গুরুকুল ক্যাম্পাস লার্নিং নেটওয়ার্ক, GCLN

উইলিয়াম শেক্সপিয়র দিবস উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা । ২৩ এপ্রিল

উইলিয়াম শেক্সপিয়র

উইলিয়াম শেক্সপিয়র দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। উইলিয়াম শেক্সপিয়র দিবস উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ আমরা এমন এক ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যাঁকে বলা হয় বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম নাট্যকার এবং ইংরেজি ভাষার সর্বকালের সেরা কবি। তিনি মানব হৃদয়ের গভীরতম আবেগ, দ্বন্দ ও ভালোবাসাকে শব্দের তুলিতে জীবন্ত করেছেন। তিনি আমাদের চিরকালিন অনুপ্রেরণা—উইলিয়াম শেক্সপিয়র। উপস্থিত সুধী, উইলিয়াম শেক্সপিয়রের জীবন অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক। ধারণা করা হয়, ১৫৬৪ সালের ২৩ এপ্রিল ইংল্যান্ডের স্ট্র্যাটফোর্ড-আপন-অ্যাভন (Stratford-upon-Avon) শহরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। আশ্চর্যজনকভাবে ১৬১৬ সালের ঠিক একই তারিখে অর্থাৎ ২৩ এপ্রিলেই তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। এ কারণেই বিশ্বজুড়ে আজকের এই দিনটিকে ‘শেক্সপিয়র দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। কর্মজীবনে তিনি ছিলেন একাধারে অভিনেতা, নাট্যকার এবং নাট্যশালার অংশীদার। শেক্সপিয়রের সাহিত্যকর্ম বাংলা তথা বিশ্বসাহিত্যের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। তিনি ৩৭টি নাটক এবং ১৫৪টি সনেট রচনা করেছেন। তাঁর সৃষ্টিতে ফুটে উঠেছে মানুষের জীবনের জটিল দর্শন—কখনও তা বিষাদময় ট্র্যাজেডি, কখনও বা নির্মল কমেডি। আধুনিক নাট্যকলার এমন কোনো শাখা নেই যেখানে শেক্সপিয়রের ছোঁয়া লাগেনি। তাঁর সেই কালজয়ী সৃষ্টিসমূহ আজও মঞ্চে এবং মানুষের মুখে মুখে ফেরে: “হ্যামলেট” (Hamlet) – এর সেই বিখ্যাত উক্তি: “To be, or not to be, that is the question.” “রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট” (Romeo and Juliet) – চিরন্তন প্রেমের এক মহাকাব্য। “ম্যাকবেথ” (Macbeth) এবং “ওথেলো” (Othello) – যেখানে উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও ঈর্ষার চরম পরিণতি ফুটে উঠেছে। মজার ব্যাপার হলো, আমরা প্রতিদিন অজান্তেই ইংরেজি ভাষার অসংখ্য শব্দ ও বাগধারা ব্যবহার করি যা শেক্সপিয়রের সৃষ্টি। আধুনিক ইংরেজি ভাষার ভাণ্ডারকে তিনি যে উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, তা অতুলনীয়। প্রিয় সুধী, উইলিয়াম শেক্সপিয়রের প্রভাব কেবল ইংল্যান্ডে সীমাবদ্ধ থাকেনি। আমাদের ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর—সবাই তাঁর সৃষ্টির দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন যে ‘পুরো বিশ্বটাই একটা মঞ্চ’ (All the world’s a stage), যেখানে আমরা সবাই কেবল কুশীলব। তাঁর প্রতিটি নাটক যেন মানুষের চরিত্রের একেকটি দর্পণ। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার এই মহামতি নাট্যকারের নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর আত্মার শান্তি কামনায় সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই মহান শিল্পীর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে মানুষের জীবন ও মনস্তত্ত্বকে আরও গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করি। উইলিয়াম শেক্সপিয়র তাঁর অবিনশ্বর সৃষ্টি ও পঙক্তিগুলোর মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা । ১৫ এপ্রিল

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ আমরা এমন এক ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যাকে মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম ‘পলিম্যাথ’ বা বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী বলা হয়। তিনি একাধারে চিত্রশিল্পী, স্থপতি, গণিতবিদ, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী এবং উদ্ভাবক। রেনেসাঁ যুগের সেই অমর কারিগর—লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি। উপস্থিত সুধী, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি ১৪৫২ সালের ১৫ এপ্রিল ইতালির ফ্লোরেন্সের তুস্কানি অঞ্চলের ‘ভিঞ্চি’ নামক এক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কর্মবৈচিত্র্যের দিক দিয়ে তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের চেয়ে কয়েকশ বছর এগিয়ে থাকা এক সব্যসাচী মেধা। লিওনার্দোর প্রতিভা কেবল ক্যানভাসের রঙে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি মানুষের শরীরের ব্যবচ্ছেদ থেকে শুরু করে পাখির ওড়া পর্যবেক্ষণ করে উড়োজাহাজের নকশা পর্যন্ত করেছিলেন। তাঁর সেই বিখ্যাত নোটবুক বা ‘কোডেক্স’গুলো আজও বিজ্ঞানীদের বিস্ময়ের খোরাক। অনেকে মনে করেন লিওনার্দো কেবল একজন শিল্পী, কিন্তু তাঁর বিজ্ঞানমনস্কতা ছিল অতুলনীয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিল্পের ভিত্তি হলো গভীর পর্যবেক্ষণ এবং নিখুঁত জ্যামিতিক হিসাব। তাঁর কালজয়ী সৃষ্টিসমূহ আজও বিশ্ব ঐতিহ্যের অমূল্য সম্পদ: মোনালিসা: যার রহস্যময় হাসি আজও সারা বিশ্বকে আচ্ছন্ন করে রাখে। দ্য লাস্ট সাপার: যা চিত্রকলার ইতিহাসে এক অনন্য সংযোজন। ভিট্রুভিয়ান ম্যান: যেখানে তিনি মানুষের শরীরের অনুপাত ও জ্যামিতিক সামঞ্জস্য তুলে ধরেছেন। মজার ব্যাপার হলো, লিওনার্দোর আঁকা চিত্রকর্মের সংখ্যা খুব বেশি নয়, কিন্তু প্রতিটি সৃষ্টিই পূর্ণতা এবং গবেষণার এক একটি মাইলফলক। তাঁর ‘স্ফুমাতো’ (Sfumato) কৌশল চিত্রকলার জগতকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছিল। প্রিয় সুধী, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি কেবল একজন শিল্পী বা বিজ্ঞানী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন বড় মনের মানুষ এবং প্রকৃতির একনিষ্ঠ উপাসক। তিনি পরাধীন বা সীমাবদ্ধ চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে মহাবিশ্বের গূঢ় রহস্য উন্মোচনে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। জমিদারি বা রাজকীয় বিলাসিতা তাঁকে কখনোই তাঁর জ্ঞানতৃষ্ণা থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার এই বিশ্ববিশ্রুত মনীষীর নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন লিওনার্দোর সেই অদম্য কৌতূহল এবং সৃজনশীলতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের মেধা ও মননকে বিকশিত করতে পারি। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি তাঁর অবিনশ্বর কর্মের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর বুকে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

৬ এপ্রিল আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবস: শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে খেলার শক্তি

৬ এপ্রিল আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবস

মানবসভ্যতার ইতিহাসে ক্রীড়া বা খেলাধুলা কেবল শরীরচর্চার মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং আনন্দ, ঐক্য এবং শৃঙ্খলার প্রতীক হিসেবে সমাদৃত হয়ে আসছে। আধুনিক বিশ্বে খেলাধুলা এখন আর কেবল মাঠের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই; এটি হয়ে উঠেছে কূটনীতি, শান্তি স্থাপন এবং টেকসই উন্নয়নের এক শক্তিশালী হাতিয়ার। এই গুরুত্বকে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি দিতে প্রতি বছর ৬ এপ্রিল পালিত হয় ‘আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবস’ (International Day of Sport for Development and Peace)। জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত এই দিবসটি বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, একটি বল বা একটি দৌড় প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়েও পৃথিবীতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। ৬ এপ্রিল আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবস দিবসটির পটভূমি ও ইতিহাস আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবস পালনের প্রস্তাবটি প্রথম জোরালোভাবে আসে ২০১৩ সালে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দীর্ঘ আলোচনার পর ২৩ আগস্ট ২০১৩ তারিখে একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি বছর ৬ এপ্রিলকে উন্নয়ন ও শান্তির জন্য আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ৬ এপ্রিল তারিখটি নির্বাচনের পেছনে একটি বিশেষ ঐতিহাসিক তাৎপর্য রয়েছে। ১৮৯৬ সালের এই দিনেই গ্রিসের এথেন্সে আধুনিক অলিম্পিক গেমসের প্রথম আসরের শুভ সূচনা হয়েছিল। প্রাচীন অলিম্পিকের চেতনাকে পুনরুজ্জীবিত করে বিশ্বকে এক সুতোয় বাঁধার যে স্বপ্ন ব্যারন পিয়েরে ডি কুবার্টিন দেখেছিলেন, সেই চেতনাকেই শ্রদ্ধা জানাতে এই তারিখটি বেছে নেওয়া হয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে এই দিবসটি অত্যন্ত মর্যাদার সাথে পালিত হয়ে আসছে। দিবসের মূল লক্ষ্য ও তাৎপর্য আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবসের মূল লক্ষ্য হলো সমাজে শান্তি স্থাপন এবং টেকসই উন্নয়নে ক্রীড়ার ভূমিকাকে উদযাপন করা। এর তাৎপর্য বহুমুখী: ১. শান্তি ও সংহতি স্থাপন: খেলাধুলা কোনো সীমানা মানে না। ভাষা, বর্ণ বা ধর্মের ভিন্নতা থাকলেও খেলার মাঠে সবাই এক কাতারে দাঁড়ায়। এটি জাতিগত সংঘাত নিরসনে এবং দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব বৃদ্ধিতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। ২. টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জন: জাতিসংঘ নির্ধারিত ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে খেলাধুলা একটি কার্যকরী মাধ্যম। শিক্ষা নিশ্চিত করা থেকে শুরু করে জেন্ডার সমতা এবং সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ক্রীড়া কার্যক্রম বিশাল অবদান রাখছে। ৩. উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের প্রচার: ক্রীড়াকে ব্যবহার করে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে মূল স্রোতধারায় ফিরিয়ে আনা, তাদের অধিকার রক্ষা এবং সামাজিক নেতৃত্ব তৈরির লক্ষ্যে এই দিবসটি সচেতনতা বৃদ্ধি করে। উন্নয়নে ক্রীড়ার ভূমিকা উন্নয়ন বলতে কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বোঝায় না, বরং মানুষের জীবনমানের উন্নয়নকেও বোঝায়। এই যাত্রায় ক্রীড়া বিভিন্নভাবে সহায়তা করে: সুস্বাস্থ্য ও সুস্থ বিনোদন: আধুনিক যুগে কায়িক শ্রম কমে যাওয়ায় অসংক্রামক ব্যাধির প্রকোপ বাড়ছে। নিয়মিত খেলাধুলা হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও স্থূলতা রোধে সাহায্য করে। স্বাস্থ্যবান জাতিই উন্নত দেশ গড়তে পারে। শিক্ষার প্রসার: খেলাধুলা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধৈর্য, একাগ্রতা এবং দলগত কাজের (Teamwork) স্পৃহা তৈরি করে। অনেক দেশে খেলাধুলার মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের স্কুলে ফিরিয়ে আনার প্রকল্প সফল হয়েছে। জেন্ডার সমতা: মাঠের লড়াই এখন আর কেবল পুরুষদের নয়। নারীদের ক্রীড়াঙ্গনে অংশগ্রহণ তাদের ক্ষমতায়নের পথ সুগম করছে এবং সামাজিক সংস্কার ভাঙতে সাহায্য করছে। শান্তি স্থাপনে ক্রীড়া ও অলিম্পিক চেতনা ক্রীড়া কূটনীতি বা ‘স্পোর্টস ডিপ্লোম্যাসি’ বিশ্বশান্তিতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। যুদ্ধের ময়দানে যেখানে সংলাপ ব্যর্থ হয়, সেখানে অনেক সময় খেলার মাঠ বরফ গলাতে সাহায্য করে। উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যকার অলিম্পিক কূটনীতি এর একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। ক্রীড়া আমাদের শেখায় হার-জিত যাই হোক না কেন, প্রতিদ্বন্দ্বীকে সম্মান করতে হবে। এই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধই বিশ্বশান্তির মূল ভিত্তি। অলিম্পিক ট্রুস (Olympic Truce) বা অলিম্পিক যুদ্ধবিরতির যে প্রাচীন ঐতিহ্য রয়েছে, তা আজও আধুনিক ক্রীড়া দিবসের মাধ্যমে বিশ্বে শান্তির বাণী প্রচার করে। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবস ক্রীড়াপ্রেমী দেশ হিসেবে বাংলাদেশে এই দিবসটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালন করা হয়। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রতি বছর রেলি, আলোচনা সভা এবং বিভিন্ন প্রদর্শনীমূলক খেলার আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশে ৬ এপ্রিল একই সাথে ‘জাতীয় ক্রীড়া দিবস’ হিসেবেও পালিত হয়। আমাদের জাতীয় জীবনে খেলাধুলা কেবল বিনোদন নয়, বরং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল’ ক্রীড়াকে যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে বিশ্ব জনমত গঠন করেছিল। বর্তমান সময়েও ক্রিকেট, ফুটবল বা আর্চারির বৈশ্বিক সাফল্য বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করছে। এই দিবসটি পালনের মাধ্যমে আমাদের দেশীয় খেলাধুলা পুনরুজ্জীবিত করা এবং তরুণ প্রজন্মকে মাদক ও অপরাধ থেকে দূরে রাখার শপথ নেওয়া হয়। চ্যালেঞ্জ ও আগামীর সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবস পালনের মাধ্যমে সাফল্য অর্জিত হলেও কিছু চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। অনেক দেশে পর্যাপ্ত ক্রীড়া অবকাঠামোর অভাব রয়েছে। বিশেষ করে অনুন্নত দেশের গ্রামীণ অঞ্চলে প্রতিভাবান খেলোয়াড়রা সুযোগের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া ক্রীড়াঙ্গনে দুর্নীতি, ডোপিং বা বর্ণবাদের মতো নেতিবাচক বিষয়গুলোও একটি বড় বাধা। তবে আগামীর সম্ভাবনা অনেক। প্রযুক্তির সাথে ক্রীড়ার সমন্বয় এবং প্যারা-অলিম্পিকের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়ন মূলধারায় যুক্ত করা হচ্ছে। আধুনিক বিশ্বে ‘ই-স্পোর্টস’ বা ডিজিটাল ক্রীড়াও নতুন প্রজন্মের কাছে শান্তির বার্তা পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম হয়ে উঠছে। জাতিসংঘ মনে করে, সরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি বেসরকারি খাত এবং সিভিল সোসাইটি যদি ক্রীড়া উন্নয়নে এগিয়ে আসে, তবে ২০৩০ সালের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অনেক সহজ হবে। পরিশেষে বলা যায়, আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবস কেবল একটি তারিখ নয়, এটি একটি বৈশ্বিক অঙ্গীকার। খেলাধুলা হলো মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি প্রকাশের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। এটি আমাদের ধৈর্যশীল হতে শেখায়, প্রতিকূলতাকে জয় করতে শেখায় এবং সর্বোপরি মানুষকে ভালোবাসতে শিখায়। ঘৃণা ও বিভক্তির এই পৃথিবীতে একটি ফুটবল বা একটি ক্রিকেট ব্যাট যখন কোটি মানুষকে এক স্বরে ‘উল্লাস’ করতে শেখায়, তখনই ক্রীড়ার প্রকৃত জয় হয়। উন্নয়নের প্রতিটি ধাপে এবং শান্তির প্রতিটি পদক্ষেপে যদি আমরা ক্রীড়াকে সাথী করে নিতে পারি, তবেই একটি সমৃদ্ধ এবং সংঘাতমুক্ত পৃথিবী গড়া সম্ভব হবে। তাই ৬ এপ্রিল হোক সেই দিন, যেদিন আমরা খেলার মাধ্যমে সম্প্রীতির এক নতুন পৃথিবী গড়ার শপথ নেব। আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

কবীর সুমন-এর জন্মদিন উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা । ১৬ মার্চ

কবীর সুমন

কবীর সুমন-এর জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। কবীর সুমন-এর জন্মদিন উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ আমরা এমন এক বিস্ময়কর প্রতিভার জন্মদিন উদযাপন করছি, যিনি আধুনিক বাংলা গানের ব্যাকরণ বদলে দিয়েছেন। যিনি নাগরিক জীবনের ক্লান্তি, প্রেম আর দ্রোহকে গিটারের তারে আর পিয়ানোর রিডে এক নতুন ভাষা দিয়েছেন। তিনি আমাদের প্রিয় গানওয়ালা—কবীর সুমন। উপস্থিত সুধী, কবীর সুমন ১৯৪৯ সালের ১৬ মার্চ ওড়িশার কটকে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম সুধীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় এবং মায়ের নাম বিমলা চট্টোপাধ্যায়। প্রথাগত শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে তিনি বিশ্বভ্রমণ করেছেন, সাংবাদিকতা করেছেন দেশি-বিদেশি বিভিন্ন নামী সংবাদ সংস্থায়। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে যখন বাংলা আধুনিক গান একটি স্থবিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ১৯৯২ সালে ‘তোমাকে চাই’ অ্যালবামের মাধ্যমে তিনি বাংলা গানে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসেন। তিনি একাধারে গায়ক, গীতিকার, সুরকার এবং অসামান্য এক যন্ত্রী। কবীর সুমনের গান মানেই মধ্যবিত্তের না বলা কথা, ফুটপাতের ধুলোবালি কিংবা আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল চালচিত্র। তাঁর গান আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে ব্যক্তিগত প্রেমের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে সমষ্টির লড়াই। তাঁর কালজয়ী সৃষ্টিসমূহ আজও আমাদের প্রতিদিনের সঙ্গী: “তোমাকে চাই, তোমাকে চাই” “হাল ছেড়ো না বন্ধু বরং কণ্ঠ ছাড়ো জোরে” “পেটকাটি চাঁদিয়াল মোমবাতি বগগা” প্রিয় সুধী, কবীর সুমনের সাথে বাংলাদেশের নাড়ির সম্পর্ক অনস্বীকার্য। এদেশের মানুষের মুক্তি সংগ্রাম, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা সাধারণ মানুষের আবেগ—সব কিছুতেই তাঁর গান ও সংহতি সবসময় ছিল অটল। তিনি কেবল একজন শিল্পী নন, তিনি একজন চিন্তক এবং মানবাধিকার কর্মীও বটে। তাঁর জীবন আমাদের শিখিয়েছে আদর্শের প্রতি অবিচল থেকে কীভাবে বারবার নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করা যায়। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার এই শিল্পীর নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই অকুতোভয় শিল্পীর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের শেকড় এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়কে আজীবন ধারণ করতে পারি। কবীর সুমন তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে এবং বাংলা গানের ভুবনে চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

৭ই মার্চ: “স্বাধীনতার কবিতা দিবস” উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা

৭ই মার্চ ‘স্বাধীনতার কবিতা দিবস’ উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। ৭ই মার্চ: স্বাধীনতার কবিতা দিবস উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের রক্তিম শুভেচ্ছা ও বিনম্র শ্রদ্ধা। আজ এক ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণ। আজ থেকে ৩৯ বছর আগে ১৯৭১ সালের এই দিনে রেসকোর্স ময়দানের জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে এক অবিনাশী মহাকাব্য পাঠ করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেই কালজয়ী ভাষণকে স্মরণ করে এবং এর শৈল্পিক ও রাজনৈতিক গুরুত্বকে হৃদয়ে ধারণ করে গুরুকুল আজ পালন করছে ‘স্বাধীনতার কবিতা দিবস’। উপস্থিত সুধী, ২০১০ সালে দাঁড়িয়ে যখন আমরা পেছনের দিকে তাকাই, তখন দেখি ৭ই মার্চের ভাষণ কেবল একটি রাজনৈতিক দিক-নির্দেশনা ছিল না, এটি ছিল একটি জাতির কয়েক হাজার বছরের বঞ্চনার অবসান আর মুক্তির আকাঙ্ক্ষার এক শ্রেষ্ঠ কাব্য। ১৮ মিনিটের সেই ভাষণে কোনো লিখিত পাণ্ডুলিপি ছিল না, ছিল হৃদয়ের গভীর থেকে আসা স্বতঃস্ফূর্ত শব্দমালা। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম নিউজউইক পত্রিকা বঙ্গবন্ধুকে যথাযথভাবেই আখ্যা দিয়েছিল ‘রাজনীতির কবি’ (Poet of Politics) হিসেবে। বঙ্গবন্ধু যখন তাঁর বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন— “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”, তখন সেটি কেবল একটি ঘোষণা ছিল না, বরং বাঙালির হৃদয়ে স্বাধীনতার অগ্নিস্ফুলিঙ্গ জ্বেলে দেওয়া এক চূড়ান্ত পঙক্তি হয়ে উঠেছিল। এই ভাষণের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বিরতি এবং এর ছন্দময় ভঙ্গি আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে একটি নিরস্ত্র জাতিকে শব্দ ও সাহসের শক্তিতে সশস্ত্র করে তোলা যায়। আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এই শ্রেষ্ঠ দলিলটি আজও আমাদের প্রতিটি সংকটে প্রেরণা জোগায়। প্রিয় সুধী, যেকোনো জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জনগুলো তার সংস্কৃতির সর্বোচ্চ শিখর থেকে জন্ম নেয়। বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণ আমাদের ইতিহাসের এমন এক সাংস্কৃতিক সম্পদ, যা আমাদের জাতীয় পরিচয়কে সংজ্ঞায়িত করে। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এই দিবসের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন— “বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ কেবল রাজনীতির কৌশল নয়, এটি বাঙালির অস্তিত্বের শ্রেষ্ঠ কবিতা। একজন মানুষ যখন তাঁর নিজের সেই মৌলিক সংস্কৃতি ও ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সময়গুলোকে হৃদয়ে ধারণ করে এবং তা চর্চার মাধ্যমে নিজের জীবনকে গড়ে তোলে, তখনই সে এক পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। আমরা যদি আমাদের এই স্বাধীনতার মহাকাব্যকে ভুলে যাই, তবে আমাদের জাতিসত্তা দুর্বল হয়ে পড়বে। তাই আমরা বাঙালির এই স্বাধীনতার অমর কবিতাটির চর্চা এবং এর চেতনাকে প্রতিনিয়ত আমাদের জাতীয় জীবনে জীবন্ত রাখতে কাজ করতে চাই।” সেই দর্শনে দীক্ষিত হয়েই আমরা আজ এই ‘স্বাধীনতার কবিতা দিবস’ পালন করছি। আমরা বিশ্বাস করি, বঙ্গবন্ধুর সেই অমোঘ বজ্রবাণী আমাদের প্রজন্মের পর প্রজন্মের জন্য ধ্রুবতারার মতো পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে। ২০১০ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা নতুন করে শপথ নিই একটি সমৃদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে আমাদের জাতির পিতাকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি এবং তাঁর আত্মার শান্তি কামনায় সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন ৭ই মার্চের সেই স্বাধীনতার কবিতার প্রতিটি শব্দকে আমাদের কর্মে ও চেতনায় আজীবন বহন করতে পারি। বঙ্গবন্ধুর সেই অমর পঙক্তি চিরকাল বাংলার আকাশে-বাতাসে প্রতিধ্বনিত হোক। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় বঙ্গবন্ধু! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

মহাকবি কায়কোবাদ-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা । ২৫ ফেব্রুয়ারি

মহাকবি কায়কোবাদ-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। মহাকবি কায়কোবাদ-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ আমরা এমন এক মহীরুহের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মুসলিম কবিদের মধ্যে প্রথম মহাকাব্য রচনার গৌরব অর্জন করেছিলেন। তিনি আমাদের সাহিত্যের ‘মহাকবি’—কায়কোবাদ। উপস্থিত সুধী, মহাকবি কায়কোবাদ ১৮৫৭ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার আগলা পূর্বপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম কাজেম আল কোরেশী। মহাকবি কায়কোবাদ ছিলেন একাধারে কবি এবং একজন নিষ্ঠাবান ডাকঘর কর্মকর্তা। কর্মজীবনের ব্যস্ততার মাঝেও তিনি যেভাবে মহাকাব্য ও কাব্যগ্রন্থের বিশাল ভাণ্ডার রেখে গেছেন, তা তাঁর একাগ্রতা ও দেশপ্রেমেরই বহিঃপ্রকাশ। পারিবারিক আভিজাত্য বা সামাজিক প্রতিষ্ঠার চেয়েও বড় ছিল তাঁর সাহিত্যিক সাধনা। তিনি ছিলেন এমন একজন শিল্পী যিনি মধ্যযুগীয় কাব্যধারার সাথে আধুনিক কাব্যরীতির মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের ঐতিহাসিক পটভূমিতে রচিত তাঁর কালজয়ী মহাকাব্য ‘মহাশ্মশান’ বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সম্পদ। এছাড়াও ‘অশ্রুমালা’, ‘শিব-মন্দির’ এবং ‘অমিয় ধারা’র মতো কাব্যগ্রন্থগুলো তাঁর কবিত্ব শক্তির পরিচয় দেয়। কায়কোবাদের সাহিত্যকর্মের এক প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল হিন্দু-মুসলিম মিলনের সুর এবং গভীর দেশপ্রেম। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি জাতির উন্নতির জন্য ধর্মীয় সম্প্রীতি ও ইতিহাস সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। তাঁর অমর পঙক্তি আজও আমাদের জাতীয় জীবনে প্রাসঙ্গিক: “পাখিরা সব কলরব করিছে আকাশে/ প্রকৃতি সাজিয়া আজ নবীন বেশে” (গাওরে গাওরে আজি এ আনন্দ গান) মজার ব্যাপার হলো, যে সময় মহাকাব্য রচনার ধারাটি প্রায় স্তিমিত হয়ে আসছিল, সেই সময়ে তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে ‘মহাশ্মশান’ রচনা করে বাংলা সাহিত্যে নিজের স্থান স্থায়ী করে নেন। ১৯৩২ সালে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সম্মেলনের মূল অধিবেশনে তাঁকে ‘মহাকবি’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। প্রিয় সুধী, কায়কোবাদ কেবল একজন কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন নিভৃতচারী সাধক। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে নিজের সংস্কৃতির শিকড়কে আঁকড়ে ধরে বিশ্বসাহিত্যের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার কবির নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই মহাকবির জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের শেকড়কে ভুলে না যাই এবং স্বদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকি। মহাকবি কায়কোবাদ তাঁর অবিনশ্বর কর্মের মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

বিশ্ব স্কাউট দিবস ও মানবিক সমাজ গঠনে আমাদের ভূমিকা বিষয়ে বক্তৃতা

রোভার স্কাউটিং এর শতবর্ষ উদযাপন ও র‍্যালি-Centennial Celebrations and Rally of Rover Scouting

২২ ফেব্রুয়ারি ‘বিশ্ব স্কাউট দিবস’ (বিপি দিবস) উপলক্ষে একজন শিক্ষার্থীর দীর্ঘ ও অনুপ্রেরণামূলক বক্তৃতা সবার জন্য আপলোড করে রাখা হলো। বক্তৃতা: বিশ্ব স্কাউট দিবস ও মানবিক সমাজ গঠনে আমাদের ভূমিকা   সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ ২২ ফেব্রুয়ারি। বিশ্ব ইতিহাসের এক অনন্য দিন। আজ আমরা এখানে সমবেত হয়েছি বিশ্ব স্কাউট আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা লর্ড ব্যাডেন পাওয়েল এবং তাঁর সহধর্মিণী লেডি ব্যাডেন পাওয়েল—যাঁদের যুগপৎ জন্মদিনে পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব স্কাউট দিবস’ বা ‘বিপি দিবস’। আজকের এই শুভক্ষণে আমি গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি তাঁদের, যাঁদের হাত ধরে বিশ্বব্যাপী গড়ে উঠেছে কোটি কোটি তরুণের এক সেবামূলক পরিবার। সুধীজন, স্কাউটিং কেবল নির্দিষ্ট কোনো পোশাক বা নিছক কিছু কুচকাওয়াজ নয়; এটি একটি চিরন্তন জীবনদর্শন। ১৯০৭ সালে লর্ড ব্যাডেন পাওয়েল যখন এই আন্দোলনের সূচনা করেন, তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল তরুণদের চরিত্রে সততা, নিষ্ঠা, আত্মনির্ভরশীলতা এবং পরোপকারের গুণাবলি বপন করা। আজ আমরা  গুরুকুলের এই অডিটোরিয়ামে দাঁড়িয়ে আমরা যখন এই দিবসটি উদযাপন করছি, তখন আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে, স্কাউটিং-এর মূলমন্ত্র ‘সদা প্রস্তুত’ থাকা আমাদের জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে কতটা জরুরি। প্রিয় উপস্থিতি, স্কাউটিং আমাদের শেখায় বিভেদ ভুলে একতাবদ্ধ হতে। এখানে জাত-পাত, ধর্ম বা বর্ণের কোনো দেয়াল নেই। একজন স্কাউটের কাছে সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো সে একজন মানুষ এবং তার প্রধান ধর্ম হলো আর্তমানবতার সেবা করা। ব্যাডেন পাওয়েল তাঁর বিদায়ী বাণীতে বলেছিলেন, “পৃথিবীকে যেমন পেয়েছ, তার চেয়ে একটু ভালো অবস্থায় রেখে যাওয়ার চেষ্টা করো।” এই একটি বাক্যই আমাদের জীবনের সার্থকতা বুঝিয়ে দেয়। আজ পরিবেশ রক্ষা, দুর্যোগ মোকাবিলা কিংবা সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে স্কাউটরা যেভাবে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে, তা আমাদের আগামীর বাসযোগ্য পৃথিবীর স্বপ্ন দেখায়। গুরুকুল ও স্কাউটিং-এর মেলবন্ধন: আমরা সৌভাগ্যবান যে গুরুকুল ক্যাম্পাস লার্নিং নেটওয়ার্কের মতো একটি প্ল্যাটফর্মের সাথে যুক্ত আছি। গুরুকুল যেমন আমাদের আধুনিক ও কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ করে তুলছে, তেমনি স্কাউটিং আমাদের নৈতিকতা ও শৃঙ্খলার পাঠ দিচ্ছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, কেবল পুঁথিগত বিদ্যা অর্জন করলেই জীবন সফল হয় না; বরং অন্যের বিপদে এগিয়ে আসা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নেতৃত্বের গুণাবলি প্রদর্শন করাই হলো প্রকৃত শিক্ষা। প্রিয় সহপাঠী ও স্কাউট ভাই-বোনেরা, বর্তমান পৃথিবী নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন থেকে শুরু করে সামাজিক অস্থিরতা—সবখানেই আমাদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন। একজন স্কাউট হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো সমাজে সহনশীলতা আর সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া। আমাদের প্রতিটি কাজ যেন হয় মানুষের কল্যাণে। ক্যাম্পফায়ারের যে আগুন আমাদের সংহতির প্রতীক, সেই আগুনের শিখা যেন আমাদের হৃদয়ে দেশপ্রেম আর সেবার আলো হিসেবে প্রজ্বলিত থাকে। প্রিয় উপস্থিতি, পরিশেষে, লর্ড ব্যাডেন পাওয়েল-এর একটি আদর্শ দিয়ে শেষ করতে চাই— “মানুষের প্রকৃত সুখ অন্যকে সুখে রাখার প্রচেষ্টার মাঝেই নিহিত।” আসুন আজকের এই বিপি দিবসে আমরা নতুন করে শপথ নিই যে, আমরা মাদককে না বলব, মানবিকতাকে হ্যাঁ বলব এবং একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনে গুরুকুলের আলোকবর্তিকা হয়ে কাজ করব। ধন্যবাদ জানাই গুরুকুল কর্তৃপক্ষকে আজকের এই আয়োজন এবং আমাকে বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়ার জন্য। সবাই ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন। জয় বাংলা. জয় স্কাউট, জয় গুরুকুল। আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

২১ ফেব্রুয়ারি: শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে বক্তৃতা

২১ ফেব্রুয়ারি: শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। ২১ ফেব্রুয়ারি: শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ এক রক্তঝরা ও গর্বিত ইতিহাসের দিন। আজ অমর একুশে ফেব্রুয়ারি—আমাদের মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ১৯৫২ সালের এই দিনে বাংলার দামাল ছেলেরা বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষা করেছিলেন। তাঁদের সেই আত্মত্যাগের স্মরণে আজ বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। উপস্থিত সুধী, ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখি, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি (৮ই ফাল্গুন ১৩৫৮) তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকদের অন্যায় ও বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল এদেশের ছাত্র-জনতা। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে নেমে এসেছিলেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরসহ আরও অনেকে। পুলিশের গুলিতে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল লালে, আর সেই রক্তের বিনিময়েই আজ আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারছি। এটি কেবল ভাষার লড়াই ছিল না; এটি ছিল আমাদের জাতিসত্তা ও স্বাধীনতার প্রথম সোপান। একুশ আমাদের শিখিয়েছে অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করতে। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো এবং পরবর্তীতে জাতিসংঘ আমাদের এই আত্মত্যাগের দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। আজ সারা বিশ্বের মানুষ নিজেদের মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এই দিনটি পালন করে, যা বাঙালি হিসেবে আমাদের জন্য পরম গৌরবের। আমাদের জাতীয় জীবনের এই গৌরবময় দিনে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি সেইসব কালজয়ী গান ও স্লোগানকে, যা আজও আমাদের রক্তে শিহরণ জাগায়: “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি” “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই” “ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়” প্রিয় সুধী, ভাষা শহীদগণ তাঁদের জীবনের বিনিময়ে আমাদের একটি পরিচয় দিয়ে গেছেন। আমাদের দায়িত্ব হলো এই ভাষার শুদ্ধ চর্চা করা এবং সকল ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা। আমরা যেন আমাদের শেকড়কে ভুলে না যাই এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এই ত্যাগের মহিমা পৌঁছে দিই। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার আমাদের ভাষা শহীদদের নাম নিই, তাঁদের স্মরণ করি এবং তাঁদের আত্মার মাগফিরাত ও শান্তির জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন একুশের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজেদের দেশ ও মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করি। আমাদের মহান ভাষা শহীদগণ তাঁদের ত্যাগের মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে এবং বাংলা ভাষার প্রতিটি শব্দে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: [গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা]

কবি জীবনানন্দ দাশ-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা

কবি জীবনানন্দ দাশ

কবি জীবনানন্দ দাশ-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। কবি জীবনানন্দ দাশ-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ আমরা এমন এক ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি বাংলা কাব্যসাহিত্যের প্রচলিত ধারাকে বদলে দিয়ে আধুনিকতার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন। তিনি প্রকৃতির শুদ্ধতম কবি, রূপসী বাংলার রূপকার—আমাদের চিরচেনা কবি জীবনানন্দ দাশ। উপস্থিত সুধী, কবি জীবনানন্দ দাশ ১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশ) বরিশাল শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সত্যানন্দ দাশ ছিলেন একজন শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক এবং মাতা কুসুমকুমারী দাশ ছিলেন একজন সুপরিচিত কবি। শৈশব থেকেই এক গভীর সাহিত্যিক পরিবেশে তাঁর বেড়ে ওঠা। কর্মজীবনে তিনি অধ্যাপনার সাথে যুক্ত ছিলেন এবং ব্রজমোহন কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন। জীবনানন্দ দাশ কেবল একজন কবি ছিলেন না; তিনি ছিলেন আধুনিক মানুষের একাকিত্ব, বিষণ্নতা এবং প্রকৃতির রূপমাধুর্যের শ্রেষ্ঠ ভাষ্যকার। তাঁর কবিতায় যে চিত্রকল্প ও শব্দবিন্যাস আমরা দেখি, তা বিশ্বসাহিত্যে বিরল। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কবিতাকে ‘চিত্ররূপময়’ বলে অভিহিত করেছিলেন। জীবনানন্দ তাঁর সৃষ্টিতে বারবার ফিরে এসেছেন নদী, পাখি আর ধানসিঁড়ি তীরের এই বাংলায়। তাঁর কালজয়ী কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘বনলতা সেন’, ‘রূপসী বাংলা’, ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ এবং ‘বেলা অবেলা কালবেলা’ বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। তাঁর কবিতার কিছু অমর পঙক্তি আজও আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ: “আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে— এই বাংলায়” * “হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে” * “সুরঞ্জনা, আজো তুমি আমাদের পৃথিবীতে আছো” মজার ব্যাপার হলো, নিভৃতচারী এই কবি তাঁর জীবদ্দশায় যতটা না পরিচিত ছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপিগুলো যখন আবিষ্কৃত হয়, তখন তাঁর প্রতিভার বিশালতা সারা বিশ্বকে অবাক করে দেয়। তাঁর ‘মাল্যবান’ উপন্যাসে আমরা এক ভিন্নধর্মী গদ্যকারের পরিচয় পাই। প্রিয় সুধী, জীবনানন্দ দাশ তাঁর জীবন ও কর্মের মধ্য দিয়ে আমাদের শিখিয়েছেন মাটির কাছাকাছি থাকতে, তুচ্ছ ঘাস কিংবা সামান্য ঘাসফড়িঙের ভেতরেও সৌন্দর্য খুঁজে পেতে। তিনি ছিলেন একজন শেকড় সন্ধানী মানুষ, যিনি দেশভাগের কষ্ট এবং আধুনিক জীবনের জটিলতাকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে প্রকাশ করেছেন। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার কবির নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই রূপসী বাংলার কবির জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের শেকড় এবং প্রকৃতির প্রতি মমত্ববোধকে ভুলে না যাই। কবি জীবনানন্দ দাশ তাঁর অবিনশ্বর কর্মের মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: [গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা]

পহেলা ফাল্গুন ও বসন্ত উৎসব উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা

পহেলা ফাল্গুন ও বসন্ত উৎসব উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। পহেলা ফাল্গুন ও বসন্ত উৎসব উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই ঋতুরাজ বসন্তের রঙিন শুভেচ্ছা ও আন্তরিক প্রীতি। আজ প্রকৃতিতে এক নতুন প্রাণের স্পন্দন। শীতের রিক্ততা কাটিয়ে প্রকৃতি আজ সেজেছে নতুন সাজে। শিমুল-পলাশের রক্তিম আভা আর কোকিলের কুহুতানে আজ আমরা বরণ করে নিচ্ছি বাঙালির প্রাণের ঋতু বসন্তকে। আজ পহেলা ফাল্গুন। উপস্থিত সুধী, বসন্ত উৎসব কেবল ঋতু পরিবর্তনের বার্তা দেয় না, এটি আমাদের সংস্কৃতির এক বিশাল উৎসব। ‘ফাল্গুনে বিকশিত কাঞ্চন ফুল, ডালে ডালে পুঞ্জিত আম্রমুকুল’—কবিগুরুর এই পঙক্তির মতোই আজ আমাদের মনও বিকশিত হওয়ার দিন। প্রাচীনকাল থেকেই এই জনপদে বসন্ত উদযাপনের রীতি চলে আসছে। মোগল সম্রাট আকবরের সময় থেকে বঙ্গাব্দ গণনার মাধ্যমে ফাল্গুন মাসকে ঘিরে যে উৎসবের সূচনা হয়েছিল, আজ তা আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পহেলা ফাল্গুন মানেই চারদিকে রঙের খেলা। বাসন্তী রঙের শাড়ি আর পাঞ্জাবিতে সেজে তরুণ-তরুণীরা আজ প্রকৃতির সাথে মিতালি করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি প্রান্ত আজ মেলা, গান আর উৎসবে মুখর। বসন্ত মানেই পুনর্জন্ম; গাছের পুরনো পাতা ঝরে যেমন নতুন কিশলয় গজায়, তেমনি আমাদের মনেও সঞ্চারিত হয় নতুন আশা ও উদ্দীপনা। প্রিয় সুধী, বাঙালির ইতিহাসে বসন্তের এক ভিন্ন তাৎপর্যও রয়েছে। ১৯৫২ সালের সেই রক্তঝরা ফাল্গুন মাসেই আমাদের তরুণরা মায়ের ভাষার অধিকার আদায়ে রাজপথ রঞ্জিত করেছিল। তাই এই বসন্ত উৎসব একইসাথে আমাদের আনন্দ এবং আমাদের সাহসের প্রতীক। আজকের এই বিশ্বায়নের যুগে আমরা যখন যান্ত্রিকতায় ডুবে যাচ্ছি, তখন এই উৎসবগুলোই আমাদের মানবিক ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখে। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর প্রায়শই একটি অত্যন্ত গভীর কথা বলেন— “প্রতিজন মানুষের নৃতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় এমন এক ধরণের পরিচয় যা বদলানো যায় না। একজন মানুষ তার নিজের সেই সংস্কৃতি যখন চর্চা করে এবং তা উন্নত করতে কাজ করে, তখন সেই সংস্কৃতি তাকে পরিপূর্ণ এবং ‘ওয়েল ফর্মড’ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করে। আপনি নিজের সংস্কৃতির সাথে যুক্ত থাকলে বিশ্বের অন্য জাতিগোষ্ঠীর কাছে সম্মানিত হবেন। কিন্তু নিজের সংস্কৃতি বাদ দিয়ে অন্য সংস্কৃতির চর্চা করলে তা কখনোই আপনাকে পূর্ণ মানুষ হতে দেবে না। তাই আমরা বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতিগুলোর চর্চা ও প্রতিনিয়ত উন্নয়ন করতে কাজ করতে চাই।” সেই দর্শনে অনুপ্রাণিত হয়েই আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বসন্তের রঙে নিজেদের রাঙিয়ে নিয়েছি। আমরা বিশ্বাস করি, এই ফাল্গুন, এই পলাশ আর শিমুল—এসবই আমাদের জাতিগত শৌর্য। আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিই আমাদের বিশ্বদরবারে অনন্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করবে। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই বসন্ত উৎসবে মানুষের মনে শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন আধুনিকতার মোহে আমাদের শেকড় আর আমাদের ঐতিহ্যের এই চিরচেনা বাংলাকে কখনো ভুলে না যাই। বসন্তের এই রঙিন দিনগুলো প্রতিটি বাঙালির জীবনে আনন্দ ও শান্তি বয়ে আনুক। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা