কবি জীবনানন্দ দাশ-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা

কবি জীবনানন্দ দাশ-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। কবি জীবনানন্দ দাশ-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ আমরা এমন এক ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি বাংলা কাব্যসাহিত্যের প্রচলিত ধারাকে বদলে দিয়ে আধুনিকতার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন। তিনি প্রকৃতির শুদ্ধতম কবি, রূপসী বাংলার রূপকার—আমাদের চিরচেনা কবি জীবনানন্দ দাশ। উপস্থিত সুধী, কবি জীবনানন্দ দাশ ১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশ) বরিশাল শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সত্যানন্দ দাশ ছিলেন একজন শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক এবং মাতা কুসুমকুমারী দাশ ছিলেন একজন সুপরিচিত কবি। শৈশব থেকেই এক গভীর সাহিত্যিক পরিবেশে তাঁর বেড়ে ওঠা। কর্মজীবনে তিনি অধ্যাপনার সাথে যুক্ত ছিলেন এবং ব্রজমোহন কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন। জীবনানন্দ দাশ কেবল একজন কবি ছিলেন না; তিনি ছিলেন আধুনিক মানুষের একাকিত্ব, বিষণ্নতা এবং প্রকৃতির রূপমাধুর্যের শ্রেষ্ঠ ভাষ্যকার। তাঁর কবিতায় যে চিত্রকল্প ও শব্দবিন্যাস আমরা দেখি, তা বিশ্বসাহিত্যে বিরল। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কবিতাকে ‘চিত্ররূপময়’ বলে অভিহিত করেছিলেন। জীবনানন্দ তাঁর সৃষ্টিতে বারবার ফিরে এসেছেন নদী, পাখি আর ধানসিঁড়ি তীরের এই বাংলায়। তাঁর কালজয়ী কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘বনলতা সেন’, ‘রূপসী বাংলা’, ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ এবং ‘বেলা অবেলা কালবেলা’ বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। তাঁর কবিতার কিছু অমর পঙক্তি আজও আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ: “আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে— এই বাংলায়” * “হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে” * “সুরঞ্জনা, আজো তুমি আমাদের পৃথিবীতে আছো” মজার ব্যাপার হলো, নিভৃতচারী এই কবি তাঁর জীবদ্দশায় যতটা না পরিচিত ছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপিগুলো যখন আবিষ্কৃত হয়, তখন তাঁর প্রতিভার বিশালতা সারা বিশ্বকে অবাক করে দেয়। তাঁর ‘মাল্যবান’ উপন্যাসে আমরা এক ভিন্নধর্মী গদ্যকারের পরিচয় পাই। প্রিয় সুধী, জীবনানন্দ দাশ তাঁর জীবন ও কর্মের মধ্য দিয়ে আমাদের শিখিয়েছেন মাটির কাছাকাছি থাকতে, তুচ্ছ ঘাস কিংবা সামান্য ঘাসফড়িঙের ভেতরেও সৌন্দর্য খুঁজে পেতে। তিনি ছিলেন একজন শেকড় সন্ধানী মানুষ, যিনি দেশভাগের কষ্ট এবং আধুনিক জীবনের জটিলতাকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে প্রকাশ করেছেন। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার কবির নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই রূপসী বাংলার কবির জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের শেকড় এবং প্রকৃতির প্রতি মমত্ববোধকে ভুলে না যাই। কবি জীবনানন্দ দাশ তাঁর অবিনশ্বর কর্মের মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: [গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা]
পহেলা ফাল্গুন ও বসন্ত উৎসব উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা
পহেলা ফাল্গুন ও বসন্ত উৎসব উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। পহেলা ফাল্গুন ও বসন্ত উৎসব উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই ঋতুরাজ বসন্তের রঙিন শুভেচ্ছা ও আন্তরিক প্রীতি। আজ প্রকৃতিতে এক নতুন প্রাণের স্পন্দন। শীতের রিক্ততা কাটিয়ে প্রকৃতি আজ সেজেছে নতুন সাজে। শিমুল-পলাশের রক্তিম আভা আর কোকিলের কুহুতানে আজ আমরা বরণ করে নিচ্ছি বাঙালির প্রাণের ঋতু বসন্তকে। আজ পহেলা ফাল্গুন। উপস্থিত সুধী, বসন্ত উৎসব কেবল ঋতু পরিবর্তনের বার্তা দেয় না, এটি আমাদের সংস্কৃতির এক বিশাল উৎসব। ‘ফাল্গুনে বিকশিত কাঞ্চন ফুল, ডালে ডালে পুঞ্জিত আম্রমুকুল’—কবিগুরুর এই পঙক্তির মতোই আজ আমাদের মনও বিকশিত হওয়ার দিন। প্রাচীনকাল থেকেই এই জনপদে বসন্ত উদযাপনের রীতি চলে আসছে। মোগল সম্রাট আকবরের সময় থেকে বঙ্গাব্দ গণনার মাধ্যমে ফাল্গুন মাসকে ঘিরে যে উৎসবের সূচনা হয়েছিল, আজ তা আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পহেলা ফাল্গুন মানেই চারদিকে রঙের খেলা। বাসন্তী রঙের শাড়ি আর পাঞ্জাবিতে সেজে তরুণ-তরুণীরা আজ প্রকৃতির সাথে মিতালি করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি প্রান্ত আজ মেলা, গান আর উৎসবে মুখর। বসন্ত মানেই পুনর্জন্ম; গাছের পুরনো পাতা ঝরে যেমন নতুন কিশলয় গজায়, তেমনি আমাদের মনেও সঞ্চারিত হয় নতুন আশা ও উদ্দীপনা। প্রিয় সুধী, বাঙালির ইতিহাসে বসন্তের এক ভিন্ন তাৎপর্যও রয়েছে। ১৯৫২ সালের সেই রক্তঝরা ফাল্গুন মাসেই আমাদের তরুণরা মায়ের ভাষার অধিকার আদায়ে রাজপথ রঞ্জিত করেছিল। তাই এই বসন্ত উৎসব একইসাথে আমাদের আনন্দ এবং আমাদের সাহসের প্রতীক। আজকের এই বিশ্বায়নের যুগে আমরা যখন যান্ত্রিকতায় ডুবে যাচ্ছি, তখন এই উৎসবগুলোই আমাদের মানবিক ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখে। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর প্রায়শই একটি অত্যন্ত গভীর কথা বলেন— “প্রতিজন মানুষের নৃতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় এমন এক ধরণের পরিচয় যা বদলানো যায় না। একজন মানুষ তার নিজের সেই সংস্কৃতি যখন চর্চা করে এবং তা উন্নত করতে কাজ করে, তখন সেই সংস্কৃতি তাকে পরিপূর্ণ এবং ‘ওয়েল ফর্মড’ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করে। আপনি নিজের সংস্কৃতির সাথে যুক্ত থাকলে বিশ্বের অন্য জাতিগোষ্ঠীর কাছে সম্মানিত হবেন। কিন্তু নিজের সংস্কৃতি বাদ দিয়ে অন্য সংস্কৃতির চর্চা করলে তা কখনোই আপনাকে পূর্ণ মানুষ হতে দেবে না। তাই আমরা বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতিগুলোর চর্চা ও প্রতিনিয়ত উন্নয়ন করতে কাজ করতে চাই।” সেই দর্শনে অনুপ্রাণিত হয়েই আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বসন্তের রঙে নিজেদের রাঙিয়ে নিয়েছি। আমরা বিশ্বাস করি, এই ফাল্গুন, এই পলাশ আর শিমুল—এসবই আমাদের জাতিগত শৌর্য। আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিই আমাদের বিশ্বদরবারে অনন্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করবে। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই বসন্ত উৎসবে মানুষের মনে শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন আধুনিকতার মোহে আমাদের শেকড় আর আমাদের ঐতিহ্যের এই চিরচেনা বাংলাকে কখনো ভুলে না যাই। বসন্তের এই রঙিন দিনগুলো প্রতিটি বাঙালির জীবনে আনন্দ ও শান্তি বয়ে আনুক। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা
কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা
কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ আমরা এমন এক ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি একাধারে কবি, সাংবাদিক, শিক্ষক এবং সারা বিশ্বের মজলুম ও নিপীড়িত মানুষের অবিনাশী কণ্ঠস্বর। তিনি বিংশ শতাব্দীর উর্দু সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র—কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ। উপস্থিত সুধী, ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ ১৯১১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি অবিভক্ত ভারতের শিয়ালকোটে জন্মগ্রহণ করেন। আজকের এই ভাষা আন্দোলনের দেশে দাঁড়িয়ে অনেকে হয়তো অবাক হয়ে ভাবতে পারেন যে, কেন আমরা একজন উর্দু কবিকে উদযাপন করছি। তাঁদের উদ্দেশ্যে আমাদের গুরুকুলের স্পষ্ট অবস্থান হলো—আমাদের ভাষা হিসেবে উর্দুর সাথে কোনো শত্রুতা নেই। আমরা ভাষা আন্দোলন করেছিলাম আমাদের মায়ের ভাষা বাংলার অধিকার প্রতিষ্ঠায়, উর্দুর বিরুদ্ধে নয়। ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ এমন একজন কবি, যিনি প্রগতিশীল লেখক আন্দোলনের তাঁর সময়ের সবচেয়ে বড় নাম। তিনি সবসময় মানবতা, বন্ধুত্ব (দোস্তি), উদারতা (দিলবারি) এবং অকৃত্রিম বন্ধুত্বের (খুলুস) কথা বলেছেন। তিনি ছিলেন একাধারে প্রেমের ও বিপ্লবের সব্যসাচী কবি। ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ তাঁর আদর্শের কারণে পাকিস্তানে কখনও ক্ষমতার আশ্রয়ে থাকতে পারেননি। সত্য ও ন্যায়ের কথা বলায় জীবনের দীর্ঘ সময় তাঁকে কাটাতে হয়েছে কারান্তরালে অথবা নির্বাসনে। কিন্তু কোনো প্রাচীরই তাঁর কলমকে স্তব্ধ করতে পারেনি। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এদেশের মানুষের ওপর হওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সোচ্চার। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে এসে তিনি লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা— “হাম কে ঠ্যাহরে আজনবি ইতনি মুদারাতোঁ কে বাদ” (অর্থাৎ: এত খাতির-যত্নের পরও আমরা যেন আজব এক ভিনদেশি হয়ে রইলাম।) তাঁর জনপ্রিয় সৃষ্টিগুলো আজও সারা বিশ্বে মানুষের হৃদয়ে গেঁথে আছে। তাঁর কালজয়ী গান ও কবিতার কিছু পঙক্তি আজও আমাদের রক্তে শিহরণ জাগায়: “মুঝসে পহলি সি মহব্বত মেরে মেহবুব না মাঙ” “হাম দেখেঙ্গে, লাজিম হ্যায় কে হাম ভি দেখেঙ্গে” তাঁর শেকড় সন্ধানী মনন প্রেম, প্রকৃতি ও দ্রোহকে এক সুতোয় গেঁথেছিল। তিনি কেবল একজন কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন বিশাল হৃদয়ের মানুষ, যিনি রাজকীয় বিলাসিতা ছেড়ে মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইকে আপন করে নিয়েছিলেন। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার কবির নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই প্রগতিশীল শিল্পীর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের আদর্শ ও মানবিকতাকে ভুলে না যাই। কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ তাঁর অবিনশ্বর কর্মের মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা
কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা

কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ আমরা এমন এক ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি ছিলেন একাধারে বরেণ্য কবি, উচ্চপদস্থ আমলা এবং বাংলাদেশের কৃষি ও পানিসম্পদ মন্ত্রী। তাঁর শব্দচয়ন ও কাব্যশৈলী বাংলা সাহিত্যকে দিয়েছে এক অনন্য মাত্রা। তিনি আমাদের লোকজ ঐতিহ্যের সার্থক রূপকার—কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ। উপস্থিত সুধী, কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ ১৯৩৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার অন্তর্গত বহেরচর ক্ষুদ্রকাঠি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আব্দুল জব্বার খান ছিলেন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সাবেক স্পিকার। কবির পুরো নাম ছিল আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ খান। তিনি কেবল একজন কবিই ছিলেন না, তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর শিক্ষা লাভ করেছিলেন এবং সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ছিলেন। কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর যাপিত জীবন ছিল বৈচিত্র্যপূর্ণ। তিনি ১৯৫৪ সালে সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তানে (CSP) যোগ দেন এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকারের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এত বড় প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের মাঝেও কবিতার জগত থেকে তিনি কখনো বিচ্ছিন্ন হননি। তাঁর কবিতায় ফুটে উঠেছে আবহমান বাংলার গ্রামীণ জীবন, মানুষের লড়াই এবং শেকড়ের গভীর টান। অনেকে মনে করেন আধুনিক বাংলা কবিতায় তিনি এক নতুন ধারার প্রবর্তন করেছিলেন। তাঁর রচিত ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’ কবিতাটি বাংলাদেশের সাহিত্য ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় মাইলফলক। কবির উচ্চারণ— “আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি, তাঁর করতলে পলিমাটির সৌরভ ছিল…”—আমাদের ঐতিহ্যের প্রতি দায়বদ্ধতা মনে করিয়ে দেয়। তাঁর ‘সাত নরী হার’ কিংবা ‘বৃষ্টি ও রৌদ্রের জন্য প্রার্থনা’ কাব্যগ্রন্থগুলো বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। মজার ব্যাপার হলো, তাঁর অনেক পাঠক হয়তো জানেন না যে, তিনি পেশাদার জীবনে সফল কূটনীতিক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এবং ইউনেস্কোর এশিয়া-পশান্ত অঞ্চলের পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর শেকড় সন্ধানী মনন প্রশাসন ও শিল্পকে এক সুতোয় গেঁথেছিল। প্রিয় সুধী, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ তাঁর অসামান্য সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৯ সালে ‘একুশে পদক’ এবং ১৯৮৫ সালে ‘বাংলা একাডেমি পুরস্কার’ লাভ করেন। তাঁর প্রতিটি সৃষ্টিতে তিনি দেশপ্রেম ও ঐতিহ্যের জয়গান গেয়েছেন। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার কবির নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই প্রজ্ঞাবান কবির জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের শেকড়কে ভুলে না যাই। কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ ২০০১ সালের ১৯ মার্চ ইন্তেকাল করেন। তিনি তাঁর কালজয়ী কর্মের মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা
কবি পূর্ণেন্দুশেখর পত্রীর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা

কবি পূর্ণেন্দুশেখর পত্রীর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে বিভিন্ন আয়োজনের পাশাপাশি এই বিশেষ বক্তৃতাটি সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য তুলে ধরা হলো। সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ আমরা এমন এক বিরল বহুমুখী প্রতিভার জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি একাধারে কবি, প্রচ্ছদশিল্পী, চিত্রপরিচালক, গবেষক এবং প্রাবন্ধিক। বাংলা শিল্প-সাহিত্যের আকাশে তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যার সৃজনশীলতার আলো আজ অবধি আমাদের পথ দেখায়। তিনি আমাদের সকলের প্রিয় কবি—পূর্ণেন্দুশেখর পত্রী। উপস্থিত সুধী, পূর্ণেন্দুশেখর পত্রীর জন্ম ১৯৩১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলার শ্যামপুরের নাকোল গ্রামে। তাঁর পিতা পুলিনবিহারী পত্রী এবং মাতা নির্মলা দেবী। আজ তাঁর প্রয়াণের বহু বছর পরেও তিনি আমাদের মাঝে অম্লান তাঁর অবিনাশী সৃষ্টির মাধ্যমে। পূর্ণেন্দু পত্রী ছিলেন একাধারে সুনিপুণ প্রচ্ছদশিল্পী এবং সংবেদনশীল কবি। তাঁর ‘কথোপকথন’ কাব্যগ্রন্থটি বাংলা কবিতার ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল। ঘরোয়া চলন, অথচ গভীর ব্যঞ্জনা ছিল তাঁর কবিতার প্রধান শক্তি। প্রচ্ছদশিল্পে তিনি যে আধুনিকতা এবং নান্দনিকতার ছোঁয়া দিয়েছিলেন, তা আজও এ প্রজন্মের শিল্পীদের অনুপ্রেরণার উৎস। প্রিয় সুধী, কেবল কলম বা তুলি নয়, ক্যামেরার লেন্সেও তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী। চলচ্চিত্রকার হিসেবে তাঁর ‘স্ত্রীর পত্র’ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্প অবলম্বনে) চলচ্চিত্রটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে ব্যাপক সমাদৃত হয়েছিল। শ্রেষ্ঠ বাংলা ছবি হিসেবে এটি ২০তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে। এছাড়া তাঁর পরিচালিত ‘স্বপ্ন নিয়ে’, ‘মালঞ্চ’ এবং ‘ছেঁড়া তমসুক’ বাংলা সিনেমার ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য সংযোজন। কলকাতা নিয়ে তাঁর গবেষণা ও ঐতিহাসিক কাজগুলো আমাদের শেকড় চেনার পথে সহায়ক। তাঁর ‘বাঁকিমযুগ’ বিষয়ক গবেষণা এবং শিশুসাহিত্যিক হিসেবে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি ছদ্মনাম ‘সমুদ্রগুপ্ত’ হিসেবেও সাহিত্যচর্চা করেছেন। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার কবির নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর আত্মার শান্তি কামনায় সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই সব্যসাচী শিল্পীর জীবন থেকে সৃজনশীলতা ও শেকড় সন্ধানের শিক্ষা গ্রহণ করি। কবি পূর্ণেন্দুশেখর পত্রী তাঁর কর্মের মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা

সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ আমরা এমন এক মহান ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যাঁর নাম উচ্চারণ করলে আজও পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রেরণা জাগে। তিনি ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের কিংবদন্তি নায়ক, আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় ‘নেতাজি’ সুভাষচন্দ্র বসু। কর্মবৈচিত্র্য, অদম্য সাহস আর ত্যাগের মহিমায় তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের এক অতলস্পর্শী সব্যসাচী দেশপ্রেমিক। উপস্থিত সুধী, আজ একটি বিশেষ বিষয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন। সুভাষচন্দ্র বসুর জন্ম ১৮৯৭ সালের ২৩ জানুয়ারি উড়িষ্যার কটক শহরে। তাঁর পিতা জানকীনাথ বসু ছিলেন একজন খ্যাতিমান আইনজীবী এবং মাতা প্রভাবতী দেবী। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন এবং ১৯২০ সালে ইংল্যান্ডে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস (ICS) পরীক্ষায় চতুর্থ স্থান অধিকার করেছিলেন। কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের অধীনে চাকরি করার বিলাসিতা তাঁকে মোহাবিষ্ট করতে পারেনি। দেশমাতার মুক্তির নেশায় তিনি আইসিএস থেকে পদত্যাগ করে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন বীরত্বের প্রতীক। ১৯৩৮ ও ১৯৩৯ সালে তিনি দুবার ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। পরবর্তীকালে মতাদর্শগত পার্থক্যের কারণে তিনি কংগ্রেস ত্যাগ করে ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ গঠন করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন তিনি বিশ্বাস করতেন, সশস্ত্র সংগ্রাম ছাড়া ভারতের মুক্তি সম্ভব নয়। সেই সুদূর বার্লিন থেকে টোকিও পর্যন্ত তাঁর রোমাঞ্চকর যাত্রা আজও আমাদের শিহরিত করে। ১৯৪৩ সালে তিনি ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’-এর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং তাঁর অমর স্লোগান— “তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব”—কোটি কোটি মানুষের মনে স্বাধীনতার সূর্যোদয় ঘটিয়েছিল। অনেকে মনে করেন তাঁর জীবন কেবল যুদ্ধের কথা বলে, কিন্তু তাঁর চিন্তা ছিল অনেক গভীর। তিনি একটি এমন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতেন যেখানে কোনো জাত-পাত বা ধর্মের বৈষম্য থাকবে না। আজাদ হিন্দ ফৌজে তিনি সকল ধর্মের মানুষকে এক পতাকাতলে এনেছিলেন, যা মূলত আমাদের গুরুকুলের ‘প্লুরালিস্ট সোসাইটি’ বা বহুত্ববাদী সমাজেরই মূল ভিত্তি। মজার ব্যাপার হলো, আজও নেতাজির মহাপ্রয়াণ নিয়ে নানা বিতর্ক ও রহস্য বিদ্যমান। ১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট তাইহোকু বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যুর খবর প্রচার করা হলেও, অনেক ইতিহাসবিদ ও তাঁর অনুসারীরা তা মেনে নিতে পারেননি। তবে বিতর্ক যাই হোক, তাঁর আদর্শ ও সাহসের কাছে কোনো বিতর্কই বড় নয়। প্রিয় সুধী, আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার নেতাজির নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর ত্যাগ ও আদর্শ সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই বীর সেনানীর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের শেকড়কে ভুলে না যাই। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং দেশকে ভালোবাসার যে শিক্ষা তিনি দিয়ে গেছেন, তা যেন আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের পাথেয় হয়। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু তাঁর দেশপ্রেম ও অজেয় ইচ্ছাশক্তির মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা
কবি আজিজুর রহমান এর জন্ম জয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা

কবি আজিজুর রহমানের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। কবি আজিজুর রহমান এর জন্ম জয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ আমরা এমন এক ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি একাধারে কবি, গীতিকার, সম্পাদক এবং নিবেদিতপ্রাণ নাট্য সংগঠক। কর্মবৈচিত্র্যের দিক দিয়ে তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের এক অতলস্পর্শী সব্যসাচী প্রতিভা। তিনি আমাদের প্রিয় কুষ্টিয়ার হাটশ হরিপুর গ্রামের সন্তান—কবি আজিজুর রহমান। উপস্থিত সুধী, আজ একটি বিশেষ বিষয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন। আমাদের জাতীয় মন ও মননের প্রতীক বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘চরিতাভিধান’ গ্রন্থে কবির জন্ম তারিখ দেখানো হয়েছে ১৮ জানুয়ারি, ১৯১৭। কিন্তু প্রকৃত তথ্য ও দালিলিক প্রমাণ অনুযায়ী তাঁর সঠিক জন্ম তারিখ ১৮ অক্টোবর, ১৯১৪। একটি জাতির ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে বাংলা একাডেমি এই ভুলের দায় এড়াতে পারে না। আমরা আশা করি, সত্য অনুসন্ধানের মাধ্যমে জাতির এই কীর্তিমান লেখকের সঠিক ইতিহাস বিশ্বদরবারে যথাযথভাবে উপস্থাপিত হবে। কবি আজিজুর রহমান জন্মেছিলেন এক প্রভাবশালী জমিদার পরিবারে। সেই সময়ের জমিদারদের জীবন-জৌলুস ছিল কিংবদন্তি সমান। কিন্তু কোনো মোহ তাঁকে আবিষ্ট করতে পারেনি। ফরাসি নাট্যকার জ্যাঁ জেঁনের মতো তিনিও যেন নিয়তিকে তুচ্ছ করে প্রান্তিক মানুষের সাথে গড়ে তুলেছিলেন সুনিবিড় সখ্য। সেই আভিজাত্য ত্যাগ করেই তিনি গড়ে তুলেছিলেন নাট্যদল, নিজে করেছেন অভিনয়। গণমানুষের সাথে তাঁর এই নিবিড় সম্পর্কই তাঁকে করেছে গণমানুষের কবি। অনেকে মনে করেন কবির চেয়ে তাঁর গীতিকার পরিচয়টি অনেক বড়। যদিও বলা হয় তিনি দুই হাজার গান লিখেছেন, কিন্তু তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায় তাঁর গানের সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। বাংলা চলচ্চিত্রের যখন স্বর্ণযুগ, তখন আজিজুর রহমানের গান সেই স্বর্ণযুগের সোনার প্রতিমায় নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছিল। আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে তাঁর সেই কালজয়ী সৃষ্টিসমূহ: “আমি রূপ নগরের রাজকন্যা রূপের জাদু এনেছি” “বুঝি না মন যে দোলে বাঁশির সুরে” “ভবের নাট্যশালায় মানুষ চেনা দায় রে” “কারো মনে তুমি দিও না আঘাত, সে আঘাত লাগে কাবার ঘরে” মজার ব্যাপার হলো, যে গানগুলো দশকের পর দশক মানুষের হূদয়ে গেঁথে আছে, সেই গানের গীতিকার যে আজিজুর রহমান—তা হয়তো অনেকেরই অজানা। পরাধীন মাতৃভূমির স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর গান মুক্তিযোদ্ধাদের মনে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তুলেছিল। “মুজিব এনেছে বাংলাদেশের নতুন সূর্যোদয়” কিংবা “পলাশ ঢাকা কোকিল ডাকা আমারই দেশ ভাই রে”—গানগুলো আমাদের জাতীয় চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এছাড়া জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের পর ইসলামী সংগীত রচনায় কবি আজিজুর রহমানের অসামান্য অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর শেকড় সন্ধানী মনন প্রেম, প্রকৃতি ও দেশপ্রেমকে এক সুতোয় গেঁথেছিল। প্রিয় সুধী, আজিজুর রহমান তাঁর ‘ডাইনোসরের রাজ্যে’, ‘জীবজন্তুর কথা’ কিংবা ‘এই দেশ এই মাটি’র মতো জনপ্রিয় গ্রন্থগুলোর মাধ্যমে আমাদের সাহিত্যভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন। তিনি কেবল একজন শিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন বড় মনের মানুষ, যিনি জমিদারি বিলাসিতা ছেড়ে মানুষের দুঃখ-বেদনাকে আপন করে নিয়েছিলেন। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়‘। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার কবির নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই সব্যসাচী শিল্পীর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের শেকড়কে ভুলে না যাই। কবি আজিজুর রহমান তাঁর কর্মের মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা
পৌষ সংক্রান্তি ও সাকরাইন উৎসব উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা
পৌষ সংক্রান্তি ও সাকরাইন উৎসব উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। পৌষ সংক্রান্তি ও সাকরাইন উৎসব উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই পৌষের হিমেল শুভেচ্ছা এবং সাকরাইনের উষ্ণ অভিনন্দন। আজ এক বর্ণিল দিন। আজ আমরা এমন এক উৎসব উদযাপন করতে সমবেত হয়েছি, যা আমাদের হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির এক বর্ণাঢ্য বহিঃপ্রকাশ। পৌষ মাসের শেষ দিনে বাঙালির ঘরে ঘরে পালিত হয় ‘পৌষ সংক্রান্তি’, যা পুরান ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ‘সাকরাইন’ নামে এক মহোৎসবে রূপ নেয়। ইংরেজি পঞ্জিকা মতে, প্রতি বছর ১৪ বা ১৫ই জানুয়ারি এই উৎসব উদযাপিত হয়। উপস্থিত সুধী, পৌষ সংক্রান্তি মূলত ফসলের উৎসব, এক ঋতু থেকে অন্য ঋতুতে পদার্পণের সন্ধিক্ষণ। আমাদের কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে এই দিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে নতুন ধানের চাল দিয়ে তৈরি হয় হরেক রকমের পিঠা-পুলি—পাটিসাপটা, চিতই, তিলপুলি আর দুধ-পুলি। গুড় আর নারিকেলের ম ম গন্ধে ভরে ওঠে চারপাশ। শীতের এই পিঠা উৎসব বাঙালির পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করে। অন্যদিকে, এই উৎসবেরই একটি রোমাঞ্চকর দিক হলো ‘সাকরাইন’। বিশেষ করে পুরান ঢাকার আকাশ এই দিনে রঙিন হয়ে ওঠে হাজার হাজার ঘুড়িতে। নাটাই-সুতা নিয়ে ছাদে ছাদে চলে ঘুড়ি কাটাকাটির লড়াই। সন্ধ্যায় আতশবাজি আর ফানুসের আলোয় আলোকিত হয় রাতের আকাশ। সাকরাইন কেবল একটি স্থানীয় উৎসব নয়, এটি বাঙালির আনন্দপ্রিয়তা এবং সাহসিকতার প্রতীক। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রতিকূলতার সুতোয় টান পড়লেও আমরা আকাশের মতো বিশাল আর ঘুড়ির মতো স্বাধীন হতে জানি। প্রিয় সুধী, সংস্কৃতিই একটি জাতির প্রাণ। আজকের আধুনিক যুগে যখন আমরা বিশ্বজনীন হওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, তখন এই দেশীয় উৎসবগুলোই আমাদের আত্মপরিচয় টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর প্রায়শই একটি অত্যন্ত গভীর কথা বলেন— “প্রতিজন মানুষের নৃতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় এমন এক ধরণের পরিচয় যা বদলানো যায় না। একজন মানুষ তার নিজের সেই সংস্কৃতি যখন চর্চা করে এবং তা উন্নত করতে কাজ করে, তখন সেই সংস্কৃতি তাকে পরিপূর্ণ এবং ‘ওয়েল ফর্মড’ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করে। আপনি নিজের সংস্কৃতির সাথে যুক্ত থাকলে বিশ্বের অন্য জাতিগোষ্ঠীর কাছে সম্মানিত হবেন। কিন্তু নিজের সংস্কৃতি বাদ দিয়ে অন্য সংস্কৃতির চর্চা করলে তা কখনোই আপনাকে পূর্ণ মানুষ হতে দেবে না। তাই আমরা বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতিগুলোর চর্চা ও প্রতিনিয়ত উন্নয়ন করতে কাজ করতে চাই।” সেই দর্শনে দীক্ষিত হয়েই আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে আমাদের কৃষ্টিকে নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করি। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের এই পিঠা-পুলি আর ঘুড়ি ওড়ানোর উৎসব কোনো ধর্মের বা গোষ্ঠীর নয়; বরং এটি সর্বজনীন বাঙালির ঐতিহ্য। আমরা যখন বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চাই, তখন আমাদের এই অনন্য সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই পৌষ সংক্রান্তি ও সাকরাইন উৎসবে আমাদের সকলের সমৃদ্ধি কামনা করি এবং বাংলার প্রতিটি ঘরে খুশির আমেজ বয়ে যাওয়ার প্রার্থনা করি। আসুন, আমরা অঙ্গীকার করি—আমরা যেন আধুনিকতার ভিড়ে আমাদের শেকড় আর আমাদের ঐতিহ্যের এই সুন্দর বাংলাকে কখনো হারিয়ে যেতে না দিই। সংক্রান্তির এই মিষ্টি রোদে আর সাকরাইনের রঙিন আকাশে প্রতিটি বাঙালির জীবন আনন্দময় হয়ে উঠুক। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা