গুরুকুল ক্যাম্পাস লার্নিং নেটওয়ার্ক, GCLN

নেলসন ম্যান্ডেলা-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা

নেলসন ম্যান্ডেলা

নেলসন ম্যান্ডেলা-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। নেলসন ম্যান্ডেলা-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ আমরা এমন এক ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি অদম্য সাহস, ক্ষমা এবং মানবিকতার এক জীবন্ত কিংবদন্তি। যিনি শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য আর বর্ণবাদের অন্ধকার থেকে দক্ষিণ আফ্রিকাকে মুক্ত করে বিশ্বকে দেখিয়েছেন সহনশীলতার নতুন পথ। তিনি আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় নেতা—নেলসন ম্যান্ডেলা। উপস্থিত সুধী, নেলসন ম্যান্ডেলা ১৯১৮ সালের ১৮ জুলাই দক্ষিণ আফ্রিকার এমভেজো গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব নাম ছিল রোলিহ্লাহ্লা ম্যান্ডেলা। কর্মবৈচিত্র্যের দিক দিয়ে তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের এক অকুতোভয় সব্যসাচী প্রতিভা—যিনি একাধারে আইনজীবী, রাজনৈতিক নেতা এবং শান্তিকামী বিশ্বনাগরিক। আজ তাঁর জীবনের একটি বিশেষ অধ্যায় স্মরণ করা প্রয়োজন। বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের কারণে তাঁকে দীর্ঘ ২৭ বছর কারাবরণ করতে হয়েছিল। কিন্তু জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ তাঁর আদর্শকে আরও উজ্জ্বল করেছিল। ১৯৯০ সালে কারামুক্ত হওয়ার পর তিনি যখন ক্ষমতায় আসীন হলেন, তখন তিনি প্রতিহিংসার পথ বেছে নেননি। বরং ‘সত্য ও পুনর্মিলন কমিশন’ (Truth and Reconciliation Commission) গঠনের মাধ্যমে শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের এক সুতোয় গেঁথে গড়ে তুলেছিলেন ‘রেইনবো নেশন’ বা রংধনু জাতি। ১৯৯৩ সালে তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন এবং ১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন। প্রিয় সুধী, নেলসন ম্যান্ডেলার সাথে বাংলাদেশের এক বিশেষ আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি আমাদের আমন্ত্রণে বাংলাদেশে এসেছিলেন। সেই সময় তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা হলো বিশ্বকে পরিবর্তন করার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। ম্যান্ডেলার অনেক কালজয়ী উক্তি আজও সারা বিশ্বে অনুপ্রেরণা জোগায়: “পৃথিবীর কোনো মানুষই অন্য মানুষকে তার গায়ের রঙের কারণে ঘৃণা করে জন্মায় না। মানুষকে ঘৃণা করা শিখতে হয়, আর যদি তারা ঘৃণা করা শিখতে পারে, তবে তাদের ভালোবাসাও শেখানো সম্ভব।” তিনি কেবল নিজের দেশের নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন পৃথিবীর প্রতিটি মুক্তিকামী মানুষের কণ্ঠস্বর। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, বিজয় মানে কেবল জয়লাভ নয়, বরং প্রতিটি পতনের পর আবার উঠে দাঁড়ানো। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার এই মহান নেতার নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর আদর্শ সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই মহাপ্রাণের জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে পারি। নেলসন ম্যান্ডেলা তাঁর কর্ম ও আদর্শের মধ্য দিয়ে সারা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের হৃদয়ে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

১১ই জুলাই: সেক্টর কমান্ডার্স ডে উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সাংগঠনিক কাঠামো

১১ই জুলাই ‘সেক্টর কমান্ডার্স ডে’ উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। ১১ই জুলাই: সেক্টর কমান্ডার্স ডে উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই ঐতিহাসিক ১১ই জুলাই ‘সেক্টর কমান্ডার্স ডে’-র বিনম্র শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা। আজ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে কলকাতার ৮ নম্বর থিয়েটার রোডে শুরু হয়েছিল এক মহাকাব্যিক সামরিক মহড়া, যা ‘সেক্টর কমান্ডার্স কনফারেন্স ১৯৭১’ নামে পরিচিত। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর সরকারের (প্রবাসী সরকার) প্রধান কার্যালয় বা ওয়ার টাইম হেডকোয়ার্টার হিসেবে ব্যবহৃত হতো ছিল সেই ৮ থিয়েটার রোড। ১১ই জুলাই থেকে ১৭ই জুলাই পর্যন্ত চলা সেই ঐতিহাসিক সম্মেলনের শুরুর দিনটিকে স্মরণ করে গুরুকুল আজ পালন করছে ‘সেক্টর কমান্ডার্স ডে’। উপস্থিত সুধী, ১৯৭১ সালের মার্চের পর থেকে সারা দেশে যে বিচ্ছিন্ন ও বিশৃঙ্খল প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল, তাকে একটি সুশৃঙ্খল যুদ্ধের রূপ দিতে এই সম্মেলনের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। এই কনফারেন্সের মাধ্যমেই আনুষ্ঠানিকভাবে সমগ্র বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করা হয় এবং প্রতিটি সেক্টরের জন্য একজন করে যোগ্য কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়। প্রধান সেনাপতি জেনারেল আতাউল গণি ওসমানীর নেতৃত্বে এই দিন থেকেই মুক্তিবাহিনীর ‘চেইন অব কমান্ড’ বা প্রশাসনিক কাঠামো পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়। ১১ জুলাই অনুষ্ঠিত বৈঠকে মুজিবনগর সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কর্নেল এম. এ. জি. ওসমানীকে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি (C-in-C) হিসেবে পুনঃনিয়োগ দেয়। এই দিনেই লেঃ কর্নেল আবদুর রবকে সেনাবাহিনী প্রধান এবং গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকারকে উপ-প্রধান সেনাপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই কনফারেন্সটি ১১ জুলাই শুরু হয়ে ১৭ জুলাই পর্যন্ত চলেছিল, যেখানে কমান্ডারদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া এবং যুদ্ধ কৌশল চূড়ান্ত করা হয়। আজ এই মাহেন্দ্রক্ষণে আমরা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি সেই বীর সেনানী সেক্টর কমান্ডারদের: ১ নম্বর সেক্টর: মেজর জিয়াউর রহমান (পরবর্তীতে মেজর রফিকুল ইসলাম দায়িত্ব পালন করেন)। ২ নম্বর সেক্টর: মেজর খালেদ মোশাররফ (পরবর্তীতে মেজর এ.টি.এম হায়দার দায়িত্ব পালন করেন)। ৩ নম্বর সেক্টর: মেজর কে.এম. শফিউল্লাহ (পরবর্তীতে মেজর এ.এন.এম নূরুজ্জামান দায়িত্ব পালন করেন)। ৪ নম্বর সেক্টর: মেজর সি.আর. দত্ত। ৫ নম্বর সেক্টর: মেজর মীর শওকত আলী। ৬ নম্বর সেক্টর: উইং কমান্ডার এম. খাদেমুল বাশার। ৭ নম্বর সেক্টর: মেজর নাজমুল হক (পরবর্তীতে মেজর কাজী নুরুজ্জামান দায়িত্ব পালন করেন)। ৮ নম্বর সেক্টর: মেজর আবু ওসমান চৌধুরী (পরবর্তীতে মেজর এম.এ. মঞ্জুর দায়িত্ব পালন করেন)। ৯ নম্বর সেক্টর: মেজর এম.এ. জলিল (পরবর্তীতে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন মেজর এম.এ. মঞ্জুর ও মেজর জয়নাল আবেদীন)। ১০ নম্বর সেক্টর: এটি ছিল নৌ-সেক্টর, যা সরাসরি প্রধান সেনাপতির অধীনে ছিল। ১১ নম্বর সেক্টর: মেজর আবু তাহের (পরবর্তীতে মেজর এম. হামিদুল্লাহ খান দায়িত্ব পালন করেন)।   সেক্টর কমান্ডারদের এই সম্মেলনেই যুদ্ধের কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। সাধারণ মানুষ ও তরুণদের সমন্বয়ে গঠিত গেরিলা বাহিনী এবং সম্মুখ সমরের যোদ্ধাদের মাঝে সমন্বয় সাধনের জন্য এটি ছিল এক মাইলফলক। বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধ থেকে একটি সুসংগঠিত সামরিক বাহিনীতে রূপান্তরিত হওয়ার সেই ঐতিহাসিক যাত্রার সূচনালগ্ন ছিল আজকের এই ১১ই জুলাই। আমাদের বীর সেক্টর কমান্ডারদের সেই দূরদর্শী সিদ্ধান্তই বাংলাদেশের বিজয়কে ত্বরান্বিত করেছিল। প্রিয় সুধী, একটি জাতির স্বাধীনতা অর্জনের জন্য কেবল আবেগ নয়, প্রয়োজন হয় সুশৃঙ্খল নেতৃত্ব এবং সাংগঠনিক শক্তি। আমাদের মুক্তিবাহিনীর এই সাংগঠনিক কাঠামো আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এই দিবসের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন— “১৯৭১ সালের সেক্টর কমান্ডারদের এই ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস কেবল একটি সামরিক পরিকল্পনা ছিল না, এটি ছিল বাঙালির লড়াকু সংস্কৃতির এক সুশৃঙ্খল বহিঃপ্রকাশ। একজন মানুষ যখন তাঁর দেশের ইতিহাসের এই বীরত্বগাথা ও রণকৌশলকে হৃদয়ে ধারণ করে নিজের জীবনকে সুশৃঙ্খল করে তোলে, তখনই সে প্রকৃত ও ওয়েল-ফর্মড মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। আমরা যদি আমাদের এই মুক্তি সংগ্রামের সাংগঠনিক ইতিহাসকে ভুলে যাই, তবে আমাদের জাতীয় পরিচয় অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তাই আমরা মুক্তিবাহিনীর সেই চেইন অব কমান্ড এবং সেক্টর কমান্ডারদের ত্যাগের ইতিহাসকে প্রতিনিয়ত আমাদের জাতীয় জীবনে চর্চা করতে চাই।” সেই দর্শনে দীক্ষিত হয়েই আমরা আজ এই ‘সেক্টর কমান্ডার্স ডে’ পালন করছি। আমরা বিশ্বাস করি, সেক্টর কমান্ডারদের সেই সাহস ও শৃঙ্খলার শিক্ষা আমাদের প্রজন্মের পর প্রজন্মের জন্য দেশপ্রেমের এক অনন্য পাঠ হয়ে থাকবে। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে আমাদের সকল সেক্টর কমান্ডার এবং অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধাদের গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি এবং তাঁদের সুস্বাস্থ্য ও আত্মার শান্তি কামনায় সম্মিলিত প্রার্থনা করি। সেই সাথে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি মহান মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লক্ষ শহীদ ও ২ লক্ষ সম্ভ্রমহারা মা-বোনকে। গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি বাংলাদেশের জাতির পিতা ও মুক্তিযুদ্ধের সুপ্রিম কমান্ডার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদসহ মুক্তিযুদ্ধকালীন সকল নেতৃত্ব এবং জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করা সকল বীর মুক্তিযোদ্ধাকে। আজ আমরা অঙ্গীকার করি—আমরা যেন তাঁদের সেই ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া এই স্বাধীন বাংলাদেশকে একটি সুশৃঙ্খল ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারি। বাংলাদেশের সকল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জয় হোক। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় বঙ্গবন্ধু! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

কবি নির্মলেন্দু গুণ-এর জন্মদিন উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা, ২১ জুন

নির্মলেন্দু গুণ

কবি নির্মলেন্দু গুণ-এর জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। কবি নির্মলেন্দু গুণ-এর জন্মদিন উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ আমরা এমন এক কবির জন্মদিন উদযাপন করছি, যাঁর কবিতার শব্দে বারুদ আছে, আছে প্রেমের গভীর আকুতি এবং রাজনীতির অমোঘ সত্য। তিনি আমাদের আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অবিনাশী কণ্ঠস্বর, গণমানুষের কবি—নির্মলেন্দু গুণ। উপস্থিত সুধী, নির্মলেন্দু গুণ ১৯৪৫ সালের ২১ জুন নেত্রকোনা জেলার বারহাট্টার কাশবন গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম সুখেন্দুবিকাশ গুণ এবং মায়ের নাম বিনাপাণি গুণ। কর্মবৈচিত্র্যের দিক দিয়ে তিনি একাধারে কবি, সাংবাদিক এবং একজন দক্ষ চিত্রশিল্পী। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ প্রকাশিত হওয়ার পরেই তিনি বাংলা সাহিত্যে তাঁর শক্ত অবস্থান তৈরি করে নেন। আজ একটি বিশেষ বিষয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন। নির্মলেন্দু গুণ সেই বিরল সাহসীদের একজন, যিনি ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের বিয়োগান্তক ঘটনার পর যখন সারা দেশে এক স্তব্ধতা নেমে এসেছিল, তখন বুক ফুলিয়ে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে কবিতা লিখেছিলেন। তাঁর সেই কালজয়ী কবিতা ‘হুলিয়া’ বা ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’—বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে তাঁর পঙক্তিগুলো আমাদের জাতীয় চেতনার অংশ হয়ে আছে। প্রিয় সুধী, কবির সৃষ্টিতে প্রেম ও রাজনীতি সমান্তরালভাবে চলে। তিনি কেবল রাজপথের কবি নন, তিনি হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতিরও রূপকার। তাঁর লেখনীতে যেমন উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের বঞ্চনার কথা, তেমনি ফুটে উঠেছে রূপসী বাংলার নিসর্গ। তাঁর জনপ্রিয় কিছু পঙক্তি আজও আমাদের মুখে মুখে ফেরে: “স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো” “আমি যখন মেজাজ হারিয়ে ফেলি, তখন তুমি আকাশ হয়ে যাও” “হাত বাড়িয়ে দাও, আমি তোমার আঙুল ছুঁতে চাই” তিনি তাঁর অসামান্য সাহিত্যকর্মের জন্য ১৯৮২ সালে ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার’ এবং ২০০১ সালে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত হন। ২০১৬ সালে তিনি লাভ করেন ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’। কবির জীবন আমাদের শিখিয়েছে আদর্শের প্রতি অবিচল থেকে কীভাবে শিল্পের মাধ্যমে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হয়। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার এই মহৎ কবির নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই অকুতোভয় কবির জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের ভাষা, দেশ এবং সংস্কৃতির প্রতি আজীবন অনুগত থাকতে পারি। কবি নির্মলেন্দু গুণ তাঁর কালজয়ী কবিতার মধ্য দিয়ে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে এবং বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

বেগম সুফিয়া কামাল-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা, ২০ জুন

বেগম সুফিয়া কামাল-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। বেগম সুফিয়া কামাল-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ আমরা এমন এক মহীয়সী নারীর জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি বাঙালির সকল প্রগতিশীল আন্দোলন এবং নারী জাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ। তিনি আমাদের প্রাণের মমতায় আগলে রাখা ‘জননী সাহসিকা’—কবি বেগম সুফিয়া কামাল। উপস্থিত সুধী, সুফিয়া কামাল ১৯১১ সালের ২০ জুন বরিশালের শায়েস্তাবাদে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম সৈয়দ আবদুল বারী এবং মায়ের নাম সৈয়দা সাবেরা খাতুন। এমন এক সময়ে তিনি জন্মেছিলেন যখন মুসলিম নারীদের শিক্ষার পরিবেশ ছিল অত্যন্ত প্রতিকূল। কিন্তু অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে তিনি স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হন এবং বেগম রোকেয়ার আদর্শকে ধারণ করে সমাজ সংস্কারে আত্মনিয়োগ করেন। কর্মবৈচিত্র্যের দিক দিয়ে তিনি ছিলেন এক অনন্য সব্যসাচী ব্যক্তিত্ব। তিনি কেবল একজন কবিই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন, ১৯৬১-র রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী প্রতিরোধ আন্দোলন এবং ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। যুদ্ধের দিনগুলোতে অবরুদ্ধ ঢাকায় থেকেও তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহায়তা করেছেন এবং পরবর্তীতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে তোলা আন্দোলনেও বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৬৯ সালে গঠিত ‘মহিলা পরিষদ’-এর প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী হিসেবে তিনি আমৃত্যু নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় লড়াই করে গেছেন। প্রিয় সুধী, সুফিয়া কামালের কবিতা ও গদ্য আমাদের সাহিত্যভাণ্ডারকে ঋদ্ধ করেছে। তাঁর লেখনীতে ফুটে উঠেছে প্রকৃতি, দেশপ্রেম এবং অধিকারবঞ্চিত মানুষের কথা। তাঁর কালজয়ী গ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘সাঁঝের মায়া’, ‘মায়া কাজল’, ‘মন ও জীবন’ এবং ‘একাত্তরের ডায়েরি’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কবির সেই অমোঘ পঙক্তি আজও আমাদের প্রেরণা দেয়: “আমাদের এই দেশে হবে সেই ছেলে কবে/ কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে?” সুফিয়া কামাল ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূর্ত প্রতীক। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে মাথা নত না করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হয়। ১৯৮১ সালে যখন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তী পালনে বাধা দেওয়া হয়েছিল, তিনি সেই রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রাজপথে নেমেছিলেন। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার এই মহীয়সী নারীর নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর ত্যাগ ও আদর্শ সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই জননী সাহসিকার জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের দেশপ্রেম ও মানবিকতাকে আজীবন অক্ষুণ্ণ রাখতে পারি। বেগম সুফিয়া কামাল তাঁর কর্ম এবং আদর্শের মধ্য দিয়ে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

কাজী নজরুল ইসলাম-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা । ২৪ মে

কাজী নজরুল ইসলাম

কাজী নজরুল ইসলাম-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। কাজী নজরুল ইসলাম-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ এগারোই জ্যৈষ্ঠ। আজ আমরা এমন এক আগ্নেয়গিরির জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যার কলম পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার গান গেয়েছে, যার সুর বাঙালির হৃদয়ে সাহসের সঞ্চার করেছে। তিনি আমাদের জাতীয় কবি, আমাদের চিরকালের বিদ্রোহী কবি—কাজী নজরুল ইসলাম। উপস্থিত সুধী, কাজী নজরুল ইসলাম ১৮৯৯ সালের ২৪ মে (বাংলা পঞ্জিকা মতে ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ই জ্যৈষ্ঠ) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জীবন ছিল এক মহাকাব্যিক লড়াইয়ের গল্প। অতি দারিদ্র্যের কারণে তাঁর শৈশব কেটেছে ‘দুখু মিয়া’ হয়ে, কাজ করেছেন লেটোর দলে, এমনকি রুটির দোকানেও। কিন্তু কোনো প্রতিকূলতাই তাঁর ভেতরের প্রতিভাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। কর্মবৈচিত্র্যের দিক দিয়ে তিনি ছিলেন এক অতুলনীয় সব্যসাচী—তিনি একাধারে কবি, সাংবাদিক, সংগীতজ্ঞ, নাট্যকার এবং সৈনিক। আজ একটি বিশেষ বিষয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন। নজরুল কেবল প্রেমের কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন সাম্যের কবি। ১৯২২ সালে তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রকাশিত হওয়ার পর বাংলা সাহিত্যে এক অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি হয়। পরাধীন ভারতবর্ষে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে তাঁর কলম ছিল কামানের গোলার মতো শক্তিশালী। ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতার জন্য তাঁকে কারাবরণ করতে হয়েছিল, কিন্তু শিকল পরে তিনি গেয়েছেন শিকল ভাঙার গান। প্রিয় সুধী, নজরুলের অবদান কেবল সাহিত্যে সীমাবদ্ধ নয়; তিনি বাংলা সংগীতের এক বিশাল ভাণ্ডার তৈরি করে দিয়ে গেছেন। প্রায় ৩০০০-এর বেশি গান রচনা করেছেন তিনি, যা ‘নজরুল গীতি’ নামে পরিচিত। ধ্রুপদী রাগাশ্রয়ী গান থেকে শুরু করে গজল, শ্যামাসংগীত এবং বিশেষ করে ইসলামী সংগীত রচনায় তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। আজও আমাদের প্রতিটি জাতীয় উৎসবে তাঁর সেই কালজয়ী সৃষ্টিসমূহ নতুন করে প্রাণের সঞ্চার করে: “বল বীর— বল উন্নত মম শির!” “কারার ঐ লৌহকপাট, ভেঙে ফেল কর রে লোপাট” “ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশির ঈদ” “মোর প্রিয়া হবে এসো রানী, দেব খোঁপায় তারার ফুল” ১৯৭২ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে কবিকে সপরিবারে বাংলাদেশে আনা হয় এবং তাঁকে বাংলাদেশের জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া হয়। তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনা আজও আমাদের দেশপ্রেমের শ্রেষ্ঠ পাথেয়। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার আমাদের জাতীয় কবির নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন নজরুলের বিদ্রোহী ও মানবিক জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পারি। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর অবিনশ্বর কর্মের মধ্য দিয়ে প্রতিটি বাঙালির রক্তে ও চেতনায় চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় নজরুল! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

আন্তর্জাতিক নার্স দিবস উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা । ১২ মে

১২ মে - আন্তর্জাতিক নার্স দিবস রচনা

আন্তর্জাতিক নার্স দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। আন্তর্জাতিক নার্স দিবস উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তর্জাতিক নার্স দিবসের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা। আজ ১২ মে, ২০২৬। সমগ্র বিশ্বে আজ অত্যন্ত মর্যাদার সাথে পালিত হচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক নার্স দিবস’। আজকের এই দিনটি কেবল একটি তারিখ নয়, বরং এটি মানবসেবার এক অনন্য প্রতীকের জন্মদিন। ১৮২০ সালের আজকের এই দিনে ইতালির ফ্লোরেন্সে জন্মগ্রহণ করেছিলেন আধুনিক নার্সিং পরিষেবার অগ্রদূত ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং বিশ্বের সকল নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও সেবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেই এই দিবসটি পালন করা হয়। উপস্থিত সুধী, ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখি, আন্তর্জাতিক ধাত্রী পরিষদ (ICN) ১৯৬৫ সাল থেকে এই দিনটি পালন করে আসছে। তবে ১৯৭৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ১২ মে দিনটিকে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আন্তর্জাতিক নার্স দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল আমাদের শিখিয়েছেন যে, নার্সিং কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি মহান ব্রত বা সেবা। তিনি ছিলেন ‘দ্য লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প’, যিনি ক্রিমিয়ার যুদ্ধে প্রদীপ হাতে সেবা দিয়ে মানবতার এক নতুন ইতিহাস রচনা করেছিলেন। প্রিয় সুধী, প্রতি বছর এই দিবসের একটি নির্দিষ্ট প্রতিপাদ্য থাকে যা আমাদের আগামীর পথ দেখায়। ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক নার্স দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে: “আমাদের নার্স। আমাদের ভবিষ্যৎ। ক্ষমতায়িত নার্সরাই জীবন বাঁচান” (Our Nurses. Our Future. Empowered Nurses Save Lives)। এই প্রতিপাদ্যটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, একটি সুস্থ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ার কারিগর হলেন আমাদের নার্সরা। তাঁদের যদি আধুনিক শিক্ষা, প্রযুক্তি ও উপযুক্ত পরিবেশে ক্ষমতায়িত করা যায়, তবে তাঁরা আরও নিপুণভাবে মানুষের জীবন বাঁচাতে সক্ষম হবেন। সেই দর্শনে দীক্ষিত হয়েই আমরা আজ ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের মতো মহান ‘আলোকবর্তিকা’র জীবনী চর্চা করি। আমরা বিশ্বাস করি, নার্সদের নিঃস্বার্থ সেবা ও মমত্ববোধ থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরাও নিজেদের জীবনকে পরোপকারে নিয়োজিত করতে পারি। একজন নার্স যখন ক্ষমতায়িত হয়ে এবং হাসিমুখে রোগীর সেবা করেন, তখন সেখানে কেবল চিকিৎসা হয় না, বরং মানবতার এক জয়গান গীত হয়। সেই রেওয়াজে আমরা আজ বিশ্বের সকল নার্স ও ধাত্রীদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানাই এবং তাঁদের সুস্বাস্থ্য কামনায় সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—সেবা ও ত্যাগের যে আদর্শ ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল রেখে গেছেন, তা যেন আমাদের প্রাত্যহিক জীবনেও প্রতিফলিত হয়। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় বঙ্গবন্ধু! জয় গুরুকুল! * বক্তৃতাটি ২০২৬ সালের জন্য আপডেট করা হলো। আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা । ৭ মে

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ পঁচিশে বৈশাখ। আজ আমরা এমন এক জ্যোতির্ময় ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিয়েছেন হিমালয়সম উচ্চতায়। তিনি আমাদের চেতনার দীপশিখা, আমাদের প্রাণের কবি—বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। উপস্থিত সুধী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৬১ সালের ৭ মে (বাংলা পঞ্জিকা মতে ১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫শে বৈশাখ) কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং মাতা সারদাসুন্দরী দেবী। কর্মবৈচিত্র্যের দিক দিয়ে তিনি ছিলেন এক অতলস্পর্শী সব্যসাচী প্রতিভা। তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, দার্শনিক, সংগীতস্রষ্টা, চিত্রশিল্পী এবং শিক্ষাবিদ। আজ একটি বিশেষ বিষয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন। ১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য প্রথম এশীয় হিসেবে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর এই অর্জন কেবল একজন কবির বিজয় ছিল না, এটি ছিল বাংলা ভাষার বিশ্বজয়ের সূচনালগ্ন। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে বৈশ্বিক ভাবনার সাথে দেশীয় সংস্কৃতির সমন্বয় ঘটাতে হয়। ১৯২১ সালে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘বিশ্বভারতী’ বিশ্ববিদ্যালয় আজও বিশ্ব সংস্কৃতির এক অনন্য মিলনস্থল। প্রিয় সুধী, রবীন্দ্রনাথের সাথে আমাদের এই বাংলাদেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ও নিবিড়। পাবনার শিলাইদহ, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর আর নওগাঁর পতিসরে কাটানো তাঁর জীবনের সোনালি দিনগুলোতেই তিনি রচনা করেছেন তাঁর শ্রেষ্ঠ অনেক সৃষ্টি। আমাদের জাতীয় সংগীত “আমার সোনার বাংলা” এই মাটির প্রতি তাঁর গভীর মমত্ববোধের অমর ফসল। রবীন্দ্রনাথের গানের সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। তাঁর সেই কালজয়ী সৃষ্টিসমূহ আজও বাঙালির আনন্দ-বেদনায় পরম আশ্রয়: “তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম” “ছিলে একা বসি আপন মনে” “বাংলার মাটি বাংলার জল, বাংলার বায়ু বাংলার ফল— পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান” তিনি কেবল সৌন্দর্যের কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার এক কণ্ঠস্বর। ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তিনি ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া ‘নাইটহুড’ উপাধি বর্জন করে যে নৈতিক সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন, তা ইতিহাসে বিরল। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার বিশ্বকবির নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই মহাপ্রাণের জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের সংস্কৃতি ও মনুষ্যত্বকে আজীবন লালন করতে পারি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কর্মের মধ্য দিয়ে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

আজ প্রখ্যাত স্কটিশ দার্শনিক, ইতিহাসবিদ ও অর্থনীতিবিদ ডেভিড হিউমের জন্মদিন । ৭ মে

ডেভিড হিউম

ডেভিড হিউম (David Hume) ছিলেন আঠারো শতকের একজন প্রভাবশালী স্কটিশ দার্শনিক, ইতিহাসবিদ, অর্থনীতিবিদ, গ্রন্থাগারিক এবং প্রাবন্ধিক। তিনি ১৭১১ সালের ২৬ এপ্রিল (পুরানো স্টাইল) বা ৭ মে (নতুন স্টাইল) স্কটল্যান্ডের এডিনবরায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব কাটে বারউইকশায়ারের নিনাভলেসে তাঁদের পারিবারিক ভিটায়। ১৭৩৪ সালে তিনি নিজের উপাধি ‘হোম’ (Home) থেকে পরিবর্তন করে ‘হিউম’ (Hume) করেন, যাতে ইংরেজদের পক্ষে এর সঠিক উচ্চারণ করা সহজ হয়। ডেভিড হিউম: অভিজ্ঞতাবাদ ও সংশয়বাদের এক অনন্য আলোকবর্তিকা দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিজ্ঞতাবাদ ডেভিড হিউমকে জন লক, ফ্রান্সিস বেকন এবং টমাস হবসের সাথে ব্রিটিশ অভিজ্ঞতাবাদের অন্যতম স্তম্ভ মনে করা হয়। তাঁর প্রথম ও প্রধান কাজ ‘A Treatise of Human Nature’ (১৭৩৯-৪০), যেখানে তিনি মানব প্রকৃতির একটি মনস্তাত্ত্বিক ও প্রাকৃতিক ভিত্তি তৈরির চেষ্টা করেন। হিউমের মতে, সমস্ত মানব জ্ঞানের ভিত্তি হলো অভিজ্ঞতা। তিনি যুক্তি দেন যে, ধারণাগুলো অবশ্যই ইন্দ্রিয়জাত অভিজ্ঞতা থেকে উদ্ভূত হতে হবে। সংশয়বাদ ও কার্যকারণ তত্ত্ব হিউমের দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো কার্যকারণ (Causality) সংক্রান্ত সংশয়বাদ। তিনি দাবি করেন যে, আমরা যখন কোনো একটি ঘটনাকে অন্য একটি ঘটনার কারণ হিসেবে দেখি, তা আসলে ঘটনার ‘ধ্রুবক সংযোগ’ (Constant conjunction) থেকে আসা এক ধরণের মানসিক অভ্যাস। তিনি যুক্তি দেন যে, কোনো ঘটনা যে অন্য একটি ঘটনার কারণ হবে, তা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে প্রমাণ করা সম্ভব নয়; বরং এটি অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমাদের এক ধরণের বিশ্বাস মাত্র। নৈতিকতা ও ধর্মতত্ত্ব নৈতিকতার ক্ষেত্রে হিউম যুক্তি দেন যে, আমাদের নৈতিক মূল্যায়ন বুদ্ধি বা যুক্তির পরিবর্তে আবেগ ও অনুভূতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। তাঁর বিখ্যাত উক্তি হলো— “বুদ্ধি হলো আবেগ বা অনুভূতির দাস” (Reason is and ought only to be the slave of the passions)। এছাড়া ঈশ্বরের অস্তিত্বের জন্য প্রদত্ত ‘টেলিলজিক্যাল’ বা উদ্দেশ্যমূলক যুক্তির বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ডারউইনবাদের পূর্ববর্তী সময়ের সবচেয়ে জোরালো বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টা হিসেবে স্বীকৃত। প্রভাব ও উত্তরাধিকার হিউমের দর্শন পরবর্তীকালে ইমানুয়েল কান্টকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। কান্ট স্বীকার করেছিলেন যে, হিউমের কাজই তাঁকে তাঁর “ডগমেটিক স্ল্যাম্বার” বা অন্ধ বিশ্বাস থেকে জাগিয়ে তুলেছিল। হিউম উপযোগবাদ, জ্ঞানতত্ত্ব, বিশ্লেষণধর্মী দর্শন এবং আধুনিক সংজ্ঞানাত্মক বিজ্ঞানের (Cognitive Science) পথপ্রদর্শক হিসেবে আজও স্বীকৃত। ব্যক্তিগত জীবন ও শেষকাল হিউম সারাজীবন অবিবাহিত ছিলেন। তাঁর জীবনের অনেকটা সময় তিনি লেখালেখি এবং গবেষণার কাজে ব্যয় করেন। তাঁর ভাতিজা ডেভিড হিউম অফ নিনাভলেস পরবর্তীকালে এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক এবং বিশিষ্ট স্কটিশ ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। ১৭৭৬ সালের ২৫ আগস্ট এই মহান দার্শনিকের মৃত্যু হয়। তাঁকে এডিনবরার ওল্ড কেল্টন সিমেট্রিতে সমাহিত করা হয়। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই জন্মদিনে ডেভিড হিউমকে স্মরণ করি এবং আধুনিক দর্শনে তাঁর অসামান্য অবদানের কথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

সত্যজিৎ রায়-এর জন্মদিন উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা । ২ মে

সত্যজিৎ রায়

সত্যজিৎ রায়-এর জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। সত্যজিৎ রায়-এর জন্মদিন উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ আমরা এমন এক ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি বাংলা ও বাঙালির সংস্কৃতিকে বিশ্ব চলচ্চিত্রের দরবারে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তিনি কেবল একজন চলচ্চিত্র পরিচালক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একাধারে লেখক, চিত্রকর, সঙ্গীত পরিচালক, ক্যালিগ্রাফার এবং অমর সব চরিত্রের স্রষ্টা। তিনি আমাদের গর্ব—সত্যজিৎ রায়। উপস্থিত সুধী, সত্যজিৎ রায় ১৯২১ সালের ২ মে কলকাতার বিখ্যাত ‘রায় পরিবারে’ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী এবং পিতা সুকুমার রায়—উভয়েই ছিলেন বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি। ১৯৫৫ সালে ‘পথের পাঁচালী’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি বিশ্ব চলচ্চিত্রে পা রাখেন এবং প্রথম ছবিতেই আন্তর্জাতিক মহলে হইচই ফেলে দেন। তাঁর হাত ধরেই বিশ্ব চিনেছে অপু, দুর্গা আর নিশ্চিন্তপুরের সেই রেললাইন দেখার গল্প। কর্মবৈচিত্র্যের দিক দিয়ে তিনি ছিলেন এক কালজয়ী প্রতিভা। তাঁর পরিচালিত ৩২টি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এবং ডকুফিল্মগুলো আজও চলচ্চিত্রের পাঠ্যবই হিসেবে গণ্য করা হয়। শুধু চলচ্চিত্র নয়, বাংলা সাহিত্যে তাঁর অমর সৃষ্টি ‘ফেলুদা’ ও ‘প্রফেসর শঙ্কু’ আমাদের শৈশবকে করেছে রোমাঞ্চকর। এছাড়া তাঁর অনন্য শিল্পবোধ ফুটে উঠেছে বইয়ের প্রচ্ছদ অলঙ্করণ এবং নিজের তৈরি করা ফন্ট ‘রে রোমান’ (Ray Roman)-এর মাধ্যমে। ১৯৯২ সালে তিনি বিশ্বের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র সম্মান ‘অস্কার’ (একাডেমি অ্যাওয়ার্ড) লাভ করেন আজীবন অবদানের জন্য। সত্যজিৎ রায়ের কালজয়ী কিছু সৃষ্টি ও সিরিজের কথা না বললেই নয়: অপু ট্রিলজি: পথের পাঁচালী, অপরাজিত ও অপুর সংসার। ফেলুদা সিরিজ: সোনার কেল্লা, জয় বাবা ফেলুনাথ-এর মতো কালজয়ী চলচ্চিত্র ও উপন্যাস। হীরক রাজার দেশে: যেখানে তিনি রূপকের মাধ্যমে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার বার্তা দিয়েছেন। জলসাঘর ও চারুলতা: যা বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নির্মাণ। প্রিয় সুধী, সত্যজিৎ রায় তাঁর শিল্পচর্চায় সবসময় মাটির কাছাকাছি থেকেছেন, কিন্তু তাঁর চিন্তা ছিল বিশ্বজনীন। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে অত্যন্ত পরিমিতিবোধ ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে শিল্পকে সার্থক করে তোলা যায়। তাঁর জীবন ছিল কাজের প্রতি একাগ্রতা ও নিষ্ঠার এক জীবন্ত পাঠশালা। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার এই মহান শিল্পীর নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন সত্যজিৎ রায়ের জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের প্রতিভা ও দেশজ সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে সঠিকভাবে উপস্থাপিত করতে পারি। সত্যজিৎ রায় তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে এবং বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে চিরকাল ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা

হুমায়ুন আজাদ-এর জন্মদিন উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা । ২৮ এপ্রিল

হুমায়ুন আজাদ

হুমায়ুন আজাদ-এর জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। হুমায়ুন আজাদ-এর জন্মদিন উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ আমরা এমন এক নির্ভীক ও প্রথাবিরোধী মানুষের জন্মদিন উদযাপন করছি, যিনি আধুনিক বাংলা সাহিত্য ও চিন্তার জগতে এক প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক এবং এদেশের ভাষাবিজ্ঞানের অন্যতম পথিকৃৎ। তিনি আমাদের প্রিয় অধ্যাপক—হুমায়ুন আজাদ। উপস্থিত সুধী, হুমায়ুন আজাদ ১৯৪৭ সালের ২৮ এপ্রিল তৎকালীন বিক্রমপুরের (বর্তমানে মুন্সীগঞ্জ জেলা) রাড়িখাল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মেধা ও পাণ্ডিত্যের স্বাক্ষর রেখেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা জীবনে এবং পরবর্তীতে এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাবিজ্ঞানে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে। তিনি কেবল একজন শিক্ষক ছিলেন না, তিনি ছিলেন যুক্তিবাদী ও আধুনিক মননের এক দীপশিখা। তাঁর ‘বাক্যতত্ত্ব’ বা ‘তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান’ গ্রন্থগুলো বাংলা ভাষাতত্ত্বের জগতে মাইলফলক হয়ে আছে। তবে হুমায়ুন আজাদ সবচেয়ে বেশি আলোচিত তাঁর প্রখর ও সাহসী গদ্যের জন্য। তিনি বিশ্বাস করতেন বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ে কোনো আপস নেই। প্রথাধীন সমাজের সংস্কার ভাঙতে তিনি কলম ধরেছিলেন। তাঁর ‘নারী’, ‘প্রবচনগুচ্ছ’, ‘ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল’ এবং ‘সব কিছু ভেঙে পড়ে’র মতো গ্রন্থগুলো আমাদের নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। তাঁর প্রতিটি শব্দ ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক একটি ধারালো অস্ত্র। স্বাধীনতার চেতনা আর অসাম্প্রদায়িকতা ছিল তাঁর প্রতিটি নিশ্বাসে। প্রিয় সুধী, হুমায়ুন আজাদের জীবন ছিল এক সংগ্রামের নাম। সত্য কথা বলার অপরাধে তাঁকে বারবার আক্রান্ত হতে হয়েছে, তবুও তিনি তাঁর আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। তাঁর ‘লাল নীল দীপাবলি’ কিংবা ‘ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না’র মতো কিশোর সাহিত্যগুলো আমাদের প্রজন্মের পর প্রজন্মকে বইয়ের প্রতি এবং সুন্দরের প্রতি আকৃষ্ট করেছে। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে নিজের সত্তাকে জাগ্রত রেখে সব ধরণের অন্ধত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকা যায়। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার এই কীর্তিমান লেখকের নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই অকুতোভয় বুদ্ধিজীবীর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নির্ভীক চিন্তা ও সত্যের পথে অবিচল থাকতে পারি। হুমায়ুন আজাদ তাঁর অবিনশ্বর সৃষ্টি ও সাহসী চিন্তার মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা