গুরুকুল ক্যাম্পাস লার্নিং নেটওয়ার্ক, GCLN

মির্জা গালিব-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো।

মির্জা গালিব
মির্জা গালিব

 

মির্জা গালিব-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা

সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ,

আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা।

আজ আমরা এমন এক ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যাঁর নাম উচ্চারণ মাত্রই বিশ্বসাহিত্যের এক গভীর দর্শন ও কাব্যময় জগত আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তিনি মুঘল সাম্রাজ্যের শেষ সূর্যোদয়ের সাক্ষী, উর্দু ও ফারসি ভাষার অমর কবি— মির্জা আসাদুল্লাহ খান গালিব।

উপস্থিত সুধী,

মির্জা গালিব ১৭৯৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর ভারতের আগ্রায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষরা ছিলেন মধ্য এশীয় তুর্কি বংশোদ্ভূত। গালিব এমন এক সময়ে কাব্যচর্চা করেছেন যখন মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ঘটছে এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন জেঁকে বসছে। এই যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে তিনি জীবনকে যে গভীরতা দিয়ে দেখেছিলেন, তা আজ আড়াইশ বছর পরও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

গালিবের কবিতার প্রধান বিষয়বস্তু ছিল মানুষের অস্তিত্বের সংকট, প্রেম, মৃত্যু এবং আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা। তিনি কেবল কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দার্শনিক। তাঁর ‘দিওয়ান-ই-গালিব’ উর্দু সাহিত্যের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠতম সংকলন হিসেবে বিবেচিত। তাঁর রচিত চিঠিপত্রগুলোও উর্দু গদ্য সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ, যা সেই সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির এক প্রামাণ্য দলিল।

তাঁর কিছু অমর পঙক্তি আজও সারা বিশ্বের কাব্যপ্রেমীদের মুখে মুখে ঘোরে:

“হাজারো খোয়াইশে অ্যায়সি কে হর খোয়াইশ পে দম নিকলে / বহুত নিকলে মেরে আরমান লেকিন ফির ভি কম নিকলে”

(অর্থাৎ: হাজারো এমন আকাঙ্ক্ষা যার প্রতিটির জন্য প্রাণ উৎসর্গ করা যায়; অনেক আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হয়েছে ঠিকই, তবু যেন তা পর্যাপ্ত নয়।)

প্রিয় সুধী,

মির্জা গালিব তাঁর জীবদ্দশায় চরম দারিদ্র্য ও ব্যক্তিগত শোকের মধ্য দিয়ে গেছেন। তাঁর সাতটি সন্তানই শৈশবে মারা যায়। কিন্তু এই দুঃখ তাঁকে ভেঙে ফেলেনি, বরং তাঁর কলমকে করেছে আরও ধারালো এবং সংবেদনশীল। তিনি ছিলেন অত্যন্ত স্বাধীনচেতা এবং রসবোধ সম্পন্ন একজন মানুষ। মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফর তাঁকে ‘দাবির-উল-মুলক’ এবং ‘নাজিম-উদ-দৌলা’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।

আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন—

‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’।

সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে এই মহান দার্শনিকের নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সেই সুগভীর কাব্যদর্শন সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন গালিবের মতো প্রতিকূলতার মাঝেও জীবনকে দেখার নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করতে পারি এবং নিজেদের জীবনকে শিল্পের আলোয় রাঙাতে পারি।

মির্জা গালিব তাঁর কালজয়ী সৃষ্টির মধ্য দিয়ে সাহিত্যের আকাশে চিরকাল ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন।

ধন্যবাদ সবাইকে।

জয় বাংলা!

জয় গুরুকুল!

মির্জা গালিব
মির্জা গালিব