কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা
কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ আমরা এমন এক ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি একাধারে কবি, সাংবাদিক, শিক্ষক এবং সারা বিশ্বের মজলুম ও নিপীড়িত মানুষের অবিনাশী কণ্ঠস্বর। তিনি বিংশ শতাব্দীর উর্দু সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র—কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ। উপস্থিত সুধী, ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ ১৯১১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি অবিভক্ত ভারতের শিয়ালকোটে জন্মগ্রহণ করেন। আজকের এই ভাষা আন্দোলনের দেশে দাঁড়িয়ে অনেকে হয়তো অবাক হয়ে ভাবতে পারেন যে, কেন আমরা একজন উর্দু কবিকে উদযাপন করছি। তাঁদের উদ্দেশ্যে আমাদের গুরুকুলের স্পষ্ট অবস্থান হলো—আমাদের ভাষা হিসেবে উর্দুর সাথে কোনো শত্রুতা নেই। আমরা ভাষা আন্দোলন করেছিলাম আমাদের মায়ের ভাষা বাংলার অধিকার প্রতিষ্ঠায়, উর্দুর বিরুদ্ধে নয়। ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ এমন একজন কবি, যিনি প্রগতিশীল লেখক আন্দোলনের তাঁর সময়ের সবচেয়ে বড় নাম। তিনি সবসময় মানবতা, বন্ধুত্ব (দোস্তি), উদারতা (দিলবারি) এবং অকৃত্রিম বন্ধুত্বের (খুলুস) কথা বলেছেন। তিনি ছিলেন একাধারে প্রেমের ও বিপ্লবের সব্যসাচী কবি। ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ তাঁর আদর্শের কারণে পাকিস্তানে কখনও ক্ষমতার আশ্রয়ে থাকতে পারেননি। সত্য ও ন্যায়ের কথা বলায় জীবনের দীর্ঘ সময় তাঁকে কাটাতে হয়েছে কারান্তরালে অথবা নির্বাসনে। কিন্তু কোনো প্রাচীরই তাঁর কলমকে স্তব্ধ করতে পারেনি। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এদেশের মানুষের ওপর হওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সোচ্চার। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে এসে তিনি লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা— “হাম কে ঠ্যাহরে আজনবি ইতনি মুদারাতোঁ কে বাদ” (অর্থাৎ: এত খাতির-যত্নের পরও আমরা যেন আজব এক ভিনদেশি হয়ে রইলাম।) তাঁর জনপ্রিয় সৃষ্টিগুলো আজও সারা বিশ্বে মানুষের হৃদয়ে গেঁথে আছে। তাঁর কালজয়ী গান ও কবিতার কিছু পঙক্তি আজও আমাদের রক্তে শিহরণ জাগায়: “মুঝসে পহলি সি মহব্বত মেরে মেহবুব না মাঙ” “হাম দেখেঙ্গে, লাজিম হ্যায় কে হাম ভি দেখেঙ্গে” তাঁর শেকড় সন্ধানী মনন প্রেম, প্রকৃতি ও দ্রোহকে এক সুতোয় গেঁথেছিল। তিনি কেবল একজন কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন বিশাল হৃদয়ের মানুষ, যিনি রাজকীয় বিলাসিতা ছেড়ে মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইকে আপন করে নিয়েছিলেন। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার কবির নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই প্রগতিশীল শিল্পীর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের আদর্শ ও মানবিকতাকে ভুলে না যাই। কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ তাঁর অবিনশ্বর কর্মের মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা
কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা

কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ আমরা এমন এক ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি ছিলেন একাধারে বরেণ্য কবি, উচ্চপদস্থ আমলা এবং বাংলাদেশের কৃষি ও পানিসম্পদ মন্ত্রী। তাঁর শব্দচয়ন ও কাব্যশৈলী বাংলা সাহিত্যকে দিয়েছে এক অনন্য মাত্রা। তিনি আমাদের লোকজ ঐতিহ্যের সার্থক রূপকার—কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ। উপস্থিত সুধী, কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ ১৯৩৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার অন্তর্গত বহেরচর ক্ষুদ্রকাঠি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আব্দুল জব্বার খান ছিলেন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সাবেক স্পিকার। কবির পুরো নাম ছিল আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ খান। তিনি কেবল একজন কবিই ছিলেন না, তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর শিক্ষা লাভ করেছিলেন এবং সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ছিলেন। কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর যাপিত জীবন ছিল বৈচিত্র্যপূর্ণ। তিনি ১৯৫৪ সালে সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তানে (CSP) যোগ দেন এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকারের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এত বড় প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের মাঝেও কবিতার জগত থেকে তিনি কখনো বিচ্ছিন্ন হননি। তাঁর কবিতায় ফুটে উঠেছে আবহমান বাংলার গ্রামীণ জীবন, মানুষের লড়াই এবং শেকড়ের গভীর টান। অনেকে মনে করেন আধুনিক বাংলা কবিতায় তিনি এক নতুন ধারার প্রবর্তন করেছিলেন। তাঁর রচিত ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’ কবিতাটি বাংলাদেশের সাহিত্য ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় মাইলফলক। কবির উচ্চারণ— “আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি, তাঁর করতলে পলিমাটির সৌরভ ছিল…”—আমাদের ঐতিহ্যের প্রতি দায়বদ্ধতা মনে করিয়ে দেয়। তাঁর ‘সাত নরী হার’ কিংবা ‘বৃষ্টি ও রৌদ্রের জন্য প্রার্থনা’ কাব্যগ্রন্থগুলো বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। মজার ব্যাপার হলো, তাঁর অনেক পাঠক হয়তো জানেন না যে, তিনি পেশাদার জীবনে সফল কূটনীতিক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এবং ইউনেস্কোর এশিয়া-পশান্ত অঞ্চলের পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর শেকড় সন্ধানী মনন প্রশাসন ও শিল্পকে এক সুতোয় গেঁথেছিল। প্রিয় সুধী, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ তাঁর অসামান্য সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৯ সালে ‘একুশে পদক’ এবং ১৯৮৫ সালে ‘বাংলা একাডেমি পুরস্কার’ লাভ করেন। তাঁর প্রতিটি সৃষ্টিতে তিনি দেশপ্রেম ও ঐতিহ্যের জয়গান গেয়েছেন। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার কবির নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই প্রজ্ঞাবান কবির জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের শেকড়কে ভুলে না যাই। কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ ২০০১ সালের ১৯ মার্চ ইন্তেকাল করেন। তিনি তাঁর কালজয়ী কর্মের মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা
কবি পূর্ণেন্দুশেখর পত্রীর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা

কবি পূর্ণেন্দুশেখর পত্রীর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে বিভিন্ন আয়োজনের পাশাপাশি এই বিশেষ বক্তৃতাটি সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য তুলে ধরা হলো। সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ আমরা এমন এক বিরল বহুমুখী প্রতিভার জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি একাধারে কবি, প্রচ্ছদশিল্পী, চিত্রপরিচালক, গবেষক এবং প্রাবন্ধিক। বাংলা শিল্প-সাহিত্যের আকাশে তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যার সৃজনশীলতার আলো আজ অবধি আমাদের পথ দেখায়। তিনি আমাদের সকলের প্রিয় কবি—পূর্ণেন্দুশেখর পত্রী। উপস্থিত সুধী, পূর্ণেন্দুশেখর পত্রীর জন্ম ১৯৩১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলার শ্যামপুরের নাকোল গ্রামে। তাঁর পিতা পুলিনবিহারী পত্রী এবং মাতা নির্মলা দেবী। আজ তাঁর প্রয়াণের বহু বছর পরেও তিনি আমাদের মাঝে অম্লান তাঁর অবিনাশী সৃষ্টির মাধ্যমে। পূর্ণেন্দু পত্রী ছিলেন একাধারে সুনিপুণ প্রচ্ছদশিল্পী এবং সংবেদনশীল কবি। তাঁর ‘কথোপকথন’ কাব্যগ্রন্থটি বাংলা কবিতার ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল। ঘরোয়া চলন, অথচ গভীর ব্যঞ্জনা ছিল তাঁর কবিতার প্রধান শক্তি। প্রচ্ছদশিল্পে তিনি যে আধুনিকতা এবং নান্দনিকতার ছোঁয়া দিয়েছিলেন, তা আজও এ প্রজন্মের শিল্পীদের অনুপ্রেরণার উৎস। প্রিয় সুধী, কেবল কলম বা তুলি নয়, ক্যামেরার লেন্সেও তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী। চলচ্চিত্রকার হিসেবে তাঁর ‘স্ত্রীর পত্র’ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্প অবলম্বনে) চলচ্চিত্রটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে ব্যাপক সমাদৃত হয়েছিল। শ্রেষ্ঠ বাংলা ছবি হিসেবে এটি ২০তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে। এছাড়া তাঁর পরিচালিত ‘স্বপ্ন নিয়ে’, ‘মালঞ্চ’ এবং ‘ছেঁড়া তমসুক’ বাংলা সিনেমার ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য সংযোজন। কলকাতা নিয়ে তাঁর গবেষণা ও ঐতিহাসিক কাজগুলো আমাদের শেকড় চেনার পথে সহায়ক। তাঁর ‘বাঁকিমযুগ’ বিষয়ক গবেষণা এবং শিশুসাহিত্যিক হিসেবে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি ছদ্মনাম ‘সমুদ্রগুপ্ত’ হিসেবেও সাহিত্যচর্চা করেছেন। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার কবির নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর আত্মার শান্তি কামনায় সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই সব্যসাচী শিল্পীর জীবন থেকে সৃজনশীলতা ও শেকড় সন্ধানের শিক্ষা গ্রহণ করি। কবি পূর্ণেন্দুশেখর পত্রী তাঁর কর্মের মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা

সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ আমরা এমন এক মহান ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যাঁর নাম উচ্চারণ করলে আজও পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রেরণা জাগে। তিনি ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের কিংবদন্তি নায়ক, আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় ‘নেতাজি’ সুভাষচন্দ্র বসু। কর্মবৈচিত্র্য, অদম্য সাহস আর ত্যাগের মহিমায় তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের এক অতলস্পর্শী সব্যসাচী দেশপ্রেমিক। উপস্থিত সুধী, আজ একটি বিশেষ বিষয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন। সুভাষচন্দ্র বসুর জন্ম ১৮৯৭ সালের ২৩ জানুয়ারি উড়িষ্যার কটক শহরে। তাঁর পিতা জানকীনাথ বসু ছিলেন একজন খ্যাতিমান আইনজীবী এবং মাতা প্রভাবতী দেবী। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন এবং ১৯২০ সালে ইংল্যান্ডে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস (ICS) পরীক্ষায় চতুর্থ স্থান অধিকার করেছিলেন। কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের অধীনে চাকরি করার বিলাসিতা তাঁকে মোহাবিষ্ট করতে পারেনি। দেশমাতার মুক্তির নেশায় তিনি আইসিএস থেকে পদত্যাগ করে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন বীরত্বের প্রতীক। ১৯৩৮ ও ১৯৩৯ সালে তিনি দুবার ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। পরবর্তীকালে মতাদর্শগত পার্থক্যের কারণে তিনি কংগ্রেস ত্যাগ করে ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ গঠন করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন তিনি বিশ্বাস করতেন, সশস্ত্র সংগ্রাম ছাড়া ভারতের মুক্তি সম্ভব নয়। সেই সুদূর বার্লিন থেকে টোকিও পর্যন্ত তাঁর রোমাঞ্চকর যাত্রা আজও আমাদের শিহরিত করে। ১৯৪৩ সালে তিনি ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’-এর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং তাঁর অমর স্লোগান— “তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব”—কোটি কোটি মানুষের মনে স্বাধীনতার সূর্যোদয় ঘটিয়েছিল। অনেকে মনে করেন তাঁর জীবন কেবল যুদ্ধের কথা বলে, কিন্তু তাঁর চিন্তা ছিল অনেক গভীর। তিনি একটি এমন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতেন যেখানে কোনো জাত-পাত বা ধর্মের বৈষম্য থাকবে না। আজাদ হিন্দ ফৌজে তিনি সকল ধর্মের মানুষকে এক পতাকাতলে এনেছিলেন, যা মূলত আমাদের গুরুকুলের ‘প্লুরালিস্ট সোসাইটি’ বা বহুত্ববাদী সমাজেরই মূল ভিত্তি। মজার ব্যাপার হলো, আজও নেতাজির মহাপ্রয়াণ নিয়ে নানা বিতর্ক ও রহস্য বিদ্যমান। ১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট তাইহোকু বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যুর খবর প্রচার করা হলেও, অনেক ইতিহাসবিদ ও তাঁর অনুসারীরা তা মেনে নিতে পারেননি। তবে বিতর্ক যাই হোক, তাঁর আদর্শ ও সাহসের কাছে কোনো বিতর্কই বড় নয়। প্রিয় সুধী, আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়’। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার নেতাজির নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর ত্যাগ ও আদর্শ সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই বীর সেনানীর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের শেকড়কে ভুলে না যাই। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং দেশকে ভালোবাসার যে শিক্ষা তিনি দিয়ে গেছেন, তা যেন আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের পাথেয় হয়। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু তাঁর দেশপ্রেম ও অজেয় ইচ্ছাশক্তির মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা
কবি আজিজুর রহমান এর জন্ম জয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা

কবি আজিজুর রহমানের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। কবি আজিজুর রহমান এর জন্ম জয়ন্তী উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ আমরা এমন এক ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, যিনি একাধারে কবি, গীতিকার, সম্পাদক এবং নিবেদিতপ্রাণ নাট্য সংগঠক। কর্মবৈচিত্র্যের দিক দিয়ে তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের এক অতলস্পর্শী সব্যসাচী প্রতিভা। তিনি আমাদের প্রিয় কুষ্টিয়ার হাটশ হরিপুর গ্রামের সন্তান—কবি আজিজুর রহমান। উপস্থিত সুধী, আজ একটি বিশেষ বিষয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন। আমাদের জাতীয় মন ও মননের প্রতীক বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘চরিতাভিধান’ গ্রন্থে কবির জন্ম তারিখ দেখানো হয়েছে ১৮ জানুয়ারি, ১৯১৭। কিন্তু প্রকৃত তথ্য ও দালিলিক প্রমাণ অনুযায়ী তাঁর সঠিক জন্ম তারিখ ১৮ অক্টোবর, ১৯১৪। একটি জাতির ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে বাংলা একাডেমি এই ভুলের দায় এড়াতে পারে না। আমরা আশা করি, সত্য অনুসন্ধানের মাধ্যমে জাতির এই কীর্তিমান লেখকের সঠিক ইতিহাস বিশ্বদরবারে যথাযথভাবে উপস্থাপিত হবে। কবি আজিজুর রহমান জন্মেছিলেন এক প্রভাবশালী জমিদার পরিবারে। সেই সময়ের জমিদারদের জীবন-জৌলুস ছিল কিংবদন্তি সমান। কিন্তু কোনো মোহ তাঁকে আবিষ্ট করতে পারেনি। ফরাসি নাট্যকার জ্যাঁ জেঁনের মতো তিনিও যেন নিয়তিকে তুচ্ছ করে প্রান্তিক মানুষের সাথে গড়ে তুলেছিলেন সুনিবিড় সখ্য। সেই আভিজাত্য ত্যাগ করেই তিনি গড়ে তুলেছিলেন নাট্যদল, নিজে করেছেন অভিনয়। গণমানুষের সাথে তাঁর এই নিবিড় সম্পর্কই তাঁকে করেছে গণমানুষের কবি। অনেকে মনে করেন কবির চেয়ে তাঁর গীতিকার পরিচয়টি অনেক বড়। যদিও বলা হয় তিনি দুই হাজার গান লিখেছেন, কিন্তু তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায় তাঁর গানের সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। বাংলা চলচ্চিত্রের যখন স্বর্ণযুগ, তখন আজিজুর রহমানের গান সেই স্বর্ণযুগের সোনার প্রতিমায় নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছিল। আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে তাঁর সেই কালজয়ী সৃষ্টিসমূহ: “আমি রূপ নগরের রাজকন্যা রূপের জাদু এনেছি” “বুঝি না মন যে দোলে বাঁশির সুরে” “ভবের নাট্যশালায় মানুষ চেনা দায় রে” “কারো মনে তুমি দিও না আঘাত, সে আঘাত লাগে কাবার ঘরে” মজার ব্যাপার হলো, যে গানগুলো দশকের পর দশক মানুষের হূদয়ে গেঁথে আছে, সেই গানের গীতিকার যে আজিজুর রহমান—তা হয়তো অনেকেরই অজানা। পরাধীন মাতৃভূমির স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর গান মুক্তিযোদ্ধাদের মনে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তুলেছিল। “মুজিব এনেছে বাংলাদেশের নতুন সূর্যোদয়” কিংবা “পলাশ ঢাকা কোকিল ডাকা আমারই দেশ ভাই রে”—গানগুলো আমাদের জাতীয় চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এছাড়া জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের পর ইসলামী সংগীত রচনায় কবি আজিজুর রহমানের অসামান্য অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর শেকড় সন্ধানী মনন প্রেম, প্রকৃতি ও দেশপ্রেমকে এক সুতোয় গেঁথেছিল। প্রিয় সুধী, আজিজুর রহমান তাঁর ‘ডাইনোসরের রাজ্যে’, ‘জীবজন্তুর কথা’ কিংবা ‘এই দেশ এই মাটি’র মতো জনপ্রিয় গ্রন্থগুলোর মাধ্যমে আমাদের সাহিত্যভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন। তিনি কেবল একজন শিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন বড় মনের মানুষ, যিনি জমিদারি বিলাসিতা ছেড়ে মানুষের দুঃখ-বেদনাকে আপন করে নিয়েছিলেন। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর সব সময় বলেন— ‘বড় মানুষদের সম্পর্কে জানো, তাঁদের নিয়ে পড়ো, তাঁদের কথা ভাবো এবং তাঁদের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ো, প্রার্থনা করো। এটা এজন্য নয় যে এতে তাঁদের উপকার হবে; বরং পড়ো তোমার নিজের জন্য, যেন ওইসব খুবসুরত আলোকিত নামের আলোকরশ্মি তোমার মনের ওপর পড়ে এবং তোমার জীবন আলোকিত হয়‘। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে বারবার কবির নাম নিই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানি এবং তাঁর জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা করি। আর সেই সাথে অঙ্গীকার করি—আমরা যেন এই সব্যসাচী শিল্পীর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের শেকড়কে ভুলে না যাই। কবি আজিজুর রহমান তাঁর কর্মের মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা
পৌষ সংক্রান্তি ও সাকরাইন উৎসব উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা
পৌষ সংক্রান্তি ও সাকরাইন উৎসব উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকল আয়োজনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা করে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তৃতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করে রাখা হলো। পৌষ সংক্রান্তি ও সাকরাইন উৎসব উদযাপন উপলক্ষে বক্তৃতা সম্মানিত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সবাইকে গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই পৌষের হিমেল শুভেচ্ছা এবং সাকরাইনের উষ্ণ অভিনন্দন। আজ এক বর্ণিল দিন। আজ আমরা এমন এক উৎসব উদযাপন করতে সমবেত হয়েছি, যা আমাদের হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির এক বর্ণাঢ্য বহিঃপ্রকাশ। পৌষ মাসের শেষ দিনে বাঙালির ঘরে ঘরে পালিত হয় ‘পৌষ সংক্রান্তি’, যা পুরান ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ‘সাকরাইন’ নামে এক মহোৎসবে রূপ নেয়। ইংরেজি পঞ্জিকা মতে, প্রতি বছর ১৪ বা ১৫ই জানুয়ারি এই উৎসব উদযাপিত হয়। উপস্থিত সুধী, পৌষ সংক্রান্তি মূলত ফসলের উৎসব, এক ঋতু থেকে অন্য ঋতুতে পদার্পণের সন্ধিক্ষণ। আমাদের কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে এই দিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে নতুন ধানের চাল দিয়ে তৈরি হয় হরেক রকমের পিঠা-পুলি—পাটিসাপটা, চিতই, তিলপুলি আর দুধ-পুলি। গুড় আর নারিকেলের ম ম গন্ধে ভরে ওঠে চারপাশ। শীতের এই পিঠা উৎসব বাঙালির পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করে। অন্যদিকে, এই উৎসবেরই একটি রোমাঞ্চকর দিক হলো ‘সাকরাইন’। বিশেষ করে পুরান ঢাকার আকাশ এই দিনে রঙিন হয়ে ওঠে হাজার হাজার ঘুড়িতে। নাটাই-সুতা নিয়ে ছাদে ছাদে চলে ঘুড়ি কাটাকাটির লড়াই। সন্ধ্যায় আতশবাজি আর ফানুসের আলোয় আলোকিত হয় রাতের আকাশ। সাকরাইন কেবল একটি স্থানীয় উৎসব নয়, এটি বাঙালির আনন্দপ্রিয়তা এবং সাহসিকতার প্রতীক। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রতিকূলতার সুতোয় টান পড়লেও আমরা আকাশের মতো বিশাল আর ঘুড়ির মতো স্বাধীন হতে জানি। প্রিয় সুধী, সংস্কৃতিই একটি জাতির প্রাণ। আজকের আধুনিক যুগে যখন আমরা বিশ্বজনীন হওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, তখন এই দেশীয় উৎসবগুলোই আমাদের আত্মপরিচয় টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে। আমাদের গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর প্রায়শই একটি অত্যন্ত গভীর কথা বলেন— “প্রতিজন মানুষের নৃতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় এমন এক ধরণের পরিচয় যা বদলানো যায় না। একজন মানুষ তার নিজের সেই সংস্কৃতি যখন চর্চা করে এবং তা উন্নত করতে কাজ করে, তখন সেই সংস্কৃতি তাকে পরিপূর্ণ এবং ‘ওয়েল ফর্মড’ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করে। আপনি নিজের সংস্কৃতির সাথে যুক্ত থাকলে বিশ্বের অন্য জাতিগোষ্ঠীর কাছে সম্মানিত হবেন। কিন্তু নিজের সংস্কৃতি বাদ দিয়ে অন্য সংস্কৃতির চর্চা করলে তা কখনোই আপনাকে পূর্ণ মানুষ হতে দেবে না। তাই আমরা বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতিগুলোর চর্চা ও প্রতিনিয়ত উন্নয়ন করতে কাজ করতে চাই।” সেই দর্শনে দীক্ষিত হয়েই আমরা আজ এই সুন্দর আয়োজনে আমাদের কৃষ্টিকে নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করি। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের এই পিঠা-পুলি আর ঘুড়ি ওড়ানোর উৎসব কোনো ধর্মের বা গোষ্ঠীর নয়; বরং এটি সর্বজনীন বাঙালির ঐতিহ্য। আমরা যখন বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চাই, তখন আমাদের এই অনন্য সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। সেই রেওয়াজে আমরা আজ এই পৌষ সংক্রান্তি ও সাকরাইন উৎসবে আমাদের সকলের সমৃদ্ধি কামনা করি এবং বাংলার প্রতিটি ঘরে খুশির আমেজ বয়ে যাওয়ার প্রার্থনা করি। আসুন, আমরা অঙ্গীকার করি—আমরা যেন আধুনিকতার ভিড়ে আমাদের শেকড় আর আমাদের ঐতিহ্যের এই সুন্দর বাংলাকে কখনো হারিয়ে যেতে না দিই। সংক্রান্তির এই মিষ্টি রোদে আর সাকরাইনের রঙিন আকাশে প্রতিটি বাঙালির জীবন আনন্দময় হয়ে উঠুক। ধন্যবাদ সবাইকে। জয় বাংলা! জয় গুরুকুল! আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা
১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস রচনা: বাঙালির শৌর্য ও আত্মপরিচয়ের মহাকাব্য

বিজয় মানেই আনন্দ, বিজয় মানেই সার্থকতা। তবে বাঙালির কাছে ‘বিজয়’ শব্দটি কেবল একটি শব্দ নয়, এটি কোটি প্রাণের আকুতি, নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম এবং ৩০ লক্ষ শহিদের পবিত্র রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এক মহিমান্বিত বাস্তবতা। প্রতিটি স্বাধীন জাতির ইতিহাসে একটি দিন থাকে যা তাদের আত্মমর্যাদাকে হিমালয়ের চূড়ার মতো উঁচুতে তুলে ধরে; বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই দিনটি হলো ১৬ই ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের এই দিনে পৃথিবীর মানচিত্রে সগৌরবে উদিত হয়েছিল এক নতুন সূর্য, যার নাম ‘বাংলাদেশ’। বিজয়ের এই দিনটি বাঙালির জাতীয় জীবনের শ্রেষ্ঠতম অর্জন এবং সার্বভৌমত্বের চিরস্থায়ী স্মারক। বাংলাদেশের বিজয় দিবস ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের জাতীয় বিজয় দিবস। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৭১-এর উত্তাল দিনগুলোর পরিক্রমায় এই বিজয় ছিল অবধারিত। দীর্ঘ নয় মাস পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পৈশাচিক বর্বরতা, লুণ্ঠন আর ধ্বংসযজ্ঞের অবসান ঘটেছিল এই দিনে। ১৬ই ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে বাঙালি জাতি দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে মুক্তির স্বাদ গ্রহণ করে। এটি যেমন আনন্দের দিন, তেমনি আমাদের অশ্রুসিক্ত কৃতজ্ঞতার দিন—যেখানে মিশে আছে অগণিত মা-বোনের সম্ভ্রম হারানো বেদনা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের মহিমা। ঐতিহাসিক পটভূমি ও শোষণের ইতিহাস বাঙালির এই বিজয়ের ইতিহাস একদিনে রচিত হয়নি। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ব্রিটিশদের বিদায়ের পর জন্ম নেয় ভারত ও পাকিস্তান। অদ্ভুত ভৌগোলিক কাঠামো নিয়ে গঠিত পাকিস্তানের দুটি অংশের মধ্যে কৃষ্টি, কালচার ও ভাষায় আকাশ-পাতাল পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও কেবল ধর্মের দোহাই দিয়ে আমাদের শাসন করা শুরু হয়। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী শুরু থেকেই পূর্ব পাকিস্তানকে (বর্তমান বাংলাদেশ) তাদের উপনিবেশ হিসেবে গণ্য করতে থাকে। মোট জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশ বাঙালির মাতৃভাষা বাংলাকে উপেক্ষা করে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ৫২-র রক্তঝরা ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি প্রথম বুঝতে পারে, এই পাকিস্তান রাষ্ট্রে তাদের ভাগ্য কেবল শোষিত হওয়া। এরপর ৫৪-র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬-র ঐতিহাসিক ছয় দফা—যা ছিল বাঙালির মুক্তির সনদ, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং সবশেষে ৭০-এর সাধারণ নির্বাচন। সত্তরের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলেও পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিবর্তে বাঙালির ওপর হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে। ২৫শে মার্চের কালোরাত ও স্বাধীনতার ঘোষণা ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ দিবাগত রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যা শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস ও পিলখানাসহ সারা দেশে নিরস্ত্র মানুষের ওপর ট্যাংক ও মেশিনগান নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা। এই চরম মুহূর্তে ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। এরপর শুরু হয় বাঙালির মরণপণ প্রতিরোধ যুদ্ধ। গ্রাম থেকে শহরে, কৃষক থেকে ছাত্র—সবাই পরিণত হয় এক একজন যোদ্ধায়। ভারতের মিত্রবাহিনীর সহযোগিতায় এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অসীম সাহসিকতায় যুদ্ধ চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়। ১৬ই ডিসেম্বর: একাত্তরের সেই মহিমান্বিত বিজয়োল্লাস ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বিকেল ৪টা ৩১ মিনিট। ঢাকার রেসকোর্স ময়দান তখন জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। একদিকে পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রধান জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি, আর অন্যদিকে বিজয়ী বীরের বেশে মিত্রবাহিনীর প্রধান জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। ৯১,৬৩৪ জন পাকিস্তানি সৈন্যের এই প্রকাশ্য আত্মসমর্পণ ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর ইতিহাসে বৃহত্তম আত্মসমর্পণ। সেই মুহূর্তটি ছিল বাঙালির সাত কোটি মানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। আকাশ-বাতাস বিদীর্ণ করে তখন একটাই স্লোগান প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল— “জয় বাংলা”। ঘরে ফেরা মুক্তিযোদ্ধাদের আলিঙ্গন করতে মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিল। লাল-সবুজের পতাকা হাতে সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য! স্বজন হারানোর হাহাকার ছাপিয়ে সেদিন বাঙালির চোখে ছিল নতুন এক দেশ গড়ার রঙিন স্বপ্ন। বিজয় দিবসের উদযাপন ও রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা প্রতি বছর ১৬ই ডিসেম্বর সমগ্র বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিজয় দিবস পালিত হয়। ১৫ই ডিসেম্বর রাত ১২টা ১ মিনিটে তোপধ্বনির মাধ্যমে দিবসের সূচনা হয়। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে জাতি বীর শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানায়। এদিন রাজধানী ঢাকার তেজগাঁওস্থ জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে সশস্ত্র বাহিনীর কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়, যা আমাদের সামরিক সক্ষমতা ও শৃঙ্খলার বহিঃপ্রকাশ। দেশের প্রতিটি স্কুল, কলেজ, অফিস ও ভবনে এদিন জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। লাল ও সবুজের আলোকসজ্জায় সজ্জিত হয় সারা দেশ। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো আয়োজন করে বিজয় মেলা ও দেশাত্মবোধক গানের অনুষ্ঠান। এটি কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি বাঙালির অস্তিত্বের নবায়ন। বিজয় দিবসের তাৎপর্য ও জাতীয় চেতনা বিজয় দিবসের তাৎপর্য বহুমুখী। এটি আমাদের আত্মপরিচয়ের দিন। এই বিজয় আমাদের শিখিয়েছে যে, ঐক্যবদ্ধ শক্তির কাছে কোনো আধুনিক অস্ত্রই টিকতে পারে না। এটি একটি শোষিত জাতির মুক্তি সংগ্রামের সফল মহাকাব্য। বিজয় দিবস উদযাপনের মাধ্যমে আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন করি। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, যে স্বাধীনতায় আমরা আজ নিশ্বাস নিচ্ছি, তা লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে কেনা। তাই এই সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের সবার। তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা ও বিজয় দিবসের চেতনা বিজয় দিবসের প্রকৃত চেতনা কেবল উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ভাষায়: ‘সাবাস বাংলাদেশ! এ পৃথিবী- অবাক তাকিয়ে রয় জ্বলে-পুড়ে-মরে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়।’ আমাদের তরুণ প্রজন্মকে এই মাথা না নোয়াবার মন্ত্রে দীক্ষিত হতে হবে। আজকের তরুণরাই ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার মূল কারিগর। বিজয়ের ৫৪ বছর পর আমাদের চ্যালেঞ্জ ভিন্ন—এখন লড়াই করতে হবে দারিদ্র্য, দুর্নীতি, অশিক্ষা ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে। তরুণদের উচিত মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের কথা মাথায় রেখে দেশপ্রেমকে হৃদয়ে ধারণ করা। প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় বিশ্বদরবারে বাংলাদেশকে একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করার মধ্য দিয়েই বিজয়ের প্রকৃত সার্থকতা নিহিত। জাতীয় কর্তব্য: ইতিহাস সংরক্ষণ ও সচেতনতা আমাদের জাতীয় কর্তব্য হলো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করা। প্রতিটি লাইব্রেরি, স্কুল ও পরিবারে মুক্তিযুদ্ধের দলিল ও স্মৃতি সংরক্ষণ করতে হবে। যারা স্বাধীনতার বিরোধী শক্তি এবং যারা ইতিহাসের মিথ্যাচার করে, তাদের চিহ্নিত করে নতুন প্রজন্মকে সতর্ক রাখা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। বিজয়ের সঠিক ইতিহাস সংরক্ষিত না থাকলে জাতির মেরুদণ্ড দুর্বল হয়ে পড়ে। উপসংহার বিজয় দিবস বাঙালির জীবনে একই সাথে আনন্দের উৎসব এবং পরম শ্রদ্ধার একটি দিন। এই দিনটি আমাদের জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। ৩০ লক্ষ শহীদ এবং ২ লক্ষ মা-বোনের ত্যাগের মহিমা আমাদের প্রতিটি কাজে প্রেরণা জোগায়। আমরা যেন কেবল একটি মানচিত্র আর পতাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকি, বরং যে শোষণমুক্ত ও সাম্যবাদী সমাজের স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু দেখেছিলেন, তা বাস্তবায়নে সচেষ্ট হই। প্রিয় মাতৃভূমির মর্যাদা রক্ষায় বিজয়ের আলোকবর্তিকা যেন প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে চিরকাল প্রজ্জ্বলিত থাকে। জয় বাংলা, বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।
শারদীয় দুর্গাপূজা ২০০৯ উপলক্ষে ছুটি নোটিশ

বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার মহালগ্নে ‘বিজয়া দশমী’ উপলক্ষে ‘গুরুকুল কুষ্টিয়া ক্যাম্পাস’-এ আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর ২০০৯ (সোমবার) সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এই দিন প্রতিষ্ঠানের সকল একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। প্লুরালিস্ট সোসাইটি ও গুরুকুলের জীবনদর্শন গুরুকুল কুষ্টিয়া ক্যাম্পাস একটি ‘প্লুরালিস্ট সোসাইটি’ বা বহুত্ববাদী সমাজ বিনির্মাণে বিশ্বাসী। গুরুকুল মনে করে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আঙিনা হবে এমন এক মিলনমেলা যেখানে সকল ধর্ম, বর্ণ ও মতের মানুষ তাদের স্ব-স্ব বিশ্বাস ও সংস্কৃতি নিয়ে অত্যন্ত মর্যাদার সাথে সহাবস্থান করবে। শারদীয় দুর্গাপূজার এই ছুটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং প্রতিটি সম্প্রদায়ের উৎসবকে সম্মান জানানোর মাধ্যমে সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধন সুদৃঢ় করার একটি সনিষ্ঠ প্রয়াস। ছুটির বিস্তারিত সময়সূচী প্রশাসন বিভাগ কর্তৃক জারিকৃত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী: ছুটির তারিখ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০০৯ (সোমবার)। কার্যক্রম পুনরায় শুরু: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০০৯ (মঙ্গলবার) থেকে ক্যাম্পাসের সকল ক্লাস, পরীক্ষা এবং দাপ্তরিক কাজ পূর্বনির্ধারিত সময়সূচী অনুযায়ী যথারীতি পরিচালিত হবে। নিরাপত্তা ও ভ্রাতৃত্বের নির্দেশনা উৎসবকালীন সময়ে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও উৎসবের পবিত্রতা বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। বিজ্ঞপ্তি অনুসারে, সকল শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মীকে নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণভাবে উৎসব উদযাপনের জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে। গুরুকুল বিশ্বাস করে, উৎসবের আনন্দ যখন বৈষম্যহীনভাবে সকলের মাঝে ভাগ করে নেওয়া হয়, তখনই একটি সুন্দর ও সহনশীল সমাজ গড়ে ওঠে। কর্তৃপক্ষের বার্তা গুরুকুল কুষ্টিয়া ক্যাম্পাসের প্রশাসন বিভাগ জানিয়েছে, “গুরুকুল পরিবার বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যে বিশ্বাস করে। আমাদের ক্যাম্পাসে সব ধর্মের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানই আমাদের প্রকৃত শিক্ষার পরিচয়। বিজয়া দশমীর এই পুণ্য তিথিতে আমরা সকল ধর্মাবলম্বীদের মাঝে মৈত্রী ও সংহতির জয়গান গাই।” গুরুকুল কুষ্টিয়া ক্যাম্পাস পরিবারের পক্ষ থেকে কুষ্টিয়াবাসীসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে শারদীয় দুর্গাপূজা ও বিজয়া দশমীর আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানানো হয়েছে। আরও দেখুন: গুরুকুল ক্যাম্পাসে দ্বীন ও ধর্ম বিষয়ক নীতিমালা
১২ মে: আন্তর্জাতিক নার্স দিবস রচনা: সেবার মহান ব্রত ও মানবিকতার জয়গান

“সেবাই পরম ধর্ম”—এই নীতিকে ধারণ করে যারা নিভৃতে আর্তমানবতার সেবা করে যান, তারা হলেন নার্স বা সেবিকা। আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং হাসপাতালের প্রাণকেন্দ্র হলো নার্সিং পেশা। একজন চিকিৎসকের পরামর্শে রোগ নির্ণয় হতে পারে, কিন্তু সেই রোগীকে মমতায় আগলে রেখে সুস্থ করে তোলার প্রধান কারিগর হলেন নার্সরা। প্রতি বছর ১২ মে বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালিত হয় ‘আন্তর্জাতিক নার্স দিবস’। এটি কেবল একটি দিবস নয়, বরং পৃথিবীর লাখো সেবিকাদের ত্যাগ, ধৈর্য এবং অসীম সাহসিকতাকে সম্মান জানানোর একটি আন্তর্জাতিক প্লাটফর্ম। আর্তের সেবা ও মুমূর্ষুর জীবন রক্ষায় নার্সদের যে নিরলস ভূমিকা, তা এই দিবসের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করা হয়। ঐতিহাসিক পটভূমি: ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল ও নার্সিংয়ের সূচনা আন্তর্জাতিক নার্স দিবসের ইতিহাস ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে আধুনিক নার্সিংয়ের প্রবর্তক ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের নামের সাথে। ১৮২০ সালের ১২ মে ইতালির ফ্লোরেন্স শহরে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মদিনটিকে চিরস্মরণীয় করে রাখতেই ১৯৬৫ সাল থেকে ‘ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অফ নার্সেস’ (ICN) এই দিনটিকে নার্স দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। নাইটিঙ্গেলের অবদান চিরভাস্বর হয়ে ওঠে ১৮৫৪ সালের ক্রিমিয়ার যুদ্ধের সময়। সেই ভয়াবহ যুদ্ধে আহত সৈন্যদের করুণ অবস্থা দেখে তিনি বিচলিত হন এবং ৩৮ জন সেবিকা নিয়ে তুরস্কের স্কুটারি হাসপাতালে সেবা শুরু করেন। সেই সময়ে হাসপাতালের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর। নাইটিঙ্গেল নিজের হাতে হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করেন এবং রাত জেগে প্রদীপ হাতে আহত রোগীদের সেবা দিতেন। এ থেকেই তাঁর নাম হয় ‘লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প’ বা ‘প্রদীপ হাতে সেই নারী’। তাঁর এই মহৎ উদ্যোগের ফলে হাসপাতালে মৃত্যুর হার দুই-তৃতীয়াংশ কমে যায়। যুদ্ধের পর তিনি নার্সিংকে একটি বিজ্ঞানসম্মত পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে লন্ডনে ‘নাইটিঙ্গেল ট্রেনিং স্কুল ফর নার্সেস’ প্রতিষ্ঠা করেন। সেবার মহত্ত্ব ও মানবিক মূল্যবোধ নার্সিং পেশা কেবল একটি কর্মসংস্থান নয়, এটি একটি মানবিক সাধনা। একজন নার্সকে ধৈর্য, সহনশীলতা এবং গভীর সহমর্মিতার অধিকারী হতে হয়। হাসপাতালের চার দেয়ালের মাঝে যেখানে স্বজনরাও অনেক সময় রোগীর কাছে যেতে দ্বিধা করেন, সেখানে নার্সরা পরম মমতায় রোগীর মল-মূত্র পরিষ্কার থেকে শুরু করে ওষুধ সেবন নিশ্চিত করেন। তাদের একটি মিষ্টি কথা আর হাসিমুখ অনেক সময় বড় কোনো ওষুধের চেয়েও বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে। মৃত্যুশয্যায় থাকা রোগীর শেষ ভরসা এবং সুস্থ হয়ে ওঠা রোগীর প্রথম কৃতজ্ঞতা—উভয় ক্ষেত্রেই নার্সদের অবস্থান শীর্ষে। তারা অসুস্থ মানুষের শারীরিক যন্ত্রণার পাশাপাশি মানসিক যন্ত্রণারও উপশম করেন। চিকিৎসা ব্যবস্থায় নার্সদের অপরিহার্য ভূমিকা আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাফল্য অনেকাংশেই দক্ষ নার্সদের ওপর নির্ভরশীল। একজন চিকিৎসক প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে রাউন্ডে আসেন, কিন্তু একজন নার্স ২৪ ঘণ্টা রোগীর পাশে থেকে তাঁর প্রতিটি মুহূর্তের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করেন। রক্তচাপ পরিমাপ, ইনজেকশন দেওয়া, ড্রেসিং করা এবং জরুরি অবস্থায় প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদানের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলো নার্সরাই পালন করেন। বিশেষ করে নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র (ICU) বা অপারেশন থিয়েটারে নার্সদের দক্ষতা ও ক্ষিপ্রতা রোগীর জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান গড়ে দেয়। নার্সিং ছাড়া একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতালের অস্তিত্ব কল্পনা করা অসম্ভব। করোনাকালে নার্সদের বীরত্ব: সম্মুখ সমরের যোদ্ধা সাম্প্রতিক সময়ে কোভিড-১৯ মহামারি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে নার্সরা সমাজের জন্য কতটা অপরিহার্য। যখন পুরো বিশ্ব ঘরবন্দি ছিল এবং প্রিয়জনরা একে অপরের থেকে দূরে সরে গিয়েছিল, তখন নার্সরা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পিপিই কিট পরে টানা কয়েক ঘণ্টা ডিউটি করেছেন। অনেক নার্স মাসের পর মাস পরিবারের সাথে দেখা করতে পারেননি কেবল রোগীদের সেবার কথা চিন্তা করে। মহামারির সময় অক্সিজেনের স্তর মেপে দেখা থেকে শুরু করে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ানো রোগীকে সাহস জোগানো—সবখানেই নার্সরা ছিলেন সম্মুখ সারির যোদ্ধা। এই লড়াইয়ে অনেক নার্স নিজেও সংক্রমিত হয়েছেন এবং প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন, যা ইতিহাসের পাতায় চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। নার্সিং পেশার চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবন্ধকতা নার্সিং পেশার মহত্ত্ব অনেক হলেও এই পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হন। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অতিরিক্ত কাজের চাপ এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব তাঁদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। অনেক সময় রোগীদের স্বজনদের ক্ষোভ বা দুর্ব্যবহারের শিকারও হতে হয় তাঁদের। এছাড়াও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নার্সিং পেশাকে এখনো যথাযথ সামাজিক মর্যাদা বা সম্মান দেওয়া হয় না। বেতন বৈষম্য এবং উন্নত প্রশিক্ষণের অভাব এই পেশার বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আন্তর্জাতিক নার্স দিবস আমাদের এই সমস্যাগুলো নিয়ে ভাববার এবং নার্সদের জন্য একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানায়। বাংলাদেশে নার্সিং পেশার চিত্র ও সম্ভাবনা বাংলাদেশে গত এক দশকে নার্সিং পেশার আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নার্সিং কলেজের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন শিক্ষিত ও মেধাবী তরুণ-তরুণীরা এই পেশায় এগিয়ে আসছে। বর্তমান সরকার নার্সদের দ্বিতীয় শ্রেণির পদমর্যাদা প্রদান করেছে, যা এই পেশার সামাজিক মর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে জনসংখ্যার তুলনায় এখনো নার্সদের সংখ্যা অত্যন্ত কম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একজন চিকিৎসকের বিপরীতে অন্তত ৩ জন নার্স থাকা প্রয়োজন, যা আমাদের দেশে এখনো নিশ্চিত হয়নি। দক্ষ নার্স তৈরি করতে পারলে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও প্রচুর জনশক্তি রপ্তানি করা সম্ভব, যা জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখবে। নার্সিংয়ের আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তি বর্তমান যুগে নার্সিং কেবল সেবাতেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি এখন অনেক বেশি প্রযুক্তি নির্ভর। আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার এবং ডিজিটাল ডেটা ম্যানেজমেন্ট সম্পর্কে নার্সদের জ্ঞান থাকা জরুরি। বিশ্ব নার্স দিবসের প্রতিপাদ্যগুলো প্রতি বছরই নার্সদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরে। ‘নার্সিং এডুকেশন’ এখন একটি উচ্চতর গবেষণার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। একজন দক্ষ নার্স কেবল সেবাই করেন না, তিনি রোগীর স্বাস্থ্যের মানোন্নয়নে বিজ্ঞানসম্মত পরামর্শও প্রদান করেন। উপসংহার নার্সরা হলেন মমতার প্রতীক এবং সেবার আলোকবর্তিকা। ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল যে প্রদীপ জ্বালিয়ে গিয়েছিলেন, সেই প্রদীপের আলো আজও বিশ্বজুড়ে লাখো সেবিকার মাধ্যমে প্রজ্জ্বলিত হচ্ছে। ১২ মে আন্তর্জাতিক নার্স দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত নার্সদের প্রাপ্য সম্মান ও অধিকার নিশ্চিত করা। কেবল একদিনের ফুলেল শুভেচ্ছা নয়, বরং তাঁদের কাজের সঠিক মূল্যায়ন এবং পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ করে দেওয়াই হোক এই দিবসের সার্থকতা। অসুস্থ মানুষের সেবায় যারা নিজের জীবন বিলিয়ে দেন, তাঁদের প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা। “সাদা পোশাকে যে মানুষগুলো দিনরাত যন্ত্রণার উপশম করেন, তাঁরাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানবতাবাদী। নার্সদের প্রতি আমাদের ভালোবাসা চিরকাল অটুট থাকুক।” নার্সদের ত্যাগ ও শ্রমকে সম্মান জানাই। শুভ নার্স দিবস!
৮ মে: বিশ্ব রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট দিবস রচনা: আর্তমানবতার সেবায় এক অনন্য অঙ্গীকার

“সেবা ও মানবতা”—এই দুটি শব্দই বিশ্ব রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট আন্দোলনের মূল ভিত্তি। পৃথিবীতে যখনই যুদ্ধ, বিগ্রহ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা মহামারি হানা দিয়েছে, তখনই সাদা পতাকায় লাল রঙের ক্রস বা ক্রিসেন্ট চিহ্নধারী একদল মানুষ নিঃস্বার্থভাবে আর্তমানবতার সেবায় এগিয়ে এসেছে। প্রতি বছর ৮ই মে বিশ্বব্যাপী পালিত হয় ‘বিশ্ব রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট দিবস’। এটি কেবল একটি দিবস নয়, বরং পৃথিবীর বৃহত্তম সেবামূলক আন্দোলনের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর দিন। আর্তের সেবা, মুমূর্ষুর প্রাণ রক্ষা এবং শান্তি ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে এই আন্দোলন আজ ১৯২টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ঐতিহাসিক পটভূমি: সলফেরিনোর যুদ্ধ ও হেনরি ডুনান্ট বিশ্ব রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট আন্দোলনের সূচনার ইতিহাস অত্যন্ত আবেগঘন। ১৮৫৯ সালের ২৪শে জুন ইতালির সলফেরিনো নামক স্থানে এক ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। সেই যুদ্ধে মাত্র কয়েক ঘণ্টায় প্রায় ৪০ হাজার সৈনিক আহত ও নিহত হন। যুদ্ধক্ষেত্রের সেই বীভৎস দৃশ্য দেখে শিউরে ওঠেন সুইজারল্যান্ডের তরুণ ব্যবসায়ী জঁ হেনরি ডুনান্ট। তিনি দেখলেন, আহত সৈনিকরা বিনা চিকিৎসায় ব্যথায় কাতরাচ্ছেন। ডুনান্ট তাঁর ব্যবসার কাজ ফেলে স্থানীয় গ্রামবাসীদের সহায়তায় জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আহতদের সেবা শুরু করেন। এই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি ১৮৬২ সালে ‘এ মেমোরি অফ সলফেরিনো’ (A Memory of Solferino) নামক একটি বই লেখেন। বইটিতে তিনি প্রস্তাব করেন—শান্তিকালীন সময়ে প্রতিটি দেশে এমন একটি সেবামূলক সংস্থা থাকা উচিত যারা যুদ্ধের সময় নিরপেক্ষভাবে আহতদের সেবা করবে। তাঁর এই মহৎ চিন্তা থেকেই ১৮৬৩ সালে জেনেভায় ‘আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি’ (ICRC) প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮২৮ সালের ৮ই মে হেনরি ডুনান্ট জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলে তাঁর জন্মদিনটিকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে প্রতি বছর এই দিনটি বিশ্বব্যাপী ‘রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট দিবস’ হিসেবে পালিত হয়। সাতটি মূলনীতি: আন্দোলনের পথপ্রদর্শক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট আন্দোলন সাতটি মৌলিক নীতির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। এই নীতিগুলোই একে পৃথিবীর অন্য সব সংস্থা থেকে আলাদা করেছে: ১. মানবতা: মানুষের কষ্ট লাঘব এবং জীবন রক্ষা করা। ২. পক্ষপাতহীনতা: ধর্ম, বর্ণ, জাতীয়তা বা রাজনৈতিক বিশ্বাসের ঊর্ধ্বে থেকে কেবল প্রয়োজনের ভিত্তিতে সেবা দেওয়া। ৩. নিরপেক্ষতা: কোনো রাজনৈতিক বা আদর্শিক বিতর্কে অংশ না নেওয়া। ৪. স্বাধীনতা: সরকারি ক্ষমতার প্রভাবমুক্ত থেকে নিজস্ব নীতিতে চলা। ৫. স্বেচ্ছাসেবা: কোনো লাভের আশা ছাড়া নিজেদের শ্রম ও সময় দেওয়া। ৬. একতা: প্রতিটি দেশে কেবল একটিই রেড ক্রস বা রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি থাকবে। ৭. সার্বজনীনতা: এই আন্দোলন বিশ্বজুড়ে সমান মর্যাদা ও দায়িত্ব বহন করে। প্রতীক বা চিহ্নের ইতিহাস: রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট প্রাথমিকভাবে এই আন্দোলনের প্রতীক ছিল সাদা জমিনের ওপর লাল রঙের প্লাস চিহ্ন বা ‘রেড ক্রস’, যা মূলত সুইজারল্যান্ডের পতাকার রঙের বিপরীত রূপ। তবে ১৮৭৬ সালে রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যে যুদ্ধের সময় মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে ক্রসের পরিবর্তে লাল রঙের চাঁদ বা ‘রেড ক্রিসেন্ট’ ব্যবহারের প্রচলন শুরু হয়। বর্তমানে অধিকাংশ মুসলিম প্রধান দেশ রেড ক্রিসেন্ট ব্যবহার করে, আর বাকি দেশগুলো রেড ক্রস ব্যবহার করে। তবে উভয় প্রতীকের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অভিন্ন—সেবা ও সুরক্ষা। কোনো দুর্যোগ বা যুদ্ধক্ষেত্রে এই প্রতীক ব্যবহারের অর্থ হলো সেই স্থান বা ব্যক্তিটি সম্পূর্ণ নিরাপদ ও নিরপেক্ষ। দুর্যোগ মোকাবিলায় অকুতোভয় ভূমিকা প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা মানবসৃষ্ট সংকট—সবখানেই রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্টের উপস্থিতি অনস্বীকার্য। ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প, বন্যা কিংবা অগ্নিকাণ্ডের মতো পরিস্থিতিতে এই সংস্থার স্বেচ্ছাসেবকরা সবার আগে দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তারা কেবল উদ্ধারকাজই করেন না, বরং অস্থায়ী আশ্রয়ণ কেন্দ্র নির্মাণ, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করেন। যুদ্ধের ময়দানে বন্দি বিনিময় এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার মতো কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজেও এই সংস্থাটি বিশ্বজুড়ে আস্থার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। রক্তদান ও জনস্বাস্থ্য রক্ষা বিশ্বজুড়ে নিরাপদ রক্ত সঞ্চালনে রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্টের ভূমিকা অতুলনীয়। মুমূর্ষু রোগীর প্রয়োজনে স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি পরিচালনা করা এই সংস্থার অন্যতম প্রধান কাজ। এছাড়া প্রাথমিক চিকিৎসা (First Aid) প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে জীবন রক্ষাকারী কৌশল শেখানো হয়। সংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধ, টিকাদান কর্মসূচি এবং করোনাকালীন মহামারিতে সচেতনতা বৃদ্ধিতে রেড ক্রিসেন্ট যে নিরলস পরিশ্রম করেছে, তা বৈশ্বিক স্বাস্থ্যখাতে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি: সেবার এক আলোকবর্তিকা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির অবদান অত্যন্ত গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় আহতদের সেবা ও শরণার্থীদের সহায়তার মধ্য দিয়ে এর যাত্রা শুরু হয়। ১৯৭৩ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদেশে ‘বাংলাদেশ রেড ক্রস সোসাইটি’ (পরবর্তীতে রেড ক্রিসেন্ট) আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পায়। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (CPP) পরিচালনায় রেড ক্রিসেন্টের ভূমিকা বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে। রোাহিঙ্গা শরণার্থী সংকট থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক প্রতিটি জাতীয় দুর্যোগে রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবকরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছেন। স্বেচ্ছাসেবার গুরুত্ব ও তরুণ সমাজ রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি হলো এর লক্ষ লক্ষ স্বেচ্ছাসেবক। কোনো বিনিময় বা বেতনের প্রত্যাশা না করে স্রেফ মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর এই মানবিক শিক্ষা তরুণ সমাজকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। স্কুল-কলেজে ‘জুনিয়র রেড ক্রিসেন্ট’ বা ‘যুব রেড ক্রিসেন্ট’-এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলি এবং সহমর্মিতা জাগ্রত করা হয়। এটি তরুণদের শেখায় কীভাবে একটি সুন্দর ও মানবিক সমাজ গঠন করা সম্ভব। শান্তি ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠায় অবদান শান্তি বজায় রাখা এবং জাতিগত বিভেদ দূর করা এই আন্দোলনের অন্যতম লক্ষ্য। যুদ্ধের ধ্বংসলীলার মাঝেও যারা সাদা পতাকা হাতে সেবার বার্তা নিয়ে আসেন, তারা মূলত মানুষকে ভালোবাসার শিক্ষা দেন। জঁ হেনরি ডুনান্টের সেই ছোট্ট উদ্যোগটি আজ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মানবিক নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। এই সংস্থার কর্মকাণ্ড কেবল সেবাতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। উপসংহার বিশ্ব রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মানুষের জন্য মানুষের ভালোবাসা অসীম। ৮ই মে তারিখটি আমাদের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন—সেই সব স্বেচ্ছাসেবকদের প্রতি যারা নিজের জীবন বাজি রেখে অন্যের মুখে হাসি ফোটান। বর্তমান অস্থির পৃথিবীতে যেখানে সংঘাত ও বিভেদ বাড়ছে, সেখানে হেনরি ডুনান্টের ‘আদর্শ’ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। আসুন, আমরা এই দিবসের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আর্তমানবতার সেবায় নিজেদের নিয়োজিত করি। মনে রাখতে হবে, আমাদের ছোট একটি সহানুভূতিশীল পদক্ষেপ কারো জীবনের শেষ ভরসা হয়ে উঠতে পারে। “মানুষের সেবাই হোক আমাদের শ্রেষ্ঠ ধর্ম; আর্তমানবতার জয় হোক সর্বত্র।” সেবার আদর্শে উদ্দীপ্ত হোক প্রতিটি প্রাণ।