১৪ এপ্রিল: পহেলা বৈশাখ রচনা: বাঙালির প্রাণস্পন্দন ও সর্বজনীন উৎসব

“মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা / অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।”—কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই অমোঘ আহ্বানের মধ্য দিয়েই বাঙালি বরণ করে নেয় তার নতুন বছরকে। পহেলা বৈশাখ কেবল একটি তারিখ নয়, বরং এটি বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং জাতিসত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি বাঙালির শ্রেষ্ঠ সর্বজনীন উৎসব, যেখানে ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সবাই এক কাতারে এসে দাঁড়ায়। পহেলা বৈশাখ আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমাদের শিকড়ের কথা, আমাদের নিজস্ব পঞ্জিকার কথা। বৈশাখের তপ্ত রোদ আর কালবৈশাখীর তাণ্ডব পেরিয়ে নতুনের কেতন উড়িয়ে আসা এই দিনটি বাঙালির জীবনে এক পরম আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে। ঐতিহাসিক পটভূমি: বঙ্গাব্দের প্রবর্তন বাংলা নববর্ষের সূচনার ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন ও কৌতূহল উদ্দীপক। ঐতিহাসিকভাবে এর প্রচলন নিয়ে বিভিন্ন মতভেদ থাকলেও, সম্রাট আকবরের সময়কাল থেকেই এটি সুসংহত রূপ পায় বলে অধিকাংশ ঐতিহাসিক মনে করেন। মূলত কর বা খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে সম্রাট আকবর প্রাচীন হিজরি ক্যালেন্ডারকে সংশোধন করে ‘ফসলি সন’ বা ‘বঙ্গাব্দ’ প্রবর্তন করেন। তৎকালে হিজরি পঞ্জিকা অনুযায়ী খাজনা আদায় করা হতো, যা চন্দ্রবর্ষ হওয়ার কারণে কৃষকদের ফসল কাটার সময়ের সাথে মিলত না। কৃষকদের এই দুঃখ লাঘব করতেই সম্রাটের নির্দেশে রাজজ্যোতিষী ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌর বছর ও চন্দ্র বছরের সমন্বয়ে বাংলা সনের উদ্ভব ঘটান। ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দ (হিজরি ৯৬৩) থেকে এই গণনা কার্যকর হলেও তা মূলত আকবরের সিংহাসন আরোহণের বছর (১৫৫৬) থেকেই গণনা শুরু হয়। হালখাতা: বাণিজ্যিক ঐতিহ্যের সেতুবন্ধন পহেলা বৈশাখের অন্যতম প্রধান অনুসঙ্গ হলো ‘হালখাতা’। এটি মূলত পুরানো বছরের হিসাব চুকিয়ে নতুন বছরের হিসাব শুরু করার একটি বাণিজ্যিক রীতি। গ্রামবাংলা থেকে শুরু করে শহরের ব্যবসায়ীরা এই দিনে তাদের দোকানপাটে ধূপ-ধুনা জ্বালিয়ে পবিত্র করেন এবং লাল কাপড়ে বাঁধানো নতুন খেরো খাতায় হিসাবের নতুন খতিয়ান খোলেন। হালখাতা উপলক্ষে ক্রেতাদের মিষ্টিমুখ করানো হয়, যা ব্যবসা ও গ্রাহকের মধ্যে একটি আত্মিক সম্পর্ক তৈরি করে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনেক কিছু পরিবর্তন হলেও আজও পুরান ঢাকার অলিগলি থেকে শুরু করে মফস্বলের বাজারে হালখাতার আমেজ ম্লান হয়নি। রমনার বটমূল ও ভোরের সুর বাঙালির নববর্ষ উদযাপনের আধুনিক ইতিহাসে ‘ছায়ানট’-এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। ১৯৬৭ সাল থেকে ঢাকার রমনা বটমূলে ছায়ানটের শিল্পীরা বৈশাখের ভোরে সম্মিলিত কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের “এসো হে বৈশাখ এসো এসো” গেয়ে নতুন বছরকে বরণ করে নেন। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের প্রতিবাদ হিসেবে এই আয়োজনের সূচনা হয়েছিল, যা আজ বাঙালির সাংস্কৃতিক জাগরণের প্রতীক। ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় শুভ্র পায়জামা-পাঞ্জাবি আর লাল-সাদা শাড়িতে সজ্জিত হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে রমনা প্রাঙ্গণ এক টুকরো বাংলাদেশে পরিণত হয়। মঙ্গল শোভাযাত্রা: বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পহেলা বৈশাখের এক অনন্য মাত্রা হলো ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। ১৯৮৯ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে এই শোভাযাত্রার যাত্রা শুরু হয়। অশুভকে বিদায় জানিয়ে শুভ শক্তির আবাহনই এর মূল লক্ষ্য। বড় বড় রঙিন মুখোশ, লোকজ পুতুল, মাছ, পাখি ও প্রতীকি হাতি-ঘোড়ার রেপ্লিকা নিয়ে এই মিছিলে অংশ নেয় সর্বস্তরের মানুষ। ২০১৬ সালে ইউনেস্কো এই মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ‘বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ (Intangible Cultural Heritage) হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে, যা আমাদের বাংলা নববর্ষকে আন্তর্জাতিক মণ্ডলে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এটি প্রমাণ করে যে বাঙালির সংস্কৃতি কেবল অঞ্চলের নয়, বরং সারা বিশ্বের সম্পদ। বৈশাখী মেলা: লোকজ সংস্কৃতির মিলনমেলা পহেলা বৈশাখের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো বৈশাখী মেলা। এটি যেন গ্রামবাংলার এক ভ্রাম্যমাণ জাদুঘর। মেলার মাঠগুলো মুখরিত থাকে নাগরদোলা, পুতুল নাচ আর লোকজ গানের সুরে। মাটির পুতুল, বাঁশের বাঁশি, কাঠের ঘোড়া, বেত ও পাটের তৈরি বিভিন্ন হস্তশিল্প এই মেলার প্রধান আকর্ষণ। এছাড়া মুড়ি-মুড়কি, বাতাসা, কদমা আর গরম জিলাপির মৌ মৌ গন্ধ মেলা প্রাঙ্গণকে মোহনীয় করে তোলে। এই মেলা কেবল কেনাবেচার স্থান নয়, বরং এটি গ্রামীণ জনপদের মানুষের মধ্যে সামাজিক সম্প্রীতি ও মিলনের এক বিশাল প্ল্যাটফর্ম। খাদ্যাভ্যাস ও বৈশাখী আহার বাঙালির উৎসব মানেই রসনাবিলাস। পহেলা বৈশাখের সকালে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার রীতি এখন নাগরিক সংস্কৃতির একটি ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে গ্রামবাংলায় এর আদি রূপ ছিল রাতের বেঁচে যাওয়া পান্তা ভাত কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ আর আলুভর্তা দিয়ে খাওয়া, যা ছিল মূলত সাধারণ কৃষকের প্রাত্যহিক খাবার। নববর্ষের দিন প্রতিটি বাঙালির ঘরে ঘরে আয়োজন করা হয় বিশেষ খাবারের। হরেক রকমের ভর্তা, চাটনি, মাছের ঝোল আর মিষ্টি-পায়েসের ঘ্রাণে চারপাশ ম ম করে। এই খাবারের বৈচিত্র্য আমাদের সমৃদ্ধ রন্ধনশৈলীরই প্রতিফলন। অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও সম্প্রীতি পহেলা বৈশাখ বাঙালির এমন এক উৎসব যেখানে কোনো ধর্মের ভেদাভেদ নেই। এটি কোনো ধর্মীয় আচার নয়, বরং একটি নিখাদ সাংস্কৃতিক আয়োজন। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান কিংবা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী—সবাই এখানে একক পরিচয় অর্থাৎ ‘বাঙালি’ হিসেবে উৎসব পালন করে। এ দিনটি আমাদের শেখায় যে, মানুষ হিসেবে আমাদের মূলে কোনো বিভেদ নেই। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে এই সময়ে ‘বৈসাবি’ (বৈসু, সাংগ্রাই ও বিজু) উৎসব পালিত হয়, যা মূল ভূখণ্ডের নববর্ষের আনন্দের সাথে এক অপূর্ব মেলবন্ধন তৈরি করে। এটি বাঙালির অসাম্প্রদায়িক ও উদার মানসিকতার জয়গান গায়। শহর ও গ্রামের নববর্ষের বৈচিত্র্য গ্রামের নববর্ষ আজও সরল ও চিরাচরিত। সেখানে হালখাতা, মেলা আর ঘরে ঘরে নতুন ধান ওঠার আনন্দই মুখ্য। অন্যদিকে, শহরে নববর্ষের রূপ কিছুটা আধুনিক ও জাঁকজমকপূর্ণ। ছায়ানটের গানের পাশাপাশি চারুকলা, শিল্পকলা এবং বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় আয়োজিত হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। শহুরে মানুষ ব্যস্ত জীবন থেকে একদিনের ছুটি নিয়ে লাল-সাদা পোশাকে সেজে রাস্তায় নামে। শহর বা গ্রাম—উৎসবের জাঁকজমক ভিন্ন হলেও মানুষের হৃদয়ের আবেগ কিন্তু একই। বর্তমান বাস্তবতা ও বৈশ্বিক প্রভাব আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও পহেলা বৈশাখের গুরুত্ব বিন্দুমাত্র কমেনি। বরং এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে দেশের বাইরের প্রবাসীরাও এই উৎসবে ভার্চুয়ালি অংশ নেন। বিশ্বের বড় বড় শহর যেমন লন্ডন, নিউইয়র্ক বা সিডনিতে বসবাসরত বাঙালিরা মঙ্গল শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন করে বিদেশের মাটিতেও এক টুকরো বাংলাদেশ গড়ে তোলেন। তবে আধুনিকতার চাপে যেন আমাদের আদি লোকজ সংস্কৃতি হারিয়ে না যায়, সেদিকে আমাদের সজাগ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। উপসংহার পহেলা বৈশাখ বাঙালির অস্তিত্বের নবায়ন। এটি আমাদের শেকড়ের দিকে ফিরে তাকানোর দিন। গত বছরের জরাজীর্ণতা আর ব্যর্থতাকে পেছনে ফেলে নতুন এক সম্ভাবনার দিকে যাত্রার শুরু হয় এই দিনে। বর্তমান প্রজন্মের উচিত এই উৎসবের বাণিজ্যিকীকরণের চেয়ে এর অন্তনিহিত মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করা। পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রার মতো আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ হোক মঙ্গলের পথে। আগামীর বাংলাদেশ হোক আরও সমৃদ্ধ, সুন্দর এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে উজ্জ্বল। “এসো হে বৈশাখ এসো এসো / তাপস নিঃশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে / বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক।” শুভ নববর্ষ! আপনার প্রতিটি দিন হোক উৎসবমুখর।
বাংলা নববর্ষ ১৪১৫ উপলক্ষে শুভেচ্ছা বার্তা
সবাইকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা। আজ আমরা বরণ করে নেবে বাংলা নববর্ষ ১৪১৫—আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যের, সংস্কৃতির, আত্মপরিচয়ের এক মহামিলন উৎসব। গুরুকুল ক্যাম্পাস লার্নিং নেটওয়ার্ক-এর পক্ষ থেকে আমি, সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর, প্রতিষ্ঠাতা, জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা, অভিনন্দন ও ভালোবাসা—সকল শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শুভানুধ্যায়ী এবং সারা বিশ্বের ধর্ম-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে প্রতিজন বাঙালিকে। বাংলা নববর্ষ: আমাদের আত্মপরিচয়ের উৎসব বাংলা নববর্ষ কেবল একটি ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে যাওয়ার দিন নয়, এটি আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের আত্মপরিচয়ের বহিঃপ্রকাশ। বাঙালি জাতির নিজস্ব সালগণনা, কৃষিজীবনের হিসাব-নিকাশ, আর মাটির সঙ্গে গভীর সম্পর্কই এই নববর্ষকে আমাদের জাতীয় জীবনে দিয়েছে অনন্য মর্যাদা। পহেলা বৈশাখে আমরা শুদ্ধ চেতনায় নতুনকে আহ্বান করি, পুরোনো দুঃখ-গ্লানি ভুলে যাই। এই দিনটি যেন এক সমবেত প্রার্থনা— মঙ্গল শোভাযাত্রায় রঙিন মুখোশে শোভিত হয়ে আমরা জানাই আমাদের প্রাণের আহ্বান: অশুভকে বিদায় দাও, শুভকে গ্রহণ করো। হালখাতায় নতুন খাতায় স্বাক্ষর করে ব্যবসায়ীরা জানায় নতুন শুরুর প্রতিশ্রুতি। কৃষক-শ্রমিক-নাগরিক সবাই একসঙ্গে যোগ দেয় বৈশাখী মেলায়, যেখানে মিশে থাকে গ্রামীণ জীবনের গান, খাবার, খেলাধুলা আর ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প। আত্মপরিচয় ছাড়া কোনো জাতির সম্মান নেই ইতিহাস সাক্ষী, যে জাতি নিজের সংস্কৃতি, ভাষা ও ঐতিহ্যকে অবহেলা করে, তাকে অন্য কোনো জাতি সম্মান করে না।১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত আমাদের সংগ্রামের মূল মন্ত্রই ছিল আত্মপরিচয় ও স্বাধীনতা। আমরা আমাদের ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছি, সংস্কৃতির জন্য লড়েছি। তাই আজও মনে রাখতে হবে—– আত্মপরিচয় সচেতন জাতি শক্তিশালী হয়, সম্মান পায়।– যে জাতি নিজেকে অস্বীকার করে, সে বিশ্বের দরবারে হারিয়ে যায়। বাংলা নববর্ষ আমাদের সেই আত্মপরিচয়ের শক্তি জাগিয়ে তোলে। গুরুকুলের প্রতিশ্রুতি গুরুকুল ক্যাম্পাস লার্নিং নেটওয়ার্ক শিক্ষা, সংস্কৃতি ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে নতুন প্রজন্মকে গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। আমাদের লক্ষ্য— শিক্ষার্থীদের শুধু পেশাদার দক্ষতায় নয়, সাংস্কৃতিক চেতনাতেও সমৃদ্ধ করা। প্রযুক্তির যুগে দাঁড়িয়ে আমাদের মূল শিকড়কে ভুলে না যাওয়া। বিশ্বে প্রতিযোগিতায় টিকে থেকে বাংলাদেশি পরিচয়ে গর্বিত হওয়া। নববর্ষের প্রত্যাশা বাংলা নববর্ষ ১৪১৫ আমাদের জন্য হোক— শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা বহনকারী। শিক্ষা ও প্রযুক্তির প্রসারে অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়ার উপলক্ষ। সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান জাগানো এক নবযাত্রা। চলুন আমরা সবাই মিলেই বলি—“আমি বাঙালি, আমি গর্বিত। আমার সংস্কৃতি, আমার ভাষা, আমার ঐতিহ্যই আমার পরিচয়।” এই নববর্ষে নতুন প্রতিজ্ঞা হোক— আমরা নিজেদের পরিচয় অক্ষুণ্ণ রেখে আধুনিকতার পথে এগোবো।বাংলা নববর্ষ ১৪১৫ সবার জন্য বয়ে আনুক আনন্দ, সমৃদ্ধি ও শান্তি। শুভ নববর্ষ ১৪১৫! ধন্যবাদান্তে,সুফি ফারুক ইবনে আবুবকরপ্রতিষ্ঠাতা, গুরুকুল ক্যাম্পাস লার্নিং নেটওয়ার্ক ইংরেজি তারিখ: ১৩ এপ্রিল ২০০৯
৭ এপ্রিল: বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস

“স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল”—এই চিরন্তন সত্যটি মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি জাতীয় ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও সমানভাবে সত্য। স্বাস্থ্যহীন একটি জাতি কখনোই পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। জনস্বাস্থ্যের গুরুত্ব বিবেচনা করে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতি বছর ৭ই এপ্রিল বিশ্বব্যাপী পালিত হয় ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস’। এটি কেবল একটি দিবস নয়, বরং বিশ্বজুড়ে চিকিৎসা সেবার সমতা নিশ্চিত করা এবং রোগমুক্ত পৃথিবী গড়ার একটি আন্তর্জাতিক শপথ। ১৯৫০ সাল থেকে শুরু হওয়া এই উদযাপন আজ কোটি কোটি মানুষের বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা ও দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করছে। ঐতিহাসিক পটভূমি ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ডব্লিউএইচও (World Health Organization)-এর নাম। ১৯৪৮ সালের ৭ই এপ্রিল জাতিসংঘের এই বিশেষায়িত অঙ্গপ্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার দুই বছর পর, ১৯৫০ সালের ৭ই এপ্রিল থেকে বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রতি বছর ডব্লিউএইচও একটি নির্দিষ্ট প্রতিপাদ্য বা থিম নির্ধারণ করে, যা সেই বছরের বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংকটের দিকে নজর কাড়ে। যেমন—নিরাপদ মাতৃত্ব, মানসিক স্বাস্থ্য, জলবায়ু ও স্বাস্থ্য ইত্যাদি। এই দিবসটি পালনের মাধ্যমে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সদস্য দেশগুলোকে উন্নত স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদান এবং বৈশ্বিক মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে উৎসাহিত করে। স্বাস্থ্যের সংজ্ঞা ও আধুনিক ধারণা দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্য বলতে কেবল ‘রোগের অনুপস্থিতি’ বোঝানো হতো। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, স্বাস্থ্য হলো—একজন মানুষের শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থিতি বা সুস্থ থাকার অবস্থা। অর্থাৎ, কেবল শরীর ভালো থাকলেই একজন মানুষকে সুস্থ বলা যাবে না; তার মানসিক প্রশান্তি এবং সামাজিক পরিবেশও অনুকূল হওয়া প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসে এই সমন্বিত স্বাস্থ্যের ধারণাকেই মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। শারীরিক স্বাস্থ্যের সাথে মানসিক স্বাস্থ্যের মেলবন্ধন ঘটানোই বর্তমান সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ। সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা: আমাদের অধিকার বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো ‘সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা’ (Universal Health Coverage) নিশ্চিত করা। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ, বিশেষ করে দরিদ্র ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। দুর্ভাগ্যবশত, আজও বিশ্বের অনেক দেশে মানুষ অর্থের অভাবে চিকিৎসা নিতে পারে না। সামান্য অসুখেই অনেকের জীবনপ্রদীপ নিভে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, স্বাস্থ্য কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের জন্মগত অধিকার। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাই যেন সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা পায়, সেটিই এই দিবসের মূল দাবি। পুষ্টি ও স্বাস্থ্য সচেতনতা সুস্থ থাকার প্রাথমিক শর্ত হলো সুষম খাদ্য ও সঠিক পুষ্টি। বর্তমান বিশ্বে একদিকে যেমন অপুষ্টির সমস্যা রয়েছে, অন্যদিকে স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজনের সমস্যাও প্রকট হচ্ছে। ভেজাল খাদ্য এবং অনিয়মিত জীবনযাপন আমাদের অজান্তেই অসংক্রামক ব্যাধি যেমন—ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস আমাদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় পুষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখা এবং নিয়মিত শরীরচর্চার গুরুত্ব মনে করিয়ে দেয়। সুস্থ থাকতে হলে বাইরের অস্বাস্থ্যকর খাবারের বদলে ঘরের তৈরি সুষম খাবারের কোনো বিকল্প নেই। সংক্রামক ও অসংক্রামক ব্যাধি: বর্তমান চ্যালেঞ্জ বর্তমান বিশ্বে স্বাস্থ্যখাতে দুটি প্রধান চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান—সংক্রামক ও অসংক্রামক ব্যাধি। এক সময় গুটিবসন্ত, কলেরা বা ম্যালেরিয়ার মতো সংক্রামক ব্যাধি লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিত। বিজ্ঞানের উৎকর্ষতায় সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হলেও, সাম্প্রতিক সময়ে কোভিড-১৯ এর মতো বৈশ্বিক মহামারী আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে যে পৃথিবী কতটা ঝুঁকির মুখে। অন্যদিকে, আধুনিক জীবনযাত্রার পরিবর্তনের ফলে ক্যান্সার, স্ট্রোক এবং দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগের মতো অসংক্রামক ব্যাধিগুলো নীরব ঘাতক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস আমাদের এই রোগগুলো প্রতিরোধে সচেতন হতে এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে শেখায়। মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব: অবহেলার আড়ালে “স্বাস্থ্য বলতে কেবল শরীরের সুস্থতা নয়, মনের সুস্থতাকেও বোঝায়।” বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর জোর দিলেও আমাদের সমাজে এটি এখনো উপেক্ষিত। বিষণ্নতা, উদ্বেগ এবং মানসিক চাপ মানুষের কর্মক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা প্রকট হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস আমাদের শেখায় যে মানসিক রোগ কোনো লজ্জা বা লুকানোর বিষয় নয়; বরং সঠিক সময়ে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। মন ভালো থাকলেই শরীর ভালো থাকে—এই বার্তাই আধুনিক জনস্বাস্থ্যের মূল ভিত্তি। জলবায়ু পরিবর্তন ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি বর্তমান বিশ্বে স্বাস্থ্য ঝুঁকির অন্যতম বড় কারণ হলো জলবায়ু পরিবর্তন। মাত্রাতিরিক্ত গরম, অসময়ে বন্যা এবং বায়ুদূষণ সরাসরি মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। দূষিত বায়ুর কারণে শ্বাসকষ্ট ও ফুসফুসের রোগ বাড়ছে এবং সুপেয় পানির অভাবে পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস এখন কেবল রোগের চিকিৎসার কথা বলে না, বরং একটি সুস্থ পৃথিবীর কথা বলে। পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখতে পারলে তবেই মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষা করা সম্ভব। পরিবেশ রক্ষা আর জনস্বাস্থ্য আজ একই সুতোয় গাঁথা। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও অর্জন জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে বাংলাদেশের অর্জন বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। মা ও শিশু মৃত্যুহার হ্রাস, গড় আয়ু বৃদ্ধি এবং টিকা দান কর্মসূচিতে অভাবনীয় সাফল্যের জন্য বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্মাননা লাভ করেছে। দেশের তৃণমূল পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্য সেবা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। তবে জনসংখ্যার তুলনায় চিকিৎসক ও হাসপাতালের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং ওষুধের চড়া দাম এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত মানসম্মত স্বাস্থ্য সেবা যেন প্রান্তিক মানুষের জন্য সুলভ ও সহজলভ্য হয়। সচেতনতাই প্রতিরোধের মূল উপায় অধিকাংশ রোগই কেবল সচেতনতার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব। নিয়মিত হাত ধোয়া, নিরাপদ পানি পান করা, সুষম খাবার গ্রহণ এবং ধূমপান ও মাদক থেকে দূরে থাকাই সুস্থতার চাবিকাঠি। বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস আমাদের উৎসাহিত করে যেন আমরা অলস জীবনযাপন ত্যাগ করে কায়িক পরিশ্রম ও নিয়মিত শরীরচর্চায় অভ্যস্ত হই। রোগ হওয়ার পর চিকিৎসার চেয়ে রোগ হতে না দেওয়া বা ‘Prevention is better than cure’—এই নীতি অনুসরণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। উপসংহার ৭ই এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য স্মরণ করিয়ে দেয়—স্বাস্থ্যই মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। অর্থ-বিত্ত থাকলেও সুস্বাস্থ্য ছাড়া তা অর্থহীন। তাই প্রতিটি মানুষের উচিত ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং রাষ্ট্রের উচিত প্রতিটি নাগরিকের জন্য সমান স্বাস্থ্য অধিকার নিশ্চিত করা। কেবল একদিনের আনুষ্ঠানিকতায় নয়, বছরের প্রতিটি দিন যেন আমাদের স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বজায় থাকে। একটি রোগমুক্ত, সুস্থ ও সবল জাতি গড়ে তোলার মাধ্যমেই আমরা পৃথিবীর বুকে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারি। “আসুন, স্বাস্থ্য সচেতনতা ছড়িয়ে দিই, সুস্থ ও সমৃদ্ধ পৃথিবী গড়ি।” সুস্থ থাকুন, সুন্দর জীবন যাপন করুন।
২৬শে মার্চ: মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস রচনা

স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার। কিন্তু পরাধীন জাতির কাছে এই স্বাধীনতা অর্জনের পথ হয় রক্তক্ষয়ী ও কণ্টকাকীর্ণ। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে ২৬শে মার্চ একটি অনন্য সাধারণ ও অবিস্মরণীয় দিন। এটি কেবল একটি তারিখ নয়, বরং আমাদের আত্মপরিচয়, বীরত্ব এবং সার্বভৌমত্বের অবিনাশী স্মারক। ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার মধ্য দিয়ে সূচিত হয়েছিল এক মহাকাব্যিক সংগ্রাম। শোষণের নাগপাশ ছিঁড়ে নিজের ভাগ্য বিধাতা হওয়ার দৃপ্ত শপথ নিয়ে সেদিন বাঙালি গর্জে উঠেছিল। তাই প্রতি বছর এই দিনটি আমাদের জাতীয় জীবনে নতুন প্রত্যয় ও শপথ গ্রহণের বার্তা নিয়ে আসে। ঐতিহাসিক পটভূমি: শোষণের বিরুদ্ধে জাগরণ ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটলেও বাঙালির ভাগ্যাকাশে পরাধীনতার মেঘ কাটেনি। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান নামক যে কৃত্রিম রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল, তার শাসকগোষ্ঠী শুরু থেকেই পূর্ব বাংলার মানুষকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে গণ্য করত। ৫২-র ভাষা আন্দোলন ছিল এই শোষণের বিরুদ্ধে প্রথম সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ। এরপর ধাপে ধাপে ৫৪-র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬-র ছয় দফা (বাঙালির মুক্তির সনদ) এবং ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার স্বপ্ন সুসংহত হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলেও পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন— “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” এই একটি ঘোষণা সাত কোটি বাঙালিকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করেছিল। ২৬শে মার্চ: স্বাধীনতার ঘোষণা ও প্রতিরোধ ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যা শুরু করে। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস ও পিলখানাসহ সারা দেশে নিরস্ত্র মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই সংকটময় মুহূর্তে ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ওয়্যারলেস বার্তার মাধ্যমে তিনি বলেন— “আজ হইতে বাংলাদেশ স্বাধীন।” এরপর চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকেও এই ঘোষণা প্রচারিত হয়। বঙ্গবন্ধুর এই ডাক দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ায়। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র ও সাধারণ মানুষ যার যা কিছু আছে তা-ই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা অর্জন ২৬শে মার্চের ঘোষণার পর শুরু হয় দীর্ঘ নয় মাসের এক রক্তঝরা যুদ্ধ। এই ৯ মাসে আমাদের দিতে হয়েছে চরম মূল্য। ৩০ লক্ষ শহিদের পবিত্র রক্ত আর ২ লক্ষ মা-বোনের অসীম সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে এই স্বাধীনতা। বাঙালির এই যুদ্ধে ১০ই এপ্রিল গঠিত মুজিবনগর সরকার দিক-নির্দেশনা প্রদান করে। এমএজি ওসমানীর সেনাপতিত্বে বীর মুক্তিযোদ্ধারা এবং ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সহায়তায় ১৬ই ডিসেম্বর আমরা লাভ করি চূড়ান্ত বিজয়। তবে এই বিজয়ের ভিত্তি রচিত হয়েছিল ২৬শে মার্চের সেই মহান স্বাধীনতা দিবসেই। আলবদর, আলশামস ও দেশীয় রাজাকারদের চক্রান্ত উপেক্ষা করে বাঙালি প্রমাণ করেছিল—শোষকের বুলেটের চেয়ে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা অনেক বেশি শক্তিশালী। স্বাধীনতা দিবসের তাৎপর্য: আনন্দ ও বেদনার সংমিশ্রণ বাঙালির জাতীয় জীবনে স্বাধীনতা দিবসের গুরুত্ব অপরিসীম। এ দিনটি আমাদের জন্য একই সঙ্গে পরম আনন্দের এবং গভীর বেদনার। একদিকে যেমন পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার গর্ব, অন্যদিকে লক্ষ লক্ষ স্বজন হারানোর হাহাকার। এই দিবসটি আমাদের আত্মপরিচয়ের গৌরবে উজ্জ্বল। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা একটি বীরের জাতি; আমরা অন্যায় ও শোষণের কাছে মাথা নত করি না। স্বাধীনতা দিবস কেবল উৎসবের দিন নয়, বরং এটি আত্মত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে নতুন করে দেশ গড়ার শপথ নেওয়ার দিন। এই দিবসটি প্রতি বছর আমাদের জাতীয় ঐক্য ও দেশপ্রেমের চেতনাকে নবায়ন করে। স্বাধীনতার লক্ষ্য ও বর্তমান মূল্যায়ন স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য ছিল একটি শোষণমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়া। যেখানে প্রত্যেক নাগরিকের থাকবে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার সমান অধিকার। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর আমাদের অর্জন নেহাত কম নয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, নারীর ক্ষমতায়ন এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের কাছে এক বিস্ময়। উন্নয়নশীল দেশের কাতারে আমাদের উত্তরণ ঘটেছে। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের হার কমলেও দুর্নীতি, সামাজিক অস্থিরতা এবং রাজনৈতিক বিভাজন আমাদের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করছে। স্বাধীনতার সুফল যদি সমাজের প্রান্তিক মানুষের কাছে সমানভাবে না পৌঁছায়, তবে শহিদদের আত্মত্যাগ সার্থকতা পায় না। তাই স্বাধীনতা দিবসে আমাদের বর্তমান অর্জনকে মূল্যায়নের পাশাপাশি ব্যর্থতাগুলো চিহ্নিত করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সংকল্প করতে হবে। স্বাধীনতা ও তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল একটি মানবিক ও প্রগতিশীল রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্যে। আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধ কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়, এটি এক জীবন্ত প্রেরণা। এই প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে হবে এবং স্বাধীনতার চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। প্রযুক্তির উৎকর্ষতা ও মেধা দিয়ে তরুণরাই পারে বৈশ্বিক দরবারে বাংলাদেশের মানচিত্রকে আরও সমুজ্জ্বল করতে। মাদক, সাইবার অপরাধ এবং উগ্রবাদ থেকে দূরে থেকে দেশপ্রেমের দীক্ষায় দীক্ষিত হওয়াই হোক তরুণদের ব্রত। কারণ, তরুণদের হাতেই ন্যস্ত আগামী দিনের স্মার্ট ও উন্নত বাংলাদেশের চাবিকাঠি। সমাজ-প্রগতি ও আগামীর স্বপ্ন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যথার্থই বলেছেন— “২৬শে মার্চ আমাদের জাতির আত্মপরিচয় অর্জনের দিন। পরাধীনতার শিকল ভাঙার দিন।” সমাজের প্রগতিই হলো স্বাধীনতার প্রকৃত মাপকাঠি। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই যখন স্বাধীনভাবে নিজেদের বিকাশ ঘটাতে পারবে, তখনই স্বাধীনতা পূর্ণতা পাবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ৭১-এর যুদ্ধ কেবল একটি ভূখণ্ড লাভের লড়াই ছিল না, এটি ছিল আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখার লড়াই। তাই আধুনিক ও উন্নত সমাজ গড়তে হলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মূল স্তম্ভগুলোতে অবিচল থাকতে হবে। উপসংহার স্বাধীনতা মানুষের সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ। কিন্তু স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে তা রক্ষা করা অনেক বেশি কঠিন। একটি জাতির স্বাধীনতাকে টেকসই করতে প্রয়োজন প্রখর ন্যায়বোধ, জাতীয় ঐক্য এবং জনগণের সক্রিয় সচেতনতা। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে কেনা এই স্বাধীনতা আমাদের এক পবিত্র আমানত। সেই রক্তের দায় শোধ হতে পারে কেবল একটি সুখী ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার মাধ্যমে। ২৬শে মার্চের এই মাহেন্দ্রক্ষণে আমাদের অঙ্গীকার হোক—হিংসা, দ্বেষ ও বিভেদ ভুলে আমরা সবাই মিলে এমন এক বাংলাদেশ গড়ে তুলব, যা হবে বিশ্বের দরবারে একটি মডেলে রাষ্ট্র। “স্বাধীনতা মানেই কেবল পতাকা নয়, স্বাধীনতা মানেই কেবল গান নয়, স্বাধীনতা মানেই হলো সব মানুষের অন্ন, বস্ত্র ও বেঁচে থাকার সম্মান।” জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।
২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস : ভয়াল কালরাত্রির গণহত্যা

বাঙালির জাতীয় জীবনে ২৫শে মার্চ একটি বিভীষিকাময় শোকের দিন। ১৯৭১ সালের এই রাতটি কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ ছিল না, এটি ছিল ইতিহাসের এক পৈশাচিক অধ্যায়, যা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে কুখ্যাত। একটি নিরস্ত্র ও নিরপরাধ জাতির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক জান্তা যে বর্বরোচিত গণহত্যা শুরু করেছিল, তা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। ৩০ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতার সূর্যোদয় ঘটেছিল ২৫শে মার্চের সেই রক্তস্নাত অন্ধকার পথ পাড়ি দিয়েই। দেশভাগের ট্র্যাজেডি ও বৈষম্যের বীজ ১৯৪৭ সালের আগস্টে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে ভারতীয় উপমহাদেশে। দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে জন্ম নেয় ভারত ও পাকিস্তান। অদ্ভুত ভৌগোলিক কাঠামো নিয়ে গঠিত পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে দূরত্ব ছিল হাজার মাইলেরও বেশি। এই দুই অংশের মধ্যে ধর্মের মিল থাকলেও ভাষা, সংস্কৃতি, কৃষ্টি এবং জীবন দর্শনে ছিল আকাশ-পাতাল ব্যবধান। শাসনের শুরু থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানকে (বাংলাদেশ) তাদের উপনিবেশ মনে করতে থাকে। অর্থনীতি, রাজনীতি, সম্পদ ও সরকারের সর্বময় ক্ষমতা কুক্ষিগত ছিল পশ্চিমের হাতে। পূর্ব পাকিস্তান বঞ্চিত হতে থাকে তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে। ভাষা আন্দোলন ও স্বাধিকার চেতনার উন্মেষ পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে প্রথম বিরোধের সৃষ্টি হয় মাতৃভাষা বাংলাকে কেন্দ্র করে। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করেন, ‘উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। অথচ পাকিস্তানের ৫৬ শতাংশ মানুষের মুখের ভাষা ছিল বাংলা। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে পূর্ব বাংলার ছাত্রসমাজ। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারদের বুকের রক্তে রঞ্জিত হয় রাজপথ। ৫২-র এই ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই মূলত বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ বপন করা হয়েছিল। ১৯৫৬ সালে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও শাসকগোষ্ঠীর শোষণমূলক আচরণ পরিবর্তন হয়নি। ছয় দফা: বাঙালির মুক্তির সনদ ১৯৬৬ সালে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লাহোরে অনুষ্ঠিত এক রাজনৈতিক বৈঠকে ঐতিহাসিক ‘ছয় দফা’ পেশ করেন। এই ছয় দফা ছিল বাঙালির স্বায়ত্তশাসন ও শৃঙ্খল মুক্তির রূপরেখা। বঙ্গবন্ধু যখন এই দাবি নিয়ে জনগণের দুয়ারে পৌঁছালেন, তখন তাঁর জনপ্রিয়তায় ভীত হয়ে পড়ে আইয়ুব খান সরকার। তারা দমন-পীড়নের পথ বেছে নেয়, যা বাঙালির মনে স্বাধীনতার প্রবল আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ও গণঅভ্যুত্থান ১৯৬৮ সালে বঙ্গবন্ধুকে প্রধান আসামি করে ৩৫ জনের বিরুদ্ধে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ দায়ের করা হয়। লক্ষ্য ছিল আন্দোলনের কণ্ঠরোধ করা। কিন্তু এর ফল হয় উল্টো। ১৯৬৯ সালে ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে আসে। আসাদ ও সার্জেন্ট জহুরুল হকের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হলে তা গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। পতন ঘটে লৌহমানব আইয়ুব খানের। ক্ষমতায় আসেন ইয়াহিয়া খান। গণদাবিতে বঙ্গবন্ধু কারাগার থেকে মুক্তি পান এবং তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ৭০-এর নির্বাচন ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের রাজনীতি ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। কিন্তু পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি শুরু করে। ইয়াহিয়া খান বারবার জাতীয় পরিষদের অধিবেশন পিছিয়ে দিতে থাকেন। এর প্রতিবাদে পুরো পূর্ব বাংলা অসহযোগ আন্দোলনে ফেটে পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় আসে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের সেই মহাকাব্যিক ভাষণ। বঙ্গবন্ধু স্পষ্ট ঘোষণা করেন— “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” অপারেশন সার্চলাইট: ইতিহাসের নৃশংসতম নীল নকশা ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ যখন ইয়াহিয়া খান ঢাকা ত্যাগ করেন, তখনই সংকেত দেওয়া হয় বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার। পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক জান্তা এই পৈশাচিক অভিযানের নাম দিয়েছিল ‘অপারেশন সার্চলাইট’। তাদের উদ্দেশ্য ছিল স্রেফ ভূমি দখল করা, মানুষ নয়। জেনারেল রাও ফরমান আলীর সেই কুখ্যাত উক্তি ছিল— “আমরা পূর্ব পাকিস্তানের মাটি চাই, মানুষ নয়।” রাত ১১টা ৩০ মিনিটে সেনানিবাস থেকে ঘাতক বাহিনী ট্যাংক ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নিয়ে বের হয়ে আসে। ঘুমের ঘোরে আচ্ছন্ন ঢাকা শহর মুহূর্তেই রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রক্তস্নাত জনপদ পাকিস্তানি হানাদারদের মূল লক্ষ্য ছিল মুক্তবুদ্ধির চর্চাকেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তারা জগন্নাথ হল, ইকবাল হল (বর্তমান জহুরুল হক হল) এবং শিক্ষকদের আবাসিক এলাকায় পৈশাচিক তাণ্ডব চালায়। বৃষ্টির মতো গুলি চালিয়ে শত শত ছাত্র ও শিক্ষককে হত্যা করা হয়। ইতিহাসের বর্বরোচিত এই অধ্যায়ে শহীদ হন ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব, ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা এবং অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যসহ দেশবরেণ্য বুদ্ধিজীবীরা। শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, পিলখানা ইপিআর হেডকোয়ার্টার এবং রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সেও একই সময়ে হামলা চালানো হয়। বীর পুলিশ সদস্যরা থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল দিয়ে আধুনিক ট্যাংকের প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে ইতিহাসের পাতায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেন। মধ্যরাতে ঢাকার আকাশ আগুনের লেলিহান শিখায় লাল হয়ে ওঠে, আর চারদিকে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে আর্তচিৎকার। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা ও কারাবরণ ২৫শে মার্চের সেই চরম মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বুঝতে পারেন, আপস করার আর কোনো পথ খোলা নেই। ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে (অর্থাৎ ২৫শে মার্চ রাত ১২টার পর) তিনি ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কস্থ নিজ বাসভবন থেকে ওয়্যারলেসের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তিনি ঘোষণা করেন— “ইহাই হয়তো আমার শেষ বার্তা, আজ হইতে বাংলাদেশ স্বাধীন। … পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলার মাটি হইতে বিতাড়িত না করা পর্যন্ত এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জন না হওয়া পর্যন্ত আপনাদের লড়াই জারি রাখুন।” এর কিছু পরেই পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়। কিন্তু তাঁর সেই অমোঘ ঘোষণা মুহূর্তের মধ্যেই দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং বাঙালির হৃদয়ে প্রতিরোধের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। গণহত্যা দিবসের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও তাৎপর্য দীর্ঘকাল এই ভয়াল রাতটিকে কেবল একটি কালরাত হিসেবে পালন করা হলেও, ২০১৭ সালে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে ২৫শে মার্চকে ‘জাতীয় গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই দিবসের মূল তাৎপর্য হলো বিশ্ববাসীকে মনে করিয়ে দেওয়া যে, একাত্তরের এই রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যে অপরাধ করেছিল, তা ছিল বিংশ শতাব্দীর অন্যতম বৃহৎ ‘জেনোসাইড’। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় স্বাধীনতার মূল্য কতখানি এবং শহীদদের রক্তের ঋণ কতটা ভারী। স্বাধীনতা অর্জন: রক্তের বিনিময়ে কেনা মানচিত্র ২৫শে মার্চের সেই ধ্বংসস্তূপ থেকেই শুরু হয় প্রতিরোধ। নয় মাসের দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, ৩০ লক্ষ শহিদের আত্মদান এবং দুই লক্ষ মা-বোনের অসীম ত্যাগের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর অর্জিত হয় চূড়ান্ত বিজয়। ২৫শে মার্চের গণহত্যা বাঙালিকে ঘরকুনো জাতি থেকে একটি লড়াকু জাতিতে রূপান্তরিত করেছিল। সেদিন যদি বাঙালি ভয়ে পিছু হটত, তবে আজকের এই স্বাধীন মানচিত্র আমরা পেতাম না। উপসংহার ২৫শে মার্চ বাঙালির ইতিহাসে চিরকাল একটি কালো তিলক হয়ে থাকবে। এই কালরাত আমাদের মনে করিয়ে দেয় পাকিস্তানি শাসনামলের চরম নৃশংসতা এবং বাঙালির অজেয় দেশপ্রেম। আমাদের জাতীয় দায়িত্ব হলো এই গণহত্যার সঠিক ইতিহাস পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া। শহীদদের সেই রক্তস্নাত আত্মত্যাগকে বৃথা যেতে দেওয়া যাবে না। তাই আধুনিক ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ার শপথ নিতে হবে এই দিনেই, যেন আর কোনো অপশক্তি বাংলার মাটিতে এমন কালরাত ফিরিয়ে আনার দুঃসাহস না দেখায়। শহীদদের স্মৃতি অমর হোক। জয় বাংলা। আরও দেখুন: গুরুকুলের গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও গুণীজন স্মরণ পঞ্জিকা
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস রচনা

বাঙালির ইতিহাসের আকাশের উজ্জ্বলতম নক্ষত্রের নাম শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি কেবল একটি নাম নন, তিনি একটি মানচিত্র, একটি পতাকা এবং একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্থপতি। ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার নিভৃত পল্লীতে যে শিশুটি জন্ম নিয়েছিল, পরবর্তীকালে সেই শিশুটিই হয়ে ওঠে পরাধীন বাঙালির মুক্তির দিশারি এবং বিশ্বনন্দিত নেতা। তাঁর জন্ম না হলে আজ হয়তো আমরা মুক্ত বাতাসে নিশ্বাস নিতে পারতাম না। তাই ১৭ই মার্চ বাঙালির জাতীয় জীবনে এক আনন্দঘন ও গৌরবের দিন। প্রতি বছর এই দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদায় ‘জাতির পিতার জন্মদিন’ এবং ‘জাতীয় শিশু দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। জন্ম ও বংশ পরিচয় ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ তদানীন্তন ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত শেখ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর বাবার নাম শেখ লুৎফর রহমান এবং মায়ের নাম সায়েরা খাতুন। চার কন্যা ও দুই পুত্রের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন তৃতীয়। পরিবারের বড়রা আদোর করে তাঁকে ‘খোকা’ বলে ডাকতেন। টুঙ্গিপাড়ার প্রাকৃতিক পরিবেশ আর শ্যামল মাটির সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠেন আগামীর এই মহানায়ক। শৈশব ও মানবিক সত্তার বিকাশ খোকার শৈশব কেটেছে টুঙ্গিপাড়ার মেঠো পথে, মধুমতী নদীর জলে আর হিজল-তালের ছায়ায়। তবে সাধারণ শিশুদের মতো কেবল খেলাধুলায় তিনি মগ্ন ছিলেন না; শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে পরোপকার ও মানবিক গুণের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল। গ্রামের দরিদ্র মানুষের দুঃখ-কষ্ট দেখে তাঁর কিশোর প্রাণ কেঁদে উঠত। নিজের গায়ের চাদর দরিদ্র বন্ধুকে দিয়ে দেওয়া কিংবা বাবার গোলার ধান অভাবী মানুষদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, তিনি জন্মগতভাবেই ছিলেন মানবদরদি। গ্রামের হিন্দু-মুসলমান সবার সঙ্গে সম্প্রীতির আবহে বেড়ে ওঠায় তাঁর মধ্যে অসাম্প্রদায়িক চেতনার গভীর মূল প্রোথিত হয়েছিল। শিক্ষা জীবন ও রাজনীতির হাতেখড়ি বঙ্গবন্ধুর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর তিনি মাদারীপুর ইসলামিয়া হাই স্কুল এবং গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুলে পড়াশোনা করেন। ১৯৩৮ সালে যখন তিনি গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলের ছাত্র, তখন তৎকালীন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং শিল্পমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী স্কুল পরিদর্শনে আসেন। সেই কিশোর বয়সেই তিনি সাহসিকতার সঙ্গে স্কুলের ভাঙা ছাদ মেরামতের দাবি তুলে ধরে সোহরাওয়ার্দীর নজর কাড়েন। মূলত সেখান থেকেই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়। ১৯৪২ সালে তিনি এন্ট্রান্স পাস করে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন এবং ১৯৪৪ সালে আই.এ ও ১৯৪৭ সালে বি.এ পাস করেন। কলকাতায় পড়াশোনাকালীন তিনি পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক শিষ্য হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও ভাষা আন্দোলন ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর বঙ্গবন্ধু যখন ঢাকায় ফিরে আসেন, তখন বুঝতে পারেন বাঙালির মুক্তি কেবল নাম পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হয়েই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের অধিকার আদায়ে ধর্মঘটে অংশ নিয়ে কারাবরণ করেন। একই সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যখন আমাদের মাতৃভাষা বাংলার ওপর আঘাত হানে, তখন বঙ্গবন্ধু এর তীব্র প্রতিবাদ জানান। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলনে জেলের অভ্যন্তরে থেকেও তিনি আমরণ অনশন পালন করে আন্দোলনের গতি সচল রেখেছিলেন। তাঁর অদম্য নেতৃত্ব ও ত্যাগই বাঙালিকে পরবর্তী বড় আন্দোলনের সাহস জুগিয়েছিল। সংগ্রামের দীর্ঘ পথপরিক্রমা ও নেতৃত্ব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর সারাজীবন উৎসর্গ করেছিলেন বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬২-র শিক্ষা আন্দোলন এবং ১৯৬৬-র ঐতিহাসিক ‘ছয় দফা’ ছিল বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের মাইলফলক। এই ছয় দফাকে বলা হয় বাঙালির ‘ম্যাগনা কার্টা’ বা মুক্তির সনদ। এর ফলে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাঁকে স্তব্ধ করতে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ দায়ের করে। কিন্তু ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের জোয়ারে তিনি কারাগার থেকে বীরের বেশে মুক্ত হন এবং ছাত্র-জনতা তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৭০-এর নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও ক্ষমতা হস্তান্তরে চলে ষড়যন্ত্র। ৭ই মার্চের মহাকাব্য ও স্বাধীনতা ঘোষণা ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানের বিশাল জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধু বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন— “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” তাঁর এই একটি ভাষণই সাত কোটি বাঙালিকে সশস্ত্র যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। ২৫শে মার্চ কালোরাতে পাকিস্তানি বাহিনী গণহত্যা শুরু করলে ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এরপর দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ৩০ লক্ষ শহিদের রক্ত ও ২ লক্ষ মা-বোনের ত্যাগের বিনিময়ে ১৬ই ডিসেম্বর অর্জিত হয় আমাদের চূড়ান্ত বিজয়। কেন ১৭ই মার্চ ‘জাতীয় শিশু দিবস’? বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনের সঙ্গে শিশু দিবসের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। বঙ্গবন্ধু শিশুদের অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ এবং তারাই একদিন উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলবে। শিশুদের প্রতি তাঁর এই অকৃত্রিম মমতা ও ভালোবাসা স্মরণীয় করে রাখতেই ১৯৯৬ সালে তাঁর জন্মদিন ১৭ই মার্চকে ‘জাতীয় শিশু দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই দিনটি পালনের মূল উদ্দেশ্য হলো শিশুদের অধিকার রক্ষা করা এবং তাদের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও দেশপ্রেমের চেতনা ছড়িয়ে দেওয়া। বঙ্গবন্ধু চাইতেন প্রতিটি শিশু যেন নির্ভয়ে, সুশিক্ষা ও নিরাপত্তার সাথে বেড়ে উঠতে পারে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও আজকের প্রজন্ম বঙ্গবন্ধু কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন বড় মাপের মানবতাবাদী। তাঁর আদর্শ ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন থাকা এবং মেহনতি মানুষের পাশে দাঁড়ানো। আজকের শিশুদের জন্য বঙ্গবন্ধুর জীবন এক মস্ত বড় পাঠশালা। তাঁর ধৈর্য, সততা এবং সাহসিকতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন প্রজন্ম নিজেদের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। ১৭ই মার্চের আনন্দঘন পরিবেশে শিশুরা যখন বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবনের গল্প শোনে, তখন তাদের মধ্যেও দেশ সেবার প্রেরণা জাগ্রত হয়। ১৫ই আগস্ট: জাতির কলঙ্কিত অধ্যায় বাঙালির পরম দুর্ভাগ্য যে, যে নেতা আমাদের একটি দেশ ও মানচিত্র উপহার দিলেন, তাঁকে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ইতিহাসের এই জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে ঘাতকরা বাঙালির অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু তারা জানত না যে, ব্যক্তিকে হত্যা করা যায়, কিন্তু তাঁর আদর্শকে নয়। বঙ্গবন্ধু আজ নেই, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন ও চেতনা প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে চির জাগরূক। উপসংহার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বাংলাদেশ—এই দুটি শব্দ একে অপরের পরিপূরক। তিনি ছিলেন ইতিহাসের রাখাল রাজা, যাঁর বাঁশির সুরে বাঙালি জাতি স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়েছিল। ১৭ই মার্চ আমাদের সংকল্পের দিন। এই দিনে আমরা শপথ নিই একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন ‘সোনার বাংলা’ গড়ার, যা ছিল বঙ্গবন্ধুর আজীবনের স্বপ্ন। কবি অন্নদাশঙ্কর রায়ের ভাষায়: ‘যতকাল রবে পদ্মা, মেঘনা গৌরী, যমুনা বহমান ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।’ জাতির পিতার প্রতি আমাদের এই বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা কেবল একদিনের আনুষ্ঠানিকতায় নয়, বরং আমাদের প্রতিটি কাজে ও চিন্তায় প্রতিফলিত হওয়া উচিত। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।
গুরুকুল ক্যাম্পাসে দ্বীন ও ধর্ম বিষয়ক নীতিমালা

গুরুকুল ক্যাম্পাস লার্নিং নেটওয়ার্কের অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক জীবন দর্শনের আলোকে আমাদের প্রতিটি ক্যাম্পাস হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্প্রীতি এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির এক নিরাপদ স্থান। এই লক্ষ্য অর্জনে নিচের নীতিমালাসমূহ কঠোরভাবে অনুসরণ করা আবশ্যক: ১. গোপনীয়তা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সুরক্ষা কোনো শিক্ষার্থীর ধর্মীয় পরিচয় বা ধর্মীয় প্র্যাকটিস নিয়ে অতিরিক্ত কৌতূহল প্রদর্শন করা যাবে না। কেউ যদি তাঁর ধর্মীয় বিষয়গুলো জানাতে না চান, তবে তা জানার জন্য কোনো ধরনের চাপ দেওয়া যাবে না। কেউ যদি নিজের ধর্মীয় পরিচয় গোপন রাখতে চান, তবে সেই অধিকার তাঁর রয়েছে। জোরপূর্বক কারও ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা পরিচয় জানার চেষ্টা করা নীতিমালার পরিপন্থী। ২. ধর্মীয় চর্চায় জবরদস্তিহীন পরিবেশ কাউকে কোনো ধর্মীয় রীতি বা বিধান পালন করার জন্য অথবা পালন না করার জন্য কোনো ধরনের জোরাজুরি বা চাপ প্রয়োগ করা যাবে না। ধর্মীয় বিশ্বাস ও পালন সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয় এবং গুরুকুল এর পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। ৩. প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত অনুষ্ঠান পালন গুরুকুল প্রতিষ্ঠান হিসেবে কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজন বা পালন করবে না। তবে শিক্ষার্থীরা যদি নিজ উদ্যোগে কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করতে চান, তবে তাঁরা তা করতে পারবেন। সেক্ষেত্রে নিয়ম অনুযায়ী যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে হলরুম বরাদ্দ নিতে হবে। শিক্ষার্থীদের আয়োজিত এই ধর্মীয় অনুষ্ঠানে গুরুকুলের শিক্ষক বা কর্মীবৃন্দ চাইলে ব্যক্তিগতভাবে যোগ দিতে পারেন। তবে বাইরে থেকে কোনো ধর্মীয় অতিথি আমন্ত্রণ জানাতে চাইলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পূর্বানুমতি গ্রহণ বাধ্যতামূলক। ৪. অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা কোনো ধর্ম, ধর্মীয় রীতি-রেওয়াজ বা ধর্মীয় ব্যক্তিত্বকে খাটো করে, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বা ব্যঙ্গ করে কোনো ধরনের বক্তব্য, বিবৃতি বা কৌতুক করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। গুরুকুল প্রমুখ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর-এর শিক্ষা অনুযায়ী— “কাপড়ে নয়, সব অসুন্দর, অসত্য, নীচতা থেকে মনের হিজাব করো।” ক্যাম্পাসের ধর্মীয় চর্চার মূল লক্ষ্য হবে নৈতিক চরিত্র গঠন। মহৎ ব্যক্তিদের আদর্শ চর্চার মাধ্যমে নিজেদের জীবন আলোকিত করাই হবে প্রধান আধ্যাত্মিক লক্ষ্য। ৫. উগ্রবাদ ও উস্কানি প্রতিরোধ ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে কোনো ধরনের ধর্মীয় উস্কানি বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মকে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ক্যাম্পাসের শান্তি ও শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হয় এমন কোনো কাজ বা প্রচারণা চালানো যাবে না। ৬. অভিযোগ দায়ের ও শৃঙ্খলা রক্ষা এই নীতিমালার যেকোনো পয়েন্ট কেউ অমান্য করলে প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট যেকোনো ব্যক্তি (শিক্ষার্থী, শিক্ষক বা কর্মী) সরাসরি গুরুকুল শৃঙ্খলা রক্ষা কমিটি বা গুরুকুল প্রমুখ বরাবর লিখিত অভিযোগ দাখিল করতে পারবেন। ৭. শাস্তিমূলক ব্যবস্থা যদি কোনো ব্যক্তি এই নীতিমালা অমান্য করেন বা ধর্মীয় উগ্রতা ছড়ান এবং তা যদি কর্তৃপক্ষ মনে করেন প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলার পরিপন্থী, তবে গুরুকুল কর্তৃপক্ষ নিম্নোক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের অধিকার সংরক্ষণ করে: শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে: ছাত্রত্ব বাতিল ও স্থায়ী বহিষ্কার। শিক্ষক ও কর্মীদের ক্ষেত্রে: চাকরি থেকে তাৎক্ষণিক অব্যাহতি। অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় ফৌজদারি বা আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ। গুরুকুলের দ্বীন ও ধর্ম বিষয়ক নীতির মূল সারমর্ম হলো— ধর্ম যেন মানুষকে বিভক্ত না করে বরং মানবিকতার বন্ধনে আবদ্ধ করে। আমাদের লক্ষ্য এমন এক প্রজন্ম গড়ে তোলা যারা নিজ নিজ ধর্মে নিষ্ঠাবান হবে এবং একই সাথে সব মানুষের প্রতি ভালোবাসায় সিক্ত থাকবে। “সত্য ও সুন্দরের পথে চলাই হোক আমাদের পরম ধর্ম।”
শারদীয় দুর্গাপূজা ২০০৮ উপলক্ষে ছুটির নোটিশ
বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার মহালগ্নে ‘বিজয়া দশমী’ উপলক্ষে ‘গুরুকুল কুষ্টিয়া ক্যাম্পাস’-এ আগামী ০৯ অক্টোবর ২০০৮ (বৃহস্পতিবার) সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারি ছুটির সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিষ্ঠানের সকল একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম এই দিনে বন্ধ থাকবে। প্লুরালিস্ট সোসাইটি ও গুরুকুলের জীবনদর্শন গুরুকুল কুষ্টিয়া ক্যাম্পাস জন্মলগ্ন থেকেই একটি ‘প্লুরালিস্ট সোসাইটি’ বা বহুত্ববাদী সমাজ বিনির্মাণে বিশ্বাসী। গুরুকুল মনে করে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আঙিনা হবে এমন এক মিলনমেলা যেখানে সকল ধর্ম, বর্ণ ও মতের মানুষ তাদের স্ব-স্ব বিশ্বাস ও সংস্কৃতি নিয়ে অত্যন্ত মর্যাদার সাথে সহাবস্থান করবে। শারদীয় দুর্গাপূজার এই ছুটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং প্রতিটি সম্প্রদায়ের উৎসবকে সম্মান জানানোর মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধন সুদৃঢ় করার একটি প্রয়াস। ছুটির বিস্তারিত সময়সূচী প্রশাসন বিভাগ কর্তৃক জারিকৃত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী: ছুটির তারিখ: ০৯ অক্টোবর ২০০৮ (বৃহস্পতিবার)। কার্যক্রম পুনরায় শুরু: ১০ অক্টোবর ২০০৮ (শুক্রবার) থেকে ক্যাম্পাসের সকল ক্লাস, পরীক্ষা এবং দাপ্তরিক কাজ পূর্বনির্ধারিত সময়সূচী অনুযায়ী যথারীতি পরিচালিত হবে। নিরাপত্তা ও ভ্রাতৃত্বের নির্দেশনা উৎসবকালীন সময়ে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও উৎসবের পবিত্রতা বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। বিজ্ঞপ্তি অনুসারে, সকল শিক্ষার্থী ও কর্মীকে শান্তিপূর্ণভাবে উৎসব উদযাপনের জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। গুরুকুল বিশ্বাস করে, উৎসবের আনন্দ যখন সকলের মাঝে ভাগ করে নেওয়া হয়, তখনই একটি সুন্দর ও সহনশীল সমাজ গড়ে ওঠে। কর্তৃপক্ষের বার্তা গুরুকুল কুষ্টিয়া ক্যাম্পাসের প্রশাসন বিভাগ জানিয়েছে, “গুরুকুল পরিবার বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যে বিশ্বাস করে। আমাদের ক্যাম্পাসে সব ধর্মের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানই আমাদের প্রকৃত শিক্ষার পরিচয়। বিজয়া দশমীর এই পুণ্য তিথিতে আমরা সকল ধর্মাবলম্বীদের মাঝে মৈত্রী ও সংহতির জয়গান গাই।” গুরুকুল কুষ্টিয়া ক্যাম্পাস পরিবারের পক্ষ থেকে কুষ্টিয়াবাসীসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে শারদীয় দুর্গাপূজা ও বিজয়া দশমীর আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানানো হয়েছে।
অমিয়ভূষণ তাঁতী বউ: রূপান্তরিত স্বাধীন সত্তা – সোহানা মাহবুব
অমিয়ভূষণ তাঁতী বউ: রূপান্তরিত স্বাধীন সত্তা – সোহানা মাহবুব Abstract : In his short story ‘Tantibou’, Amiyabhushon Majumdar has depicted the tale of a flourishing liberated soul of an enslaved woman. Love induced sexual desire incites ecstasy, and a deep thirst for life. On the other hand, loveless sex generates perversion and deformity. The author has attempted to impose this theme on the lives of a weaver and an enslaved woman. The subservient-exhausted-dying woman has been woken up with the love of the weaver, his desire for offspring and his affectionate touches; a sense of soul-searching has risen in her. Finally, she has found herself and redemption by walking through the path of darkness. The newfound self-consciousness has given her redemption and transformed her as a liberated soul. This story apprehends how an enslaved woman becomes a weaver’s wife, and finally transforms into an independent entity. This essay attempts to critically understand the construction of different phases of this metamorphosis. [ অমিয়ভূষণ তাঁতী বউ: রূপান্তরিত স্বাধীন সত্তা – সোহানা মাহবুব ] অমিয়ভূষণের কথাসাহিত্যে নারী অমিত শক্তির আধার। তাঁর কাছে ”নারীই জীবন, পুরুষ তার means to an end…’|(১) – তাঁতীবউ গল্পেও অমিয়ভূষণ এমন এক নারীকে এঁকেছেন, যার প্রবল আত্মশক্তি এক পরাধীন অকিঞ্চনসত্তা থেকে তাকে স্বাধীন-শুদ্ধ সত্তায় রূপান্তরিত করেছে। আলোচ্য প্রবন্ধে এই নারী, গল্পে যার নাম ”তাঁতীবউ, তার রূপান্তরিত সত্তার স্বরূপ উন্মোচনই অন্বিষ্ট হয়ে উঠেছে। নরনারীর সম্পর্ক রূপায়ণে অমিয়ভূষণ মজুমদার যৌনতাকে অপরিহার্য মনে করেন। তবে সেই যৌনতাকে হতে হবে প্লবলভাবে জীবনীশক্তির আধার। আদিম প্রাণশক্তিই (লাইফ ফোর্স) তাঁর কাছে যৌনতার মূল উপাদান। তিনি মনে করেন, যৌনতা তখনই শক্তি হয়ে উঠবে, যখন তার ভেতর থাকবে পরিশুদ্ধ প্রেম। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন: …আমাদের দেশের লেখকরা যা বলে, ইউরোপেও অনেকে বলে যে love is conjunction of body. আসলে love হচ্ছে light, that is extracted from the body. দুটো শরীরের ঘর্ষণে যে আলো দেখা যায়, সেটাই মানুষের আবিষ্কার,that is love তাই সে আলোর সন্ধান যখন করব তখন আমার চিত্ত যদি প্রেমে উদ্ভাসিত না হয়, তবে কি হবে! …এটা যদি দুটো মানুষ যখন পাশাপাশি আসে …যারা মহাপুরুষ নয়, …তাদের মধ্যে, দুটো বিন্দুর মধ্যে যেমন আর্কল্যাম্পের আলো, আলো জন্মায়। তাতে কাম থাকবেই তা কিন্তু হীরকদ্যুতি স্বর্ণালঙ্কারে পান। অমিয়ভূষণের তাঁতীবউ গল্পেও লেখক এমনই এক যৌনজীবনেরযে কথা বলতে চেয়েছেন। যৌনতা যেখানে প্রেম ও জীবনীশক্তি হিসেবে কাজ করেছে, এ গল্পে সেখানে ফুল ফুটেছে; আবার যেখানে যৌনতা ধর্ষণের নামান্তর সেখানে ফুলের বদলে জেগে উঠেছে বিকলাঙ্গতা আর কদর্যতার অন্ধকার। [ অমিয়ভূষণ তাঁতী বউ: রূপান্তরিত স্বাধীন সত্তা – সোহানা মাহবুব ] ‘তাহলে ধরে নেওয়া যেতে পারে-পুরুষটি যতবেলা ইভের অ্যাডাম, ততবেলা সম্পর্কের সুতো ছাড়তে তিনি যাকে বলে অমায়িক নাম্বার ওয়ান অর্থাৎ এই ফাঁকে তোমরা যা কিছু করো না বাপু, বাধা দিতে আমার বয়েই গেছে।…তবে পুরুষসঙ্গীটি যদি ইভের অ্যাডাম হওয়ার পরিবর্তে ইভটিজার হয়ে ওঠে, তাহলেই তিনি কৃপাণহস্ত। তখন তুমি যে-ই হও না কেন…তোমাকে ধর্ষক নামেই ডাকহবে।৩ অমিয়ভূষণের এই যৌনতাবোধ তাঁর কথাসাহিত্যের মূল সুর। আলোচ্য প্রবন্ধে আমরা অমিয়ভূষণের তাঁতীবউ গল্পে গোকূল আর তাঁতীবউয়ের মধ্যকার সম্পর্ক-সূত্র ব্যাখ্যায় এবং তাঁতী বউয়ের হয়ে ওঠার ক্ষেত্র নির্মাণে এই জীবনেচ্ছাজাগানিয়া যৌনতার প্রভাব অনুধাবন করতে সচেষ্ট হব। অমিয়ভূষণের তাঁতীবউ গল্পটি ১৩৫৪ বঙ্গাব্দে ”পূর্বাশ্রার আষাঢ় সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। তাঁতী এবং তার ক্রীতদাসীর মধ্যে ক্রমে গড়ে ওঠা সম্পর্কের অন্তর্বুননকেদ্ধশল- আলো অন্ধকারের রঙে বিশ্লেষিত হয়েছে এ গল্পে। এখানে অমিয়ভূষণ এমন এক যুগের কথা বলছেন, যা অন্ধকার আর আলোর আকাক্সক্ষাহীন মিলনের যুগ, যে যুগ মানবসত্তাকে দাসে পরিণত হওয়া কতগুলো হাত-পা-চেতনা বাঁধা কাঠামো বিকিকিনির যুগ। এরকমই এক বন্ধ্যা সময়ের গল্প বলতে চেয়েছেন অমিয়ভূষণ, যার কেন্দ্রাতিগ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে এক ক্রীতদাসী আর তার সত্ত¡াধিকারী তাঁতীর মধ্যকার সম্পর্কের টানাপড়েন। [ অমিয়ভূষণ তাঁতী বউ: রূপান্তরিত স্বাধীন সত্তা – সোহানা মাহবুব ] অভিমন্যু বসাকের পুত্র গোকুল তšদবয়নের কেদ্ধশল নিরয়েইক্ত জন্মেছিল। পিতাকে বচকানা কাপড় আর ঠেঁটির পরিবর্তে মসলিন-বয়নে অতিক্রম করতে পারাটাই ছিলো তার কৃতিত্ব আর সৃজনশীলতার প্রকাশ। কিšদ তখনও পর্যন্ত সেটি পরিণত শিল্পবোধের অভাবে সেরা হয়ে উঠতে পারেনি। অর্থাৎ সৃজনে যে শৈল্পিকতা প্রয়োজন, যে জীবনীশক্তি প্রয়োজন, সেটি গোকুলের ভেতর জন্মেনি তখনও। তার তৈরি মসলিন আর মাকড়শার জাল তখনও অভিন্নই প্রায়। লেখকের ভাষায়: গঞ্ছে পাঠাবার মতো সরেস জিনিস তার তাঁতে উৎরাত না, বিশেষ করে ফুলের কাজগুলোতে সোনার আঁশ খাটাতে সে পারতো না, কাজেই রাত্রিতে ঘুমিয়ে পড়ার আগে কয়েকটি মুহূর্ত ছাড়া বড়ো বেশি কারো চোখেপড়ত না তার কারিগরি; বড়োজোর সকালে কোনো স্বামী দেখতে পেতো রাত্রির শুকনো মালাগাছির সঙ্গে বিছানায় পড়ে আছে মাকড়সার শাদা জালির মতো কী একটা। গোকুল এভাবেই মসলিনের খেয়ালে জড়িয়ে গেলো। ইদিলশাহী পরগণার হাটে মসলিন বিক্রির পর হাটের বিশেষ এক ভিড়াক্রান্ত দিক তার কেদ্ধতূহলবাড়িয়ে তোলে। জমিদার-উজির-লাঠিয়াল-পাইক-পেয়াদা-সিপাইদের প্রবল ভিড় জানান দেয় ”এদিকে বাঁদী-বান্দার দোকান। টাকা দিয়ে বান্দা পাওয়া যেতো জোয়ান, বুদ্ধিমান, কেদ্ধশলী, পাঠান, মোবলা, খোজা, হিন্দু যার যে রকম চাই। বাঁদীও পাওয়া যেতো মুলতানি, গুজরাটি, আফগানি, শাদা, গোলাপি, শ্যামলা, কখনও বসরা থেকেও আসত।…আনারকলি, নুরজাহাঁ এসব দোকানের বেসাত্রি।৫ অন্ধকার এক কাল তার ক্ষতচিহ্নসমেত এভাবেই গল্পে উঠে আসে। মসলিন আর ক্রীতদাস চিহ্নিত করে দেয় একইসঙ্গে একটি বিশেষ কালের ইতিবাচকতা ও নেতিবাচকতাকে। [ অমিয়ভূষণ তাঁতী বউ: রূপান্তরিত স্বাধীন সত্তা – সোহানা মাহবুব ] প্রাচীন ও মধ্যযুগে ভারতে যে দাসপ্রথা প্রচলিতাে, ছিতার বিবরণ মেলে শিলালিপি, পুরাণ, রামায়ণ-মহাভারত-বিদেশি পর্যটকদের বিবরণ এবং অন্য সাহিত্যের উল্লেখ থেকে। প্রথম দিকে, দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের মতে, ”দাস শব্দের অর্থে লাছিদাতা। আর্য ভাষাভাষীর হরপ্পা সভ্যতার মানুষদের সাধারণভাবে ঐ নামে অভিহিত করতো। পরবর্তীকালে বিজিত হরপ্পা অধিবাসীদের তারা দাস (অধীন) হিসাবে ব্যবহার করতো। তখন থেকেই দাস শব্দটির অর্থ পাল্টে গিয়ে সম্পূর্ণ অধীনতা বোঝান হয়েছে। বিজিত মহিলাদের অধীনভাবে ব্যবহার করলেও আর্য ভাষাভাষীদের সন্তানধারণ করা তাদের অন্যতম কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মধ্যযুগে সুলতান, আমীর ওমরাহ, রাজা বা অভিজাতদেরওীতদাসক্র থাকত’।৬ এরকমই এক ক্রীতদাসী এ গল্পের তাঁতীবউ। পঞ্চদশ শতকের শেষ বা ষোড়শ শতকের ঘটনাই এ গল্পের কালপট বলে অনুমান করে নেয়া যেতে পারে। ১৮৩৩ খ্রি. পর্যন্ত ভারতবর্ষে দাসপ্রথার প্রচলন এবংমধু সাধু ্ররখাঁনেদ্ধবাণিজ্যের সঙ্গে সঙ্গে দাসব্যবসাও ছিল ষোড়শ শতকেÑএক সাক্ষাৎকারে অমিয়ভূষণের এমন মন্তব্যের বরাতে এ গল্পের সময়কাল ষোড়শ শতকের আগে-পরে বলে বিবেচনা করা যেতে পারে। সেই কালের রূপাবয়ব নির্মাণে লেখক এখানে মসলিন-দাসব্যবসা আর সামন্ত শোষকের মতো কালচিহ্নায়ক উপাদান ব্যবহার করেছেন। মেলার শেষদিন কেদ্ধতূহলবশত পায়ে পায়ে গোকুল বাঁদী বিকিকিনির দোকানে গেলে বিক্রেতার ওঁচা-ভাঙা মাল-উচ্ছি¡ষ্ট এক বাঁদী তার কপালে জোটে। যে খেয়ালের বশে গোকুল মসলিন বয়নে জড়িয়েছিল, ঠিক সেই একই ধরনের খেয়ালেই মসলিন-বিক্রির টাকায় সে সাতপাঁচ না ভেবে একটি ”মেয়ে নয়, মেয়ের কাঠামো যেন্র৭ কিনে নিলো। [ অমিয়ভূষণ তাঁতী বউ: রূপান্তরিত স্বাধীন সত্তা – সোহানা মাহবুব ] মূল গল্পের শুরু এখান থেকেই। বাঁদী ক্রয়ের পর নিজের ওপরেই ক্ষিপ্ত গোকুল একবারই সেই মাংসহীন হাড়সর্বস্ব কাঠামোর দিকে তাকিয়ে
কেন গুরুকুলে কাজ করবেন?

গুরুকুল ক্যাম্পাস লার্নিং নেটওয়ার্কের মূল দর্শন কেবল ডিগ্রি প্রদান নয়, বরং একজন মানুষকে পূর্ণাঙ্গভাবে গড়ে তোলা। আমাদের মিশন হলো— এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করা যারা হবে শিক্ষিত, দক্ষ, কর্মঠ, রুচিশীল ও মানবিক। বর্তমান সময়ে কেবল পুঁথিগত বিদ্যা মানুষকে যান্ত্রিক করে তুলছে। গুরুকুল বিশ্বাস করে, একজন দক্ষ প্রকৌশলী বা চিকিৎসকের আগে তাকে একজন ভালো মানুষ হতে হবে। এই মানবিক ও রুচিশীল দৃষ্টিভঙ্গিই আমাদের প্রতিটি ক্যাম্পাস ও পাঠদানের মূল ভিত্তি। জনসম্পদকে ‘সম্পদে’ রূপান্তরের জাতীয় দায়িত্ব বাংলাদেশ প্রাকৃতিক খনিজ সম্পদে (যেমন: সোনা, হীরা বা খনিজ তেল) অত্যন্ত দরিদ্র। আমাদের একমাত্র এবং সবচেয়ে বড় শক্তি হলো বিশাল জনসম্পদ। কিন্তু রূঢ় সত্য এই যে, এই বিশাল জনগোষ্ঠী যদি কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত এবং কর্মক্ষেত্রে দক্ষ না হয়, তবে তারা জাতির জন্য ‘এসেট’ (Asset) হওয়ার পরিবর্তে বিশাল এক ‘লায়াবলিটি’ (Liability) বা বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। গুরুকুলের সাথে কাজ করার অর্থ হলো— এই বিশাল বোঝাটিকে দেশের অর্থনৈতিক ইঞ্জিনে রূপান্তর করা। আপনি যখন এখানে কাজ করবেন, আপনি মূলত একটি জাতির ভিত্তি মজবুত করার কারিগর হিসেবে ভূমিকা রাখবেন। সামাজিক অবক্ষয় ও নিরাপত্তার সংকট মোকাবিলা একটি দেশের তরুণ সমাজ যখন বেকার থাকে এবং তাদের হাতে কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মদক্ষতা থাকে না, তখন তারা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এই হতাশা থেকেই জন্ম নেয় মাদকাসক্তি, অপরাধপ্রবণতা এবং সামাজিক অস্থিরতা। কর্মসংস্থানহীন একটি জনপদ দ্রুতই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। গুরুকুল ক্যাম্পাস লার্নিং নেটওয়ার্ক কর্মমুখী কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান নিয়ে কাজ করছে। আমরা বিশ্বাস করি, একটি দক্ষ হাত কখনোই অপরাধের দিকে যায় না। গুরুকুলের সাথে যুক্ত হয়ে আপনি তরুণদের বিপথগামিতা থেকে রক্ষা করে একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ার যুদ্ধে অংশ নিচ্ছেন। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট: বিশ্বজয়ের প্রস্তুতি বর্তমান বিশ্ব এখন একটি গ্লোবাল ভিলেজ। বাংলাদেশের দক্ষ জনশক্তির জন্য মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে ইউরোপ-আমেরিকা পর্যন্ত বিশাল বাজার উন্মুক্ত। কিন্তু কেবল কারিগরি জ্ঞান থাকলেই আন্তর্জাতিক পরিবেশে টিকে থাকা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন ভাষাগত দক্ষতা এবং অন্য দেশের সংস্কৃতির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। গুরুকুল তার শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত কালচারাল এডুকেশন প্রদান করে। আমাদের লক্ষ্য হলো, একজন শিক্ষার্থী কুষ্টিয়া বা দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে শিক্ষা নিয়ে যেন দুবাই, সিঙ্গাপুর বা লন্ডনের যেকোনো কর্পোরেট পরিবেশে আত্মবিশ্বাসের সাথে কাজ করতে পারে। এই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখতে গিয়ে আমরা শিক্ষকদের জন্য এবং কর্মীদের জন্য তৈরি করেছি এক বিশ্বমানের কর্মপরিবেশ। কেন আপনি আমাদের সাথে যোগ দেবেন? আদর্শিক সন্তুষ্টি: আপনি কেবল একটি চাকরি করছেন না, বরং আপনি দেশ গড়ার মিশনে সুফি ফারুক ইবনে আবুবকরের মতো দূরদর্শী নেতৃত্বের সাথে কাজ করছেন। ভবিষ্যৎমুখী শিক্ষা পদ্ধতি: আমরা আধুনিক প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনী শিক্ষণ কৌশল ব্যবহার করি, যা আপনার পেশাদার দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়ক। সাংস্কৃতিক ও মানবিক বিকাশ: গুরুকুল তার কর্মীদের ব্যক্তিত্ব ও রুচি বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। এখানে কাজ করা মানে প্রতিনিয়ত নিজেকে উন্নত করা। দেশপ্রেমের বাস্তব প্রয়োগ: বক্তৃতার মাধ্যমে নয়, বরং দক্ষ হাত তৈরির মাধ্যমে দেশের জিডিপিতে সরাসরি অবদান রাখার সুযোগ এখানে বিদ্যমান। বাংলাদেশকে যদি আমরা বসবাসের উপযোগী, সমৃদ্ধ এবং নিরাপদ একটি রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চাই, তবে কারিগরি শিক্ষার বিপ্লব ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। গুরুকুল ক্যাম্পাস লার্নিং নেটওয়ার্ক সেই বিপ্লবের নাম। আপনি যদি শিক্ষিত, দক্ষ এবং মানবিক সমাজ গড়ার স্বপ্নে বিশ্বাসী হন, তবে গুরুকুলই আপনার জন্য শ্রেষ্ঠ কর্মস্থল। আসুন, ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের উর্ধ্বে উঠে জাতির কল্যাণে আমরা একযোগে কাজ করি। আপনার মেধা ও পরিশ্রমই পারে একটি দক্ষ প্রজন্ম তৈরি করতে, যারা দেশ ও বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকাকে গর্বের সাথে তুলে ধরবে। যোগ দিন আমাদের মিশনে, গড়ে তুলুন আগামীর বাংলাদেশ।