রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা । ৭ মে

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ পঁচিশে বৈশাখ। আজ আমরা এমন এক জ্যোতির্ময় ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিয়েছেন হিমালয়সম উচ্চতায়। তিনি আমাদের চেতনার দীপশিখা, আমাদের প্রাণের কবি—বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। উপস্থিত সুধী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৬১ সালের ৭ মে (বাংলা পঞ্জিকা মতে ১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫শে বৈশাখ) কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং মাতা সারদাসুন্দরী দেবী। কর্মবৈচিত্র্যের দিক দিয়ে তিনি ছিলেন এক অতলস্পর্শী সব্যসাচী প্রতিভা। তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, দার্শনিক, সংগীতস্রষ্টা, চিত্রশিল্পী এবং শিক্ষাবিদ। আজ একটি বিশেষ বিষয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন। ১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য প্রথম এশীয় হিসেবে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর এই অর্জন কেবল একজন কবির বিজয় ছিল না, এটি ছিল বাংলা ভাষার বিশ্বজয়ের সূচনালগ্ন। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে বৈশ্বিক ভাবনার সাথে দেশীয় সংস্কৃতির সমন্বয় ঘটাতে হয়। ১৯২১ সালে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘বিশ্বভারতী’ বিশ্ববিদ্যালয় আজও বিশ্ব সংস্কৃতির এক অনন্য মিলনস্থল। প্রিয় সুধী, রবীন্দ্রনাথের সাথে আমাদের এই বাংলাদেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ও নিবিড়। পাবনার শিলাইদহ, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর আর নওগাঁর পতিসরে কাটানো তাঁর জীবনের সোনালি দিনগুলোতেই তিনি রচনা করেছেন তাঁর শ্রেষ্ঠ অনেক সৃষ্টি। আমাদের জাতীয় সংগীত “আমার সোনার বাংলা” এই মাটির প্রতি তাঁর গভীর মমত্ববোধের অমর ফসল। রবীন্দ্রনাথের গানের সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। তাঁর সেই কালজয়ী সৃষ্টিসমূহ আজও বাঙালির আনন্দ-বেদনায় পরম আশ্রয়: “তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম” “ছিলে একা বসি আপন মনে” “বাংলার মাটি বাংলার জল, বাংলার বায়ু বাংলার ফল— পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান” তিনি কেবল সৌন্দর্যের কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার এক কণ্ঠস্বর। ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তিনি ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া ‘নাইটহুড’ উপাধি বর্জন করে যে নৈতিক সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন, তা ইতিহাসে বিরল। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার বিশ্বকবির নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই মহাপ্রাণের জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের সংস্কৃতি ও মনুষ্যত্বকে আজীবন লালন করতে পারি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কর্মের মধ্য দিয়ে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা
সত্যজিৎ রায়-এর জন্মদিন উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা । ২ মে

সত্যজিৎ রায়-এর জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। সত্যজিৎ রায়-এর জন্মদিন উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ আমরা এমন এক ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি বাংলা ও বাঙালির সংস্কৃতিকে বিশ্ব চলচ্চিত্রের দরবারে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তিনি কেবল একজন চলচ্চিত্র পরিচালক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একাধারে লেখক, চিত্রকর, সঙ্গীত পরিচালক, ক্যালিগ্রাফার এবং অমর সব চরিত্রের স্রষ্টা। তিনি আমাদের গর্ব—সত্যজিৎ রায়। উপস্থিত সুধী, সত্যজিৎ রায় ১৯২১ সালের ২ মে কলকাতার বিখ্যাত ‘রায় পরিবারে’ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী এবং পিতা সুকুমার রায়—উভয়েই ছিলেন বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি। ১৯৫৫ সালে ‘পথের পাঁচালী’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি বিশ্ব চলচ্চিত্রে পা রাখেন এবং প্রথম ছবিতেই আন্তর্জাতিক মহলে হইচই ফেলে দেন। তাঁর হাত ধরেই বিশ্ব চিনেছে অপু, দুর্গা আর নিশ্চিন্তপুরের সেই রেললাইন দেখার গল্প। কর্মবৈচিত্র্যের দিক দিয়ে তিনি ছিলেন এক কালজয়ী প্রতিভা। তাঁর পরিচালিত ৩২টি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এবং ডকুফিল্মগুলো আজও চলচ্চিত্রের পাঠ্যবই হিসেবে গণ্য করা হয়। শুধু চলচ্চিত্র নয়, বাংলা সাহিত্যে তাঁর অমর সৃষ্টি ‘ফেলুদা’ ও ‘প্রফেসর শঙ্কু’ আমাদের শৈশবকে করেছে রোমাঞ্চকর। এছাড়া তাঁর অনন্য শিল্পবোধ ফুটে উঠেছে বইয়ের প্রচ্ছদ অলঙ্করণ এবং নিজের তৈরি করা ফন্ট ‘রে রোমান’ (Ray Roman)-এর মাধ্যমে। ১৯৯২ সালে তিনি বিশ্বের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র সম্মান ‘অস্কার’ (একাডেমি অ্যাওয়ার্ড) লাভ করেন আজীবন অবদানের জন্য। সত্যজিৎ রায়ের কালজয়ী কিছু সৃষ্টি ও সিরিজের কথা না বললেই নয়: অপু ট্রিলজি: পথের পাঁচালী, অপরাজিত ও অপুর সংসার। ফেলুদা সিরিজ: সোনার কেল্লা, জয় বাবা ফেলুনাথ-এর মতো কালজয়ী চলচ্চিত্র ও উপন্যাস। হীরক রাজার দেশে: যেখানে তিনি রূপকের মাধ্যমে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার বার্তা দিয়েছেন। জলসাঘর ও চারুলতা: যা বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নির্মাণ। প্রিয় সুধী, সত্যজিৎ রায় তাঁর শিল্পচর্চায় সবসময় মাটির কাছাকাছি থেকেছেন, কিন্তু তাঁর চিন্তা ছিল বিশ্বজনীন। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে অত্যন্ত পরিমিতিবোধ ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে শিল্পকে সার্থক করে তোলা যায়। তাঁর জীবন ছিল কাজের প্রতি একাগ্রতা ও নিষ্ঠার এক জীবন্ত পাঠশালা। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার এই মহান শিল্পীর নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন সত্যজিৎ রায়ের জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের প্রতিভা ও দেশজ সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে সঠিকভাবে উপস্থাপিত করতে পারি। সত্যজিৎ রায় তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে এবং বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে চিরকাল ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা
হুমায়ুন আজাদ-এর জন্মদিন উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা । ২৮ এপ্রিল

হুমায়ুন আজাদ-এর জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। হুমায়ুন আজাদ-এর জন্মদিন উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ আমরা এমন এক নির্ভীক ও প্রথাবিরোধী মানুষের জন্মদিন উদযাপন করছি, যিনি আধুনিক বাংলা সাহিত্য ও চিন্তার জগতে এক প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক এবং এদেশের ভাষাবিজ্ঞানের অন্যতম পথিকৃৎ। তিনি আমাদের প্রিয় অধ্যাপক—হুমায়ুন আজাদ। উপস্থিত সুধী, হুমায়ুন আজাদ ১৯৪৭ সালের ২৮ এপ্রিল তৎকালীন বিক্রমপুরের (বর্তমানে মুন্সীগঞ্জ জেলা) রাড়িখাল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মেধা ও পাণ্ডিত্যের স্বাক্ষর রেখেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা জীবনে এবং পরবর্তীতে এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাবিজ্ঞানে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে। তিনি কেবল একজন শিক্ষক ছিলেন না, তিনি ছিলেন যুক্তিবাদী ও আধুনিক মননের এক দীপশিখা। তাঁর ‘বাক্যতত্ত্ব’ বা ‘তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান’ গ্রন্থগুলো বাংলা ভাষাতত্ত্বের জগতে মাইলফলক হয়ে আছে। তবে হুমায়ুন আজাদ সবচেয়ে বেশি আলোচিত তাঁর প্রখর ও সাহসী গদ্যের জন্য। তিনি বিশ্বাস করতেন বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ে কোনো আপস নেই। প্রথাধীন সমাজের সংস্কার ভাঙতে তিনি কলম ধরেছিলেন। তাঁর ‘নারী’, ‘প্রবচনগুচ্ছ’, ‘ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল’ এবং ‘সব কিছু ভেঙে পড়ে’র মতো গ্রন্থগুলো আমাদের নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। তাঁর প্রতিটি শব্দ ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক একটি ধারালো অস্ত্র। স্বাধীনতার চেতনা আর অসাম্প্রদায়িকতা ছিল তাঁর প্রতিটি নিশ্বাসে। প্রিয় সুধী, হুমায়ুন আজাদের জীবন ছিল এক সংগ্রামের নাম। সত্য কথা বলার অপরাধে তাঁকে বারবার আক্রান্ত হতে হয়েছে, তবুও তিনি তাঁর আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। তাঁর ‘লাল নীল দীপাবলি’ কিংবা ‘ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না’র মতো কিশোর সাহিত্যগুলো আমাদের প্রজন্মের পর প্রজন্মকে বইয়ের প্রতি এবং সুন্দরের প্রতি আকৃষ্ট করেছে। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে নিজের সত্তাকে জাগ্রত রেখে সব ধরণের অন্ধত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকা যায়। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার এই কীর্তিমান লেখকের নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই অকুতোভয় বুদ্ধিজীবীর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নির্ভীক চিন্তা ও সত্যের পথে অবিচল থাকতে পারি। হুমায়ুন আজাদ তাঁর অবিনশ্বর সৃষ্টি ও সাহসী চিন্তার মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা
উইলিয়াম শেক্সপিয়র দিবস উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা । ২৩ এপ্রিল

উইলিয়াম শেক্সপিয়র দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। উইলিয়াম শেক্সপিয়র দিবস উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ আমরা এমন এক ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যাঁকে বলা হয় বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম নাট্যকার এবং ইংরেজি ভাষার সর্বকালের সেরা কবি। তিনি মানব হৃদয়ের গভীরতম আবেগ, দ্বন্দ ও ভালোবাসাকে শব্দের তুলিতে জীবন্ত করেছেন। তিনি আমাদের চিরকালিন অনুপ্রেরণা—উইলিয়াম শেক্সপিয়র। উপস্থিত সুধী, উইলিয়াম শেক্সপিয়রের জীবন অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক। ধারণা করা হয়, ১৫৬৪ সালের ২৩ এপ্রিল ইংল্যান্ডের স্ট্র্যাটফোর্ড-আপন-অ্যাভন (Stratford-upon-Avon) শহরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। আশ্চর্যজনকভাবে ১৬১৬ সালের ঠিক একই তারিখে অর্থাৎ ২৩ এপ্রিলেই তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। এ কারণেই বিশ্বজুড়ে আজকের এই দিনটিকে ‘শেক্সপিয়র দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। কর্মজীবনে তিনি ছিলেন একাধারে অভিনেতা, নাট্যকার এবং নাট্যশালার অংশীদার। শেক্সপিয়রের সাহিত্যকর্ম বাংলা তথা বিশ্বসাহিত্যের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। তিনি ৩৭টি নাটক এবং ১৫৪টি সনেট রচনা করেছেন। তাঁর সৃষ্টিতে ফুটে উঠেছে মানুষের জীবনের জটিল দর্শন—কখনও তা বিষাদময় ট্র্যাজেডি, কখনও বা নির্মল কমেডি। আধুনিক নাট্যকলার এমন কোনো শাখা নেই যেখানে শেক্সপিয়রের ছোঁয়া লাগেনি। তাঁর সেই কালজয়ী সৃষ্টিসমূহ আজও মঞ্চে এবং মানুষের মুখে মুখে ফেরে: “হ্যামলেট” (Hamlet) – এর সেই বিখ্যাত উক্তি: “To be, or not to be, that is the question.” “রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট” (Romeo and Juliet) – চিরন্তন প্রেমের এক মহাকাব্য। “ম্যাকবেথ” (Macbeth) এবং “ওথেলো” (Othello) – যেখানে উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও ঈর্ষার চরম পরিণতি ফুটে উঠেছে। মজার ব্যাপার হলো, আমরা প্রতিদিন অজান্তেই ইংরেজি ভাষার অসংখ্য শব্দ ও বাগধারা ব্যবহার করি যা শেক্সপিয়রের সৃষ্টি। আধুনিক ইংরেজি ভাষার ভাণ্ডারকে তিনি যে উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, তা অতুলনীয়। প্রিয় সুধী, উইলিয়াম শেক্সপিয়রের প্রভাব কেবল ইংল্যান্ডে সীমাবদ্ধ থাকেনি। আমাদের ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর—সবাই তাঁর সৃষ্টির দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন যে ‘পুরো বিশ্বটাই একটা মঞ্চ’ (All the world’s a stage), যেখানে আমরা সবাই কেবল কুশীলব। তাঁর প্রতিটি নাটক যেন মানুষের চরিত্রের একেকটি দর্পণ। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার এই মহামতি নাট্যকারের নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর আত্মার শান্তি কামনায় সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই মহান শিল্পীর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে মানুষের জীবন ও মনস্তত্ত্বকে আরও গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করি। উইলিয়াম শেক্সপিয়র তাঁর অবিনশ্বর সৃষ্টি ও পঙক্তিগুলোর মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা
লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা । ১৫ এপ্রিল

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ আমরা এমন এক ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যাকে মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম ‘পলিম্যাথ’ বা বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী বলা হয়। তিনি একাধারে চিত্রশিল্পী, স্থপতি, গণিতবিদ, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী এবং উদ্ভাবক। রেনেসাঁ যুগের সেই অমর কারিগর—লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি। উপস্থিত সুধী, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি ১৪৫২ সালের ১৫ এপ্রিল ইতালির ফ্লোরেন্সের তুস্কানি অঞ্চলের ‘ভিঞ্চি’ নামক এক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কর্মবৈচিত্র্যের দিক দিয়ে তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের চেয়ে কয়েকশ বছর এগিয়ে থাকা এক সব্যসাচী মেধা। লিওনার্দোর প্রতিভা কেবল ক্যানভাসের রঙে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি মানুষের শরীরের ব্যবচ্ছেদ থেকে শুরু করে পাখির ওড়া পর্যবেক্ষণ করে উড়োজাহাজের নকশা পর্যন্ত করেছিলেন। তাঁর সেই বিখ্যাত নোটবুক বা ‘কোডেক্স’গুলো আজও বিজ্ঞানীদের বিস্ময়ের খোরাক। অনেকে মনে করেন লিওনার্দো কেবল একজন শিল্পী, কিন্তু তাঁর বিজ্ঞানমনস্কতা ছিল অতুলনীয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিল্পের ভিত্তি হলো গভীর পর্যবেক্ষণ এবং নিখুঁত জ্যামিতিক হিসাব। তাঁর কালজয়ী সৃষ্টিসমূহ আজও বিশ্ব ঐতিহ্যের অমূল্য সম্পদ: মোনালিসা: যার রহস্যময় হাসি আজও সারা বিশ্বকে আচ্ছন্ন করে রাখে। দ্য লাস্ট সাপার: যা চিত্রকলার ইতিহাসে এক অনন্য সংযোজন। ভিট্রুভিয়ান ম্যান: যেখানে তিনি মানুষের শরীরের অনুপাত ও জ্যামিতিক সামঞ্জস্য তুলে ধরেছেন। মজার ব্যাপার হলো, লিওনার্দোর আঁকা চিত্রকর্মের সংখ্যা খুব বেশি নয়, কিন্তু প্রতিটি সৃষ্টিই পূর্ণতা এবং গবেষণার এক একটি মাইলফলক। তাঁর ‘স্ফুমাতো’ (Sfumato) কৌশল চিত্রকলার জগতকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছিল। প্রিয় সুধী, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি কেবল একজন শিল্পী বা বিজ্ঞানী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন বড় মনের মানুষ এবং প্রকৃতির একনিষ্ঠ উপাসক। তিনি পরাধীন বা সীমাবদ্ধ চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে মহাবিশ্বের গূঢ় রহস্য উন্মোচনে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। জমিদারি বা রাজকীয় বিলাসিতা তাঁকে কখনোই তাঁর জ্ঞানতৃষ্ণা থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার এই বিশ্ববিশ্রুত মনীষীর নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন লিওনার্দোর সেই অদম্য কৌতূহল এবং সৃজনশীলতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের মেধা ও মননকে বিকশিত করতে পারি। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি তাঁর অবিনশ্বর কর্মের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর বুকে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা
কবীর সুমন-এর জন্মদিন উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা । ১৬ মার্চ

কবীর সুমন-এর জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। কবীর সুমন-এর জন্মদিন উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ আমরা এমন এক বিস্ময়কর প্রতিভার জন্মদিন উদযাপন করছি, যিনি আধুনিক বাংলা গানের ব্যাকরণ বদলে দিয়েছেন। যিনি নাগরিক জীবনের ক্লান্তি, প্রেম আর দ্রোহকে গিটারের তারে আর পিয়ানোর রিডে এক নতুন ভাষা দিয়েছেন। তিনি আমাদের প্রিয় গানওয়ালা—কবীর সুমন। উপস্থিত সুধী, কবীর সুমন ১৯৪৯ সালের ১৬ মার্চ ওড়িশার কটকে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম সুধীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় এবং মায়ের নাম বিমলা চট্টোপাধ্যায়। প্রথাগত শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে তিনি বিশ্বভ্রমণ করেছেন, সাংবাদিকতা করেছেন দেশি-বিদেশি বিভিন্ন নামী সংবাদ সংস্থায়। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে যখন বাংলা আধুনিক গান একটি স্থবিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ১৯৯২ সালে ‘তোমাকে চাই’ অ্যালবামের মাধ্যমে তিনি বাংলা গানে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসেন। তিনি একাধারে গায়ক, গীতিকার, সুরকার এবং অসামান্য এক যন্ত্রী। কবীর সুমনের গান মানেই মধ্যবিত্তের না বলা কথা, ফুটপাতের ধুলোবালি কিংবা আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল চালচিত্র। তাঁর গান আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে ব্যক্তিগত প্রেমের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে সমষ্টির লড়াই। তাঁর কালজয়ী সৃষ্টিসমূহ আজও আমাদের প্রতিদিনের সঙ্গী: “তোমাকে চাই, তোমাকে চাই” “হাল ছেড়ো না বন্ধু বরং কণ্ঠ ছাড়ো জোরে” “পেটকাটি চাঁদিয়াল মোমবাতি বগগা” প্রিয় সুধী, কবীর সুমনের সাথে বাংলাদেশের নাড়ির সম্পর্ক অনস্বীকার্য। এদেশের মানুষের মুক্তি সংগ্রাম, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা সাধারণ মানুষের আবেগ—সব কিছুতেই তাঁর গান ও সংহতি সবসময় ছিল অটল। তিনি কেবল একজন শিল্পী নন, তিনি একজন চিন্তক এবং মানবাধিকার কর্মীও বটে। তাঁর জীবন আমাদের শিখিয়েছে আদর্শের প্রতি অবিচল থেকে কীভাবে বারবার নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করা যায়। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার এই শিল্পীর নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই অকুতোভয় শিল্পীর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের শেকড় এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়কে আজীবন ধারণ করতে পারি। কবীর সুমন তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে এবং বাংলা গানের ভুবনে চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা
৭ই মার্চ: “স্বাধীনতার কবিতা দিবস” উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা
৭ই মার্চ ‘স্বাধীনতার কবিতা দিবস’ উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। ৭ই মার্চ: স্বাধীনতার কবিতা দিবস উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের রক্তিম শুভেচ্ছা ও বিনম্র শ্রদ্ধা। আজ এক ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণ। আজ থেকে ৩৯ বছর আগে ১৯৭১ সালের এই দিনে রেসকোর্স ময়দানের জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে এক অবিনাশী মহাকাব্য পাঠ করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেই কালজয়ী ভাষণকে স্মরণ করে এবং এর শৈল্পিক ও রাজনৈতিক গুরুত্বকে হৃদয়ে ধারণ করে গুরুকুল আজ পালন করছে ‘স্বাধীনতার কবিতা দিবস’। উপস্থিত সুধী, ২০১০ সালে দাঁড়িয়ে যখন আমরা পেছনের দিকে তাকাই, তখন দেখি ৭ই মার্চের ভাষণ কেবল একটি রাজনৈতিক দিক-নির্দেশনা ছিল না, এটি ছিল একটি জাতির কয়েক হাজার বছরের বঞ্চনার অবসান আর মুক্তির আকাঙ্ক্ষার এক শ্রেষ্ঠ কাব্য। ১৮ মিনিটের সেই ভাষণে কোনো লিখিত পাণ্ডুলিপি ছিল না, ছিল হৃদয়ের গভীর থেকে আসা স্বতঃস্ফূর্ত শব্দমালা। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম নিউজউইক পত্রিকা বঙ্গবন্ধুকে যথাযথভাবেই আখ্যা দিয়েছিল ‘রাজনীতির কবি’ (Poet of Politics) হিসেবে। বঙ্গবন্ধু যখন তাঁর বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন— “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”, তখন সেটি কেবল একটি ঘোষণা ছিল না, বরং বাঙালির হৃদয়ে স্বাধীনতার অগ্নিস্ফুলিঙ্গ জ্বেলে দেওয়া এক চূড়ান্ত পঙক্তি হয়ে উঠেছিল। এই ভাষণের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বিরতি এবং এর ছন্দময় ভঙ্গি আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে একটি নিরস্ত্র জাতিকে শব্দ ও সাহসের শক্তিতে সশস্ত্র করে তোলা যায়। আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এই শ্রেষ্ঠ দলিলটি আজও আমাদের প্রতিটি সংকটে প্রেরণা জোগায়। প্রিয় সুধী, যেকোনো জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জনগুলো তার সংস্কৃতির সর্বোচ্চ শিখর থেকে জন্ম নেয়। বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণ আমাদের ইতিহাসের এমন এক সাংস্কৃতিক সম্পদ, যা আমাদের জাতীয় পরিচয়কে সংজ্ঞায়িত করে। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এই দিবসের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন— “বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ কেবল রাজনীতির কৌশল নয়, এটি বাঙালির অস্তিত্বের শ্রেষ্ঠ কবিতা। একজন মানুষ যখন তাঁর নিজের সেই মৌলিক সংস্কৃতি ও ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সময়গুলোকে হৃদয়ে ধারণ করে এবং তা চর্চার মাধ্যমে নিজের জীবনকে গড়ে তোলে, তখনই সে এক পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। আমরা যদি আমাদের এই স্বাধীনতার মহাকাব্যকে ভুলে যাই, তবে আমাদের জাতিসত্তা দুর্বল হয়ে পড়বে। তাই আমরা বাঙালির এই স্বাধীনতার অমর কবিতাটির চর্চা এবং এর চেতনাকে প্রতিনিয়ত আমাদের জাতীয় জীবনে জীবন্ত রাখতে কাজ করতে চাই।” সেই দর্শনে দীক্ষিত হয়েই আমরা আজ এই ‘স্বাধীনতার কবিতা দিবস’ পালন করছি। আমরা বিশ্বাস করি, বঙ্গবন্ধুর সেই অমোঘ বজ্রবাণী আমাদের প্রজন্মের পর প্রজন্মের জন্য ধ্রুবতারার মতো পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে। ২০১০ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা নতুন করে শপথ নিই একটি সমৃদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে আমাদের জাতির পিতাকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি এবং তাঁর আত্মার শান্তি কামনায় সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন ৭ই মার্চের সেই স্বাধীনতার কবিতার প্রতিটি শব্দকে আমাদের কর্মে ও চেতনায় আজীবন বহন করতে পারি। বঙ্গবন্ধুর সেই অমর পঙক্তি চিরকাল বাংলার আকাশে-বাতাসে প্রতিধ্বনিত হোক। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় বঙ্গবন্ধু! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা
মহাকবি কায়কোবাদ-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা । ২৫ ফেব্রুয়ারি
মহাকবি কায়কোবাদ-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। মহাকবি কায়কোবাদ-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ আমরা এমন এক মহীরুহের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মুসলিম কবিদের মধ্যে প্রথম মহাকাব্য রচনার গৌরব অর্জন করেছিলেন। তিনি আমাদের সাহিত্যের ‘মহাকবি’—কায়কোবাদ। উপস্থিত সুধী, মহাকবি কায়কোবাদ ১৮৫৭ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার আগলা পূর্বপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম কাজেম আল কোরেশী। মহাকবি কায়কোবাদ ছিলেন একাধারে কবি এবং একজন নিষ্ঠাবান ডাকঘর কর্মকর্তা। কর্মজীবনের ব্যস্ততার মাঝেও তিনি যেভাবে মহাকাব্য ও কাব্যগ্রন্থের বিশাল ভাণ্ডার রেখে গেছেন, তা তাঁর একাগ্রতা ও দেশপ্রেমেরই বহিঃপ্রকাশ। পারিবারিক আভিজাত্য বা সামাজিক প্রতিষ্ঠার চেয়েও বড় ছিল তাঁর সাহিত্যিক সাধনা। তিনি ছিলেন এমন একজন শিল্পী যিনি মধ্যযুগীয় কাব্যধারার সাথে আধুনিক কাব্যরীতির মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের ঐতিহাসিক পটভূমিতে রচিত তাঁর কালজয়ী মহাকাব্য ‘মহাশ্মশান’ বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সম্পদ। এছাড়াও ‘অশ্রুমালা’, ‘শিব-মন্দির’ এবং ‘অমিয় ধারা’র মতো কাব্যগ্রন্থগুলো তাঁর কবিত্ব শক্তির পরিচয় দেয়। কায়কোবাদের সাহিত্যকর্মের এক প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল হিন্দু-মুসলিম মিলনের সুর এবং গভীর দেশপ্রেম। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি জাতির উন্নতির জন্য ধর্মীয় সম্প্রীতি ও ইতিহাস সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। তাঁর অমর পঙক্তি আজও আমাদের জাতীয় জীবনে প্রাসঙ্গিক: “পাখিরা সব কলরব করিছে আকাশে/ প্রকৃতি সাজিয়া আজ নবীন বেশে” (গাওরে গাওরে আজি এ আনন্দ গান) মজার ব্যাপার হলো, যে সময় মহাকাব্য রচনার ধারাটি প্রায় স্তিমিত হয়ে আসছিল, সেই সময়ে তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে ‘মহাশ্মশান’ রচনা করে বাংলা সাহিত্যে নিজের স্থান স্থায়ী করে নেন। ১৯৩২ সালে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সম্মেলনের মূল অধিবেশনে তাঁকে ‘মহাকবি’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। প্রিয় সুধী, কায়কোবাদ কেবল একজন কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন নিভৃতচারী সাধক। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে নিজের সংস্কৃতির শিকড়কে আঁকড়ে ধরে বিশ্বসাহিত্যের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার কবির নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই মহাকবির জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের শেকড়কে ভুলে না যাই এবং স্বদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকি। মহাকবি কায়কোবাদ তাঁর অবিনশ্বর কর্মের মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা
বিশ্ব স্কাউট দিবস ও মানবিক সমাজ গঠনে আমাদের ভূমিকা বিষয়ে বক্তৃতা

২২ ফেব্রুয়ারি ‘বিশ্ব স্কাউট দিবস’ (বিপি দিবস) উপলক্ষে একজন শিক্ষার্থীর দীর্ঘ ও অনুপ্রেরণামূলক বক্তৃতা সবার জন্য আপলোড করে রাখা হলো। বক্তৃতা: বিশ্ব স্কাউট দিবস ও মানবিক সমাজ গঠনে আমাদের ভূমিকা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ ২২ ফেব্রুয়ারি। বিশ্ব ইতিহাসের এক অনন্য দিন। আজ আমরা এখানে সমবেত হয়েছি বিশ্ব স্কাউট আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা লর্ড ব্যাডেন পাওয়েল এবং তাঁর সহধর্মিণী লেডি ব্যাডেন পাওয়েল—যাঁদের যুগপৎ জন্মদিনে পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব স্কাউট দিবস’ বা ‘বিপি দিবস’। আজকের এই শুভক্ষণে আমি গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি তাঁদের, যাঁদের হাত ধরে বিশ্বব্যাপী গড়ে উঠেছে কোটি কোটি তরুণের এক সেবামূলক পরিবার। সুধীজন, স্কাউটিং কেবল নির্দিষ্ট কোনো পোশাক বা নিছক কিছু কুচকাওয়াজ নয়; এটি একটি চিরন্তন জীবনদর্শন। ১৯০৭ সালে লর্ড ব্যাডেন পাওয়েল যখন এই আন্দোলনের সূচনা করেন, তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল তরুণদের চরিত্রে সততা, নিষ্ঠা, আত্মনির্ভরশীলতা এবং পরোপকারের গুণাবলি বপন করা। আজ আমরা গুরুকুলের এই অডিটোরিয়ামে দাঁড়িয়ে আমরা যখন এই দিবসটি উদযাপন করছি, তখন আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে, স্কাউটিং-এর মূলমন্ত্র ‘সদা প্রস্তুত’ থাকা আমাদের জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে কতটা জরুরি। প্রিয় উপস্থিতি, স্কাউটিং আমাদের শেখায় বিভেদ ভুলে একতাবদ্ধ হতে। এখানে জাত-পাত, ধর্ম বা বর্ণের কোনো দেয়াল নেই। একজন স্কাউটের কাছে সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো সে একজন মানুষ এবং তার প্রধান ধর্ম হলো আর্তমানবতার সেবা করা। ব্যাডেন পাওয়েল তাঁর বিদায়ী বাণীতে বলেছিলেন, “পৃথিবীকে যেমন পেয়েছ, তার চেয়ে একটু ভালো অবস্থায় রেখে যাওয়ার চেষ্টা করো।” এই একটি বাক্যই আমাদের জীবনের সার্থকতা বুঝিয়ে দেয়। আজ পরিবেশ রক্ষা, দুর্যোগ মোকাবিলা কিংবা সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে স্কাউটরা যেভাবে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে, তা আমাদের আগামীর বাসযোগ্য পৃথিবীর স্বপ্ন দেখায়। গুরুকুল ও স্কাউটিং-এর মেলবন্ধন: আমরা সৌভাগ্যবান যে গুরুকুল ক্যাম্পাস লার্নিং নেটওয়ার্কের মতো একটি প্ল্যাটফর্মের সাথে যুক্ত আছি। গুরুকুল যেমন আমাদের আধুনিক ও কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ করে তুলছে, তেমনি স্কাউটিং আমাদের নৈতিকতা ও শৃঙ্খলার পাঠ দিচ্ছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, কেবল পুঁথিগত বিদ্যা অর্জন করলেই জীবন সফল হয় না; বরং অন্যের বিপদে এগিয়ে আসা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নেতৃত্বের গুণাবলি প্রদর্শন করাই হলো প্রকৃত শিক্ষা। প্রিয় সহপাঠী ও স্কাউট ভাই-বোনেরা, বর্তমান পৃথিবী নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন থেকে শুরু করে সামাজিক অস্থিরতা—সবখানেই আমাদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন। একজন স্কাউট হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো সমাজে সহনশীলতা আর সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া। আমাদের প্রতিটি কাজ যেন হয় মানুষের কল্যাণে। ক্যাম্পফায়ারের যে আগুন আমাদের সংহতির প্রতীক, সেই আগুনের শিখা যেন আমাদের হৃদয়ে দেশপ্রেম আর সেবার আলো হিসেবে প্রজ্বলিত থাকে। প্রিয় উপস্থিতি, পরিশেষে, লর্ড ব্যাডেন পাওয়েল-এর একটি আদর্শ দিয়ে শেষ করতে চাই— “মানুষের প্রকৃত সুখ অন্যকে সুখে রাখার প্রচেষ্টার মাঝেই নিহিত।” আসুন আজকের এই বিপি দিবসে আমরা নতুন করে শপথ নিই যে, আমরা মাদককে না বলব, মানবিকতাকে হ্যাঁ বলব এবং একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনে গুরুকুলের আলোকবর্তিকা হয়ে কাজ করব। ধন্যবাদ জানাই গুরুকুল কর্তৃপক্ষকে আজকের এই আয়োজন এবং আমাকে বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়ার জন্য। সবাই ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন। জয় বাংলা. জয় স্কাউট, জয় গুরুকুল। আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা
২১ ফেব্রুয়ারি: শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে বক্তৃতা
২১ ফেব্রুয়ারি: শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। ২১ ফেব্রুয়ারি: শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ এক রক্তঝরা ও গর্বিত ইতিহাসের দিন। আজ অমর একুশে ফেব্রুয়ারি—আমাদের মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ১৯৫২ সালের এই দিনে বাংলার দামাল ছেলেরা বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষা করেছিলেন। তাঁদের সেই আত্মত্যাগের স্মরণে আজ বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। উপস্থিত সুধী, ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখি, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি (৮ই ফাল্গুন ১৩৫৮) তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকদের অন্যায় ও বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল এদেশের ছাত্র-জনতা। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে নেমে এসেছিলেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরসহ আরও অনেকে। পুলিশের গুলিতে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল লালে, আর সেই রক্তের বিনিময়েই আজ আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারছি। এটি কেবল ভাষার লড়াই ছিল না; এটি ছিল আমাদের জাতিসত্তা ও স্বাধীনতার প্রথম সোপান। একুশ আমাদের শিখিয়েছে অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করতে। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো এবং পরবর্তীতে জাতিসংঘ আমাদের এই আত্মত্যাগের দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। আজ সারা বিশ্বের মানুষ নিজেদের মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এই দিনটি পালন করে, যা বাঙালি হিসেবে আমাদের জন্য পরম গৌরবের। আমাদের জাতীয় জীবনের এই গৌরবময় দিনে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি সেইসব কালজয়ী গান ও স্লোগানকে, যা আজও আমাদের রক্তে শিহরণ জাগায়: “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি” “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই” “ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়” প্রিয় সুধী, ভাষা শহীদগণ তাঁদের জীবনের বিনিময়ে আমাদের একটি পরিচয় দিয়ে গেছেন। আমাদের দায়িত্ব হলো এই ভাষার শুদ্ধ চর্চা করা এবং সকল ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা। আমরা যেন আমাদের শেকড়কে ভুলে না যাই এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এই ত্যাগের মহিমা পৌঁছে দিই। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার আমাদের ভাষা শহীদদের নাম নিই, তাঁদের স্মরণ করি এবং তাঁদের আত্মার মাগফিরাত ও শান্তির জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন একুশের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজেদের দেশ ও মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করি। আমাদের মহান ভাষা শহীদগণ তাঁদের ত্যাগের মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে এবং বাংলা ভাষার প্রতিটি শব্দে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: [গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা]