গুরুকুল ক্যাম্পাস লার্নিং নেটওয়ার্ক, GCLN

বেগম সুফিয়া কামাল-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো।

বেগম সুফিয়া কামাল-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা

সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ,

আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা।

আজ আমরা এমন এক মহীয়সী নারীর জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি বাঙালির সকল প্রগতিশীল আন্দোলন এবং নারী জাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ। তিনি আমাদের প্রাণের মমতায় আগলে রাখা ‘জননী সাহসিকা’—কবি বেগম সুফিয়া কামাল।

উপস্থিত সুধী,

সুফিয়া কামাল ১৯১১ সালের ২০ জুন বরিশালের শায়েস্তাবাদে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম সৈয়দ আবদুল বারী এবং মায়ের নাম সৈয়দা সাবেরা খাতুন। এমন এক সময়ে তিনি জন্মেছিলেন যখন মুসলিম নারীদের শিক্ষার পরিবেশ ছিল অত্যন্ত প্রতিকূল। কিন্তু অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে তিনি স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হন এবং বেগম রোকেয়ার আদর্শকে ধারণ করে সমাজ সংস্কারে আত্মনিয়োগ করেন।

কর্মবৈচিত্র্যের দিক দিয়ে তিনি ছিলেন এক অনন্য সব্যসাচী ব্যক্তিত্ব। তিনি কেবল একজন কবিই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন, ১৯৬১-র রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী প্রতিরোধ আন্দোলন এবং ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। যুদ্ধের দিনগুলোতে অবরুদ্ধ ঢাকায় থেকেও তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহায়তা করেছেন এবং পরবর্তীতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে তোলা আন্দোলনেও বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৬৯ সালে গঠিত ‘মহিলা পরিষদ’-এর প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী হিসেবে তিনি আমৃত্যু নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় লড়াই করে গেছেন।

প্রিয় সুধী,

সুফিয়া কামালের কবিতা ও গদ্য আমাদের সাহিত্যভাণ্ডারকে ঋদ্ধ করেছে। তাঁর লেখনীতে ফুটে উঠেছে প্রকৃতি, দেশপ্রেম এবং অধিকারবঞ্চিত মানুষের কথা। তাঁর কালজয়ী গ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘সাঁঝের মায়া’, ‘মায়া কাজল’, ‘মন ও জীবন’ এবং ‘একাত্তরের ডায়েরি’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কবির সেই অমোঘ পঙক্তি আজও আমাদের প্রেরণা দেয়:

“আমাদের এই দেশে হবে সেই ছেলে কবে/ কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে?”

সুফিয়া কামাল ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূর্ত প্রতীক। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে মাথা নত না করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হয়। ১৯৮১ সালে যখন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তী পালনে বাধা দেওয়া হয়েছিল, তিনি সেই রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রাজপথে নেমেছিলেন।

আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন—

‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’।

সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার এই মহীয়সী নারীর নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর ত্যাগ ও আদর্শ সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই জননী সাহসিকার জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের দেশপ্রেম ও মানবিকতাকে আজীবন অক্ষুণ্ণ রাখতে পারি।

বেগম সুফিয়া কামাল তাঁর কর্ম এবং আদর্শের মধ্য দিয়ে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন।

ধন্যবাদ সবাইকে।

জয় বাংলা!

জয় গুরুকুল!

বেগম সুফিয়া কামাল
বেগম সুফিয়া কামাল