পের মাধ্যমে সমসাময়িক রাজনীতি ও মানবিক সংকটকে তুলে ধরেছেন। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে এই মহান শিল্পীকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর আত্মার শান্তি কামনায় প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন পিকাসোর অদম্য সৃজনশীলতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের জীবনকে বৈচিত্র্যময় ও অর্থবহ করে তুলতে পারি। পাবলো পিকাসো তাঁর অমর তুলির টানে বিশ্বের শিল্পমনা মানুষের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

কবি শহীদ কাদরী-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা

কবি শহীদ কাদরী-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। কবি শহীদ কাদরী-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ ১৪ই আগস্ট। আজ আমরা এমন এক কবির জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি দেশবিভাগোত্তর বাংলা কবিতায় নাগরিক জীবন, আধুনিকতা এবং নিঃসঙ্গতাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তিনি আমাদের আধুনিক কবিতার প্রবাদপ্রতিম পুরুষ—কবি শহীদ কাদরী। উপস্থিত সুধী, শহীদ কাদরী ১৯৪২ সালের ১৪ আগস্ট কলকাতার পার্ক সার্কাসে জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর তিনি সপরিবারে ঢাকায় চলে আসেন। তিনি ছিলেন পঞ্চাশের দশকের অন্যতম প্রভাবশালী কবি। যদিও তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা মাত্র চারটি, কিন্তু বাংলা কবিতায় তাঁর গভীরতা ও প্রভাব অপরিসীম। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলো হলো— ‘উত্তরাধিকার’, ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’, ‘কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই’ এবং ‘আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও’। শহীদ কাদরী ছিলেন মূলত নগর-মনস্কতার কবি। ঢাকা শহরের অলিগলি, নাগরিক যন্ত্রণা আর আধুনিক মানুষের বিচ্ছিন্নতাবোধ তাঁর কলমে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। ১৯৭৩ সালে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং ২০১১ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন। দীর্ঘ প্রবাস জীবনেও তাঁর হৃদয়ে বাংলাদেশ এবং বাংলা ভাষা সর্বদা প্রদীপ্ত ছিল। প্রিয় সুধী, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং মানুষের মৌলিক অধিকারের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা ছিল অটুট। তাঁর ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’ কবিতাটি আমাদের জাতীয় চেতনার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। যেখানে তিনি যুদ্ধ ও সংঘাতের বিপরীতে প্রেমের জয়গান গেয়েছেন: “ভয় নেই / আমি এমন ব্যবস্থা করব / যাতে সেনাবাহিনীর বদলে / চারা গাছগুলো অভিবাদন করবে তোমাকে” তাঁর কবিতার সেই কালজয়ী পঙক্তিগুলো আজও প্রতিটি তরুণের মনে আশার আলো জ্বালায়। তিনি ছিলেন একজন রুচিশীল ও প্রগতিশীল মানুষ, যাঁর জীবনবোধ আমাদের শেখায় কীভাবে প্রতিকূলতার মাঝেও শিল্পের শুদ্ধতা বজায় রাখতে হয়। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার কবির নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই মহান শিল্পীর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের কৃষ্টি ও মাতৃভাষাকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় লালন করতে পারি। কবি শহীদ কাদরী তাঁর অবিনশ্বর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে প্রতিটি বাঙালি পাঠকের হৃদয়ে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

নেলসন ম্যান্ডেলা-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা

নেলসন ম্যান্ডেলা

নেলসন ম্যান্ডেলা-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। নেলসন ম্যান্ডেলা-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ আমরা এমন এক ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি অদম্য সাহস, ক্ষমা এবং মানবিকতার এক জীবন্ত কিংবদন্তি। যিনি শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য আর বর্ণবাদের অন্ধকার থেকে দক্ষিণ আফ্রিকাকে মুক্ত করে বিশ্বকে দেখিয়েছেন সহনশীলতার নতুন পথ। তিনি আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় নেতা—নেলসন ম্যান্ডেলা। উপস্থিত সুধী, নেলসন ম্যান্ডেলা ১৯১৮ সালের ১৮ জুলাই দক্ষিণ আফ্রিকার এমভেজো গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব নাম ছিল রোলিহ্লাহ্লা ম্যান্ডেলা। কর্মবৈচিত্র্যের দিক দিয়ে তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের এক অকুতোভয় সব্যসাচী প্রতিভা—যিনি একাধারে আইনজীবী, রাজনৈতিক নেতা এবং শান্তিকামী বিশ্বনাগরিক। আজ তাঁর জীবনের একটি বিশেষ অধ্যায় স্মরণ করা প্রয়োজন। বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের কারণে তাঁকে দীর্ঘ ২৭ বছর কারাবরণ করতে হয়েছিল। কিন্তু জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ তাঁর আদর্শকে আরও উজ্জ্বল করেছিল। ১৯৯০ সালে কারামুক্ত হওয়ার পর তিনি যখন ক্ষমতায় আসীন হলেন, তখন তিনি প্রতিহিংসার পথ বেছে নেননি। বরং ‘সত্য ও পুনর্মিলন কমিশন’ (Truth and Reconciliation Commission) গঠনের মাধ্যমে শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের এক সুতোয় গেঁথে গড়ে তুলেছিলেন ‘রেইনবো নেশন’ বা রংধনু জাতি। ১৯৯৩ সালে তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন এবং ১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন। প্রিয় সুধী, নেলসন ম্যান্ডেলার সাথে বাংলাদেশের এক বিশেষ আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি আমাদের আমন্ত্রণে বাংলাদেশে এসেছিলেন। সেই সময় তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা হলো বিশ্বকে পরিবর্তন করার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। ম্যান্ডেলার অনেক কালজয়ী উক্তি আজও সারা বিশ্বে অনুপ্রেরণা জোগায়: “পৃথিবীর কোনো মানুষই অন্য মানুষকে তার গায়ের রঙের কারণে ঘৃণা করে জন্মায় না। মানুষকে ঘৃণা করা শিখতে হয়, আর যদি তারা ঘৃণা করা শিখতে পারে, তবে তাদের ভালোবাসাও শেখানো সম্ভব।” তিনি কেবল নিজের দেশের নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন পৃথিবীর প্রতিটি মুক্তিকামী মানুষের কণ্ঠস্বর। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, বিজয় মানে কেবল জয়লাভ নয়, বরং প্রতিটি পতনের পর আবার উঠে দাঁড়ানো। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার এই মহান নেতার নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর আদর্শ সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই মহাপ্রাণের জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে পারি। নেলসন ম্যান্ডেলা তাঁর কর্ম ও আদর্শের মধ্য দিয়ে সারা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের হৃদয়ে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

বেগম সুফিয়া কামাল-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা, ২০ জুন

বেগম সুফিয়া কামাল-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। বেগম সুফিয়া কামাল-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ আমরা এমন এক মহীয়সী নারীর জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি বাঙালির সকল প্রগতিশীল আন্দোলন এবং নারী জাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ। তিনি আমাদের প্রাণের মমতায় আগলে রাখা ‘জননী সাহসিকা’—কবি বেগম সুফিয়া কামাল। উপস্থিত সুধী, সুফিয়া কামাল ১৯১১ সালের ২০ জুন বরিশালের শায়েস্তাবাদে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম সৈয়দ আবদুল বারী এবং মায়ের নাম সৈয়দা সাবেরা খাতুন। এমন এক সময়ে তিনি জন্মেছিলেন যখন মুসলিম নারীদের শিক্ষার পরিবেশ ছিল অত্যন্ত প্রতিকূল। কিন্তু অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে তিনি স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হন এবং বেগম রোকেয়ার আদর্শকে ধারণ করে সমাজ সংস্কারে আত্মনিয়োগ করেন। কর্মবৈচিত্র্যের দিক দিয়ে তিনি ছিলেন এক অনন্য সব্যসাচী ব্যক্তিত্ব। তিনি কেবল একজন কবিই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন, ১৯৬১-র রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী প্রতিরোধ আন্দোলন এবং ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। যুদ্ধের দিনগুলোতে অবরুদ্ধ ঢাকায় থেকেও তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহায়তা করেছেন এবং পরবর্তীতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে তোলা আন্দোলনেও বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৬৯ সালে গঠিত ‘মহিলা পরিষদ’-এর প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী হিসেবে তিনি আমৃত্যু নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় লড়াই করে গেছেন। প্রিয় সুধী, সুফিয়া কামালের কবিতা ও গদ্য আমাদের সাহিত্যভাণ্ডারকে ঋদ্ধ করেছে। তাঁর লেখনীতে ফুটে উঠেছে প্রকৃতি, দেশপ্রেম এবং অধিকারবঞ্চিত মানুষের কথা। তাঁর কালজয়ী গ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘সাঁঝের মায়া’, ‘মায়া কাজল’, ‘মন ও জীবন’ এবং ‘একাত্তরের ডায়েরি’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কবির সেই অমোঘ পঙক্তি আজও আমাদের প্রেরণা দেয়: “আমাদের এই দেশে হবে সেই ছেলে কবে/ কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে?” সুফিয়া কামাল ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূর্ত প্রতীক। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে মাথা নত না করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হয়। ১৯৮১ সালে যখন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তী পালনে বাধা দেওয়া হয়েছিল, তিনি সেই রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রাজপথে নেমেছিলেন। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার এই মহীয়সী নারীর নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর ত্যাগ ও আদর্শ সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই জননী সাহসিকার জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের দেশপ্রেম ও মানবিকতাকে আজীবন অক্ষুণ্ণ রাখতে পারি। বেগম সুফিয়া কামাল তাঁর কর্ম এবং আদর্শের মধ্য দিয়ে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা । ৭ মে

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ পঁচিশে বৈশাখ। আজ আমরা এমন এক জ্যোতির্ময় ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিয়েছেন হিমালয়সম উচ্চতায়। তিনি আমাদের চেতনার দীপশিখা, আমাদের প্রাণের কবি—বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। উপস্থিত সুধী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৬১ সালের ৭ মে (বাংলা পঞ্জিকা মতে ১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫শে বৈশাখ) কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং মাতা সারদাসুন্দরী দেবী। কর্মবৈচিত্র্যের দিক দিয়ে তিনি ছিলেন এক অতলস্পর্শী সব্যসাচী প্রতিভা। তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, দার্শনিক, সংগীতস্রষ্টা, চিত্রশিল্পী এবং শিক্ষাবিদ। আজ একটি বিশেষ বিষয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন। ১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য প্রথম এশীয় হিসেবে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর এই অর্জন কেবল একজন কবির বিজয় ছিল না, এটি ছিল বাংলা ভাষার বিশ্বজয়ের সূচনালগ্ন। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে বৈশ্বিক ভাবনার সাথে দেশীয় সংস্কৃতির সমন্বয় ঘটাতে হয়। ১৯২১ সালে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘বিশ্বভারতী’ বিশ্ববিদ্যালয় আজও বিশ্ব সংস্কৃতির এক অনন্য মিলনস্থল। প্রিয় সুধী, রবীন্দ্রনাথের সাথে আমাদের এই বাংলাদেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ও নিবিড়। পাবনার শিলাইদহ, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর আর নওগাঁর পতিসরে কাটানো তাঁর জীবনের সোনালি দিনগুলোতেই তিনি রচনা করেছেন তাঁর শ্রেষ্ঠ অনেক সৃষ্টি। আমাদের জাতীয় সংগীত “আমার সোনার বাংলা” এই মাটির প্রতি তাঁর গভীর মমত্ববোধের অমর ফসল। রবীন্দ্রনাথের গানের সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। তাঁর সেই কালজয়ী সৃষ্টিসমূহ আজও বাঙালির আনন্দ-বেদনায় পরম আশ্রয়: “তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম” “ছিলে একা বসি আপন মনে” “বাংলার মাটি বাংলার জল, বাংলার বায়ু বাংলার ফল— পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান” তিনি কেবল সৌন্দর্যের কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার এক কণ্ঠস্বর। ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তিনি ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া ‘নাইটহুড’ উপাধি বর্জন করে যে নৈতিক সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন, তা ইতিহাসে বিরল। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার বিশ্বকবির নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই মহাপ্রাণের জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের সংস্কৃতি ও মনুষ্যত্বকে আজীবন লালন করতে পারি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কর্মের মধ্য দিয়ে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা