কবি শহীদ কাদরী-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো।
কবি শহীদ কাদরী-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা
সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ,
আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা।
আজ ১৪ই আগস্ট। আজ আমরা এমন এক কবির জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি দেশবিভাগোত্তর বাংলা কবিতায় নাগরিক জীবন, আধুনিকতা এবং নিঃসঙ্গতাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তিনি আমাদের আধুনিক কবিতার প্রবাদপ্রতিম পুরুষ—কবি শহীদ কাদরী।
উপস্থিত সুধী,
শহীদ কাদরী ১৯৪২ সালের ১৪ আগস্ট কলকাতার পার্ক সার্কাসে জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর তিনি সপরিবারে ঢাকায় চলে আসেন। তিনি ছিলেন পঞ্চাশের দশকের অন্যতম প্রভাবশালী কবি। যদিও তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা মাত্র চারটি, কিন্তু বাংলা কবিতায় তাঁর গভীরতা ও প্রভাব অপরিসীম। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলো হলো— ‘উত্তরাধিকার’, ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’, ‘কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই’ এবং ‘আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও’।
শহীদ কাদরী ছিলেন মূলত নগর-মনস্কতার কবি। ঢাকা শহরের অলিগলি, নাগরিক যন্ত্রণা আর আধুনিক মানুষের বিচ্ছিন্নতাবোধ তাঁর কলমে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। ১৯৭৩ সালে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং ২০১১ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন। দীর্ঘ প্রবাস জীবনেও তাঁর হৃদয়ে বাংলাদেশ এবং বাংলা ভাষা সর্বদা প্রদীপ্ত ছিল।
প্রিয় সুধী,
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং মানুষের মৌলিক অধিকারের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা ছিল অটুট। তাঁর ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’ কবিতাটি আমাদের জাতীয় চেতনার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। যেখানে তিনি যুদ্ধ ও সংঘাতের বিপরীতে প্রেমের জয়গান গেয়েছেন:
“ভয় নেই / আমি এমন ব্যবস্থা করব / যাতে সেনাবাহিনীর বদলে / চারা গাছগুলো অভিবাদন করবে তোমাকে”
তাঁর কবিতার সেই কালজয়ী পঙক্তিগুলো আজও প্রতিটি তরুণের মনে আশার আলো জ্বালায়। তিনি ছিলেন একজন রুচিশীল ও প্রগতিশীল মানুষ, যাঁর জীবনবোধ আমাদের শেখায় কীভাবে প্রতিকূলতার মাঝেও শিল্পের শুদ্ধতা বজায় রাখতে হয়।
আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন—
‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’।
সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার কবির নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই মহান শিল্পীর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের কৃষ্টি ও মাতৃভাষাকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় লালন করতে পারি।
কবি শহীদ কাদরী তাঁর অবিনশ্বর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে প্রতিটি বাঙালি পাঠকের হৃদয়ে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন।
ধন্যবাদ সবাইকে।
জয় বাংলা!
জয় গুরুকুল!
আরও দেখুন: