গুরুকুল ক্যাম্পাস লার্নিং নেটওয়ার্ক, GCLN

বেগম সুফিয়া কামাল-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা, ২০ জুন

বেগম সুফিয়া কামাল-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। বেগম সুফিয়া কামাল-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ আমরা এমন এক মহীয়সী নারীর জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি বাঙালির সকল প্রগতিশীল আন্দোলন এবং নারী জাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ। তিনি আমাদের প্রাণের মমতায় আগলে রাখা ‘জননী সাহসিকা’—কবি বেগম সুফিয়া কামাল। উপস্থিত সুধী, সুফিয়া কামাল ১৯১১ সালের ২০ জুন বরিশালের শায়েস্তাবাদে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম সৈয়দ আবদুল বারী এবং মায়ের নাম সৈয়দা সাবেরা খাতুন। এমন এক সময়ে তিনি জন্মেছিলেন যখন মুসলিম নারীদের শিক্ষার পরিবেশ ছিল অত্যন্ত প্রতিকূল। কিন্তু অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে তিনি স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হন এবং বেগম রোকেয়ার আদর্শকে ধারণ করে সমাজ সংস্কারে আত্মনিয়োগ করেন। কর্মবৈচিত্র্যের দিক দিয়ে তিনি ছিলেন এক অনন্য সব্যসাচী ব্যক্তিত্ব। তিনি কেবল একজন কবিই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন, ১৯৬১-র রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী প্রতিরোধ আন্দোলন এবং ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। যুদ্ধের দিনগুলোতে অবরুদ্ধ ঢাকায় থেকেও তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহায়তা করেছেন এবং পরবর্তীতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে তোলা আন্দোলনেও বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৬৯ সালে গঠিত ‘মহিলা পরিষদ’-এর প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী হিসেবে তিনি আমৃত্যু নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় লড়াই করে গেছেন। প্রিয় সুধী, সুফিয়া কামালের কবিতা ও গদ্য আমাদের সাহিত্যভাণ্ডারকে ঋদ্ধ করেছে। তাঁর লেখনীতে ফুটে উঠেছে প্রকৃতি, দেশপ্রেম এবং অধিকারবঞ্চিত মানুষের কথা। তাঁর কালজয়ী গ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘সাঁঝের মায়া’, ‘মায়া কাজল’, ‘মন ও জীবন’ এবং ‘একাত্তরের ডায়েরি’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কবির সেই অমোঘ পঙক্তি আজও আমাদের প্রেরণা দেয়: “আমাদের এই দেশে হবে সেই ছেলে কবে/ কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে?” সুফিয়া কামাল ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূর্ত প্রতীক। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে মাথা নত না করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হয়। ১৯৮১ সালে যখন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তী পালনে বাধা দেওয়া হয়েছিল, তিনি সেই রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রাজপথে নেমেছিলেন। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার এই মহীয়সী নারীর নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর ত্যাগ ও আদর্শ সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই জননী সাহসিকার জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের দেশপ্রেম ও মানবিকতাকে আজীবন অক্ষুণ্ণ রাখতে পারি। বেগম সুফিয়া কামাল তাঁর কর্ম এবং আদর্শের মধ্য দিয়ে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

কাজী নজরুল ইসলাম-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা । ২৪ মে

কাজী নজরুল ইসলাম

কাজী নজরুল ইসলাম-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। কাজী নজরুল ইসলাম-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ এগারোই জ্যৈষ্ঠ। আজ আমরা এমন এক আগ্নেয়গিরির জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যার কলম পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার গান গেয়েছে, যার সুর বাঙালির হৃদয়ে সাহসের সঞ্চার করেছে। তিনি আমাদের জাতীয় কবি, আমাদের চিরকালের বিদ্রোহী কবি—কাজী নজরুল ইসলাম। উপস্থিত সুধী, কাজী নজরুল ইসলাম ১৮৯৯ সালের ২৪ মে (বাংলা পঞ্জিকা মতে ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ই জ্যৈষ্ঠ) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জীবন ছিল এক মহাকাব্যিক লড়াইয়ের গল্প। অতি দারিদ্র্যের কারণে তাঁর শৈশব কেটেছে ‘দুখু মিয়া’ হয়ে, কাজ করেছেন লেটোর দলে, এমনকি রুটির দোকানেও। কিন্তু কোনো প্রতিকূলতাই তাঁর ভেতরের প্রতিভাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। কর্মবৈচিত্র্যের দিক দিয়ে তিনি ছিলেন এক অতুলনীয় সব্যসাচী—তিনি একাধারে কবি, সাংবাদিক, সংগীতজ্ঞ, নাট্যকার এবং সৈনিক। আজ একটি বিশেষ বিষয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন। নজরুল কেবল প্রেমের কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন সাম্যের কবি। ১৯২২ সালে তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রকাশিত হওয়ার পর বাংলা সাহিত্যে এক অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি হয়। পরাধীন ভারতবর্ষে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে তাঁর কলম ছিল কামানের গোলার মতো শক্তিশালী। ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতার জন্য তাঁকে কারাবরণ করতে হয়েছিল, কিন্তু শিকল পরে তিনি গেয়েছেন শিকল ভাঙার গান। প্রিয় সুধী, নজরুলের অবদান কেবল সাহিত্যে সীমাবদ্ধ নয়; তিনি বাংলা সংগীতের এক বিশাল ভাণ্ডার তৈরি করে দিয়ে গেছেন। প্রায় ৩০০০-এর বেশি গান রচনা করেছেন তিনি, যা ‘নজরুল গীতি’ নামে পরিচিত। ধ্রুপদী রাগাশ্রয়ী গান থেকে শুরু করে গজল, শ্যামাসংগীত এবং বিশেষ করে ইসলামী সংগীত রচনায় তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। আজও আমাদের প্রতিটি জাতীয় উৎসবে তাঁর সেই কালজয়ী সৃষ্টিসমূহ নতুন করে প্রাণের সঞ্চার করে: “বল বীর— বল উন্নত মম শির!” “কারার ঐ লৌহকপাট, ভেঙে ফেল কর রে লোপাট” “ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশির ঈদ” “মোর প্রিয়া হবে এসো রানী, দেব খোঁপায় তারার ফুল” ১৯৭২ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে কবিকে সপরিবারে বাংলাদেশে আনা হয় এবং তাঁকে বাংলাদেশের জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া হয়। তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনা আজও আমাদের দেশপ্রেমের শ্রেষ্ঠ পাথেয়। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার আমাদের জাতীয় কবির নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন নজরুলের বিদ্রোহী ও মানবিক জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পারি। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর অবিনশ্বর কর্মের মধ্য দিয়ে প্রতিটি বাঙালির রক্তে ও চেতনায় চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় নজরুল! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা । ৭ মে

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ পঁচিশে বৈশাখ। আজ আমরা এমন এক জ্যোতির্ময় ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিয়েছেন হিমালয়সম উচ্চতায়। তিনি আমাদের চেতনার দীপশিখা, আমাদের প্রাণের কবি—বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। উপস্থিত সুধী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৬১ সালের ৭ মে (বাংলা পঞ্জিকা মতে ১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫শে বৈশাখ) কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং মাতা সারদাসুন্দরী দেবী। কর্মবৈচিত্র্যের দিক দিয়ে তিনি ছিলেন এক অতলস্পর্শী সব্যসাচী প্রতিভা। তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, দার্শনিক, সংগীতস্রষ্টা, চিত্রশিল্পী এবং শিক্ষাবিদ। আজ একটি বিশেষ বিষয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন। ১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য প্রথম এশীয় হিসেবে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর এই অর্জন কেবল একজন কবির বিজয় ছিল না, এটি ছিল বাংলা ভাষার বিশ্বজয়ের সূচনালগ্ন। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে বৈশ্বিক ভাবনার সাথে দেশীয় সংস্কৃতির সমন্বয় ঘটাতে হয়। ১৯২১ সালে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘বিশ্বভারতী’ বিশ্ববিদ্যালয় আজও বিশ্ব সংস্কৃতির এক অনন্য মিলনস্থল। প্রিয় সুধী, রবীন্দ্রনাথের সাথে আমাদের এই বাংলাদেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ও নিবিড়। পাবনার শিলাইদহ, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর আর নওগাঁর পতিসরে কাটানো তাঁর জীবনের সোনালি দিনগুলোতেই তিনি রচনা করেছেন তাঁর শ্রেষ্ঠ অনেক সৃষ্টি। আমাদের জাতীয় সংগীত “আমার সোনার বাংলা” এই মাটির প্রতি তাঁর গভীর মমত্ববোধের অমর ফসল। রবীন্দ্রনাথের গানের সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। তাঁর সেই কালজয়ী সৃষ্টিসমূহ আজও বাঙালির আনন্দ-বেদনায় পরম আশ্রয়: “তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম” “ছিলে একা বসি আপন মনে” “বাংলার মাটি বাংলার জল, বাংলার বায়ু বাংলার ফল— পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান” তিনি কেবল সৌন্দর্যের কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার এক কণ্ঠস্বর। ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তিনি ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া ‘নাইটহুড’ উপাধি বর্জন করে যে নৈতিক সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন, তা ইতিহাসে বিরল। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার বিশ্বকবির নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই মহাপ্রাণের জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের সংস্কৃতি ও মনুষ্যত্বকে আজীবন লালন করতে পারি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কর্মের মধ্য দিয়ে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

সত্যজিৎ রায়-এর জন্মদিন উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা । ২ মে

সত্যজিৎ রায়

সত্যজিৎ রায়-এর জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। সত্যজিৎ রায়-এর জন্মদিন উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ আমরা এমন এক ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি বাংলা ও বাঙালির সংস্কৃতিকে বিশ্ব চলচ্চিত্রের দরবারে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তিনি কেবল একজন চলচ্চিত্র পরিচালক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একাধারে লেখক, চিত্রকর, সঙ্গীত পরিচালক, ক্যালিগ্রাফার এবং অমর সব চরিত্রের স্রষ্টা। তিনি আমাদের গর্ব—সত্যজিৎ রায়। উপস্থিত সুধী, সত্যজিৎ রায় ১৯২১ সালের ২ মে কলকাতার বিখ্যাত ‘রায় পরিবারে’ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী এবং পিতা সুকুমার রায়—উভয়েই ছিলেন বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি। ১৯৫৫ সালে ‘পথের পাঁচালী’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি বিশ্ব চলচ্চিত্রে পা রাখেন এবং প্রথম ছবিতেই আন্তর্জাতিক মহলে হইচই ফেলে দেন। তাঁর হাত ধরেই বিশ্ব চিনেছে অপু, দুর্গা আর নিশ্চিন্তপুরের সেই রেললাইন দেখার গল্প। কর্মবৈচিত্র্যের দিক দিয়ে তিনি ছিলেন এক কালজয়ী প্রতিভা। তাঁর পরিচালিত ৩২টি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এবং ডকুফিল্মগুলো আজও চলচ্চিত্রের পাঠ্যবই হিসেবে গণ্য করা হয়। শুধু চলচ্চিত্র নয়, বাংলা সাহিত্যে তাঁর অমর সৃষ্টি ‘ফেলুদা’ ও ‘প্রফেসর শঙ্কু’ আমাদের শৈশবকে করেছে রোমাঞ্চকর। এছাড়া তাঁর অনন্য শিল্পবোধ ফুটে উঠেছে বইয়ের প্রচ্ছদ অলঙ্করণ এবং নিজের তৈরি করা ফন্ট ‘রে রোমান’ (Ray Roman)-এর মাধ্যমে। ১৯৯২ সালে তিনি বিশ্বের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র সম্মান ‘অস্কার’ (একাডেমি অ্যাওয়ার্ড) লাভ করেন আজীবন অবদানের জন্য। সত্যজিৎ রায়ের কালজয়ী কিছু সৃষ্টি ও সিরিজের কথা না বললেই নয়: অপু ট্রিলজি: পথের পাঁচালী, অপরাজিত ও অপুর সংসার। ফেলুদা সিরিজ: সোনার কেল্লা, জয় বাবা ফেলুনাথ-এর মতো কালজয়ী চলচ্চিত্র ও উপন্যাস। হীরক রাজার দেশে: যেখানে তিনি রূপকের মাধ্যমে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার বার্তা দিয়েছেন। জলসাঘর ও চারুলতা: যা বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নির্মাণ। প্রিয় সুধী, সত্যজিৎ রায় তাঁর শিল্পচর্চায় সবসময় মাটির কাছাকাছি থেকেছেন, কিন্তু তাঁর চিন্তা ছিল বিশ্বজনীন। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে অত্যন্ত পরিমিতিবোধ ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে শিল্পকে সার্থক করে তোলা যায়। তাঁর জীবন ছিল কাজের প্রতি একাগ্রতা ও নিষ্ঠার এক জীবন্ত পাঠশালা। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার এই মহান শিল্পীর নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন সত্যজিৎ রায়ের জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের প্রতিভা ও দেশজ সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে সঠিকভাবে উপস্থাপিত করতে পারি। সত্যজিৎ রায় তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে এবং বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে চিরকাল ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

হুমায়ুন আজাদ-এর জন্মদিন উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা । ২৮ এপ্রিল

হুমায়ুন আজাদ

হুমায়ুন আজাদ-এর জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। হুমায়ুন আজাদ-এর জন্মদিন উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ আমরা এমন এক নির্ভীক ও প্রথাবিরোধী মানুষের জন্মদিন উদযাপন করছি, যিনি আধুনিক বাংলা সাহিত্য ও চিন্তার জগতে এক প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক এবং এদেশের ভাষাবিজ্ঞানের অন্যতম পথিকৃৎ। তিনি আমাদের প্রিয় অধ্যাপক—হুমায়ুন আজাদ। উপস্থিত সুধী, হুমায়ুন আজাদ ১৯৪৭ সালের ২৮ এপ্রিল তৎকালীন বিক্রমপুরের (বর্তমানে মুন্সীগঞ্জ জেলা) রাড়িখাল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মেধা ও পাণ্ডিত্যের স্বাক্ষর রেখেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা জীবনে এবং পরবর্তীতে এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাবিজ্ঞানে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে। তিনি কেবল একজন শিক্ষক ছিলেন না, তিনি ছিলেন যুক্তিবাদী ও আধুনিক মননের এক দীপশিখা। তাঁর ‘বাক্যতত্ত্ব’ বা ‘তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান’ গ্রন্থগুলো বাংলা ভাষাতত্ত্বের জগতে মাইলফলক হয়ে আছে। তবে হুমায়ুন আজাদ সবচেয়ে বেশি আলোচিত তাঁর প্রখর ও সাহসী গদ্যের জন্য। তিনি বিশ্বাস করতেন বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ে কোনো আপস নেই। প্রথাধীন সমাজের সংস্কার ভাঙতে তিনি কলম ধরেছিলেন। তাঁর ‘নারী’, ‘প্রবচনগুচ্ছ’, ‘ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল’ এবং ‘সব কিছু ভেঙে পড়ে’র মতো গ্রন্থগুলো আমাদের নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। তাঁর প্রতিটি শব্দ ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক একটি ধারালো অস্ত্র। স্বাধীনতার চেতনা আর অসাম্প্রদায়িকতা ছিল তাঁর প্রতিটি নিশ্বাসে। প্রিয় সুধী, হুমায়ুন আজাদের জীবন ছিল এক সংগ্রামের নাম। সত্য কথা বলার অপরাধে তাঁকে বারবার আক্রান্ত হতে হয়েছে, তবুও তিনি তাঁর আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। তাঁর ‘লাল নীল দীপাবলি’ কিংবা ‘ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না’র মতো কিশোর সাহিত্যগুলো আমাদের প্রজন্মের পর প্রজন্মকে বইয়ের প্রতি এবং সুন্দরের প্রতি আকৃষ্ট করেছে। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে নিজের সত্তাকে জাগ্রত রেখে সব ধরণের অন্ধত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকা যায়। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার এই কীর্তিমান লেখকের নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই অকুতোভয় বুদ্ধিজীবীর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নির্ভীক চিন্তা ও সত্যের পথে অবিচল থাকতে পারি। হুমায়ুন আজাদ তাঁর অবিনশ্বর সৃষ্টি ও সাহসী চিন্তার মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

উইলিয়াম শেক্সপিয়র দিবস উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা । ২৩ এপ্রিল

উইলিয়াম শেক্সপিয়র

উইলিয়াম শেক্সপিয়র দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। উইলিয়াম শেক্সপিয়র দিবস উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ আমরা এমন এক ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যাঁকে বলা হয় বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম নাট্যকার এবং ইংরেজি ভাষার সর্বকালের সেরা কবি। তিনি মানব হৃদয়ের গভীরতম আবেগ, দ্বন্দ ও ভালোবাসাকে শব্দের তুলিতে জীবন্ত করেছেন। তিনি আমাদের চিরকালিন অনুপ্রেরণা—উইলিয়াম শেক্সপিয়র। উপস্থিত সুধী, উইলিয়াম শেক্সপিয়রের জীবন অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক। ধারণা করা হয়, ১৫৬৪ সালের ২৩ এপ্রিল ইংল্যান্ডের স্ট্র্যাটফোর্ড-আপন-অ্যাভন (Stratford-upon-Avon) শহরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। আশ্চর্যজনকভাবে ১৬১৬ সালের ঠিক একই তারিখে অর্থাৎ ২৩ এপ্রিলেই তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। এ কারণেই বিশ্বজুড়ে আজকের এই দিনটিকে ‘শেক্সপিয়র দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। কর্মজীবনে তিনি ছিলেন একাধারে অভিনেতা, নাট্যকার এবং নাট্যশালার অংশীদার। শেক্সপিয়রের সাহিত্যকর্ম বাংলা তথা বিশ্বসাহিত্যের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। তিনি ৩৭টি নাটক এবং ১৫৪টি সনেট রচনা করেছেন। তাঁর সৃষ্টিতে ফুটে উঠেছে মানুষের জীবনের জটিল দর্শন—কখনও তা বিষাদময় ট্র্যাজেডি, কখনও বা নির্মল কমেডি। আধুনিক নাট্যকলার এমন কোনো শাখা নেই যেখানে শেক্সপিয়রের ছোঁয়া লাগেনি। তাঁর সেই কালজয়ী সৃষ্টিসমূহ আজও মঞ্চে এবং মানুষের মুখে মুখে ফেরে: “হ্যামলেট” (Hamlet) – এর সেই বিখ্যাত উক্তি: “To be, or not to be, that is the question.” “রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট” (Romeo and Juliet) – চিরন্তন প্রেমের এক মহাকাব্য। “ম্যাকবেথ” (Macbeth) এবং “ওথেলো” (Othello) – যেখানে উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও ঈর্ষার চরম পরিণতি ফুটে উঠেছে। মজার ব্যাপার হলো, আমরা প্রতিদিন অজান্তেই ইংরেজি ভাষার অসংখ্য শব্দ ও বাগধারা ব্যবহার করি যা শেক্সপিয়রের সৃষ্টি। আধুনিক ইংরেজি ভাষার ভাণ্ডারকে তিনি যে উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, তা অতুলনীয়। প্রিয় সুধী, উইলিয়াম শেক্সপিয়রের প্রভাব কেবল ইংল্যান্ডে সীমাবদ্ধ থাকেনি। আমাদের ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর—সবাই তাঁর সৃষ্টির দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন যে ‘পুরো বিশ্বটাই একটা মঞ্চ’ (All the world’s a stage), যেখানে আমরা সবাই কেবল কুশীলব। তাঁর প্রতিটি নাটক যেন মানুষের চরিত্রের একেকটি দর্পণ। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার এই মহামতি নাট্যকারের নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর আত্মার শান্তি কামনায় সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই মহান শিল্পীর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে মানুষের জীবন ও মনস্তত্ত্বকে আরও গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করি। উইলিয়াম শেক্সপিয়র তাঁর অবিনশ্বর সৃষ্টি ও পঙক্তিগুলোর মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা । ১৫ এপ্রিল

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ আমরা এমন এক ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যাকে মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম ‘পলিম্যাথ’ বা বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী বলা হয়। তিনি একাধারে চিত্রশিল্পী, স্থপতি, গণিতবিদ, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী এবং উদ্ভাবক। রেনেসাঁ যুগের সেই অমর কারিগর—লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি। উপস্থিত সুধী, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি ১৪৫২ সালের ১৫ এপ্রিল ইতালির ফ্লোরেন্সের তুস্কানি অঞ্চলের ‘ভিঞ্চি’ নামক এক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কর্মবৈচিত্র্যের দিক দিয়ে তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের চেয়ে কয়েকশ বছর এগিয়ে থাকা এক সব্যসাচী মেধা। লিওনার্দোর প্রতিভা কেবল ক্যানভাসের রঙে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি মানুষের শরীরের ব্যবচ্ছেদ থেকে শুরু করে পাখির ওড়া পর্যবেক্ষণ করে উড়োজাহাজের নকশা পর্যন্ত করেছিলেন। তাঁর সেই বিখ্যাত নোটবুক বা ‘কোডেক্স’গুলো আজও বিজ্ঞানীদের বিস্ময়ের খোরাক। অনেকে মনে করেন লিওনার্দো কেবল একজন শিল্পী, কিন্তু তাঁর বিজ্ঞানমনস্কতা ছিল অতুলনীয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিল্পের ভিত্তি হলো গভীর পর্যবেক্ষণ এবং নিখুঁত জ্যামিতিক হিসাব। তাঁর কালজয়ী সৃষ্টিসমূহ আজও বিশ্ব ঐতিহ্যের অমূল্য সম্পদ: মোনালিসা: যার রহস্যময় হাসি আজও সারা বিশ্বকে আচ্ছন্ন করে রাখে। দ্য লাস্ট সাপার: যা চিত্রকলার ইতিহাসে এক অনন্য সংযোজন। ভিট্রুভিয়ান ম্যান: যেখানে তিনি মানুষের শরীরের অনুপাত ও জ্যামিতিক সামঞ্জস্য তুলে ধরেছেন। মজার ব্যাপার হলো, লিওনার্দোর আঁকা চিত্রকর্মের সংখ্যা খুব বেশি নয়, কিন্তু প্রতিটি সৃষ্টিই পূর্ণতা এবং গবেষণার এক একটি মাইলফলক। তাঁর ‘স্ফুমাতো’ (Sfumato) কৌশল চিত্রকলার জগতকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছিল। প্রিয় সুধী, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি কেবল একজন শিল্পী বা বিজ্ঞানী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন বড় মনের মানুষ এবং প্রকৃতির একনিষ্ঠ উপাসক। তিনি পরাধীন বা সীমাবদ্ধ চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে মহাবিশ্বের গূঢ় রহস্য উন্মোচনে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। জমিদারি বা রাজকীয় বিলাসিতা তাঁকে কখনোই তাঁর জ্ঞানতৃষ্ণা থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার এই বিশ্ববিশ্রুত মনীষীর নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন লিওনার্দোর সেই অদম্য কৌতূহল এবং সৃজনশীলতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের মেধা ও মননকে বিকশিত করতে পারি। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি তাঁর অবিনশ্বর কর্মের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর বুকে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

৬ এপ্রিল আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবস: শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে খেলার শক্তি

৬ এপ্রিল আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবস

মানবসভ্যতার ইতিহাসে ক্রীড়া বা খেলাধুলা কেবল শরীরচর্চার মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং আনন্দ, ঐক্য এবং শৃঙ্খলার প্রতীক হিসেবে সমাদৃত হয়ে আসছে। আধুনিক বিশ্বে খেলাধুলা এখন আর কেবল মাঠের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই; এটি হয়ে উঠেছে কূটনীতি, শান্তি স্থাপন এবং টেকসই উন্নয়নের এক শক্তিশালী হাতিয়ার। এই গুরুত্বকে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি দিতে প্রতি বছর ৬ এপ্রিল পালিত হয় ‘আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবস’ (International Day of Sport for Development and Peace)। জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত এই দিবসটি বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, একটি বল বা একটি দৌড় প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়েও পৃথিবীতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। ৬ এপ্রিল আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবস দিবসটির পটভূমি ও ইতিহাস আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবস পালনের প্রস্তাবটি প্রথম জোরালোভাবে আসে ২০১৩ সালে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দীর্ঘ আলোচনার পর ২৩ আগস্ট ২০১৩ তারিখে একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি বছর ৬ এপ্রিলকে উন্নয়ন ও শান্তির জন্য আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ৬ এপ্রিল তারিখটি নির্বাচনের পেছনে একটি বিশেষ ঐতিহাসিক তাৎপর্য রয়েছে। ১৮৯৬ সালের এই দিনেই গ্রিসের এথেন্সে আধুনিক অলিম্পিক গেমসের প্রথম আসরের শুভ সূচনা হয়েছিল। প্রাচীন অলিম্পিকের চেতনাকে পুনরুজ্জীবিত করে বিশ্বকে এক সুতোয় বাঁধার যে স্বপ্ন ব্যারন পিয়েরে ডি কুবার্টিন দেখেছিলেন, সেই চেতনাকেই শ্রদ্ধা জানাতে এই তারিখটি বেছে নেওয়া হয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে এই দিবসটি অত্যন্ত মর্যাদার সাথে পালিত হয়ে আসছে। দিবসের মূল লক্ষ্য ও তাৎপর্য আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবসের মূল লক্ষ্য হলো সমাজে শান্তি স্থাপন এবং টেকসই উন্নয়নে ক্রীড়ার ভূমিকাকে উদযাপন করা। এর তাৎপর্য বহুমুখী: ১. শান্তি ও সংহতি স্থাপন: খেলাধুলা কোনো সীমানা মানে না। ভাষা, বর্ণ বা ধর্মের ভিন্নতা থাকলেও খেলার মাঠে সবাই এক কাতারে দাঁড়ায়। এটি জাতিগত সংঘাত নিরসনে এবং দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব বৃদ্ধিতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। ২. টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জন: জাতিসংঘ নির্ধারিত ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে খেলাধুলা একটি কার্যকরী মাধ্যম। শিক্ষা নিশ্চিত করা থেকে শুরু করে জেন্ডার সমতা এবং সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ক্রীড়া কার্যক্রম বিশাল অবদান রাখছে। ৩. উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের প্রচার: ক্রীড়াকে ব্যবহার করে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে মূল স্রোতধারায় ফিরিয়ে আনা, তাদের অধিকার রক্ষা এবং সামাজিক নেতৃত্ব তৈরির লক্ষ্যে এই দিবসটি সচেতনতা বৃদ্ধি করে। উন্নয়নে ক্রীড়ার ভূমিকা উন্নয়ন বলতে কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বোঝায় না, বরং মানুষের জীবনমানের উন্নয়নকেও বোঝায়। এই যাত্রায় ক্রীড়া বিভিন্নভাবে সহায়তা করে: সুস্বাস্থ্য ও সুস্থ বিনোদন: আধুনিক যুগে কায়িক শ্রম কমে যাওয়ায় অসংক্রামক ব্যাধির প্রকোপ বাড়ছে। নিয়মিত খেলাধুলা হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও স্থূলতা রোধে সাহায্য করে। স্বাস্থ্যবান জাতিই উন্নত দেশ গড়তে পারে। শিক্ষার প্রসার: খেলাধুলা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধৈর্য, একাগ্রতা এবং দলগত কাজের (Teamwork) স্পৃহা তৈরি করে। অনেক দেশে খেলাধুলার মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের স্কুলে ফিরিয়ে আনার প্রকল্প সফল হয়েছে। জেন্ডার সমতা: মাঠের লড়াই এখন আর কেবল পুরুষদের নয়। নারীদের ক্রীড়াঙ্গনে অংশগ্রহণ তাদের ক্ষমতায়নের পথ সুগম করছে এবং সামাজিক সংস্কার ভাঙতে সাহায্য করছে। শান্তি স্থাপনে ক্রীড়া ও অলিম্পিক চেতনা ক্রীড়া কূটনীতি বা ‘স্পোর্টস ডিপ্লোম্যাসি’ বিশ্বশান্তিতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। যুদ্ধের ময়দানে যেখানে সংলাপ ব্যর্থ হয়, সেখানে অনেক সময় খেলার মাঠ বরফ গলাতে সাহায্য করে। উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যকার অলিম্পিক কূটনীতি এর একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। ক্রীড়া আমাদের শেখায় হার-জিত যাই হোক না কেন, প্রতিদ্বন্দ্বীকে সম্মান করতে হবে। এই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধই বিশ্বশান্তির মূল ভিত্তি। অলিম্পিক ট্রুস (Olympic Truce) বা অলিম্পিক যুদ্ধবিরতির যে প্রাচীন ঐতিহ্য রয়েছে, তা আজও আধুনিক ক্রীড়া দিবসের মাধ্যমে বিশ্বে শান্তির বাণী প্রচার করে। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবস ক্রীড়াপ্রেমী দেশ হিসেবে বাংলাদেশে এই দিবসটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালন করা হয়। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রতি বছর রেলি, আলোচনা সভা এবং বিভিন্ন প্রদর্শনীমূলক খেলার আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশে ৬ এপ্রিল একই সাথে ‘জাতীয় ক্রীড়া দিবস’ হিসেবেও পালিত হয়। আমাদের জাতীয় জীবনে খেলাধুলা কেবল বিনোদন নয়, বরং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল’ ক্রীড়াকে যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে বিশ্ব জনমত গঠন করেছিল। বর্তমান সময়েও ক্রিকেট, ফুটবল বা আর্চারির বৈশ্বিক সাফল্য বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করছে। এই দিবসটি পালনের মাধ্যমে আমাদের দেশীয় খেলাধুলা পুনরুজ্জীবিত করা এবং তরুণ প্রজন্মকে মাদক ও অপরাধ থেকে দূরে রাখার শপথ নেওয়া হয়। চ্যালেঞ্জ ও আগামীর সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবস পালনের মাধ্যমে সাফল্য অর্জিত হলেও কিছু চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। অনেক দেশে পর্যাপ্ত ক্রীড়া অবকাঠামোর অভাব রয়েছে। বিশেষ করে অনুন্নত দেশের গ্রামীণ অঞ্চলে প্রতিভাবান খেলোয়াড়রা সুযোগের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া ক্রীড়াঙ্গনে দুর্নীতি, ডোপিং বা বর্ণবাদের মতো নেতিবাচক বিষয়গুলোও একটি বড় বাধা। তবে আগামীর সম্ভাবনা অনেক। প্রযুক্তির সাথে ক্রীড়ার সমন্বয় এবং প্যারা-অলিম্পিকের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়ন মূলধারায় যুক্ত করা হচ্ছে। আধুনিক বিশ্বে ‘ই-স্পোর্টস’ বা ডিজিটাল ক্রীড়াও নতুন প্রজন্মের কাছে শান্তির বার্তা পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম হয়ে উঠছে। জাতিসংঘ মনে করে, সরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি বেসরকারি খাত এবং সিভিল সোসাইটি যদি ক্রীড়া উন্নয়নে এগিয়ে আসে, তবে ২০৩০ সালের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অনেক সহজ হবে। পরিশেষে বলা যায়, আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবস কেবল একটি তারিখ নয়, এটি একটি বৈশ্বিক অঙ্গীকার। খেলাধুলা হলো মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি প্রকাশের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। এটি আমাদের ধৈর্যশীল হতে শেখায়, প্রতিকূলতাকে জয় করতে শেখায় এবং সর্বোপরি মানুষকে ভালোবাসতে শিখায়। ঘৃণা ও বিভক্তির এই পৃথিবীতে একটি ফুটবল বা একটি ক্রিকেট ব্যাট যখন কোটি মানুষকে এক স্বরে ‘উল্লাস’ করতে শেখায়, তখনই ক্রীড়ার প্রকৃত জয় হয়। উন্নয়নের প্রতিটি ধাপে এবং শান্তির প্রতিটি পদক্ষেপে যদি আমরা ক্রীড়াকে সাথী করে নিতে পারি, তবেই একটি সমৃদ্ধ এবং সংঘাতমুক্ত পৃথিবী গড়া সম্ভব হবে। তাই ৬ এপ্রিল হোক সেই দিন, যেদিন আমরা খেলার মাধ্যমে সম্প্রীতির এক নতুন পৃথিবী গড়ার শপথ নেব। আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

কবীর সুমন-এর জন্মদিন উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা । ১৬ মার্চ

কবীর সুমন

কবীর সুমন-এর জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। কবীর সুমন-এর জন্মদিন উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ আমরা এমন এক বিস্ময়কর প্রতিভার জন্মদিন উদযাপন করছি, যিনি আধুনিক বাংলা গানের ব্যাকরণ বদলে দিয়েছেন। যিনি নাগরিক জীবনের ক্লান্তি, প্রেম আর দ্রোহকে গিটারের তারে আর পিয়ানোর রিডে এক নতুন ভাষা দিয়েছেন। তিনি আমাদের প্রিয় গানওয়ালা—কবীর সুমন। উপস্থিত সুধী, কবীর সুমন ১৯৪৯ সালের ১৬ মার্চ ওড়িশার কটকে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম সুধীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় এবং মায়ের নাম বিমলা চট্টোপাধ্যায়। প্রথাগত শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে তিনি বিশ্বভ্রমণ করেছেন, সাংবাদিকতা করেছেন দেশি-বিদেশি বিভিন্ন নামী সংবাদ সংস্থায়। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে যখন বাংলা আধুনিক গান একটি স্থবিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ১৯৯২ সালে ‘তোমাকে চাই’ অ্যালবামের মাধ্যমে তিনি বাংলা গানে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসেন। তিনি একাধারে গায়ক, গীতিকার, সুরকার এবং অসামান্য এক যন্ত্রী। কবীর সুমনের গান মানেই মধ্যবিত্তের না বলা কথা, ফুটপাতের ধুলোবালি কিংবা আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল চালচিত্র। তাঁর গান আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে ব্যক্তিগত প্রেমের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে সমষ্টির লড়াই। তাঁর কালজয়ী সৃষ্টিসমূহ আজও আমাদের প্রতিদিনের সঙ্গী: “তোমাকে চাই, তোমাকে চাই” “হাল ছেড়ো না বন্ধু বরং কণ্ঠ ছাড়ো জোরে” “পেটকাটি চাঁদিয়াল মোমবাতি বগগা” প্রিয় সুধী, কবীর সুমনের সাথে বাংলাদেশের নাড়ির সম্পর্ক অনস্বীকার্য। এদেশের মানুষের মুক্তি সংগ্রাম, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা সাধারণ মানুষের আবেগ—সব কিছুতেই তাঁর গান ও সংহতি সবসময় ছিল অটল। তিনি কেবল একজন শিল্পী নন, তিনি একজন চিন্তক এবং মানবাধিকার কর্মীও বটে। তাঁর জীবন আমাদের শিখিয়েছে আদর্শের প্রতি অবিচল থেকে কীভাবে বারবার নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করা যায়। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার এই শিল্পীর নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই অকুতোভয় শিল্পীর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের শেকড় এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়কে আজীবন ধারণ করতে পারি। কবীর সুমন তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে এবং বাংলা গানের ভুবনে চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

৭ই মার্চ: “স্বাধীনতার কবিতা দিবস” উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা

৭ই মার্চ ‘স্বাধীনতার কবিতা দিবস’ উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। ৭ই মার্চ: স্বাধীনতার কবিতা দিবস উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের রক্তিম শুভেচ্ছা ও বিনম্র শ্রদ্ধা। আজ এক ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণ। আজ থেকে ৩৯ বছর আগে ১৯৭১ সালের এই দিনে রেসকোর্স ময়দানের জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে এক অবিনাশী মহাকাব্য পাঠ করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেই কালজয়ী ভাষণকে স্মরণ করে এবং এর শৈল্পিক ও রাজনৈতিক গুরুত্বকে হৃদয়ে ধারণ করে গুরুকুল আজ পালন করছে ‘স্বাধীনতার কবিতা দিবস’। উপস্থিত সুধী, ২০১০ সালে দাঁড়িয়ে যখন আমরা পেছনের দিকে তাকাই, তখন দেখি ৭ই মার্চের ভাষণ কেবল একটি রাজনৈতিক দিক-নির্দেশনা ছিল না, এটি ছিল একটি জাতির কয়েক হাজার বছরের বঞ্চনার অবসান আর মুক্তির আকাঙ্ক্ষার এক শ্রেষ্ঠ কাব্য। ১৮ মিনিটের সেই ভাষণে কোনো লিখিত পাণ্ডুলিপি ছিল না, ছিল হৃদয়ের গভীর থেকে আসা স্বতঃস্ফূর্ত শব্দমালা। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম নিউজউইক পত্রিকা বঙ্গবন্ধুকে যথাযথভাবেই আখ্যা দিয়েছিল ‘রাজনীতির কবি’ (Poet of Politics) হিসেবে। বঙ্গবন্ধু যখন তাঁর বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন— “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”, তখন সেটি কেবল একটি ঘোষণা ছিল না, বরং বাঙালির হৃদয়ে স্বাধীনতার অগ্নিস্ফুলিঙ্গ জ্বেলে দেওয়া এক চূড়ান্ত পঙক্তি হয়ে উঠেছিল। এই ভাষণের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বিরতি এবং এর ছন্দময় ভঙ্গি আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে একটি নিরস্ত্র জাতিকে শব্দ ও সাহসের শক্তিতে সশস্ত্র করে তোলা যায়। আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এই শ্রেষ্ঠ দলিলটি আজও আমাদের প্রতিটি সংকটে প্রেরণা জোগায়। প্রিয় সুধী, যেকোনো জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জনগুলো তার সংস্কৃতির সর্বোচ্চ শিখর থেকে জন্ম নেয়। বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণ আমাদের ইতিহাসের এমন এক সাংস্কৃতিক সম্পদ, যা আমাদের জাতীয় পরিচয়কে সংজ্ঞায়িত করে। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এই দিবসের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন— “বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ কেবল রাজনীতির কৌশল নয়, এটি বাঙালির অস্তিত্বের শ্রেষ্ঠ কবিতা। একজন মানুষ যখন তাঁর নিজের সেই মৌলিক সংস্কৃতি ও ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সময়গুলোকে হৃদয়ে ধারণ করে এবং তা চর্চার মাধ্যমে নিজের জীবনকে গড়ে তোলে, তখনই সে এক পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। আমরা যদি আমাদের এই স্বাধীনতার মহাকাব্যকে ভুলে যাই, তবে আমাদের জাতিসত্তা দুর্বল হয়ে পড়বে। তাই আমরা বাঙালির এই স্বাধীনতার অমর কবিতাটির চর্চা এবং এর চেতনাকে প্রতিনিয়ত আমাদের জাতীয় জীবনে জীবন্ত রাখতে কাজ করতে চাই।” সেই দর্শনে দীক্ষিত হয়েই আমরা আজ এই ‘স্বাধীনতার কবিতা দিবস’ পালন করছি। আমরা বিশ্বাস করি, বঙ্গবন্ধুর সেই অমোঘ বজ্রবাণী আমাদের প্রজন্মের পর প্রজন্মের জন্য ধ্রুবতারার মতো পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে। ২০১০ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা নতুন করে শপথ নিই একটি সমৃদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে আমাদের জাতির পিতাকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি এবং তাঁর আত্মার শান্তি কামনায় সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন ৭ই মার্চের সেই স্বাধীনতার কবিতার প্রতিটি শব্দকে আমাদের কর্মে ও চেতনায় আজীবন বহন করতে পারি। বঙ্গবন্ধুর সেই অমর পঙক্তি চিরকাল বাংলার আকাশে-বাতাসে প্রতিধ্বনিত হোক। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় বঙ্গবন্ধু! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা