রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা
সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ,
আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা।
আজ পঁচিশে বৈশাখ। আজ আমরা এমন এক জ্যোতির্ময় ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিয়েছেন হিমালয়সম উচ্চতায়। তিনি আমাদের চেতনার দীপশিখা, আমাদের প্রাণের কবি—বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
উপস্থিত সুধী,
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৬১ সালের ৭ মে (বাংলা পঞ্জিকা মতে ১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫শে বৈশাখ) কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং মাতা সারদাসুন্দরী দেবী। কর্মবৈচিত্র্যের দিক দিয়ে তিনি ছিলেন এক অতলস্পর্শী সব্যসাচী প্রতিভা। তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, দার্শনিক, সংগীতস্রষ্টা, চিত্রশিল্পী এবং শিক্ষাবিদ।
আজ একটি বিশেষ বিষয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন। ১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য প্রথম এশীয় হিসেবে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর এই অর্জন কেবল একজন কবির বিজয় ছিল না, এটি ছিল বাংলা ভাষার বিশ্বজয়ের সূচনালগ্ন। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে বৈশ্বিক ভাবনার সাথে দেশীয় সংস্কৃতির সমন্বয় ঘটাতে হয়। ১৯২১ সালে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘বিশ্বভারতী’ বিশ্ববিদ্যালয় আজও বিশ্ব সংস্কৃতির এক অনন্য মিলনস্থল।
প্রিয় সুধী,
রবীন্দ্রনাথের সাথে আমাদের এই বাংলাদেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ও নিবিড়। পাবনার শিলাইদহ, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর আর নওগাঁর পতিসরে কাটানো তাঁর জীবনের সোনালি দিনগুলোতেই তিনি রচনা করেছেন তাঁর শ্রেষ্ঠ অনেক সৃষ্টি। আমাদের জাতীয় সংগীত “আমার সোনার বাংলা” এই মাটির প্রতি তাঁর গভীর মমত্ববোধের অমর ফসল।
রবীন্দ্রনাথের গানের সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। তাঁর সেই কালজয়ী সৃষ্টিসমূহ আজও বাঙালির আনন্দ-বেদনায় পরম আশ্রয়:
- “তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম”
- “ছিলে একা বসি আপন মনে”
- “বাংলার মাটি বাংলার জল, বাংলার বায়ু বাংলার ফল— পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান”
তিনি কেবল সৌন্দর্যের কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার এক কণ্ঠস্বর। ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তিনি ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া ‘নাইটহুড’ উপাধি বর্জন করে যে নৈতিক সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন, তা ইতিহাসে বিরল।
আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন—
‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’।
সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার বিশ্বকবির নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই মহাপ্রাণের জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের সংস্কৃতি ও মনুষ্যত্বকে আজীবন লালন করতে পারি।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কর্মের মধ্য দিয়ে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন।
ধন্যবাদ সবাইকে।
জয় বাংলা!
জয় গুরুকুল!
আরও দেখুন: